চালুক্য বংশ

বাতাপির চালুক্য বংশ প্রসঙ্গে চালুক্য বংশের বিভিন্ন শাখা, চালুক্য বংশের উৎপত্তি, রাজা জয়সিংহ, প্রথম পুলকেশী, কীর্তিবর্মন, দ্বিতীয় পুলকেশী, প্রথম বিক্রমাদিত্য, বিনয়াদিত্য, দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য, আরব আক্রমণ ও সাম্রাজ্যের ভাঙন সম্পর্কে জানবো।

বাতাপির চালুক্য বংশ

বিষয়বাতাপির চালুক্য বংশ
স্থানদক্ষিণের বাতাপি
স্থপতিপ্রথম পুলকেশী
শ্রেষ্ঠ রাজাদ্বিতীয় পুলকেশী
শেষ শ্রেষ্ঠ রাজাদ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য
বাতাপির চালুক্য বংশ

ভূমিকা :- বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে অবস্থিত দক্ষিণ ভারতকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। বিন্ধ্য অঞ্চল থেকে তুঙ্গভদ্রা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকে দাক্ষিণাত্য এবং তুঙ্গভদ্রার দক্ষিণের অঞ্চলকে সুদূর দক্ষিণ বলা হয়। এই দাক্ষিণাত্যের ইতিহাসে চালুক্য রাজবংশ ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

চালুক্য বংশের বিভিন্ন শাখা

দক্ষিণ ভারতের চালুক্য বংশের কয়েকটি শাখার কথা জানা যায়। যথা –

  • (১) বাতাপি বা বাদামির চালুক্য বা পশ্চিম চালুক্য। ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি থেকে অষ্টম শতকের মাঝামাঝি এরা রাজত্ব করেন।
  • (২) বেঙ্গীর চালুক্য বা পূর্ব চালুক্য। এটি ছিল পশ্চিম চালুক্যের শাখা। সপ্তম শতক থেকে দ্বাদশ শতক এঁরা রাজত্ব করেন।
  • (৩) কল্যাণীর চালুক্য বংশ। দশম শতক থেকে এঁরা রাজত্ব করেন।
  • (৪) গুজরাটের চালুক্য বংশ।

চালুক্য বংশের উৎপত্তি

  • (১) চালুক্যদের উৎপত্তি সম্পর্কে স্মিথ মন্তব্য করেছেন যে, চালুক্যরা ছিল বহিরাগত গুর্জর বা চাপদের বংশধর। এরা রাজপুতানা থেকে দক্ষিণে বসবাস করতে আসে। স্মিথ বলেন যে, শক জাতীয় চুলিক উপজাতি হতে চালুক্যদের উদ্ভব হয়।
  • (২) কিংবদন্তী অনুসারে চালুক্যরা ছিল “মানব্য গোত্রের” উদ্ভূত “হারীতিপুত্র” বংশীয়। অপর একটি কিংবদন্তী হল যে, চালুক্যরা ছিল মনুর বংশধর। তারা ব্রহ্মার চুলুক বা হাতের তালু থেকে উদ্ভূত হয়। ডঃ ডি. সি. সরকার প্রমুখ পণ্ডিত এই সকল কিংবদন্তী ও স্মিথের তত্ত্বকে অগ্রাহ্য করেন।
  • (৩) ডঃ সরকারের মতে, চালুক্যরা ছিল দক্ষিণ ভারতীয় স্থানীয় অধিবাসী। তারা চল্ক বা চালুক উপজাতি থেকে উদ্ভূত হয় এবং চালুক্য নামে খ্যাতি পায়। কৃষ্ণা নদীর তীরে হিরণ্য রাষ্ট্রে তাদের পূর্বপুরুষদের আদি বাস ছিল।

চালুক্য বংশের প্রথম প্রধান শাসক জয়সিংহ

বাতাপির চালুক্য বংশের প্রথম প্রধান শাসকের নাম ছিল জয়সিংহ। তিনি বিজাপুর জেলার বাতাপি অঞ্চলে রাজ্য স্থাপন করেন এবং রাষ্ট্রকূট শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তারপর রণরাজ রাজত্ব করেন।

চালুক্য সম্রাট প্রথম পুলকেশী

রণরাজের পর প্রথম পুলকেশীর শাসনকালে চালুক্য শক্তির বিস্তার ঘটে। প্রথম পুলকেশী বাতাপিতে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন এবং অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। প্রথম পুলকেশীই ছিলেন চালুক্য রাজশক্তির স্থপতি।

চালুক্য সম্রাট কীর্তিবর্মন

প্রথম পুলকেশীর পর চালুক্য সিংহাসনে বসেন কীর্তিবর্মন। তিনি বেলারি জেলার নল, কোঙ্কনের মৌর্য, উত্তর কর্ণাটক বা বনবাসীর কদম্বদের পরাস্ত করেন। তিনি ৫৩৬-৫৯৭ খ্রিস্টাব্দ রাজত্ব করেন।

চালুক্য সম্রাট মঙ্গলেশ

তার পর চালুক্য সিংহাসনে বসেন মঙ্গলেশ। তিনি কলচুরী শক্তিকে পরাস্ত করে উত্তর ও মধ্য মহারাষ্ট্র অধিকার করেন। তিনি মহারাষ্ট্রের রত্নগিরি জেলা অধিকার করেন। তিনি বাদামির বিখ্যাত বিষ্ণু মন্দির নির্মাণ করেন। তার রাজত্বের শেষ দিকে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র দ্বিতীয় পুলকেশীর সঙ্গে গৃহযুদ্ধে তিনি ৬১০ খ্রিস্টাব্দে নিহত হন।

চালুক্য বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট দ্বিতীয় পুলকেশী

  • (১) দ্বিতীয় পুলকেশী তাঁর পিতৃব্য মঙ্গলেশের সঙ্গে গৃহযুদ্ধে জয়লাভ করে পৈত্রিক সিংহাসন পান। এই গৃহযুদ্ধের সময় চালুক্য সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে অরাজকতা দেখা দেয়। দ্বিতীয় পুলকেশী সিংহাসনে বসার পর এই বিদ্রোহগুলি দমন করেন।
  • (২) তাঁর সভাকবি রবিকীর্তির রচিত আইহোল শিলালিপি থেকে দ্বিতীয় পুলকেশীর কৃতিত্বের কথা জানা যায়। তিনি  ছিলেন ঘোর সাম্রাজ্যবাদী। তিনি কেবলমাত্র শক্তিশালী রাজা ছিলেন না, প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা বলে তাঁকে গণ্য করা যায়।

চালুক্য সম্রাট প্রথম বিক্রমাদিত্য

  • (১) ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় পুলকেশী যুদ্ধে নিহত হলে প্রায় ১৩ বৎসর চালুক্য শক্তি খুবই হীনবল হয়ে পড়ে। অতঃপর পুলকেশীর পুত্র প্রথম বিক্রমাদিত্য ধ্বংসমুখী চালুক্য শক্তিকে পুনরায় গড়ে তুলেন। তিনি পল্লবদের হাত থেকে বাতাপি পুনর্দখল করে পল্লবদের হঠিয়ে দেন।
  • (২) তিনি নিজ রাজ্যে সংহতি স্থাপনের পর, তুঙ্গভদ্রা পার হয়ে পল্লব রাজ্যে অবিরাম আক্রমণ চালাতে থাকেন। প্রথম নরসিংহ বর্মন, দ্বিতীয় মহেন্দ্রবর্মন ও পরমেশ্বর বর্মনের সঙ্গে একাদিক্রমে চালুক্য প্রথম বিক্রমাদিত্য যুদ্ধ চালিয়ে যান।
  • (৩) ডঃ মহালিঙ্গনের মতে, দ্বিতীয় মহেন্দ্রবর্মন সম্ভবতঃ চালুক্য প্রথম বিক্রমাদিত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হন। শেষ পর্যন্ত তিনি তুঙ্গভদ্রা নদীকে উভয় শক্তির স্বীকৃত সীমারেখায় পরিণত করেন। এর ফলে তুঙ্গভদ্রা নদীর উত্তরে পল্লব শক্তির রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়।
  • (৪) প্রথম বিক্রমাদিত্য এর পর তুঙ্গভদ্রা পার হয়ে পল্লব রাজধানী কাঞ্চী আক্রমণ করেন। পল্লব প্রথম পরমেশ্বর বর্মন কাঞ্চী থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। চালুক্য প্রথম বিক্রমাদিত্যের মিত্র গঙ্গরাজ ভূবিক্রম পল্লবদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে বিশেষ পরাক্রম দেখান।
  • (৫) প্রথম বিক্রমাদিত্য চোল, পান্ড্য ও কেরলদেরও তাঁর বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন। চোল রাজধানী উগ্রপুর বা ত্রিচিনোপল্লী তিনি অধিকার করেন। প্রথম পরমেশ্বর বর্মন শেষ পর্যন্ত আত্মরক্ষার জন্য মরীয়া হয়ে প্রতিরোধ আরম্ভ করেন। তিনি পেরুবলা নাল্লুরের যুদ্ধে প্রথম বিক্রমাদিত্যকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করলে চালুক্যরা তুঙ্গভদ্রা পার হয়ে নিজ রাজ্যে ফিরে যায়।

বাতাপির চালুক্য সম্রাট বিনয়াদিত্য

বিক্রমাদিত্যের পর, বিনয়াদিত্য দক্ষিণে পল্লব, চোল প্রভৃতির সঙ্গে নিয়মিত যুদ্ধ চালান। বিনয়াদিত্য মগধ -এর মহাসেন গুপ্তকে পরাস্ত করেন বলে দাবী করা হয়। তবে ঐতিহাসিকেরা এই বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।

চালুক্য সম্রাট বিজয়াদিত্য

এর পর বিজয়াদিত্য (৬৯৬-৭৩৩ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনে বসেন। তিনি কাঞ্চী আক্রমণ করে পল্লব রাজা দ্বিতীয় পরমেশ্বর বর্মনকে কর প্রদানে বাধ্য করেন। তিনি বিজাপুরের বিখ্যাত শিবমন্দির তৈরি করেন। তিনি পরধর্মসহিষ্ণু ছিলেন এবং তার রাজ্যের জৈনদের প্রতি তিনি সহনশীলতা দেখান।

চালুক্য সম্রাট দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য

  • (১) দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য (৭৩৩-৭৪৫ খ্রি) পিতার সিংহাসনে বসে পল্লব নন্দীবর্মনকে আক্রমণ করেন। তিনি পল্লব রাজাকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন। তিনি কাঞ্চী অধিকার করলেও, দেব মন্দির ও সাধারণ অধিবাসীর গৃহ সম্পত্তির কোনো ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকেন।
  • (২) কাঞ্চীর রাজ সিংহেশ্বর মন্দিরে তিনি প্রভূত সোনা দান করেন। তিনি চোল, পান্ড‌্য, কেরলদের পরাস্ত করে সাগর তীরে বিজয় স্তম্ভ প্রোথিত করেন। তাকেই বাতাপির শেষ শ্রেষ্ঠ চালুক্য রাজা বলা চলে।

চালুক্য সাম্রাজ্যে আরব আক্রমণ

দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্যের আমলে সিন্ধু থেকে গুজরাট অঞ্চলে আরব আক্রমণ আরম্ভ হয়। গুজরাট ছিল দ্বিতীয় পুলকেশীর আমল থেকে চালুক্য অধিকারে। গুজরাটের শাসনকর্তার সাহায্য নিয়ে দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য আরবদের শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন।

চালুক্য সাম্রাজ্যে ভাঙ্গন

দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর পর (৭৪৫ খ্রি) চালুক্য শক্তির ভাঙন আরম্ভ হয়। দ্বিতীয় কীর্তিবর্মন এই ভাঙন রোধে ব্যর্থ হন। নিরন্তর পল্লব যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকায় কীর্তিবর্মন ও তাঁর বংশধরেরা নিজ রাজ্যে সুশাসন স্থাপন করতে ব্যর্থ হন।

উপসংহার :- চালুক্যদের দুর্বলতার সুযোগে চালুক্য সামন্ত রাষ্ট্রকূট দন্তিদুর্গ চালুক্য রাজ্যের একাংশ অধিকার করেন। রাষ্ট্রকূট প্রথম কৃষ্ণ চালুক্য শক্তিকে ধ্বংস করে রাষ্ট্রকূট শক্তি স্থাপন করেন।

(FAQ) চালুক্য বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বাতাপির চালুক্য বংশের প্রথম প্রধান শাসক কে ছিলেন?

জয়সিংহ।

২. চালুক্য রাজশক্তির স্থপতি কাকে বলা হয়?

প্রথম পুলকেশী।

৩. চালুক্য বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

দ্বিতীয় পুলকেশী।

৪. বাতাপির শেষ শ্রেষ্ঠ চালুক্য রাজা কে ছিলেন?

দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য।

Leave a Comment