নব্য প্রস্তর যুগে কৃষির বিকাশ

নব্য প্রস্তর যুগে কৃষির বিকাশ প্রসঙ্গে কৃষির বিকাশে মেয়েদের ভূমিকা, কৃষি পদ্ধতি আবিষ্কার এর সময়কাল, কৃষি প্রযুক্তি, কৃষিজ ফসল, কৃষি পদ্ধতি আবিষ্কার এর সুফল সম্পর্কে জানবো।

নব্য প্রস্তর যুগে কৃষির বিকাশ

ঐতিহাসিক ঘটনানব্য প্রস্তর যুগে কৃষির বিকাশ
সময়কাল আনুমানিক৮০০০-৬০০০ খ্রি:পূ:
কৃষির সূত্রপাতমেয়েরা
প্রধান ফসলযব, গম
কাস্তের নিদর্শনফিলিস্তিনের গুহা
ভারতে ধান চাষ৫০০০ খ্রি:পূ:
নব্য প্রস্তর যুগে কৃষির বিকাশ

ভূমিকা :- নব্য প্রস্তর যুগ -এ আদিম মানুষ লক্ষ্য করেছিল যে, মাটিতে পড়ে থাকা গম, বার্লি প্রভৃতির বীজ থেকে একই রকম নতুন চারাগাছ জন্মায় এবং তাতে শস্য উৎপাদন হয়। এই বিষয় লক্ষ্য করে মানুষ নিজের বসতি অঞ্চলে মাটিতে বীজ বুনতে শুরু করে।

কৃষির বিকাশে মেয়েদের ভূমিকা

কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, আদিম যুগে বীজ থেকে নতুন চারাগাছ জন্মানোর বিষয়টি প্রথমে মেয়েদেরই নজরে আসে এবং মেয়েরাই কৃষির সূত্রপাত করে। পরবর্তীকালে কৃষিকাজের যথেষ্ট প্রসার ঘটলে পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও কৃষিকাজে অংশ নেয়। এই যুগে পুরুষেরা যখন কৃষির পরিশ্রমসাধ্য কাজগুলি সম্পন্ন করত তখন মেয়েরা নিড়ানির সাহায্যে মাটি খুঁড়ে আলু, কচু প্রভৃতি সংগ্রহ করত এবং এর কিছু অংশ আবার মাটিতে পুঁতে দিত।

কৃষি পদ্ধতি আবিস্কারের সময়কাল

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৮,০০০ অব্দ থেকে ৬,০০০ অব্দের কাছাকাছি সময়ের মধ্যে মানুষ কৃষি পদ্ধতির আবিষ্কার করে। এই সময়কার মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাকের) জারমো অঞ্চলের প্রাচীন গ্রামে কৃষিকাজের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ছাড়া এখানকার হাসৌনিয়া, উম-আল দাব্বাগিয়া, তেল আল সুয়াম, মাতারা প্রভৃতি স্থানেও প্রাচীন কৃষিকাজের নিদর্শন মিলেছে। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল লর্দান-এর জেরিকো নামক স্থানেও নব্য প্রস্তর যুগে কৃষির বিকাশ ঘটেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

কৃষি প্রযুক্তি

প্রথমদিকে কৃষি যন্ত্রপাতি ছিল একেবারেই নিম্নমানের। যেমন  –

(১) কৃষি যন্ত্রপাতি

পশুর শিং, পাথর বা লাঠি দিয়ে মাটি আলগা করে তখন বীজ বপন করা হত। পরবর্তীকালে নিড়ানি, কাস্তে, লাঙল প্রভৃতি কৃষি যন্ত্রপাতির উন্নতির পাশাপাশি উৎপাদন ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। বর্তমান ফিলিস্তিনের ওয়াদি এল নাতুফ নামে একটি গুহায় প্রাচীন একটি কাস্তে পাওয়া গেছে। হরিণের পাঁজরের হাড় দিয়ে তৈরি এই কাস্তের মধ্যে পাথরের দাঁত বসানো আছে। এ ছাড়া মিশর, সুইজারল্যান্ড, স্ক্যান্ডিনেভিয়া প্রভৃতি দেশেও প্রাচীন যুগের কৃষিকাজে ব্যবহৃত কাস্তের নিদর্শন মিলেছে। কাস্তে ছাড়াও আদিম মানুষ কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী নিড়ানি, কোদাল প্রভৃতির ব্যবহার শুরু করেছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীকালে লাঙল এবং জোয়ালেরও উদ্ভব ঘটে।

(২) সেচ ও সার প্রয়োগ

কৃষি যন্ত্রপাতির সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমিতে জল দেওয়া বা সেচ ব্যবস্থারও প্রচলন ঘটেছিল বলে জানা যায়। দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন গ্রামগুলিতে কৃষিকাজে সেচ ব্যবস্থার প্রমাণ পাওয়া যায়। অনেক পরে গবাদিপশুর গোবরকে জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি করা হত। তা ছাড়া নদী তীরবর্তী অঞ্চলের মাটি যথেষ্ট উর্বর হওয়ায় নদী উপত্যকা অঞ্চলে চাষবাস বৃদ্ধি পায়।

কৃষিজ ফসল

নব্য প্রস্তর যুগের পূর্বে খাদ্যসংগ্রহকারী মানুষ খাদ্যের জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। খাদ্যের সন্ধানে তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াত। কিন্তু কৃষি পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে সেই নির্ভরশীলতা ও খাদ্য সংস্থানের অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর হয়। এই সময়ের প্রধান কৃষিজ ফসল হল –

(১) যব

মানুষ সর্বপ্রথম যব চাষে অভ্যস্ত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। আবিসিনিয়া ও সিন্ধুর অববাহিকা অঞ্চলে যথেষ্ট যব উৎপাদন হত বলে জানা যায়।

(২) গম

এ ছাড়া প্রথমদিকের উৎপাদিত অন্য শস্যের মধ্যে গম ছিল প্রধান। মেসোপটেমিয়া ও উত্তর আফ্রিকার আদিম মানুষ এই জাতীয় শস্যের চাষ করত। কেন-না, কম পরিশ্রমেই গম জাতীয় শস্য উৎপাদন সম্ভব ছিল।

(৩) ধান ও অন্যান্য ফসল

পরবর্তীকালে ধান ও অন্যান্য শস্য উৎপাদন শুরু হয়। ভারতে আজ থেকে অন্তত ৫০০০ বছর পূর্বে সর্বপ্রথম ধান চাষ শুরু হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ইংল্যান্ড ও সোভিয়েত রাশিয়ায় জোয়ার চাষের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

কৃষি পদ্ধতি আবিষ্কারের সুফল

নব্য প্রস্তর যুগে কৃষি আবিষ্কারের ফলে মানবসমাজে বিরাট এক বিপ্লব ঘটে যায়। যেমন –

(১) অনিশ্চয়তার অবসান

পূর্বে মানুষ নিজেরা খাদ্য উৎপাদন করতে জানত না বলে তারা প্রকৃতির ফলমূল, পাখির ডিম, নদীর মাছ প্রভৃতি সংগ্রহ এবং পশু শিকার করে খাদ্য সংগ্রহ করত। কিন্তু এভাবে খাদ্যের জোগান ছিল সম্পূর্ণ অনিয়মিত এবং অনিশ্চিত। কৃষি পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে আদিম মানুষের খাদ্যের অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর হয়।

(২) জনসংখ্যা বৃদ্ধি

পূর্বে খাদ্যের অভাবে অনাহারে অথবা পশুশিকার করতে গিয়ে হিংস্র পশুর আক্রমণে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটত। কুড়ি বছর বয়সের মধ্যেই অন্তত অর্ধেক মানুষ মারা যেত। কিন্তু কৃষি পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে মানুষ অনাহার ও বন্যপশুর আক্রমণ থেকে অনেকটা রেহাই পায়। ফলে মৃত্যুর হার কমে গিয়ে আদিম সমাজে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

(৩) যাযাবর জীবন ত্যাগ

কৃষি আবিষ্কারের ফলে মানুষ ধীরে ধীরে যাযাবর জীবন ছেড়ে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে এবং সমাজবদ্ধ হয়। তারা গাছের ডালপালা, বিভিন্ন লতাপাতা প্রভৃতি দিয়ে কুটির তৈরি করে বসবাস শুরু করে। কৃষিক্ষেত্রের নিকটবর্তী স্থলভূমিতে, এমনকি ছোটোবড়ো জলাশয়, হ্রদ ইত্যাদিতে খুঁটি পুঁতে বসতি গড়ে তোলে। সুইজারল্যান্ডের প্রাচীন অধিবাসীদের হ্রদে বসবাসের প্রমাণ আবিষ্কৃত হয়েছে।

(৪) উদ্‌বৃত্ত শস্য সংরক্ষণ

নারীদের সঙ্গে ক্রমে পুরুষরাও কৃষিকাজে যুক্ত হলে উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পায়। উদ্‌বৃত্ত শস্য সংরক্ষণের জন্য শস্যগুদামের ব্যবহার শুরু হয়।

(৫) কুটিরশিল্পের বিকাশ

নব্য প্রস্তর যুগে কৃষির বিকাশের পরোক্ষ প্রভাবে বিভিন্ন কুটিরশিল্পের প্রসার ঘটে। এই সব শিল্পের মধ্যে অন্যতম ছিল মৃৎশিল্প, ঝুড়ি তৈরি শিল্প, দারুশিল্প, বয়নশিল্প ইত্যাদি।

উপসংহার :- প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় জমিতে লাগালাগার কাজে লাগানো হতো ভারতের সিন্ধু সভ্যতায় গবাদি পশুকে পোষ মানিয়ে কৃষিকাজে ব্যবহার করা হতো।

(FAQ) নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কোন সময় মানুষ কৃষি পদ্ধতি আবিষ্কার করে?

আনুমানিক ৮০০০ থেকে ৬০০০ খ্রিস্টপূর্বে।

২. আদিম যুগে কৃষির সূত্রপাত কারা করে বলে মনে করা হয়?

মেয়েরা।

৩. আদিম মানুষের প্রধান কৃষিজ ফসল কি ছিল?

যব ও গম।

Leave a Comment