প্রাচীন প্রস্তর যুগ

প্রাচীন প্রস্তর যুগ -এর সময়কাল, উল্লেখযোগ্য মানুষ, উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার, সমাজ, জীবিকা, বাসস্থান, পোশাক, ভাষার উদ্ভব সম্পর্কে জানবো ।

প্রাচীন প্রস্তর যুগ

সময়কাল আনুমানিক ৫০০০০-১৫০০০ খ্রিস্টপূর্ব
উল্লেখযোগ্য মানুষপিকিং মানব, জাভা মানব
উল্লেখযোগ্য হাতিয়ারহাত-কুঠার
সমাজমাতৃতান্ত্রিক
প্রাচীন প্রস্তর যুগ

ভূমিকা :- প্রাচীন যুগকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা- প্রাগৈতিহাসিক যুগ, প্রায় ঐতিহাসিক যুগ এবং ঐতিহাসিক যুগ। প্রাগৈতিহাসিক যুগের তিনটি ভাগের অন্যতম হল প্রাচীন প্রস্তর যুগ।

প্রস্তর যুগ

যে সময়ে মানুষ বিভিন্ন ধরনের পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করে খাদ্য সংগ্রহ করত সেই সময়কালকে প্রস্তর যুগ বলা হয়।

প্রস্তর যুগের শ্রেনীবিভাগ

বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্ববিদ পাথরে নির্মিত হাতিয়ারের ক্রমোন্নতি লক্ষ্য করে প্রস্তর যুগকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন –

প্রাচীন প্রস্তর যুগ

যে সময়ে মানুষ প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত পাথরের কোনো পরিবর্তন না ঘটিয়েই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত সেই সময়কালকে প্রাচীন প্রস্তর যুগ বা পুরা প্রস্তর যুগ বলা হয়।

সময়কাল

প্রাচীন প্রস্তর যুগ শুরু হয় অন্তত ৫০ হাজার বছর আগে এবং শেষ হয় প্রায় ১৫০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।

এই যুগের মানুষ

পিকিং মানব, জাভা মানব, আটলানথ্রোপাস মানব (আলজেরিয়া), ওলডুভাই মানব (তাঞ্জানিয়া), নিয়ানডারথাল মানব-সহ বিভিন্ন শাখার হোমো ইরেক্টাস অর্থাৎ প্রায়-মানুষেরা প্রাচীন প্রস্তর যুগের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

হাতিয়ার

এ যুগের মানুষ বিভিন্ন ধরনের পাথর ও হাড়ের তৈরি হাতিয়ার ব্যবহার করত এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বসবাস করত।

প্রথম পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার

দক্ষিণ আফ্রিকার অস্ট্রালোপিথেকাস নামে মানবগোষ্ঠী সর্বপ্রথম পাথরের হাতিয়ারের ব্যবহার শুরু করে।

হাতিয়ারের আকৃতি

এ যুগের মানুষ প্রকৃতি থেকে যে আকারের পাথরকে পেত তার কোনো আকারগত পরিবর্তন না করেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাথর ভেঙে ধারালো ও তীক্ষ্ণ করার চেষ্টা করত বলেও মনে করা হয়।

হাত কুঠার

এই যুগের মানুষ একই হাতিয়ার দিয়ে মাংস কাটা, কাঠ কাটা, শিকার করা প্রভৃতি বিভিন্ন কাজ করত। প্রথমদিকের এই সাধারণ হাতিয়ার হাত-কুঠার’ (Hand-Axe) নামে পরিচিত।

বিভিন্ন হাতিয়ার

ক্রমে পাথরের বল্লম, ছুরি, ছুঁচ, হারপুন, রাঁদা প্রভৃতি হাতিয়ার তারা তৈরি করতে শুরু করে। এ যুগের হাতিয়ারগুলি হত অমসৃণ এবং বৃহদাকার। এ যুগের শেষদিকে মানুষ তিরধনুক আবিষ্কার করে।

জীবিকা

পশু শিকার করে পশুর মাংস সংগ্রহ করাই ছিল প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষের প্রধান জীবিকা।

  • (১) প্রথমদিকে ছোটো আকারের প্রাণী শিকার করলেও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তারা দলবদ্ধ হয়ে ম্যামথ, বাইসন, বলগা হরিণ প্রভৃতি বড়ো পশুশিকারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।
  • (২) এ যুগের মানুষ বনেজঙ্গলে ঘুরে গাছের ফলমূল সংগ্রহ করত, পাখির ডিম সংগ্রহ করত, মাছ ধরত।
  • (৩) আগুনের ব্যবহার জানত না বলে তারা কাঁচা মাংস খেত।
বাসস্থান
  • (১) আদিম মানুষ প্রাচীন প্রস্তর যুগের প্রথমদিকে খোলা আকাশের নীচে বসবাস করত।
  • (২) পরবর্তীতে তারা গুহার ভেতরে বা পাহাড়ের বুলন্ত পাথরের নীচে বসবাস করত।
  • (৩) আরো পরবর্তীকালে তারা গাছের ডালপালা, লতাপাতা, পশুর চামড়া প্রভৃতি দিয়ে তাদের আস্তানা তৈরি করত।
পোশাক

এই যুগের মানুষ গাছের ছাল বা পশুর চামড়া পরিধান করত।

সমাজজীবন

প্রাচীন প্রস্তর যুগ থেকেই মানুষ দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে শুরু করে। দলবদ্ধ হয়ে বসবাস ও জীবিকানির্বাহের ফলে আদিম মানুষের মধ্যে সামাজিক ধারণা গড়ে উঠেছিল। কেউ কেউ মনে করেন যে, এই যুগে আদিম মানুষের সমাজে পরিবারও গড়ে উঠেছিল।

দলবদ্ধতা

আদিম মানুষের দলবদ্ধতার প্রধানত দুটি কারণ ছিল—

(i) শিকার

ম্যামথ, বাইসন, বলগা হরিণ প্রভৃতি বড়ো আকারের প্রাণী শিকার করতে গেলে দলগত শক্তির প্রয়োজন ছিল।

(ii) পশুর আক্রমণ

বসতি অঞ্চলে হিংস্ৰ পশুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে অস্ত্রশস্ত্র-সহ দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে হত।

মাতৃতান্ত্রিক সমাজ

এ যুগের সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। পরিবার ও সমাজজীবনে পুরুষের তুলনায় নারীদের প্রাধান্য বেশি ছিল। নারীদের এই প্রাধান্য অন্তত নব্যপ্রস্তর যুগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

অস্তিত্বের নিদর্শন

আফ্রিকার গ্রে রিফ্ট উপত্যকায়, ইউরোপের কিছু অঞ্চলে, ভারতের পাঞ্জাবের সোয়ান নদী উপত্যকা ও মাদ্রাজে প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষের অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায়।

গুহাচিত্র

আদিম মানুষ পশুর হাড় ও শিঙ দিয়ে গুহার দেওয়ালে ছবি আঁকতে শিখেছিল। তাদের এই গুহা চিত্রের প্রধান বিষয় ছিল শিকার। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি প্রভৃতি দেশে এ ধরনের গুহাচিত্রের নিদর্শন মিলেছে। পন্ডিতদের মতে, অদৃশ্য শক্তিকে তুষ্ট করে শিকারে সফল হওয়ার জন্যই  তারা এভাবে ছবি আঁকতো।

ভাষার উদ্ভব

ঐতিহাসিকদের অনুমান পুরাতন প্রস্তর যুগেই ভাষার উদ্ভব ঘটেছিল। দলবদ্ধভাবে শিকার যাত্রার সময় বা মনের বিভিন্ন ভাব প্রকাশের সময় বিভিন্ন সাংকেতিক শব্দের ব্যবহার থেকেই আদিম ভাষার উদ্ভব ঘটে বলা চলে।

আগুনের ব্যবহার

পুরাতন পাথরের যুগে মানুষ আগুন জ্বালাতে শেখেনি। কিন্তু প্রাকৃতিক ভাবে বা দুর্বিপাকের কারণে জ্বলে ওঠা আগুনকে গুহামুখে জ্বালিয়ে রেখে তারা হিংস্র জন্তু জানোয়ারদের তাড়ানোর ব্যবস্থা করত। এছাড়া এই আগুন দিয়েই তারা তুষার যুগের শীতের তীব্রতা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পেরেছিল।

উপসংহার :- আশ্চর্যের বিষয় যে, এই যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মানুষগুলি আলাদা হলেও তাদের তৈরি হাতিয়ারগুলিতে অদ্ভুত মিল লক্ষ করা যায়।

(FAQ) প্রাচীন প্রস্তর যুগ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য ?

১. প্রস্তর যুগ বলতে কি বোঝা?

বিশ্বের ইতিহাসে প্রস্তর যুগ বলতে মানব ও তার সমাজের বিবর্তনের ধারায় একটা পর্যায়কে বোঝানো হয় যখন মানুষের ব্যবহার্য হাতিয়ার তৈরির মূল উপকরণ ছিল পাথর।

২. ভারতের প্রাচীন প্রস্তর যুগের দুটি স্থানের নাম লেখ।

পাঞ্জাবের সোয়ান নদী উপত্যকা ও মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকা।

৩. প্রাচীন প্রস্তর যুগের হাতিয়ার কি কি ছিল?

পাথরের কুঠার, কাস্তে, নিড়ানি, বড়শি, বাটালি ইত্যাদি।

Leave a Reply

Translate »