কিউনিফর্ম বা কীলক লিপি

কিউনিফর্ম লিপি -র সৃষ্টি, অর্থ, জনপ্রিয়তা, লিপি তৈরি ও লেখার পদ্ধতি, আবিষ্কর্তা, নামকরণ, বিবর্তন, ব্যবহৃত ভাষা, নমুনা, ব্যবহার, লিপির সংস্কার, প্রাপ্ত লিপির পরিনাম ও লিপির পাঠোদ্ধার সম্পর্কে জানবো।

কীলক লিপি বা কিউনিফর্ম লিপি

প্রচলন কালআনুমানিক ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
প্রচলিত স্থানসুমেরীয় সভ্যতা
নামকরণটমাস হাইড
কীলক লিপি

ভূমিকা :- কিউনিফর্ম লিপি বিশ্বের প্রাচীন লিপিগুলোর মধ্যে অন্যতম। অনেক ভাষাবিদ মনে করেন, কিউনিফর্ম লিপি মিশরীয় সভ্যতাহায়ারোগ্লিফিক লিপির থেকেও পুরনো।

শব্দলিপি

প্রকৃতপক্ষে ধ্বনিলিপি স্তরের প্রথম ধাপ হল শব্দলিপি। শব্দলিপির ক্ষেত্রে লিপিতে ব্যবহৃত প্রতীকগুলি এক-একটি শব্দেরই প্রতীক ছিল।

শীর্ষ নির্দেশ

পরবর্তীতে লিপির শব্দচিত্রের রেখাগুলি ক্রমশ সরল, সংক্ষিপ্ত ও সাংকেতিক হয়ে এক-একটি শব্দকে না বুঝিয়ে শুধু তার আদ্য দল কে প্রকাশ করতে লাগল। এই সরলীকরণের প্রক্রিয়াকে বলে শীর্ষনির্দেশ। এই প্রক্রিয়ায় শব্দলিপি পরিণত হল দললিপিতে।

ধ্বনির প্রতীক

ধ্বনিলিপি বিকাশের শেষ ধাপে এসে লিপিতে ব্যবহৃত প্রতিটি রেখাচিহ্ন এক-একটি দল-এর প্রতীক না হয়ে সেই ভাষায় ব্যবহৃত এক-একটি একক ধ্বনির প্রতীক হয়ে উঠল।

বর্ণলিপি

একক ধ্বনির লিপিই হল বর্ণ। ধ্বনিলিপিকে তাই বর্ণলিপিও বলা যায়। রােমীয় লিপি প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বনিমূলক।

আধুনিক লিপি

সবচেয়ে আধুনিক লিপি হল ধ্বনিলিপি। ইতিপূর্বে যা ছিল বিশেষ কোনাে বস্তু বা বিষয় বা ভাবের প্রতীক, তা হয়ে উঠল কোনাে ভাষায় ব্যবহৃত ধ্বনির প্রতীক। এটি তাই উচ্চারণ-ভিত্তিক লিপিপদ্ধতি।

উদাহরণ

গােরুর মুখের ছবি থেকে ক্রমে ক্রমে ‘a’ ধ্বনিচিহ্নের বা বর্ণের সৃষ্টি হয়েছে। গ্রিক ধ্বনি/বর্ণ ‘a'(আলফা) থেকে এসেছে ইংরেজি বর্ণ ‘a’। এই ‘a’ বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া শব্দের সঙ্গে তাই গােরু-সম্পর্কিত কোনাে কিছুর যােগ না থাকাটাই স্বাভাবিক।

কীলক লিপি

ইংরেজিতে সুমেরীয় সভ্যতার লিপিকে বলে Cuneiform script। এর অর্থ গোঁজ আকৃতি। এই লিপির আকৃতি কীলক বা ছোট্ট তীরের মতো হওয়ার কারণে এদের কিউনিফর্ম বা কীলক লিপি বলা হয়।

কীলক লিপির জনপ্রিয়তা

সুমেরীয় সভ্যতার মানুষেরা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার জন্মভূমি মেসােপটেমিয়ায় এসে তাদের লিপি পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করে।

কীলক লিপি ব্যবহারের সময়কাল

কিউনিফর্ম লিপি আনুমানিক ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যবহৃত হত।

কীলক লিপি তৈরির পদ্ধতি

কাঁচা মাটির পাটাতনে কীলক বা বাটালি দিয়ে রেখাচিত্র এঁকে তারপর সেই মাটি রােদে পুড়িয়ে তারা কীলক লিপি তৈরি করত।

কীলক লিপি লেখার পদ্ধতি

কিউনিফর্ম বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন ও চিত্রের সমন্বয়ে লেখার পদ্ধতি। এটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে গঠিত কোনো বর্ণমালা নয় এবং এতে নির্দিষ্ট বা ধরাবাঁধা কোনো অক্ষরও নেই। নির্দিষ্ট অক্ষরের পরিবর্তে ৬০০ থেকে ১০০০ -এর মতো কীলক আকৃতির শব্দ বা তাদের অংশের শেপ ব্যবহার করে লেখা হত।

কীলক লিপি বা কিউনিফর্ম লিপির আবিষ্কর্তা

প্রাচীন মেসােপটেমিয়ার মানুষেরা মনে করতেন যে, নেবাে নামক দেবতাই এই লিপি পদ্ধতির আবিষ্কর্তা।

কীলক লিপির নামকরণ

বিখ্যাত লিপি বিশারদ টমাস হাইড এই লিপির নামকরণ করেন কিউনিফর্ম। লাতিন ভাষায় ‘Cuneus’ শব্দের অর্থ পেরেক বা কীলক বা বাটালি এবং ‘forma’ শব্দের অর্থ আকৃতি। কীলকের মতাে খোঁচা খোঁচা চেহারার জন্যই এর নাম কীলক লিপি।

কীলক লিপির বিবর্তন

প্রথম যুগে এটি চিত্রলিপি থাকলেও পরবর্তীকালে এটি ক্রমে ক্রমে ভাবলিপি ও ধ্বনিলিপিতে পরিবর্তিত হয়।

কীলক লিপিতে ব্যবহৃত ভাষা

ব্যাবিলনীয় এবং আসিরীয় – এই দুই প্রধান মেসােপটেমীয় ভাষা পাথরের ওপর বা কাদার টালির ওপর লেখা হত এই লিপিতেই। পারস্যদেশে আর্যদের প্রাচীন পারসিক ভাষা লেখার জন্যও এই লিপি ব্যবহৃত হত।

কীলক লিপির নমুনা

এই কীলক লিপির সবচেয়ে প্রাচীন নমুনাটি (প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের পুরানাে) পাওয়া গেছে উরুক শহরে। তাছাড়া প্রাচীন সুমেরের নিসপুরে একটি মন্দিরের নীচে একটি সিলমােহর পাওয়া গেছে যা প্রায় পঞ্চাশ হাজার কিউনিফর্মে লেখা।

কীলক লিপির উল্লেখযোগ্য কাজ

হামুরাবির আইনবিধি এই লিপির লিখন পদ্ধতিতেই লিপিবদ্ধ করা হয়।

কীলক লিপির ব্যবহার

প্রাচীন যুগে কিউনিফর্ম খুবই জনপ্রিয় লিখন পদ্ধতি ছিল। সুমেরীয় ও আক্কাদিয়ান বাদে অ্যাসিরিয়ান, ব্যাবিলনিয়ান, এব্লেইট, আমোরাইট, অ্যালামাইট, হাত্তিক, হুররিয়ান, উরার্তিয়ান, হিট্টাইট, লুউইয়ান ভাষা এই লিখন পদ্ধতিতে লেখা হত।

কীলক লিপির লিপির সংস্কার

কিউনিফর্ম লিপিকে প্রথম সংস্কার করেন পারস্য সম্রাট দরায়ুস।

কীলক লিপিতে প্রাপ্ত নমুনার পরিমাণ

প্রাচীন সভ্যতার বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি খুঁড়ে ৫ – ১০ লাখ কিউনিফর্ম ফলক বা ট্যাবলেট পাওয়া গেছে।

কীলক লিপির পাঠোদ্ধার

এই লিপির পাঠোদ্ধারের সূচনা করেন আইরিশ পাদ্রি এডওয়ার্ড হিংকস।

কীলক লিপিতে বর্ণিত বিষয়

  • (১) এই লিপির বেশির ভাগ ফলক সাংসারিক সাধারণ হিসাব বা শস্য গণনার জন্য ব্যবহৃত হত।
  • (২) কিছু শিলালিপিতে প্রাচীন মেসোপটেমীয় জীবনের সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়।
  • (৩) কিছু কিউনিফর্ম লিপি জটিল জ্যোতির্বিদ্যার গণনায় ব্যবহৃত হত।
  • (৪) ব্যাবিলনীয়দের তিনটি কিউনিফর্ম থেকে সবচেয়ে প্রাচীন রন্ধন প্রণালীর সন্ধান পাওয়া যায়। এই বিশেষ শিলালিপিতে স্টিউ ও সুপের জন্য ২৫টি রেসিপির (মাংস ও নিরামিষ উভয়) কিছু নির্দেশাবলি সহ বর্ণনা রয়েছে। তবে কোনো পরিমাপ বা কত সময় রান্না করতে হবে তা লেখা নেই।

উপসংহার :- বর্তমানে এই লিপি বিলুপ্ত। তবে ব্রিটিশ জাদুঘরসহ বার্লিন, ইরাক, তুরস্ক ইত্যাদি দেশের জাদুঘরেও কিউনিফর্ম ট্যাবলেট সংরক্ষিত আছে।

(FAQ) কীলক লিপি বা কিউনিফর্ম লিপি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সুমেরীয় লিপির নাম কি?

কিউনিফর্ম বা কীলক লিপি।

২. কিউনিফর্ম লিপির আবিষ্কর্তা কে?

মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীদের মতে, নেবো নামক দেবতা।

৩. কিউনিফর্ম লিপির অপর নাম কী?

কীলকাক্ষর বা বাণমুখ লিপি।

Leave a Reply

Translate »