বিশ্ববারা

ঋক বৈদিক যুগের বিদেশী নারী বিশ্ববারা প্রসঙ্গে বৈদিক যুগে নারীর মর্যাদা, বিশ্ববারা কে ছিলেন, বিশ্ববারার জন্ম, গোত্রের ইতিহাস, বিশ্ববারা কর্তৃক ঋকবেদের সূক্ত রচনা ও বিশ্ব বাঁড়া রচিত ঋক গুলির ভাবার্থ সম্পর্কে জানবো।

বিশ্ববারা

ঐতিহাসিক চরিত্রবিশ্ববারা
সময়কালঋকবৈদিক যুগ
জন্মগ্ৰহণঅত্রি মুনির গোত্রে
বিশেষ পরিচয়অত্রিগোত্রজা বিশ্ববারা ঋষি
আরাধ্যঅগ্নি
কৃতিত্বঋকবেদের সূক্ত রচনা
বিশ্ববারা

ভূমিকা :- বৈদিক যুগে সমাজে নারী জাতির বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা ছিল। প্রাচীনকালে বেদের ভাষায় স্ত্রীজাতির সাধারণ নাম ছিল নারী। নারী শব্দে নেত্রী বুঝাত। এই একটি শব্দ থেকেই আর্যসমাজে স্ত্রীজাতির যে কিরূপ সম্মান ছিল, তা বুঝতে পারা যায়। আর এই সময়ের একজন অন্যতম বিদুষী নারী ছিলেন বিশ্ববারা।

বৈদিক যুগে নারীর মর্যাদা

  • (১) প্রাচীন ভারতে বৈদিক যুগে সমাজে বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিল না। পিতৃগৃহে শিক্ষালাভ করতেন এবং যৌবনে স্বীয় অভিপ্রায়ানুরূপ পতি গ্রহণ করতেন। আর্যনারীরা স্বামীর সাথে একসঙ্গে দেবপূজা এবং যজ্ঞ ইত্যাদি করতেন। তাদেরকে অন্তঃপুরমধ্যে বন্দিনী করে রাখবার প্রথা তখন প্রচলিত ছিল না।
  • (২) ঋগ্বেদে সস্ত্রীক যজ্ঞ সম্পাদনের কথা আছে। যে সকল আর্য নারী বেদের মন্ত্র রচনা করেছিলেন তাঁরা ‘ঋষি’ আখ্যা পেয়েছিলেন। কোনো কোনো বৈদিক মহিলা গভীর তত্ত্ববিদ্যা লাভ করেও যশস্বিনী হয়েছিলেন। এখানে একে একে তাঁদের বিষয় আলোচনা করব।

বিশ্ববারা কে ছিলেন?

বৈদিক যুগে যে সকল মহিলারা নারী-ঋষি নামে পরিচিতা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ব্রহ্মবাদিনী মহিলা বিশ্ববারা ছিলেন প্রধান। তাঁর রচিত মন্ত্রগুলি যেমন সুন্দর কবিত্বপূর্ণ তেমনই বিশ্ববারার অসাধারণ মনীষার পরিচায়ক।

বিশ্ববারার জন্ম

বিদুষী নারী বিশ্ববারা অত্রিমুনির গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। এজন্য তিনি অত্রিগোত্রজা বিশ্ববারা ঋষি নামে পরিচিত।

গোত্রের ইতিহাস

  • (১) ভারতবর্ষে আসবার পূর্বে আর্যরা কোনো স্থানেই দীর্ঘকাল বাস করতে পারেন নি, কিন্তু পঞ্চনদ প্রদেশে এসে তাঁরা স্থায়ীভাবে গৃহ ইত্যাদি নির্মাণ করে বসবাস করতে আরম্ভ করলেন। এই পঞ্চনদ প্রদেশেই তাঁদের প্রথম পারিবারিক জীবন গঠিত হল।
  • (২) তাঁরা এদেশে স্ত্রী-পুত্র-পরিবার ও পরিজনবর্গ নিয়ে বেশ সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের পরিবার ও পরিজন বৃদ্ধি পেতে লাগল। একই পূর্বপুরুষের সন্তানরা বহু পরিবারের কর্তা হয়ে উঠল।
  • (৩) তখন পরিবারের মধ্যে গোত্রের বন্ধন স্থাপিত হল এবং বহু পরিবার নিয়ে এক একটি বিশিষ্ট গোত্র গড়ে উঠল। তবে এমনও হত যে একই গোত্রভুক্ত পরিবারসমূহ একই পূর্বপুরুষের বংশধর হতেন না। কিন্তু একটা সাধারণ ধারণার বশীভূত হয়ে তারা ঐরূপ একটি গোত্রের অঙ্গীভূত হতেন। এটাই হল গোত্রের ইতিহাস।

আর্যদের উপাসনা

আর্যরা প্রথমে প্রকৃতির উপাসক ছিলেন। প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যে মুগ্ধ বিস্মিত হয়ে, কিংবা রুদ্রমূর্তিতে ভীত হয়ে, তারই বিধি প্রকাশকে দেবতা বলে গ্রহণ করতেন। এই রূপে তারা ঊষা, সূর্য, আকাশ, অগ্নি, ইন্দ্র প্রভৃতি বহু দেবদেবীর স্তুতিগান করতেন।

বিশ্ববারা কর্তৃক ঋকবেদের সূক্ত রচনা

সেকালে স্ত্রীলোকের পতির সাথে যজ্ঞ সম্পাদন করতে কোনও বাধা ছিল না। ঋগ্বেদ-সংহিতার পঞ্চম মণ্ডলের অষ্টাবিংশ সূক্তটি বিশ্ববারা রচনা করেছিলেন। এই সূক্তে ছয়টি মাত্র ঋক্ আছে৷ আমরা প্রথম ঋক্ থেকে বুঝতে পেরেছি ব্রহ্মবাদিনী বিশ্ববারা দেবগণের স্তব উচ্চারণ করে ঋত্বিকের কার্যও সম্পাদন করছছেন, এবং তৃতীয় ঋকে তিনি দাম্পত্য-সম্বন্ধ শৃঙ্খলাবদ্ধ করবার জন্য অগ্নিদেবতার নিকট প্রার্থনা করছেন। তাঁর বিরচিত ঋক গুলি শব্দ মাধুর্যে ও ভাবসম্পদে এত সুন্দর যে পড়লে বিমুগ্ধ হতে হয়।

বিশ্ববারা রচিত ঋক গুলির ভাবার্থ

আমরা এখানে বিশ্ববারা রচিত ঋক গুলির ভাবার্থ করলাম। –

  • (১) অগ্নি প্রজ্বলিত হয়ে প্রদীপ্ত শিখা বিস্তার করে দীপ্তিমান হয়ছছেন। ঊষাকালে অগ্নি তাঁর প্রশস্ত শিখা বিস্তার করে অত্যন্ত শোভান্বিত হয়েছেন। এই সময়ে বিশ্ববারা হোম করবার জন্য ঘৃতপাত্র-সংযুক্তা হয়ে ইন্দ্রাদি দেবগণের স্তব করতে করতে অগ্নির অভিমুখে গমন করছেন।
  • (২) হে অগ্নি! তুমি সম্যক রূপে প্রজ্বলিত হয়ে অমৃতের উপর আধিপত্য বিস্তার কর। তুমি হব্যদাতার কল্যাণ বিধানার্থে তাঁর নিকট উপস্থিত থাক। তুমি যে যজমানের নিকট বর্তমান থাক, তিনি সমস্ত ধন লাভ করেন এবং তোমার মত যোগ্য অতিথির প্রাপ্য ঘৃতাদি উত্তম দ্রব্য প্রদান করেন।
  • (৩) হে অগ্নি! তুমি আমাদের প্রতি প্রসন্ন হও। আমাদেরকে বিপুল ঐশ্বর্য প্রদান কর। অর্থাৎ তোমার কৃপায় আমরা যেন ধনবান হই। তুমি আমাদের শত্রুগণের পরাক্রম নিবারণ কর এবং আমাদের পতি ও পত্নীর পবিত্র দাম্পত্য প্রেমকে নিবিড়তর কর – সুশৃঙ্খলাবদ্ধ কর। তোমার আশীর্বাদে তাদের যেন কখন পরস্পর বিচ্ছেদ না ঘটে।
  • (৪) হে প্রজ্বলিত দীপ্তিমান অগ্নি! আমি তোমার দীপ্তির স্তব করি। তুমি যজ্ঞস্থলে প্রজ্বলিত থাক, তুমি আমাদের কামনা পূরণ কর।
  • (৫) হে অগ্নি! যজ্ঞে যজমানগণ তোমাকে প্রজ্বলিত ও আহ্বান করছেন তুমি যজ্ঞস্থলে দেবগণকে পূজা কর।
  • (৬) হে পূজকগণ ! হব্যবাহক অগ্নিতে হোম কর, অগ্নির সেবা কর এবং দেবগণের নিকট হব্য বহনার্থে তাঁকে বরণ কর।

উপসংহার :- ভারতবর্ষ স্বৰ্ণভূমি – বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী। ভারতের অপৌরুষেয় বেদ সকল শাস্ত্রের-সকল বিদ্যার আধার। এই বেদের সুক্তসমূহ যে কেবল শাস্ত্রদ্রষ্টা ঋষিরাই রচনা করতেন তা নয়, বিদূষী রমণীরাও সেই রচনায় অংশ গ্রহণ করতেন। এরকমই একজন বিদুষী নারী ছিলেন বিশ্ববারা।

(FAQ) ঋক বৈদিক যুগের বিদেশী নারী বিশ্ববারা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বিশ্ববারা কে ছিলেন?

ঋকবৈদিক যুগের একজন বিদুষী নারী।

২. ঋগ্বেদ-সংহিতার কোন অংশটি বিশ্ববারা রচনা করেন?

পঞ্চম মণ্ডলের অষ্টাবিংশ সূক্তটি।

৩. বিশ্ববারা কোন গোত্রে জন্মগ্ৰহণ করেন?

অত্রি মুনির গোত্রে।

৪. বিশ্ববারা কি নামে পরিচিত ছিলেন?

অত্রিগোত্রজা বিশ্ববারা ঋষি।

Leave a Comment