অপালা

ঋক বৈদিক যুগের বিদুষী নারী অপালা প্রসঙ্গে তার জন্ম, দুঃখের জীবন, ইন্দ্রকে সোম দান করার উদ্দেশ্যে অপালার যাত্রা, অপালার নিকট ইন্দ্রের আগমন, অপালা কর্তৃক ইন্দ্রকে সোমপান করার আবেদন, অপালার নিকট সোমপ্রার্থী ইন্দ্র, দেবরাজ ইন্দ্রের সোমপান, ইন্দ্রের নিকট অপালার বর প্রার্থনা, অপালে ইন্দ্রের বর প্রদান, ত্বক রোগ মুক্ত অপালা, অপালা কর্তৃক ঋগ্বেদ-সংহিতার ঋক রচনা, অপালার পিতৃভক্তি ও আধুনিক সাহিত্যে অপালা সম্পর্কে জানবো।

প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী অপালা প্রসঙ্গে অত্রির কন্যা অপালা আত্রেয়ী, ঋগ্বেদ-সংহিতার অষ্টম মণ্ডলের ৯১তম কবিতার রচয়িতা অপালা, অপালার দুঃখের জীবন, অপালার পিতৃভক্তি সম্পর্কে আলোচনা।

বিদুষী নারী অপালা

ঐতিহাসিক চরিত্রঅপালা
সময়কালঋকবৈদিক যুগ
জন্মঅত্রিবংশ
রোগত্বকরোগ
আরাধ্যইন্দ্র
কৃতিত্বঋকবেদের ঋক রচনা
অপালা

ভূমিকা:- ভারতবর্ষ স্বৰ্ণভূমি – বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী। ভারতের অপৌরুষেয় বেদ সকল শাস্ত্রের-সকল বিদ্যার আধার। এই বেদের সুক্তসমূহ যে কেবল শাস্ত্রদ্রষ্টা ঋষিরাই রচনা করতেন তা নয়, বিদূষী রমণীরাও সেই রচনায় অংশ গ্রহণ করতেন। এরকমই একজন বিদুষী নারী ছিলেন অপালা।

অপালার জন্ম

অপালাও বিশ্ববারার ন্যায় অত্রিবংশে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।

বিদুষী অপালার দুঃখের জীবন

অত্রির কন্যা ব্রহ্মবাদিনী অপালার জীবন বড় দুঃখময় ছিল। কোনো কারণে ত্বক রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর স্বামী অপালাকে পরিত্যাগ করেন। স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্তা হয়ে অপালা পিতার আশ্রমে তপস্যা করছিলেন।

ইন্দ্রকে সোম দান করার উদ্দেশ্যে অপালার যাত্রা

সোম ইন্দ্রের প্রিয় বলে তিনি ইন্দ্রকে সোম দান করবার জন্য একদিন নদী তীরে গমন করেন। স্নান করে ফেরার পথে সোমও পেয়েছিলেন, কিন্তু পথে যেতে যেতে সেই সোম তিনি নিজেই পান করেন।

অপালার নিকট ইন্দ্রের আগমন

সোম পান করার সময় তাঁর দন্তঘর্ষণজনিত শব্দ শুনে ইন্দ্ৰ তা অভিষব প্রস্তরের ধ্বনি মনে করে অপালার নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন “এখানে কি সোম অভিযুক্ত হচ্ছে ?” অপালা বললেন, “তা নয়, দন্তঘর্ষণজনিত শব্দ হচ্ছে।”

বিদুষী অপালা কর্তৃক ইন্দ্রকে সোমপান করার আবেদন

এরপর ইন্দ্ৰ ফিরে যেতে উদ্যত হলেন। তখন ব্রহ্মবাদিনী অপালা বললেন, “আপনি ত সোমপান করার জন্য গৃহে গৃহে গমন করেন, তবে কেন আপনি ফিরে যাচ্ছেন ? আপনি আমার দন্তমধ্য হতে সোম পান করুন।”

অপালার নিকট সোমপ্রার্থী ইন্দ্র

পরে ইন্দ্ৰই এসেছেন নিশ্চিতভাবে জানতে পেরে সোমকে বললেন “হে সোম! ইন্দ্ৰ সোমপ্রার্থীরূপে উপস্থিত হয়েছেন ; অতএব ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে প্রথমে ধীরে ধীরে, পরে দ্রুতবেগে গমন কর।”

দেবরাজ ইন্দ্রের সোমপান

ইন্দ্র সোমপানের অভিলাষী হয়ে এসেছিলেন, কাজেই তিনি অপালার মুখ থেকেই সোমপান করলেন। তখন অপালা বললেন “ আপনি সোমপানে কি তৃপ্তি লাভ করেছেন ! ইন্দ্র বলিলেন “আমি তোমার মুখ থেকে সোম পান করে সত্য সত্যই আনন্দিত হয়েছি এবং তৃপ্তি লাভ করেছি – আমি তোমার জন্য কি করতে পারি, বর প্রার্থনা কর।

ইন্দ্রের নিকট অপালার বর প্রার্থনা

অপালা বললেন “হে ইন্দ্রদেব ! আমার পিতার মস্তকে কেশ নেই এবং তাঁর শস্য ক্ষেত্র অনুর্বর। প্রথমে আমার পিতার এই দোষ দুটি দূর করুন।” পরে বললেন “আমি ত্বকরোগে আক্রান্ত হওয়ায় স্বামী আমাকে পরিত্যাগ করেছেন, আমার সেই ত্বকরোগ দূর করে দিন।

বিদুষী অপালার প্রতি ইন্দ্রের বর প্রদান

ইন্দ্রের বরে অপালার পিতার অনুর্বর শস্যক্ষেত্র উর্বর ও শস্যসম্পদশালী হল এবং কেশশূন্য মস্তক কেশে পরিপূর্ণ হল। ইন্দ্রের কৃপায় অপালাও ত্বকরোগ মুক্ত হয়ে সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল হলেন।

ত্বকরোগ মুক্ত অপালা

ইন্দ্র অপালাকে তিনবার আপনার রথ, শকট এবং যুগের ছিদ্রের মধ্য দিয়ে আকর্ষণ করলেন। তাতে তার দোষযুক্ত ত্বক তিনবার উন্মুক্ত হল। প্রথমবারের ত্বক থেকে শল্যকের উৎপত্তি হইল, দ্বিতীয়বার ত্বক থেকে গোধার উৎপত্তি হল এবং তৃতীয়বারে ত্বক থেকে ক্বকলাস হল এবং ব্রহ্মবাদিনীর বর্ণ সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল হল।

অপালা কর্তৃক ঋগ্বেদ-সংহিতার ঋক রচনা

ঋগ্বেদ-সংহিতার অষ্টম মণ্ডলের ৯১ সূক্তের আটটি ঋক্ অপালা রচনা করেছিলেন। জলের দিকে গমন করবার সময় অপালা সোমও লাভ করলেন, গৃহে আনয়ন কালে সোমকে বললেন, ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে তোমাকে অভিষব করি। –

  • (১) হে ইন্দ্র! তুমি বীর, তুমি দীপ্তিমান, তুমি গৃহে গৃহে গমন কর, এই দন্ত দ্বারা অভিযুত ভ্রষ্ট নব শক্তূ, অপূপ এবং উকথস্তুতিবিশিষ্ট সোম পান কর।
  • (২) হে ইন্দ্র! বহুবার আমাদেরকে সামর্থ্যযুক্ত কর। আমাদেরকে বহুসংখ্যক কর, আমাদেরকে বহুবার ধন দান কর।
  • (৩) হে ইন্দ্র! আমার পিতার যে ঊষর ক্ষেত্র আছে তা উৎপাদনশীল এবং তাঁর মস্তক কেশপূর্ণ কর।

বিদুষী অপালার পিতৃভক্তি

ইন্দ্রের নিকট বর প্রার্থনা থেকেই বোঝা যায় যে, অপালার পিতৃভক্তি আদর্শস্থানীয় ছিল।

আধুনিক সাহিত্যে অপালা

সতীনাথ ভাদুড়ির লেখাতেও জায়গা করে নিয়েছে অপালার কাহিনি। ইংরেজি ১৯৬১ সাল, অর্থাৎ ১৩৬৮ বঙ্গাব্দের পূজাবার্ষিকী আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘স্বর্গের স্বাদ’ গল্পটি অপালা আর ইন্দ্রকে নিয়ে লেখা।

উপসংহার :- অপালার মুখ থেকে ইন্দ্র যে সোমপান করেছিলেন সেটিই ছিল চর্মরোগাক্রান্ত, সক্কলের দুচ্ছাই মেয়েটির কাছে স্বর্গের স্বাদ।

(FAQ) ঋক বৈদিক যুগের বিদুষী নারী অপালা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. অপালা কে ছিলেন?

ঋক বৈদিক যুগের বিদুষী নারী।

২. অপালা নামের অর্থ কি?

চর্মরোগ দ্বারা অভিশপ্ত মহিলা।

৩. অপালা সম্পর্কে আধুনিক কালে কে গল্প রচনা করেন?

সতীনাথ ভাদুড়ী।

৪. অপালার কৃতিত্ব কি ছিল?

ঋগ্বেদ-সংহিতার অষ্টম মণ্ডলের ৯১ সূক্তের আটটি ঋক্ অপালা রচনা করেছিলেন।

Leave a Comment