মেহেরগড় সভ্যতা

মেহেরগড় সভ্যতা র সময়কাল, অবস্থান, আবিষ্কার, বিস্তার, খননকার্য, মেহেরগড় সভ্যতার – প্রথম পর্যায়, দ্বিতীয় পর্যায়, তৃতীয় পর্যায়, চতুর্থ থেকে সপ্তম পর্যায় সম্পর্কে আলোচনা করা হল ।

Table of Contents

মেহেরগড় সভ্যতা

সময়কাল৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
স্থানবর্তমান পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের কাচ্চি সমভূমি
আবিষ্কারকজাঁ ফ্রাঁসোয়া জারিজ, ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে
সভ্যতার পর্যায় ৭ টি
সভ্যতার ধরণগ্রামকেন্দ্রিক
মেহেরগড় সভ্যতা

ভূমিকা :- নব্যপ্রস্তর যুগে আজ থেকে প্রায় নয় হাজার বছর আগে সিন্ধু উপত্যকার পশ্চিমে গড়ে ওঠে এক গ্রামীণ সভ্যতা, যাকে ‘মেহেরগড় সভ্যতা’ নামে অভিহিত করা হয়।

মেহেরগড় সভ্যতার সময়কাল

খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০ অব্দ থেকে শুরু হয়ে মোটামুটি ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এই সভ্যতা পৃথিবীর বুকে টিকে ছিল।

হরপ্পা সভ্যতার ভিত্তি মেহেরগড় সভ্যতা

অনেকের ধারণা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতার খ্যাতি হয়তো ‘ হরপ্পা সভ্যতা ‘র গায়ে সেঁটে দেওয়া আছে। কিন্তু হরপ্পা সভ্যতা গড়ে উঠেছে এই মেহেরগড় সভ্যতার উপর ভিত্তি করেই।

মেহেরগড় সভ্যতার অবস্থান

এই সভ্যতা বর্তমানে পাকিস্তানের কোয়েটা, কালাত, সিবি শহরের মধ্যে এবং বোলান গিরিপথের নিকটে অবস্থিত।

হরপ্পা সভ্যতার আদি রহস্য

ফরাসি স্বামী-স্ত্রী জাঁ ফ্রাঁসোয়া জারিজ ও ক্যাথরিন জারিজ পরিচালিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক দল পাকিস্তানে আসেন প্রাচীন বসতির খোঁজে। কিন্তু তারা পেয়ে যায় এক মিসিং লিংকের সন্ধান, যে মিসিং লিংক উদঘাটন করে দিয়েছে হরপ্পা সভ্যতার আদি রহস্য।

মেহেরগড় সভ্যতার আবিষ্কার

জাঁ ফ্রাঁসোয়া জারিজ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে বেলুচিস্তানের পশ্চিমে সিন্ধু উপত্যকার কাচ্চি সমভূমিতে তারা এই সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কার করেন।

মেহেরগড় সভ্যতার বিস্তার

বেলুচিস্তানের ঝোব নদীর দক্ষিণ উপত্যকা থেকে সিন্ধু নদের সমগ্র পশ্চিম অংশ পর্যন্ত এই মেহেরগড় সভ্যতা বিস্তৃত ছিল।

মেহেরগড় সভ্যতার খননকার্য

ফরাসি স্বামী-স্ত্রী জাঁ ফ্রাঁসোয়া জারিজ ও ক্যাথরিন জারিজ পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক দল দীর্ঘদিন একটানা খননকার্য চালিয়ে যায়।

  • (১) ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে তারা এই স্থান আবিষ্কারের পর ‘আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ পাকিস্তান’-এর সাথে মিলে ১৯৭৫-৮৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত একটানা কাজ করে যান।
  • (২) ১৯৮৭-৯৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তারা মনোনিবেশ করেন ‘নাউশারো’  নামক এক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে। এরপর তারা ১৯৯৬-২০০০ সাল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে মেহেরগড় সভ্যতার আদ্যোপান্ত জানার উদ্দেশ্যে খননকাজে হাত লাগান।

মেহেরগড় সভ্যতায় আবিষ্কৃত টিলা

এই মেহেরগড় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ছয়টি টিলা আবিষ্কার করা গেছে। এই টিলাগুলি থেকে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সংখ্যা ৩২,০০০ এরও অধিক।

মেহেরগড় সভ্যতার ক্ষেত্রফল

৪৯৫ একর ক্ষেত্রফলের প্রাচীন এই সভ্যতাটির গোড়াপত্তন ঠিক কোন জায়গা থেকে হয়েছিল তা স্পষ্টভাবে জানা যায় নি।

মেহেরগড় সভ্যতার পথ চলা

ধারণা করা হয়, আনুমানিক ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে ওই স্থানের উত্তর-পূর্ব কোণের ছোট্ট কৃষিনির্ভর গ্রামকে কেন্দ্র করে শুরু হয় সভ্যতার পথচলা।

মেহেরগড় সভ্যতার পর্যায়কাল

গবেষকেরা এই সভ্যতার পর্যায়কালকে মোট ৭টি স্তরে বিভক্ত করেছেন। যার মধ্যে প্রথম তিনটিকে নব্যপ্রস্তরযুগের এবং বাকি চারটিকে তাম্র-যুগের বলে অভিহিত করা হয়।

মেহেরগড় সভ্যতার নাগরিকতার উত্তরণ

এই মেহেরগড় সভ্যতার সাতটি স্তরে ভ্রাম্যমাণ পশুপালকের জীবন থেকে শুরু করে নাগরিকতায় উত্তরণের প্রতিটি দশার সুস্পষ্ট বিবরণ বিদ্যমান।

মেহেরগড় সভ্যতা – প্রথম পর্যায়

মেহেরগড় সভ্যতার সময়কাল

প্রথম পর্যায়ে মেহেরগড় সভ্যতার সময় ছিল ৭,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫,৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত।

মেহেরগড় সভ্যতার যুগ

প্রথম পর্যায়ে মেহেরগড় সভ্যতা ছিল নব্যপ্রস্তরযুগীয় পর্যায়ের প্রায় ঐতিহাসিক যুগ -এর সভ্যতা।

মেহেরগড় সভ্যতা কৃষির সূচনা

এই সভ্যতায় কৃষিব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে গম ও যব চাষ করা কিছু অর্ধ-যাযাবর জাতির লোকের মাধ্যমে।

মেহেরগড় সভ্যতার পশুপালন

এই মেহেরগড় সভ্যতার মানুষেরা কৃষিকাজের পাশাপাশি গবাদিপশু পালনও শুরু করেছিল।

মেহেরগড় সভ্যতার স্থায়ী বাসস্থান গঠন

প্রথমে মেহেরগড় এলাকাটি ছিল শিকারি ও ভ্রাম্যমাণ পশুপালনের এক অস্থায়ী আবাসস্থল। পরবর্তীতে কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থার বিকাশ ঘটার মাধ্যমেই এখানে স্থায়ী আবাস গড়ে ওঠে।

মেহেরগড় সভ্যতার মানুষের সহজ জীবন

এই মেহেরগড় সভ্যতার উর্বর জমি আর চমৎকার আবহাওয়া সেখানকার অধিবাসীদের জীবন অনেকটাই সহজ করে দিয়েছিল।

মেহেরগড় সভ্যতার গৃহপালিত পশু

গৃহপালিত পশুর মধ্যে গরু, ভেড়া, ছাগল এবং ষাঁড় ছিল অন্যতম। শিকার ধরার জন্য ওরা কুকুরকেও গৃহপালিত প্রাণীতে পরিণত করেছিল।

মেহেরগড় সভ্যতার মানুষের জীবিকা

মেহেরগড় সভ্যতার মানুষেরা বিভিন্ন উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করত।

  • (১) কৃষিজমিতে জলসেচের জন্য জলাধারে ছোট ছোট ছোট বাঁধ দেওয়া হত।
  • (২) কৃষিজাত পণ্য সংরক্ষণের জন্য শস্যাগার নির্মাণের প্রচলন ছিল সেই সময়।
  • (৩) এই সভ্যতায় কৃষির বিকাশ লাভ করার পরেই পশুপালনের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কৃষিজ শস্য বহন এবং খাদ্যের জন্যই মেহেরগড়বাসী পশুপালন করত।
  • (৪) এছাড়া পশু শিকারও ছিল তাদের অন্যতম জীবিকা।

মেহেরগড় সভ্যতার ঘরবাড়ি

মেহেরগড় সভ্যতার বাসস্থান সম্পর্কে বেশ কিছু ধারণা পাওয়া যায়।

  • (১) সেই সময় অধিকাংশ ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হতো কাদামাটির সাহায্যে। কাদামাটি দিয়ে তারা সমান মাপের ইট তৈরি করত। বাড়িগুলো ছিল একাধিক কামরায় বিভক্ত।
  • (২) প্রথমদিকে মেহেরগড়বাসীরা দরজা বিহীন বহু কামরা বিশিষ্ট কক্ষে বাস করত। যাতায়াতের পথ ছিল ছাদ। এই ঘরগুলোর সাথে নব্যপ্রস্তরযুগীয় তুরস্কের কাতাল হুয়ুকের বাড়িগুলোর সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
  • (৩) ঘর উষ্ণ রাখার উদ্দেশ্য অনেক বাড়িতে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা ছিল, যা বর্তমানের ফায়ার প্লেসের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

মেহেরগড় সভ্যতার সমাধি

প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখানে বেশ কিছু সমাধির খোঁজ পেয়েছেন।

  • (১) সমাধিক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো দুটো বাড়ির মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান।
  • (২) অবাক করা বিষয় হলো সমাধির ভেতরে সন্ধান মিলেছে ঝুড়ি, জপমালা, কানের দুল, হাড়ের সরঞ্জাম, নীলকান্তমণি, একপৃষ্ঠীয় পাথরের কুঠার ইত্যাদি।

মেহেরগড় সভ্যতায় বলি প্রথা

মেহেরগড় সভ্যতায় পাওয়া গিয়েছে বলি দেওয়া পশুর কঙ্কাল। অর্থাৎ এই সভ্যতার শুরুর দিকে বলি প্রথা চালু ছিল বলে মনে করা হয়।

প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু

মেহেরগড় সভ্যতায় ঝিনুকের খোল, চুনাপাথর, যাঁতা, হামানদিস্তা, নিড়ানি, কাস্তে, এবং বেলেপাথরের অলঙ্কারের সন্ধানও মিলেছে।

মেহেরগড় সভ্যতার স্থাপত্য

এই মেহেরগড় সভ্যতায় সিন্ধু সভ্যতার মতো বিভিন্ন প্রাণী ও মানবমূর্তিও পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এই মূর্তিগুলি ভারতীয় ভাস্কর্যের প্রাচীনতম নিদর্শন।

মানুষের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি

মেহেরগড় সভ্যতার মানুষ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করত বলে জানা যায়।

  • (১) কৃষি-যন্ত্রপাতির মধ্যে প্রাপ্ত প্রাচীনতম হাতিয়ার হলো বিটুমিন জাতীয় পাথরখণ্ড দ্বারা নির্মিত কাস্তে।
  • (২) পাথরের নির্মিত শিলনোড়া, যাঁতা, হামানদিস্তা, নিড়ানি ও অন্যান্য পাথরের যন্ত্রপাতিও সেই সময়ে মেহেরগড় সভ্যতার বাসিন্দারা ব্যবহার করত।

মেহেরগড় সভ্যতার বাণিজ্য

প্রত্নসম্পদের মধ্যে প্রচুর সামুদ্রিক ঝিনুকের অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে, মেহেরগড় সভ্যতার সাথে দূরবর্তী দেশসমূহের বহির্বাণিজ্য চালু ছিল।

গ্রাম থেকে নগরায়নের পথে

কালক্রমে এই মেহেরগড়েই স্থায়ী হতে চেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন এই সভ্যতা। তাই গ্রামকেন্দ্রিক সভ্যতার বলয় থেকে বের হয়ে মেহেরগড় ধীরে ধীরে নগরায়নের পথে অগ্রসর হতে শুরু করে।

মেহেরগড় সভ্যতা – দ্বিতীয় পর্যায়

মেহেরগড় সভ্যতার প্রথম পর্যায়ের সময়কাল

দ্বিতীয় পর্যায়ে মেহেরগড় সভ্যতার সময়সীমা ধরা হয় ৫০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত।

প্রথম পর্যায় থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে পরিবর্তন

মেহেরগড় সভ্যতার প্রথম পর্যায়ে চলতি কৃষিকাজ এবং পশুপালনের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের পরিবর্তন প্রয়াসী মনোভাবের জন্য দ্বিতীয় পর্যায়ে নতুন বেশ কিছু সংস্কার ও নতুনত্ব চোখে পড়ে।

কার্পাস চাষ

  • (১) মেহেরগড় সভ্যতার এই পর্যায়ে প্রচুর কার্পাস তুলোর বীজের অবশিষ্টাংশের অস্তিত্ব থেকে মনে করা হয় যে, তখনকার মানুষ কার্পাস চাষ করতে জানত, যা ভারতবর্ষের তুলো চাষের প্রাচীনতম নিদর্শন।
  • (২) অনুমান করা হয়, এই কার্পাস তুলো দিয়ে তৈরি করা সুতো দিয়ে তারা কাপড় বানাত। এটাও চিহ্নিত করে যে, হরপ্পা সভ্যতার দু’হাজার বছর আগেই মেহেরগড় সভ্যতায় তুলাের চাষ শুরু হয়।

মৃৎশিল্প

মেহেরগড়বাসীরা ইতিহাস সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে তাদের কুমোর শিল্প দ্বারা। এদিক থেকে তাদের দক্ষতা যে প্রশ্নাতীত, তা বলাই বাহুল্য। তৎকালীন সভ্যতার সুনজর যায় মৃৎশিল্পের দিকে।

  • (১) মৃৎশিল্পে ইতিবাচক প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিল কুমোরের চাকা, যার আগমন ঘটে সুদূর সুমের সভ্যতা থেকে।
  • (২) খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দের দিকে, অর্থাৎ দ্বিতীয় পর্যায়ের শেষভাগে জোয়ার আসে এঁটেল মাটির তৈরি দ্রব্যসামগ্রীর নান্দনিক শিল্পকর্মে।
  • (৩) চাকা আসার আগে অবশ্য মাটির পাত্রগুলো হাতে তৈরি করা হত। চাকা আসার পরেই মৃৎশিল্পে একপ্রকার বিপ্লব চলে আসে।
  • (৪) মৃৎপাত্রগুলো শক্ত ও টেকসই করার জন্য চুল্লির আগুনে পোড়াত ও তাতে রঙ-বেরঙের প্রলেপ দিত।
  • (৫) দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য পাত্র ছাড়াও এই সভ্যতার মানুষ মাটি দিয়ে নারীমূর্তি, গবাদিপশুর মূর্তি ও খেলনা বানাত।

মেহেরগড় সভ্যতার সেচব্যবস্থা

দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রচুর পরিমাণে গম, বার্লি এবং তুলোর চাষ হত। এই বিষয় থেকে স্পষ্ট হয় যে, তখনকার মানুষ তৎকালীন সভ্যতায় সেচব্যবস্থার উদ্ভাবন ঘটিয়েছিল।

পশুপালন ও বহির্বাণিজ্য

মেহেরগড় সভ্যতায় প্রথম পর্যায়ের মতো দ্বিতীয় পর্যায়েও পশুপালন এবং বহির্বাণিজ্য বহাল ছিল।

সমাধি ব্যবস্থা

মেহেরগড় সভ্যতার দ্বিতীয় পর্যায়ে মৃতদেহের উপরে লাল মাটির সন্ধান মিলেছে। সময়ের সাথে সাথে যেমন মৃতের সংখ্যা কমেছে, তেমনি ক্ষয় হয়ে গিয়েছে মৃতদেহের সাথে দেওয়া অলংকার।

কিলি গুল মুহম্মদ পর্যায়

এই মেহেরগড় সভ্যতা মৃৎশিল্পের সাথে পরিচিত হবার আগে পর্যন্ত সময়কালকে অনেকসময় ‘কিলি গুল মুহাম্মদ পর্যায়’ বলে অভিহিত করা হয়। কিলি গুল মুহাম্মদে সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছিল প্রায় ৫০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।

মেহেরগড় সভ্যতা – তৃতীয় পর্যায়

মেহেরগড় সভ্যতার তৃতীয় পর্যায়ের সময়কাল

৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত বহাল ছিল মেহেরগড় সভ্যতার তৃতীয় পর্যায়।

মেহেরগড় সভ্যতার তৃতীয় পর্যায়ে কৃষির উন্নতি

এই মেহেরগড় সভ্যতার এই পর্যায়ে কৃষিক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতির ধারা লক্ষ্য করা যায়। কারণ, প্রত্নসম্পদে কর্ষিত শস্যের বিরাট তালিকার সন্ধান পাওয়া গেছে।

মেহেরগড় সভ্যতার তৃতীয় পর্যায়ে নব্যপ্রস্তর যুগ থেকে তাম্র যুগে পদার্পণ

এই সময়ে নব্যপ্রস্তর যুগের পরিমণ্ডল থেকে বের হয়ে মেহেরগড় সভ্যতা পদার্পণ করে তাম্র-যুগে। নব্য প্রস্তর যুগ থেকে ধাতব যুগের উত্তরণ হয়েছিল খুব ধীরে ধীরে। তবে পাথরের ব্যবহার ও গুরুত্ব তখনও অব্যাহত ছিল।

মেহেরগড় সভ্যতার তৃতীয় পর্যায়ে তামার ব্যবহার

মেহেরগড় সভ্যতার তৃতীয় পর্যায় থেকেই যে তামার ব্যাপক ব্যবহারের সূচনা ঘটেছে তার বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া যায়।

  • (১) ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাপ্ত তামার পুঁথি থেকে মনে করা হয় এই সভ্যতার মানুষ তামা গলানোর প্রক্রিয়া আয়ত্ত করতে পেরেছিল।
  • (২) তামার আকরিক থেকে তারা বিভিন্ন সাজসজ্জার অলংকার তৈরি করত।
  • (৩) তৃতীয় পর্যায়ে অন্তত ১৪টি পাত্রের সন্ধান মিলেছে, যেগুলো তামা গলানোর কাজে ব্যবহার করা হত।
  • (৪) এই পর্যায়ে পাওয়া গেছে তামার ছুরি, বড়শি, সূচ, তামার সিলমোহর প্রভৃতি। তামার সিলমোহর দ্বারা বণিকরা নিজেদের পণ্য চিহ্নিতকরণের কাজ করত।
  • (৫) ৬০০০ বছরের পুরনো চাকা আকৃতির একটি তাম্র মাদুলি পাওয়া গেছে মেহেরগড় সভ্যতায়। ওই মাদুলি তৈরি করা হয়েছিল খাঁটি তামা থেকে।

মেহেরগড় সভ্যতার তৃতীয় পর্যায়ে বহির্বাণিজ্যের উন্নতি

এই মেহেরগড় সভ্যতার বিকাশ, উন্নতি ও বিস্তারের সাথে সাথে বহির্বিশ্বের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক হয়ে উঠে আগের থেকে আরও বিস্তৃত।

মেহেরগড় সভ্যতার তৃতীয় পর্যায়ে মৃৎশিল্প

মেহেরগড় সভ্যতার এই পর্যায়ে মৃৎপাত্রের ক্ষেত্রেও ব্যাপক উন্নতির ছোঁয়া দেখা যায়।

  • (১) এই সময়ের মৃৎপাত্রগুলোতে নানাপ্রকার জ্যামিতিক নকশা, পশু-পাখি, গবাদি পশু এবং গাছপালার ছবির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যা সভ্যতার উত্তরোত্তর অভ্যুত্থানকেই নির্দেশ করে।
  • (২) দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন চীনামাটির মূর্তি পাওয়া গেছে মেহেরগড় সভ্যতায়। সভ্যতার প্রথম দিকে তৈরি করা মূর্তিগুলো ছিল শিল্পচাতুর্যহীন এবং সাদাসিধে রকমের।
  • (৩) সময়ের সাথে সাথে মৃৎশিল্পে বাহারি ধরন যোগ হতে থাকে। যেমন, খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দের দিকে চুলের ধরনে আসে বৈচিত্র, সেগুলো বেণী পাকানো থাকে।
  • (৪) মূর্তিগুলোর স্তনের আকার বড় হবার পাশাপাশি সম্মুখদিকে প্রলম্বিত হয়ে যায়। অনেক নারী মূর্তিকে কোলে শিশু ধরে রাখতে দেখা গেছে, যাকে Mother Goddess বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মেহেরগড় সভ্যতা – চতুর্থ থেকে সপ্তম পর্যায়

মেহেরগড় সভ্যতার চতুর্থ থেকে সপ্তম পর্যায়ের সময়কাল

৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ছিল মেহেরগড় সভ্যতার চতুর্থ থেকে সপ্তম পর্যায়ের বিস্তৃতিকাল।

মেহেরগড় সভ্যতার চুড়ান্ত উন্নতি

এই পর্যায় গুলিতে এসে মেহেরগড় সভ্যতা তার চূড়ান্ত উৎকর্ষে উপনীত এবং পরিণত হতে থাকে।

মেহেরগড় সভ্যতার চতুর্থ থেকে সপ্তম পর্যায়ের মৃৎশিল্প

আগের পর্যায়গুলোতে সাধারণ মৃৎপাত্র তৈরি করা হলেও এই পর্যায়ে তা নির্মাণে আসে নানা বৈচিত্র্য।

  • (১) সময় যত এগিয়ে যেতে থাকে মাটির তৈজসপত্রের উপরের ত্রিভুজ-রেখার নকশাগুলো পরিবর্তিত হয় পশু-পাখির দিকে।
  • (২) বৈচিত্র্যময় কারুকার্যের সাথে টেক্কা দিয়ে নানা রঙের ব্যবহারও দেখা যায়, যা তাদের শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য ও মনোভাবের পরিচায়ক।
  • (৩) মাটির তৈজসপত্রের উপর সুদৃশ্য নকশার সাথে তারা যোগ করত সামান্য জ্যামিতিক জ্ঞান।

মেহেরগড় সভ্যতার চতুর্থ থেকে সপ্তম পর্যায়ে নগরায়নের বিকাশ

এই পর্যায়গুলোতে নগরায়নের বিকাশ লক্ষ্য করা যায়।

  • (১) মেহেরগড় সভ্যতায় নগরায়নের সূচনা হয়েছিল সেই দ্বিতীয় পর্যায় তথা খ্রিস্টপূর্বাব্দে।
  • (২) চতুর্থ থেকে সপ্তম পর্যায় পর্যন্ত তার পরিপূর্ণ প্রকাশ, বিস্তার এবং বিকাশ নজরে আসে।
  • (৩) মানুষের জীবনযাত্রার মান, উন্নত রুচির বহিঃপ্রকাশ, রাস্তাঘাট এবং পয়ঃপ্রণালি ব্যবস্থার অগ্রগতিতে নগরায়নের প্রতিফলন স্পষ্ট হয়।
  • (৪) ষষ্ঠ পর্যায় থেকে সজ্জাকরণের বস্তু হিসেবে পিপুল গাছের পাতার ব্যবহার শুরু হয়।

মেহেরগড় সভ্যতার সোনালী যুগ

চতুর্থ থেকে সপ্তম পর্যায় পর্যন্ত ছিল মেহেরগড় সভ্যতার সোনালী যুগ।

  • (১) এই সময় মেহেরগড় সভ্যতা ফুলে ফেঁপে ওঠে।
  • (২) ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল আগের চেয়ে প্রাণচঞ্চল এবং ব্যাপক পরিসরের।
  • (২) চিত্রকলা এবং ভাষারও যুগপৎ পরিবর্তন ঘটে।

সমাধিক্ষেত্র

মেহেরগড় থেকে দুই ধরনের সমাধিক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে।

  • (১) যে সমাধিগুলোতে শুধু একজন মানুষকে সমাহিত করা হয়েছে সেগুলোকে সংকীর্ণ ও অপ্রশস্ত মাটির দেওয়াল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে।
  • (২) যেগুলো গণকবর সেগুলো ছিল মাটি-ইটের দেওয়াল সম্মিলিত। প্রতিটি গণকবরে লাশের সংখ্যা গড়ে ছয়টি করে। গণকবরে লাশগুলো শোয়ানো হতো পূর্ব থেকে পশ্চিমে।

মেহেরগড় সভ্যতার দন্ত চিকিৎসা

২০০১ সালের এক গবেষণা থেকে জানা যায় যে, এই সভ্যতার লোকেদের আদি দন্তচিকিৎসা সম্পর্কে ধারণা ছিল।

  • (১) প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই গবেষণা চালিয়েছিল মূলত মেহেরগড় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাপ্ত দুজনের দেহাবশেষ নিয়ে।
  • (২) ২০০৬ সালের এপ্রিল মাসে বৈজ্ঞানিক জার্নাল নেচার-এ একটি আর্টিকেল পাবলিশ করা হয়, যেখানে উল্লেখ আছে যে, সেই প্রারম্ভিক নব্যপ্রস্তরযুগেই মানুষের দাঁত বাঁধানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে মেহেরগড় সভ্যতায়।
  • (৩) প্রাচীন মেহেরগড়ের এক সমাধিস্থল থেকে আবিষ্কৃত নয়জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির এগারোটি বাঁধানো দন্ত-মুকুটের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এগুলি আনুমানিক ৫৫০০ থেকে ৯০০০ বছর আগের হতে পারে।

মেহেরগড় সভ্যতার ধর্ম

  • (১) উপাসনালয়ের অনুপস্থিতির জন্য মেহেরগড় সভ্যতার অধিবাসীদের ধর্ম সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা যায় না।
  • (২) তবে পোড়া মাটির তৈরি বিভিন্ন মূর্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নারী মূর্তি পাওয়া গেছে, যা থেকে মাতৃপূজার বিষয়ে ধারণা করা হয়।

মেহেরগড় সভ্যতার পতন

মেহেরগড় সভ্যতার পতন সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের মতামত উঠে আসে।

  • (১) অনেকের ধারণা ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে মেহেরগড়বাসীরা আরও উন্নত জীবনযাপনের লক্ষ্যে কয়েক কিলোমিটার দূরের শহর ‘নাউশারো’তে চলে আসে। ফলে খালি হয় যায় মেহেরগড় সভ্যতা।
  • (২) অনেকে মেহেরগড় সভ্যতার পতনের জন্য তৎকালীন প্রতিকূল জলবায়ুকে দায়ী করেন।
  • (৩) ঐতিহাসিকদের অনুমান মেহেরগড় সভ্যতায় দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টির ফলে সমগ্র অঞ্চল ধীরে ধীরে মরুভূমির রূপ নেওয়া শুরু করলে মেহেরগড়বাসীরা অন্যত্র সরে যায়। ফলে অঞ্চলটি জনমানবশূন্য হয়ে একসময় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
  • (৪) অনেক ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মনে করেন যে, বন্যা বা ভূমিকম্প এই দুই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে কোনো একটি মেহেরগড় সভ্যতার পতনের জন্য দায়ী।

হরপ্পা সভ্যতার সাথে মেহেরগড় সভ্যতার সংযুক্তি

মেহেরগড়বাসীরা অজানা কোনো কারণে নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করে পাঞ্জাবের হাকরা নদীর উপত্যকায় এসে নতুন এক সভ্যতা নির্মাণ করে। এই ভাবে ধীরে ধীরে তারা হরপ্পা সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যায় বলে অধিকাংশ গবেষক মত প্রকাশ করেছেন। মেহেরগড় সভ্যতা এক পরিপূর্ণ উজ্জ্বল প্রতিফলন হরপ্পা সভ্যতা।

উপসংহার – হরপ্পা-মহেঞ্জোদাড়ো উন্নত নগর সভ্যতা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নয় মেহেরগড় ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে মানব সভ্যতার যে প্রসার ঘটেছিল তারই এক পরিপূর্ণ উজ্জ্বল প্রতিফলন হরপ্পা সভ্যতা।

[FAQ] মেহেরগড় সভ্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য

১. মেহেরগড় সভ্যতার নিদর্শন কে আবিষ্কার করেন ?

ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদ জাঁ ফ্রাঁসোয়া জারিজ ।

২. মেহেরগড় সভ্যতা বর্তমানে কোথায় অবস্থিত ?

পাকিস্তানের কাচ্চি সমভূমি অঞ্চলে।

৩. মেহেরগড় সভ্যতা সময় কাল কত?

৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

Leave a Reply

Translate »