রাজা অজাতশত্রু

রাজা অজাতশত্রু -র জন্মকাহিনী, সিংহাসনে আরোহণ, রাজত্বকাল, উপাধি লাভ প্রসঙ্গে নিম্নে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হল ।

রাজা অজাতশত্রু

রাজত্বকাল৪৯২ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৪৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
পিতাবিম্বিসার
মাতাকোশল দেবী (মতান্তরে রানী চেল্লনা)
পূর্বসূরিবিম্বিসার (পিতা)
উত্তরসূরিউদয়ভদ্র (পুত্র)
রাজা অজাতশত্রু

ভূমিকা :- অজাতশত্রু  ছিলেন পূর্ব ভারতের মগধের হর্যঙ্ক বা হর্ষঙ্ক রাজবংশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজা। তিনি রাজা বিম্বিসারের পুত্র এবং মহাবীরগৌতম বুদ্ধ উভয়ের সমসাময়িক ছিলেন।

অজাতশত্রুর জন্মকাহিনী

রাজা অজাতশত্রুর কাহিনী পাওয়া যায় বৌদ্ধধর্মের ত্রিপিটক ও জৈন আগামে। উভয় ঐতিহ্যেই অজাতশত্রুর জন্মের বিবরণ কমবেশি একই রকম।

  • (১) জৈন ধর্ম অনুসারে, রাজা বিম্বিসার এবং রাণী চেল্লনার কাছে অজাতশত্রুর জন্ম হয়েছিল।
  • (২) বৌদ্ধ ঐতিহ্য বিম্বিসার এবং কোশলা দেবীর কাছে অজাতশত্রু জন্মের কথা উল্লেখ করে।
  • (৩) অবশ্য লক্ষণীয় যে জৈন ও বৌদ্ধ উভয় প্রথায় উভয় রাণীকে “বৈদেহী” বলা হয়েছিল।

জৈন নিরায়াবালিকা সূত্রে অজাতশত্রুর কাহিনী

জৈন নিরায়াবালিকা সূত্র অনুসারে,

  • (১) গর্ভাবস্থায় রানী চেলনার তার স্বামীর হৃদয়ের ভাজা মাংস খেতে এবং মদ পান করার প্রবল ইচ্ছা ছিল।
  • (২) রাজা বিম্বিসার ও রাণী নন্দের পুত্র অত্যন্ত বুদ্ধিমান যুবরাজ অভয়কুমার হৃদয়ের মতো একটি বন্য ফল ভাজালেন এবং রানীকে দিলেন। রাণী তা খেয়ে ফেলেন।
  • (৩) পরে রানী চেলনা এমন পৈশাচিক ইচ্ছা থাকার জন্য লজ্জিত হয়েছিলেন। শিশুটি বড় হয়ে পরিবারের জন্য মারাত্মক হতে পারে – এই আশঙ্কা করে সন্তানের জন্মের কয়েক মাস পরেই রানী তাকে প্রাসাদ থেকে বের করে দেন।
  • (৪) শিশুটি যখন আবর্জনার স্তূপের কাছে শুয়ে ছিল, তখন একটি মোরগ তার আঙুলে কামড় দেয়।
  • (৫) রাজা বিম্বিসার এই ঘটনা জানতে পেরে বাইরে দৌড়ে এসে শিশুটিকে তুলে নিয়ে তার রক্তক্ষরণকারী কনিষ্ঠ আঙুলটি মুখে দিয়ে চুষতে থাকে যতক্ষণ না এটি রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায় এবং এটি আরোগ্য না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে।
  • (৬) শিশুটির কনিষ্ঠ আঙুলে কালশিটে থাকায় তার ডাকনাম ছিল কুনিকা (সোর ফিঙ্গার)। পরে তার নাম রাখা হয় অশোককান্দা।

বৌদ্ধ অত্থকথায় অজাতশত্রুর কাহিনী

বৌদ্ধ শাস্ত্র অত্থকথায অনুসারে,

  • (১) কোশলাদেবী বিম্বিসারের বাহু থেকে রক্ত ​​পান করতে চেয়েছিলেন তা ছাড়া রাজা তাকে বাধ্য করেন।
  • (২) পরে, যখন শিশুটিকে আবর্জনার স্তূপের কাছে ফেলে দেওয়া হয়, তখন সংক্রমণের কারণে তার কনিষ্ঠ আঙুলে একটি ফোঁড়া হয়।
  • (৩) রাজা সেই আঙুল চোষার সময় রাজার মুখের ভিতর ফোঁড়াটি ফেটে যায়। তার সন্তানের প্রতি স্নেহের জন্য তিনি পুঁজ বের করে দেননি, বরং গিলে ফেলেছিলেন।

রাজা অজাতশত্রুর সিংহাসনে আরোহণ

অজাতশত্রু জোরপূর্বক পিতার কাছ থেকে মগধ রাজ্য দখল করেন এবং তাকে বন্দী করেন।

রাজা অজাতশত্রুর রাজত্বকাল

রাজা অজাতশত্রু ৪৯২ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৪৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত মগধ রাজ্যে রাজত্ব করেন।

অজাতশত্রুর উপাধি

ভারতের প্রাচীন জনপদ, মগধের রাজা অজাতশত্রুর উপাধি বা অপর নাম ছিল কূনিক।

মথুরার প্রাচীন লিপিতে অজাতশত্রু

রাজা অজাতশত্রু যিনি কুনিক নামেও পরিচিত, তিনি ছিলেন বিম্বিসারের পুত্র। সরকারি জাদুঘর, মথুরার প্রাচীন শিলালিপিতে তাকে বৈদেহী পুত্র অজাতশত্রু কুনিকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুদ্ধে ব্যবহৃত নতুন অস্ত্রের উদ্ভাবন

রাজা অজাতশত্রু যুদ্ধে ব্যবহৃত দুটি অস্ত্রের অনুমিত উদ্ভাবক রথমুসল (কাঁচানো রথ) এবং মহাশীলকান্তক (বড় পাথর বের করার ইঞ্জিন)।

রাজধানী স্থানান্তর

পিতার মৃত্যুর কারণে অজাতশত্রু তার রাজধানী রাজগৃহ থেকে চম্পায় স্থানান্তরিত করেন।

অজাতশত্রু ও প্রসেনজিৎ

অজাতশত্রুর আমলে মগধ ও কোশলের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

  • (১) বিম্বিসার-এর স্ত্রী এবং অজাতশত্রুর মা কোশলদেবী ছিলেন কোশল-রাজ প্রসেনজিৎ-এর বোন। বোনের অকাল মৃত্যুর জন্য প্রসেনজিৎ অজাতশত্রুকে দায়ী করে বোনের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মগধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
  • (২) এই সুযোগে বৈশালীর বৃজি ও পাবার মল্লরাও মগধের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
  • (৩) পরাজয় অনিবার্য মেনে প্রসেনজিৎ শেষ পর্যন্ত অজাতশত্রুর সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হন। সন্ধির শর্ত অনুসারে প্রসেনজিৎ তাঁর কন্যা ভাজিরার সাথে অজাতশত্রুর বিবাহ দেন।
  • (৪) বিবাহের যৌতুক হিসেবে প্রজেনজিৎ কাশী অঞ্চলকে অজাতশত্রুর হাতে অর্পণ করেন। এই ঘটনার পর থেকে কোশল রাজ্যের পতন শুরু হয়।

বৈশালীর বিরুদ্ধে অজাতশত্রু

কোশল-রাজ প্রসেনজিতের সাথে দ্বন্দ্ব মিটে যাওয়ার পর অজাতশত্রু বৈশালীর বৃজি ও পাবার মল্লরাদের শায়েস্তা করার জন্য উদ্যোগ নেন।

  • (১) তিনি প্রথমে গঙ্গা এবং শোন নদীর সঙ্গমস্থলে পাটালিগ্রামে ( পরবর্তীতে পাটলিপুত্র ) একটি অস্থায়ী দুর্গ নির্মাণ করেন।  
  • (২) কূটনৈতিক তৎপরতায় স্থানীয় ছোটো ছোটো রাজ্যগুলোর ভিতরে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেন। এরপর দুর্বল রাজ্যগুলো আক্রমণ করে নিজ রাজ্যের অধিকারের আনেন।
  • (৩) টানা ১৬ বৎসর যুদ্ধ করার পর অজাতশত্রু সমগ্র বৈশালী জয় করতে সক্ষম হন।

শক্তিশালী রাজ্য মগধ

অজাতশত্রু কাশী দখল করেন এবং ছোট রাজ্যগুলি গ্রাস করেন। এইভাবে অজাতশত্রুর অধীনে মগধ উত্তর ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত হয়েছিল।

বৌদ্ধ ধর্ম ও অজাতশত্রু

‘অবদান-শতক’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, প্রথম জীবনে অজাতশত্রু বৌদ্ধ ধর্মের ঘোর বিরোধী ছিলেন। বৌদ্ধ ধর্ম বিরুদ্ধে তিনি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

  • (১) অজাতশত্রুর পিতা বিম্বিসার ছিলেন গৌতম বুদ্ধের ভক্ত। তিনি তাঁর অন্তঃপুরে বুদ্ধের পায়ের নখ ও চুলের উপর একটি স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন। অজাতশত্রু বিম্বিসারের মৃত্যুর পর এই স্তূপে পূজা বন্ধ করে দেন।
  • (২) এক দাসী গোপনে পূজা দিতে গেলে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর তিনি প্রজাদের  গৌতম বুদ্ধের কাছে যাওয়া নিষেধ করে দেন।
  • (৩) অবশ্য শেষ পর্যন্ত তিনি পিতাকে হত্যা করার জন্য দারুন মনোকষ্টে ভুগতেন। এই পরিতাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তিনি বুদ্ধের সাথে দেখা করেন।
  • (৪) ত্রিপিটকের সূত্রপিটকের দীর্ঘনিকায় অংশে দেখা যায়, তিনি গৌতম বুদ্ধের সাথে দেখা করে দীর্ঘ আলাপ করেছেন। পরিশেষে তিনি বুদ্ধের কাছে পিতৃহত্যার কথা স্বীকার করে তার প্রতিকার প্রার্থনা করেছেন।

বৌদ্ধ সংগীতির আহ্বান

গৌতম বুদ্ধ নির্বাণলাভের পর অল্প দিনের মধ্যে মতাদর্শগত কারণে বুদ্ধের বাণী এবং তার ব্যাখ্যা বিলীন হওয়া বা বিকৃত হওয়ার আশংকা তীব্রতর হয়ে উঠে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য অজাতশত্রু উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

  • (১) ৪৮৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মগধের মহারাজ অজাতশত্রুর সহায়তায় মহাকাশ্যপ এক বৌদ্ধসভার আয়োজন করেন।
  • (২) কথিত আছে রাজগৃহের সপ্তপর্ণী নামক গুহায় এই সভায় রাজা অজাতশত্রু যোগদান করেছিলেন।
  • (৩) এই সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে বুদ্ধের অন্যতম শিষ্য আনন্দের নেতৃত্বে সংগৃহীত হয়েছিল ধর্মাংশ এবং আর বুদ্ধের অপর শিষ্য উপালি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিনায়ংশ।
  • (৪) পরবর্তিতে ধর্মাংশ ও বিনয়াংশকে বিষায়ানুসারে ভাগ করে তৈরি করা হয়েছিল বিনয়পিটক ও সূত্রপিটক।
  • (৫) পরবর্তী সময়ে সূত্রপিটকের একটি অংশ পৃথক করে অভিধম্মপিটক নামক তৃতীয় পিটক তৈরি করা হয়। এই তিনটি পিটকের সংকলনই হলো ত্রিপিটক।

অজাতশত্রু ও মহাবীর

জৈনদের প্রথম উপাঙ্গ মহাবীর এবং অজাতশত্রুর সম্পর্কের উপর আলোকপাত করে। এটি বর্ণনা করে যে

  • (১) অজাতশত্রু মহাবীরকে সর্বোচ্চ সম্মান করতেন।
  • (২) অজাতশত্রুর একজন কর্মচারী ছিলেনযে তাকে মহাবীরের দৈনন্দিন খবর জানাতেন।
  •  (৩) মহাবীরের চম্পা নগরীতে আগমনের সময় অজাতশত্রু তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন এবং অর্ধমাগধী ভাষায় মহাবীরের দেওয়া উপদেশ গ্ৰহণ করেছিলেন।।

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে অজাতশত্রু

  • (১) অজাতশত্রুর একটি কাল্পনিক বিবরণ – যাকে শারীরিকভাবে স্থূল এবং অত্যাচারী ব্যক্তি হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি নৃশংসতা এবং গণহত্যা করতে আনন্দিত – গোর ভিদালের উপন্যাসে এই ভাবেই প্রদর্শিত হয়েছে।
  • (২) অজাতশত্রু নামে তার জীবন নিয়ে একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়।
  • (৩) আম্রপালি (1966) চলচ্চিত্রে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন অজাতশত্রু। এই চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে সুনীল দত্ত এবং বৈজয়ন্তীমালা অভিনয় করেছেন।
  • (৪) সুব্বা রাও কর্তৃক অজাতশত্রু নামে তাঁর জীবন সম্পর্কে একটি বই লেখা হয়েছিল।

অজাতশত্রুর মৃত্যু

পালি সাহিত্যে জাতকের গল্প থেকে জানা যায় যে, অজাতশত্রু নিষ্ঠুর প্রকৃতির রাজা ছিলেন। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০ অব্দের দিকে মৃত্যবরণ করেন।

উপসংহার :- ভারতের ইতিহাসে প্রথম প্রতাপশালী রাজা বিম্বিসারের পুত্র ছিলেন অজাতশত্রু। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। তাই অজাতশত্রুকেও পুত্রের হাতে নিহত হতে হয়।

[FAQ] রাজা অজাতশত্রু সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য ?

অজাতশত্রু কার উপাধি ?

বিম্বিসার পুত্র কুণিক – এর ।

অজাতশত্রু কোন মহাজনপদের অধিপতি ছিলেন ?

মগধ

Leave a Reply

Translate »