কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ

আজ পৌরাণিক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ -এর বাণী, সময়কাল, স্থান, যুদ্ধের পটভূমি, শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকা, যুদ্ধের প্রথম দিন থেকে যুদ্ধের অষ্টাদশ দিন পর্যন্ত জানবো ।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ

সময়আনুমানিক ৩১৩৮ খ্রিস্টপূর্ব
স্থানবর্তমান ভারতের হরিয়ানা
পক্ষকৌরব ও পাণ্ডব
ফলাফলকৌরব ধ্বংস ও পাণ্ডবদের জয়
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে

ভূমিকা :- কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ মহাভারতে বর্ণিত একটি পৌরাণিক যুদ্ধ। একই পরিবার উদ্ভূত পাণ্ডব ও কৌরব শিবিরের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

যুদ্ধের বাণী

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বাণী হল ধর্মের জয় ও অধর্মের বিনাশ। পাণ্ডবরা ন্যায়, কর্তব্য ও ধর্মের পক্ষ। অন্যদিকে কৌরবরা অন্যায়, জোর-জবরধস্তি ও অধর্মের পক্ষ।

সময়কাল

কথিত আছে খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৮ অব্দে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

কলিযুগাব্দ

আজও ভারতে কলিযুগাব্দ বলে একটি কাল গণনা প্রচলিত আছে। কারো করো মতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরেই ঐ কাল গণনা আরম্ভ হয় অথবা কৃষ্ণের মৃত্যুর পর থেকে শুরু হয়।

স্থান

বর্তমান ভারতের হরিয়ানায় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ১৮ দিন।

যুদ্ধের পটভূমি

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কাহিনী শুরু রাজসিংহাসনের অধিকার নিয়ে।

  • (১) পিতৃসত্য পালনের স্বার্থে শান্তনুর পুত্র দেবব্রত আজীবন বিবাহ করেন নি, রাজসিংহাসনে বসেন নি। এরকম প্রতিজ্ঞার কারণে দেবব্রতর নাম হয়েছিল ভীষ্ম।
  • (২) ভীষ্ম রাজদণ্ড গ্রহণ না করায় তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য রাজ্য পরিচালনা করতেন। বিচিত্রবীর্যের দুই পুত্রের নাম ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু।
  • (৩) বিচিত্রবীর্যের উত্তরাধিকারী ছিলেন জ্যেষ্ঠ ধৃতরাষ্ট্র। কিন্তু তিনি ছিলেন জন্মান্ধ। বিচিত্রবীর্যের পর সিংহাসন আরোহণ করেন পাণ্ডু।
  • (৪) পাণ্ডুর অকালমৃত্যুর পর রাজা হন ধৃতরাষ্ট্র। তারপর প্রশ্ন ওঠে কে হবে পরবর্তী রাজা : পাণ্ডুর পুত্র, না ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র। এই প্রশ্ন ঘিরে পারিবারিক বিবাদ নানা ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পর্যবসিত হয়।

রাজা যুধিষ্ঠির

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয়ী হয় পাণ্ডব পক্ষ। রাজদণ্ড লাভ করেন পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির। এই যুদ্ধে ধৃতরাষ্টের জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্যোধন সহ একশত পুত্রের জীবনাবসান হয়।

শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকা

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ অস্ত্র ধারণ করেনি তবে তিনি পাণ্ডবদের পক্ষে অর্জুনের যুদ্ধরথের সারথী হয়েছিলেন। আবার অন্য দিকে কুরুপক্ষকে তিনি নারায়ণী সেনা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।

কর্ণের বিরোধিতা

কর্ণ দ্রৌপদীর সঙ্গে অশ্লীল আচরণ করেছিলেন এই অভিযোগে ভীষ্ম কর্ণকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধা দেন। আসলে তিনি কুন্তীর কন্যাবস্থায় পুত্রলাভের কথা জানতেন। তিনি চান নি কর্ণ আপন ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুক।

যুদ্ধের প্রথম দিন

  • (১) প্রথম দিনের যুদ্ধে পাণ্ডব পক্ষে ভীম ও কৌরব পক্ষে ভীষ্ম বীরত্ব প্রদর্শন করে পরস্পরের বহু সৈন্য হত্যা করেন।
  • (২) যুদ্ধে অর্জুন পুত্র অভিমন্যু অমিত বিক্রম প্রদর্শন করেন। তিনি একই সাথে ভীষ্ম, কৃতবর্মা, কৃপাচার্য ও শল্যের সাথে যুদ্ধ করেন।
  • (৩) মদ্ররাজ শল্যের আক্রমণে বিরাটরাজের পুত্র উত্তর পরাজিত ও নিহত হন।
  • (৪) ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বিরাটের অপর পুত্র শ্বেত ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য প্রবলভাবে যুদ্ধ শুরু করেন। অশেষ বীরত্ব প্রদর্শন করেও ভীষ্ম কর্তৃক তিনি নিহত হন।

যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন

দ্বিতীয় দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম। পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

  • (১) দ্বিতীয় দিনের যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ভীষ্ম-অর্জুনের যুদ্ধ। প্রবল যুদ্ধের পরও কেউ জয়ী হতে সক্ষম হন নি।
  • (২) ভীম কলিঙ্গরাজ শ্রুতায়ু, তাঁর পুত্র শত্রুদেব ও কেতুমান, ভানুমান, সত্য, সত্যদেব ও বিপুল সংখ্যক কলিঙ্গ সৈন্য হত্যা করেন।
  • (৩) পরে ভীষ্ম ও ভীমের যুদ্ধ হয়। তাছাড়া এই দিন অভিমন্যু, ধৃষ্টদ্যুম্ন ও অর্জুন অশেষ বীরত্ব প্রদর্শন করেন।
  • (৪) দ্বিতীয় দিনের যুদ্ধে কৌরব পক্ষে ভীষ্ম ছাড়া আর কেউ তেমন বীরত্ব প্রদর্শন করতে পারেন নি।

তৃতীয় দিনের যুদ্ধ

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের তৃতীয় দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম। পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

  • (১) এই দিন ভীমের সাথে যুদ্ধে দুর্যোধন পরাজিত হয়ে পলায়ন করেন। তাছাড়া অর্জুন ও ভীষ্মের অশেষ বীরত্ব লক্ষ্যণীয়।
  • (২) এই দিন ভীষ্মের প্রচন্ড সংহারমূর্তি দেখে তার প্রতি ক্রোধবশত কৃষ্ণ সুদর্শন চক্র উত্তোলন করেও পরে ভীষ্মের তোষণ ও অর্জুনের অনুরোধে তা প্রত্যাখ্যান করে নেন।

যুদ্ধের চতুর্থ দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চতুর্থ দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম। পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

  • (১) এই দিনে ধৃষ্টদ্যুম্ন শল্যপুত্র সাংযমনিধিকে হত্যা করেন। ভীমের অসীম বীরত্ব প্রদর্শনের কারণে কৌরব সৈন্যের একাংশ পলায়ন করে। পরে ভীষ্ম ভীমের গতিকে রোধ করতে সক্ষম হন।
  • (২) এরপর ভীমের সাথে দুর্যোধনের যুদ্ধ হয়। দুর্যোধনের শরাঘাতে ভীম সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। পরে সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে ভীম পুনরায় আক্রমণ করলে শল্য আহত হয়ে রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করেন।
  • (৩) এরপর ধৃতরাষ্ট্রের ১৪ জন পুত্র একসাথে আক্রমণ করলে ভীম জলসন্ধ, সুষেণ, উগ্র, অশ্ব, কেতু, বীরবাহু ও ভীমরথকে হত্যা করেন। ধৃতরাষ্ট্রের অন্যান্য পুত্ররা পরে পালিয়ে যায়।

যুদ্ধের পঞ্চম দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পঞ্চম দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম। পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। পঞ্চম দিনের যুদ্ধে উভয় পক্ষে বহু সৈন্য নিহত হলেও বড় কোন বীরের পতন হয়নি।

যুদ্ধের ষষ্ঠ দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ষষ্ঠ দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম ও পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। এই দিনের যুদ্ধে নকুলের পুত্র শতানীক ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র দুষ্কর্ণকে হত্যা করেন।

যুদ্ধের সপ্তম দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সপ্তম দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম ও পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

  • (১) দ্রোণ কর্তৃক বিরাট পুত্র শঙ্খ নিহত হন। এই দিনে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে বড় বড় কিছু যোদ্ধা প্রাণে রক্ষা পেলেও পরাজিত হন।
  • (২) এঁরা হলেন-ভীমের পুত্র ঘটোত্কচ, যিনি ভগদত্তের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হন। শল্য নকুল ও সহদেবের কাছে পরাজিত। শ্রুতায়ু  যুধিষ্ঠিরের কাছে পরাজিত।

যুদ্ধের অষ্টম দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের অষ্টম দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম ও পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

  • (১) ভীম ও ভীষ্মের যুদ্ধে ভীষ্মের সারথি নিহত হয়। এরপর ভীম ধৃতরাষ্ট্রের সুনাভ নামক পুত্রকে হত্যা করেন।
  • (২) এরপর ধৃতরাষ্ট্রের অন্যান্য পুত্ররা তাঁকে একযোগ তীব্রভাবে আক্রমণ করলে ভীম তা প্রতিহত করতে করতে ধৃতরাষ্ট্রের সাত পুত্রকে হত্যা করেন।
  • (৩) অর্জুন পুত্র ইরাবান শকুনির ছয় ভাইকে হত্যা করেন। পরে আর্যশৃঙ্গের হাতে ইরাবান নিহত হন। এটিই ছিল প্রথম কোন পাণ্ডব বীরের পতন।
  • (৪) এরপর দুর্যোধন বিদ্যুজ্জিহবকে হত্যা করেন। ভীম ধৃতরাষ্টের অনাধৃষ্য, কুণ্ডভেদী, বৈরাট, বিশালাক্ষ, দীর্ঘবাহু, সুবাহু ও কনকধ্বজ নামক পুত্রদের হত্যা করেন।

যুদ্ধের নবম দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের নবম দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম ও পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

  • (১) এই দিনের যুদ্ধে অভিমন্যুর কাছে অলম্বুষের পরাজয়ই হল উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
  • (২) এই দিনের দ্বিতীয় ঘটনা হল যুধিষ্ঠিরের কাছে ভীষ্ম তাঁর নিজের মৃত্যুর উপায় বলে দেওয়া।

যুদ্ধের দশম দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দশম দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম ও পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

  • (১) অর্জুন বিদেহসহ বহু সৈন্যকে হত্যা করেন। যুদ্ধে দুঃশাসন, কৃপ প্রভৃতি বীর পলায়ন করেন।
  • (২) ভীষ্ম শতানীককে হত্যা করেন। ভীষ্ম মহাপরাক্রমশালী বীর। তিনি হাতে ধনুর্বাণ থাকলে অবধ্য। কিন্তু শিখন্ডী যিনি পূর্বজন্মে মেয়ে ছিলেন তার প্রতি ভীষ্ম অস্ত্র তুলবেননা এটা পান্ডবরা জেনে যায়।
  • (৩) শিখন্ডী কে সামনে রেখে অর্জুন অজস্র শর দ্বারা ভীষ্মকে এমনভাবে বিদ্ধ করেন যে ভীষ্মের দেহ মাটি স্পর্শ করে না। ভীষ্ম শরশয্যায় শয়ন করে থাকলেন। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা মৃত্যু ছিল বলে তাঁর সেদিন মৃত্যু হয় নি।

যুদ্ধের একাদশ দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের একাদশ দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন দ্রোণাচার্য ও পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। দ্রোণাচার্য পাঞ্চাল রাজকুমার ও ব্যাঘ্রদত্তকে হত্যা করেন।

যুদ্ধের দ্বাদশ দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দ্বাদশ দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন দ্রোণাচার্য ও পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। অর্জুন কর্তৃক সুধন্বা, মালব, মাবেল্লক, ললিত্থ, ত্রিগর্ত নিহত হন।

যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন দ্রোণাচার্য ও পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

  • (১) দ্রোণাচার্যের কাছে সত্যজিত, শতানীক, দৃঢ়সেন প্রমুখ বীরগণ পরাজিত ও নিহত হন। অর্জুন সংশপ্তক সুশম্মার ভাইদের হত্যা করেন।
  • (২) ভগদত্তের শরে অর্জুনের মুকুট পড়ে যায়। ভগদত্ত অর্জুনের উদ্দেশ্যে বৈষ্ণবাস্ত্র নিক্ষেপ করলে কৃষ্ণ তা নিজ বক্ষে ধারণ করে নেন। উক্ত অস্ত্র কৃষ্ণের গলায় বৈজয়ন্তীমালায় রূপ লাভ করে। পরে অর্জুন তাঁকে হত্যা করেন।
  • (৩) এরপর অর্জুন সুবলনন্দন বৃষক ও অচল, শত্রুঞ্জয়সহ কর্ণের ভাইদের হত্যা করেন। নকুল কর্তৃক ভূতকর্মা নিহত হন। ভীম কর্তৃক অঙ্গনৃপতি নিহত হন। অশ্বত্থামা কর্তৃক নীল নিহত হন।
  • (৪) দ্রোণাচার্য কর্তৃক রচিত চক্রবুহ্য ভেদ করে অভিমন্যু শল্যের ভাইদের, রুক্সরথ, লক্ষ্মণ ক্রাত্থ, বৃক্ষারক, বৃহদ্বল, অশ্বকেতু, চন্দ্রকেতু, সৌবলগণ সহ বহু বীর ও সৈন্য হত্যা করেন।
  • (৫) পরে সাত মহারথী অন্যায়ভাবে যুদ্ধ করে অভিমন্যুকে পরাজিত করেন এবং হত্যা করেন। এই সাত মহারথী হলেন দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা, কর্ণ, কৃতবর্মা, শল্য, দুর্যোধন ও দুঃশাসন।
  • (৬) এই দিন জয়দ্রথ শিবের বরে বলীয়ান হয়ে পাণ্ডব যোদ্ধাদের চক্রব্যূহে প্রবেশ করতে দেননি। ফলে অভিমন্যুকে একাকী সপ্তরথীর সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছিল।

যুদ্ধের চতুর্দশ দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চতুর্দশ দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন দ্রোণাচার্য ও পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

  • (১) এই দিন অর্জুন অভিমন্যু হত্যার প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞা করেন। এই দিনের যুদ্ধের প্রকৃতি মূলত জয়দ্রথ হত্যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এদিনের যুদ্ধে শ্রুতায়ুধ নিজ গদা দ্বারা নিহত হন।
  • (২) এরপর অর্জুন সুদক্ষিণ, শ্রুতায়ুকে হত্যা করেন। এই দিন রাজা বৃহত্ক্ষেত্র হত্যা করেন ক্ষেত্রমধুকে এবং চেদি রাজ্যের রাজা ধৃষ্ঠকেতু হত্যা করেন বীরধন্বাকে।
  • (৩) এরপর সহদেব হত্যা করেন নিরমিত্রকে। এরপর দ্রৌপদীর সন্তানরা সৌমদত্তিকে হত্যা করেন। ভীমের পুত্র ঘটোত্কচ হত্যা করেন অলাম্বুষকে। এক্ষেত্রে পাণ্ডবপক্ষ লাভবাণ হয়।
  • (৪) যুদ্ধের এই পর্যায়ে দ্রোণাচার্য হত্যা করেন পাঞ্চাল-কৈকয়ী বীরদের। অর্জুনকে সাহায্য করার জন্য সাত্যকি অগ্রসর হয়ে বহু কৌরব সৈন্য হত্যা করেন। বিশেষ করে তিনি হত্যা করেন জলসন্ধ, সুদর্শন, পাঁচশ ত্রিগর্তবীরকে।
  • (৫) অবশেষে অর্জুন-সাত্যকি মিলিত হন। বিকেলের দিকে দ্রোণ বৃহত্ক্ষেত্র, ধৃষ্টকেতু, চেদিবীরদেরকে হত্যা করেন। এরপর সাত্যকি ও অর্জুনের সমবেত চেষ্টায় ভুরিশ্রবা নিহত হন।
  • (৬) দিনের শেষে কৃষ্ণের কৌশলে অর্জুন জয়দ্রথকে হত্যা করেন। এই দিনের যুদ্ধ রাত্রি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
  • (৭) রাতের যুদ্ধে ভীম কলিঙ্গরাজের পুত্র ও দুর্যোধনের দুই পুত্রকে হত্যা করেন। অশ্বত্থামা অঞ্জনপর্বা ও সুরথাকে হত্যা করেন।
  • (৮) এই সময় ভীম বাহ্লীককে আর সাত্যকি সোমদত্ত ও ভুরিকে হত্যা করেন। এরপর শল্য শতানীককে, ধৃষ্টদ্যুম্ন ধ্রুমসেনকে, ঘটোত্কচ অলম্বল ও অলায়ুধকে হত্যা করেন। এই রাত্রে কর্ণ ঘটোত্কচকে হত্যা করেন।

যুদ্ধের পঞ্চদশ দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পঞ্চদশ দিন কৌরবপক্ষে সেনাপতি ছিলেন দ্রোণাচার্য ও পাণ্ডবপক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। এইদিন সকালে দ্রোণ বিরাট ও দ্রুপদকে হত্যা করেন। অশ্বত্থামা হত প্রচার দ্বারা দ্রোণ কাতর হয়ে অস্ত্রত্যাগ করেন এবং ধ্যানে বসে যান। ধৃষ্টদ্যুম্ন এই অবস্থায় দ্রোণের শিরশ্ছেদ করেন।

যুদ্ধের ষোড়শ দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ষোড়শ দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন কর্ণ ও পাণ্ডব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। যুদ্ধের শুরুতেই ভীম ক্ষেমধুর্তিকে, সাত্যকি বিন্দ-অনুবিন্দকে, শ্রুতকর্মা চিত্রসেনকে, অর্জুন সংশপ্তকদের ও দণ্ডাধরকে হত্যা করেন। এই অবস্থায় অশ্বত্থামা পাণ্ডবপক্ষীয় পাণ্ড্যকে হত্যা করেন।

যুদ্ধের সপ্তদশ দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সপ্তদশ দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন কর্ণ ও পাণ্ডব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

  • (১) এই দিনের যুদ্ধে কর্ণ ভানুদেব, চিত্রসেন, সেনাবিন্দু, তপন, শূরসেন, চন্দ্রধর, দণ্ডাধর, জিষ্ণুকে হত্যা করেন।
  • (২) ভীম ভানুসেন, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদেরকে হত্যা করেন। কৃপ সুকেতুকে হত্যা করেন। এরপর কর্ণ ভার্গবদত্ত অস্ত্র প্রয়োগে অসংখ্য পাণ্ডবসৈন্য হত্যা করেন।
  • (৩) এরপর উত্তমৌজা কর্ণ-পুত্র সুষেণকে, কর্ণ বিশোককে, সাত্যকি প্রসেনকে হত্যা করেন। এরপর ভীম দুঃশাসনকে হত্যা করে তার রক্ত পান করেন।
  • (৪) পরে ভীম নিষঙ্গিবীরদেরকে, অর্জুন কর্ণপুত্র বৃষসেনকে হত্যা করেন। এরপর অনুষ্ঠিত হয় মহাভারতের অন্যতম কর্ণার্জুন যুদ্ধ।
  • (৫) যুদ্ধের প্রথমাবস্থায় অঙ্গ রাজ্যের রাজা কর্ণ কোনক্রমেই অর্জুনের উপর প্রাধান্য বিস্তার না করতে পেরে নাগাস্ত্র নিক্ষেপ করেন। এই অস্ত্রে অশ্বসেন যোগবলে প্রবেশ করলেও কৃষ্ণের সহায়তায় অর্জুন রক্ষা পান। তবে এই অস্ত্রের আঘাতে অর্জুনের মুকুট ধ্বংস হয়।
  • (৬) এরপর অশ্বসেন নাগাস্ত্র থেকে মুক্ত হয়ে অর্জুনকে আক্রমণ করতে গেলে অর্জুনের অস্ত্রাঘাতে নিহত হন। এরপর অর্জুনের তীব্র আক্রমণে কর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেললে অর্জুন তাঁকে অসুস্থ জ্ঞানে হত্যা করলেন না।
  • (৭) কিন্তু কৃষ্ণের উৎসাহে তিনি পুনরায় কর্ণকে আক্রমণ করেন। কর্ণ সংজ্ঞালাভের পর আবার যুদ্ধ শুরু করেন। অবশেষে অর্জুন কর্ণকে হত্যা করেন অসহায় অবস্থায়।
  • (৮) কর্ণের রথচক্র মাটিতে গেঁথে গেলে অর্জুন তা তোলার সুযোগ দিতে চাইলেও কৃষ্ণ উপদেশ দেন কর্নকে হত্যা করতে। কর্ণের মৃত্যুর পর কৌরব পক্ষের সেনাপতি হিসাবে নিযুক্ত হন শল্য। এরপর পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

যুদ্ধের অষ্টাদশ দিন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের অষ্টাদশ দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন শল্য ও পাণ্ডব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

  • (১) যুদ্ধের প্রথম দিকেই নকুল কর্ণপুত্র-চিত্রসেন, সত্যসেন ও সুষেণকে হত্যা করলেন। এরপর দুর্যোধন চেকিতানকে, অশ্বত্থামা সুরথকে এবং যুধিষ্ঠির শল্য ও শল্যের ভাইকে হত্যা করলেন।
  • (২) এরপর সাত্যকি শ্বাল্য ও ক্ষেত্রকীর্তিকে, সহদেব উলূক ও শকুনিকে হত্যা করেন।
  • (৩) এরপর দুর্যোধনের পক্ষের অধিকাংশ সৈন্য নিহত হওয়ায় দুর্যোধন ভীত হয়ে হ্রদে আত্মগোপন করেন। পাণ্ডবরা কিছু শিকারীর মুখে এই সংবাদ শুনে উক্ত হ্রদের কাছে আসেন।
  • (৪) এরপর ভীমের সাথে দুর্যোধনের গদাযুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ভীম দুর্যোধনের উরু ভেঙে দেয় এবং পরে দুর্যোধনের মৃত্যু হয়।

উপসংহার :- কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরব পক্ষে প্রায় কেউই জীবিত থাকেননি। যুদ্ধের পর পান্ডব যুধিষ্ঠির সিংহাসন লাভ করেন।

(FAQ) কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য ?

১. কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কোথায় হয়েছিল?

বর্তমান ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে।

২. কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কতদিন ধরে চলেছিল?

১৮ দিন।

৩. কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর কে রাজ্যভার পান?

যুধিষ্ঠির।

Leave a Reply

Translate »