রাজা পুরু বা পুরুষোত্তম

প্রাচীন ভারতের পৌরবের রাজা পুরু বা পুরুষোত্তম, তাঁর রাজ্যের অবস্থান, রাজত্বকাল, পুরুর বংশ পরিচয়, উত্থান, বীরত্ব, আলেকজান্ডার ও পুরুর যুদ্ধ সম্পর্কে জানবো।

পুরু বা পুরুষোত্তম কে ছিলেন?, পুরু কোথাকার রাজা ছিলেন?, রাজা পুরুর রাজত্বকাল, রাজা পুরুর উত্থান, রাজা পুরুর বীরত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে আলোকপাত করা হল।

রাজা পুরু বা পুরুষোত্তম

রাজত্ব৩৪০ – ৩১৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
উত্তরসূরিমলয়কেতু (ভ্রাতুষ্পুত্র)
ধর্মসনাতন বৈদিক ধর্ম
রাজা পুরুষোত্তম বা পুরু

ভূমিকা :- পৌরব ও বিপাশা নদীর অববাহিকা পর্যন্ত বিস্তৃত রাজ্যের রাজা ছিলেন পুরুষোত্তম বা পুরু। তিনিই একমাত্র প্রাচীন ভারতীয় রাজা, যিনি গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

রাজ্যের অবস্থান

এই প্রাচীন ভারতীয় রাজ্য ঝিলাম ( বিতস্তা ) ও চেনাব ( চন্দ্রভাগা ) নদীদ্বয়ের মধ্যে অবস্থিত ছিল। আধুনিক পাঞ্জাব, পাকিস্তান এবং বিপাশা নদীর অববাহিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল এই রাজ্য।

রাজা পুরুষোত্তম বা পুরুর রাজত্বকাল

আনুমানিক ৩৪০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৩১৭ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত রাজা পুরু গৌরবের সঙ্গে রাজত্ব করেছিলেন।

ঋগ্বেদের বর্ণনা

  • (১) ঋগ্বেদ -এর সপ্তম মণ্ডলে একাধিকবার উল্লেখ আছে প্রাচীন পুরু উপজাতির। ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলের বিবরণ অনুসারে ভারতবর্ষের উত্তরাপথে অবস্থিত প্রাচীন সরস্বতী নদীর তটে বসবাস করতেন পুরু উপজাতির অধিবাসীরা।
  • (২) একাধিক গোষ্ঠী দ্বারা বিভক্ত পুরু উপজাতিদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীটির নাম ছিল ঋগ্বেদের তৃতীয় মণ্ডলে উল্লেখিত ভারত গোষ্ঠীর।
  • (৩) ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলের বিবরণ অনুসারে এই ভরত গোষ্ঠীর নেতৃত্বেই সমগ্র পুরু উপজাতির যোদ্ধারা একত্রিত হয়ে প্রাচীন মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অনুষ্ঠিত দশ রাজার যুদ্ধ -এ রাজা সুদাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
  • (৪) আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে খুব সম্ভবত ঋগ্বেদে বর্ণিত এই দশ রাজার মহাযুদ্ধের বিবরণ থেকে অনুপ্রানিত হয়েছিল মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ -এর বিবরণ।

রাজা পুরুষোত্তম বা পুরুর উত্থান

  • (১) ঈশ্বরী প্রসাদ সহ আরও অনেক ঐতিহাসিকদের মতানুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু এবং যদুবংশের পতনের পর সময়ের সাথে সাথে ক্রমে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে যদুবংশীয়রা।
  • (২) এদের মধ্যে একটি অংশ মথুরা, দ্বারকা আর গুজরাট ত্যাগ করে ভাগ্যের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্রাচীন ভারতবর্ষের উত্তরাপথে সুদূর পাঞ্জাব, সিন্ধু, তক্ষশীলা প্রদেশ আর আফগানিস্থানে।
  • (৩) এরকমই কোনো যদুবংশীয় শূরসেন উপজাতি থেকেই উত্থান ঘটেছিল রাজা পুরুর।

আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ

রাজা পুরুর রাজত্বকালে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেছিলেন। তিনিই প্রথম ভারতে আলেকজান্ডার -এর গতি রোধ করেছিলেন।

ঝিলমের যুদ্ধের সময় পুরুর রাজ্যের সীমানা

গ্রীক ঐতিহাসিকদের বিবরণ অনুসারে ঝিলম যুদ্ধের সময়কালে রাজা পুরুর রাজ্যের সীমান্ত বর্তমান অখণ্ড পাঞ্জাব অঞ্চলের হিদাস্পিস নদীর (ঝিলাম নদী) তট থেকে চেনাব নদীর তট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

ঝিলমের যুদ্ধ

রাজা পুরু ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহামতি আলেকজান্ডারের সাথে বিতস্তার তীরে প্রবল বিক্রমে হিদাসপিসের যুদ্ধ -এ করলেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন।

রাজা পুরুষোত্তম বা পুরুর বীরত্ব

পরাজিত হলেও পুরু গর্বের সাথে আলেকজান্ডারকে বলেছিলেন যে তাঁর প্রতি রাজার মতো আচরণ করতে হবে। আলেকজান্ডার তাঁর এই বীরত্ব অভিভূত হয়েছিলেন।

গ্রিক বর্ণনা

গ্রীক ঐতিহাসিকরা রাজা পুরুকে ঝিলমের যুদ্ধে সম্রাট আলেকজান্ডারের সুবিশাল আর মহাশক্তিশালী গ্রীক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত এক অসাধারন সাহসি, নির্ভীক, দেশপ্রেমিক, পরাক্রমী আর মহান যোদ্ধা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

আলেকজান্ডারের জীবনের ভয়ানক যুদ্ধ

গ্রিক লেখনী অনুসারে নিজের বর্ণময় জীবনে যতগুলি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন সম্রাট আলেকজান্ডার সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক, কঠিন আর রক্তক্ষয়ী ছিল অনমনীয় রাজা পুরুর বিরুদ্ধে ঝিলমের যুদ্ধ।

আলেকজান্ডারের মুগ্ধতা

ঝিলমের যুদ্ধে রাজা পুরুর পরাক্রম দর্শন করে এতটাই বিমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন আলেকজান্ডার যে তিনি যুদ্ধ পরবর্তী সময়কালে গ্রীক অধিকৃত পাঞ্জাব অঞ্চলের সামন্তরাজা হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন রাজা পুরুকেই।

আলেকজান্ডারের দূরদর্শীতা

  • (১) দূরদর্শী আলেকজান্ডার উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, রাজা পুরুকে মুক্তি দিলে বা হত্যা করলে তাঁর আদর্শে অনুপ্রানিত হয়ে সমকালীন অনান্য ভারতীয় রাজা আর যোদ্ধারা অচিরেই গ্রীক বাহিনীর বিরুদ্ধে মহাবিদ্রোহের ঘোষণা করবে।
  • (২) রণদক্ষ যোদ্ধা ভারতবাসীদের বিদ্রোহ দমন করা কোনমতেই সম্ভব হবে না আলেকজান্ডারের পক্ষে।
  • (৩) তাই রণদক্ষ আর জাত্যাভিমানি রাজা পুরুকেই পাঞ্জাব অঞ্চলের শাসক ঘোষণা করে অসাধারণ চাতুর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন দক্ষ শাসক সম্রাট আলেকজান্ডার।

সামন্তরাজ পুরু

গ্রীক ঐতিহাসিক প্লুটার্কের লেখনী অনুসারে ঝিলমের যুদ্ধের পর পুরুকে তাঁর নিজেরই পাঞ্জাব রাজ্যের সামন্তরাজ হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন সম্রাট অ্যালেকজান্ডার।

রাজ্যের প্রসার

ঝিলামের যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল সামন্তরাজ পুরুর রাজ্যের সীমানা। সেই সময় প্রায় ৫০০০টি বৃহৎ নগরী আর অগনিত মাঝারি মাপের জনপদ ও ক্ষুদ্র গ্রাম অন্তর্ভুক্ত ছিল পুরুর রাজ্যে।

রাজা পুরুর মৃত্যু

৩১৫ খ্রিষ্টপূর্বে পাঞ্জাব অঞ্চলের গ্রীক সেনাপতি ইউডেমাসের ষড়যন্ত্রে গুপ্ত ঘাতকের হাতে নিহত হন মহারাজ পুরু।

উপসংহার :- রাজা পুরুর মৃত্যুর পর ভাঙন ধরে সুবিশাল গ্রীক সাম্রাজ্যেও। তক্ষশিলা নগরে অবস্থিত তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয় -এর এক অধ্যাপক চাণক্য বা কৌটিল্য -এর বুদ্ধিমত্তা ও অন্যতম ষোড়শ মহাজনপদ মগধ -এর এক মহান ভারতীয় যোদ্ধা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য -এর রণকুশলতায় অচিরেই ভারতবর্ষ গ্রিক শাসন থেকে মুক্ত হয়।

(FAQ) রাজা পুরু সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য ?

১. রাজা পুরু বা পুরুষোত্তম কোথাকার রাজা ছিলেন?

ঝিলাম ( বিতস্তা ) ও চেনাব ( চন্দ্রভাগা ) নদীদ্বয়ের মধ্যে অবস্থিত প্রাচীন ভারতীয় রাজ্য পৌরবের রাজা ছিলেন পুরু।  

২. আলেকজান্ডার পুরুর বিরুদ্ধে কোন নদীর তীরে যুদ্ধ করেন?

ঝিলম নদীর তীরে।

৩. আলেকজান্ডার কোথাকার রাজা ছিলেন?

ম্যাসিডন নামে প্রাচীন গ্রিক রাজ্যের রাজা ছিলেন আলেকজান্ডার।

৪. পুরু বা পুরুষোত্তম কে ছিলেন?

পুরু রাজ্যের রাজা।

Leave a Reply

Translate »