বাঁকুড়া

শহর ও জেলা বাঁকুড়া প্রসঙ্গে সীমা, মল্ল রাজত্ব, বাঁকুড়া জেলা প্রতিষ্ঠা, নামকরণ, ইতিহাস, বিষ্ণুপুর রাজ্য, মদনমোহনের পূজা, মারাঠা আক্রমণ, দামোদর নদ, ভৌগোলিক অবস্থা, জলবায়ু, বনভূমি, মহকুমা ও ব্লক, জনসংখ্যা, ভাষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, যোগাযোগ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জানবো।

বাঁকুড়া

স্থান বাঁকুড়া
দেশ ভারত
রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ
আইকন ঘোড়া
বিখ্যাত স্থান বিষ্ণুপুর
বাঁকুড়া

ভূমিকা :- ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মেদিনীপুর বিভাগের অন্তর্গত পাঁচটি জেলার অন্যতম একটি জেলা হল বাঁকুড়া।

সীমা

বাঁকুড়া জেলার উত্তরে ও পূর্বে পূর্ব বর্ধমান এবং পশ্চিম বর্ধমান, দক্ষিণে পশ্চিম মেদিনীপুর, দক্ষিণ-পূর্বে হুগলি এবং পশ্চিমে পুরুলিয়া জেলা।

মল্ল রাজত্ব

বাঁকুড়া জেলা ও এর আশেপাশের অঞ্চলগুলি ছিল মধ্যযুগীয় পশ্চিমবঙ্গের মল্ল রাজত্বের কেন্দ্রভূমি। মধ্যযুগের শেষভাগে এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীতে বৈষ্ণবধর্ম মল্লভূমের রাজধর্মের মর্যাদা অর্জন করে। এরপর এই ধর্মই এই অঞ্চলের সংস্কৃতির দিক-নির্ণায়ক হয়ে ওঠে।

বাঁকুড়া জেলা প্রতিষ্ঠা

১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মল্লভূম রাজ্য অধিকার করে নেয়। এরপর ১৮৮১ সালে আধুনিক বাঁকুড়া জেলাটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

নামকরণ

  • (১) ‘বাঁকুড়া’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ আছে। কোল-মুণ্ডাদের ভাষায় ওড়া বা ড়া শব্দের অর্থ বসতি। বাঁকু শব্দের অর্থ এবড়ো খেবড়ো। ‘বাঁকুড়া’ নামটি ‘বাঁকা’ শব্দ থেকেও উৎপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
  • (২) জেলার সবচেয়ে প্রভাবশালী লৌকিক দেবতাদের একজন হলেন ধর্মঠাকুর। তাকে স্থানীয়রা ‘বাঁকুড়া রায়’ নামে ডাকেন। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, জেলা সদর বাঁকুড়া শহরের নামকরণ হয়েছে এই শহরের প্রতিষ্ঠাতা তথা স্থানীয় গোষ্ঠীপতি নেতা বাঁকু রায়ের নামানুসারে।
  • (৩) অন্য একটি কিংবদন্তি অনুসারে, বিষ্ণুপুরের রাজা বীর হাম্বিরের ২২ পুত্রের অন্যতম বীর বাঁকুড়ার নামে এই শহরের নামকরণ করা হয়েছে। বীর হাম্বির তার রাজ্যকে ২২টি তরফে ভাগ করে দেন। প্রতিটি তরফ তার এক এক পুত্রের অধীনে আসে।
  • (৪) জয়বেলিয়া তরফটি বীর বাঁকুড়ার ভাগে পড়ে। তিনিই বাঁকুড়া শহরটি গড়ে তোলেন। অন্য একটি মতে, বাঁকুড়া নামটি বানকুন্ডা নামের অপভ্রংশ। ‘বানকুন্ডা’ শব্দের অর্থ পাঁচটি দিঘি। পুরনো সরকারি নথিপত্রে ইংরেজি Bacoonda নামটিও পাওয়া যায়

ইতিহাস

  • (১) খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে দ্বারকেশ্বর নদের উত্তর তীরে তাম্র-প্রস্তর যুগে জনবসতি গড়ে উঠেছিল। বাঁকুড়া জেলার আদি বাসিন্দা ছিল একাধিক প্রোটো-অস্ট্রালয়েড ও প্রোটো-দ্রাবিড়ীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ। পরবর্তী প্রাগৈতিহাসিক যুগে আর্য জাতি এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যায়।
  • (২) প্রাচীন যুগে বাঁকুড়া জেলা ছিল রাঢ় অঞ্চলের অধীনস্থ। ঐতরেয় আরণ্যকে এই অঞ্চলের অধিবাসীদের অসুর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন জৈন ধর্মগ্রন্থ আচারাঙ্গ সূত্রে বলা হয়েছে, সূহ্ম ও লাড়া (রাঢ়) রাজ্যে সুসভ্য ও অসভ্য দুই প্রকার মানুষই বাস করে।
  • (৩) সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষায় লেখা শুশুনিয়া শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে পুষ্করণার (আধুনিক পোখান্না) রাজা ছিলেন সিংহবর্মণের পুত্র চন্দ্রবর্মণ। এলাহাবাদ লেখ থেকে জানা যায়, সমুদ্রগুপ্ত চন্দ্রবর্মণকে পরাজিত করে তার রাজ্যকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
  • (৪) বঙ্গে বৌদ্ধ ও জৈনধর্ম বিস্তারের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তবে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যেই যে আর্যদের ধর্ম ও সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গে প্রাধান্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল, তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

বিষ্ণুপুর রাজ্য

  • (১) খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকে ব্রিটিশ শাসনের সূচনাকাল পর্যন্ত বাঁকুড়া জেলার প্রায় এক হাজার বছরের ইতিহাসের সঙ্গে বিষ্ণুপুরের হিন্দু রাজাদের শাসনকাল ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। বিষ্ণুপুর ও তৎসংলগ্ন এলাকা সেই সময় মল্লভূম নামে পরিচিত ছিল।
  • (২) মল্লভূম রাজ্যের বিস্তার ছিল পশ্চিমে সাঁওতাল পরগনার দামিন-ই-কোহ, দক্ষিণে পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্বে ও উত্তরে বর্ধমান জেলা পর্যন্ত। আদিবাসী রাজ্য ধলভূম, টুংভূম, সামন্তভূম, বরাহভূম বা বরাভূম ধীরে ধীরে বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজবংশের অধীনস্থ হয়ে পড়ে।

মদনমোহনের পূজা

মল্ল রাজবংশের ৪৯তম শাসক বীর হাম্বির ১৫৮৬ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি পাঠানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুঘলদের সাহায্য করেছিলেন। মুসলমান ঐতিহাসিকদের রচনায় তার উল্লেখ পাওয়া যায়। শ্রীনিবাস আচার্য তাকে বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত করে বিষ্ণুপুরে মদনমোহনের পূজা প্রচলন করেন

মারাঠা আক্রমণ

  • (১) সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে বিষ্ণুপুর একটি সমৃদ্ধ রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। এই সমৃদ্ধির যুগ চলেছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত। এরপর মারাঠা বর্গিরা বিষ্ণুপুর আক্রমণ করে। ১৭৪২ সালে ভাস্কর রাওয়ের নেতৃত্বে বর্গিরা বিষ্ণুপুর আক্রমণ করে।
  • (২) রাজা গোপাল সিংহের নেতৃত্বে বিষ্ণুপুরের সেনাবাহিনী মারাঠাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই যুদ্ধ সম্পর্কে বিষ্ণুপুরের একটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি হল, রাজ্যবাসীর প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে রাজবাড়ির কুলদেবতা মদনমোহন নিজে দলমাদল কামান দেগে মারাঠাদের বিতাড়িত করেছিলেন।
  • (৩) সম্ভবত, মারাঠারা বিষ্ণুপুরের মূল দুর্গে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান। তবে দুর্গে প্রবেশ করতে না পারলেও মারাঠারা রাজ্যের অরক্ষিত অংশে লুটতরাজ চালিয়েছিল।

বিষ্ণুপুর রাজ্যের নিলাম

এরপর বিষ্ণুপুর রাজ পরিবার একাধিক মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ১৮০৬ সালে রাজস্ব বাকি থাকার দায়ে বিষ্ণুপুর রাজ্য নিলাম হয়ে যায় এবং বর্ধমানের জমিদারেরা এই রাজ্য কিনে নেন।

বাঁকুড়া জেলা গঠন

  • (১) জেলার বর্তমান ভূখণ্ডটি ১৭৬০ সালে মিরকাশিমের আদেশে বর্ধমান ও মেদিনীপুর জেলার সঙ্গে আংশিকভাবে এবং ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের পর বীরভূম জেলার সঙ্গে আংশিকভাবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক্তিয়ারভুক্ত হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পর্যন্ত এই অবস্থা বজায় থাকে।
  • (২) ১৮০৫ সালে বাঁকুড়া ভূখণ্ড জঙ্গলমহল জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর ১৮৩৪ সালে বিষ্ণুপুর অঞ্চলটি যুক্ত হয় বর্ধমান জেলার সঙ্গে এবং অবশিষ্ট জঙ্গলমহলের নাম পাল্টে রাখা হয় দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি। এরপর ১৮৪৭ সালে মানভূম জেলার ছাতনা থানা পশ্চিম বর্ধমানের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৪৮ সালে আউসগ্রাম, ইন্দাস ও পোখনা থানা যুক্ত হয় পূর্ব বর্ধমান জেলায়।
  • (৩) ১৮৭২ সালে কোতুলপুর, সোনামুখী ও ইন্দাস বর্ধমান জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৮৭৯ সালে এই অঞ্চলটি পুনরায় যুক্ত হয় পশ্চিম বর্ধমান জেলার সঙ্গে। ১৮৮১ সালে পশ্চিম বর্ধমান জেলার নামকরণ করা হয় বাঁকুড়া জেলা।

দামোদর নদ

দামোদর নদ বাঁকুড়া ও বর্ধমান জেলাদুটিকে পৃথক করেছে। বাঁকুড়া জেলাকে “পূর্বের বঙ্গীয় সমভূমি ও পশ্চিমের ছোটোনাগপুর মালভূমির মধ্যকার সংযোগসূত্র” বলে বর্ণনা করা হয়।

ভৌগোলিক অবস্থা

  • (১) এই জেলার ভূমিভাগ স্তূপময় বন্ধুর। শুশুনিয়া ও বিহারীনাথ এই অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য পাহাড়। তার পূর্বে শিলাস্তূপ, নিম্নশৈলশিরা ও উপত্যকাযুক্ত মধ্যভাগের অসমতল ভূমিভাগ।
  • (২) বাঁকুড়া জেলার পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভাগের জমি নিচু ও উর্বর পলিমাটিযুক্ত। পশ্চিম ভাগের জমি ধীরে ধীরে উঁচু হয়েছে। এই অঞ্চলে স্থানে স্থানে ছোটোখাটো টিলা দেখতে পাওয়া যায়।  দামোদর, দ্বারকেশ্বর, কংসাবতী ও শিলাই এই জেলার প্রধান নদনদী।
  • (৩) বাঁকুড়া জেলার অধিকাংশ ল্যাটেরাইট ও পলি মৃত্তিকা দ্বারা গঠিত। তবে পশ্চিমাংশ সিস্টোস ও নিসস শিলা দিয়ে ও দক্ষিণাংশ পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত।

জলবায়ু

বাঁকুড়া জেলার আবহাওয়া উষ্ণ ও শুষ্ক, কিন্তু স্বাস্থ্যকর। গ্রীষ্মকালীন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৪-৪৫ ডিগ্ৰি সেন্টিগ্রেড ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্ৰি সেন্টিগ্রেড। শীতকালীন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৩ ডিগ্ৰি সেন্টিগ্রেড ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ ডিগ্ৰি সেন্টিগ্রেড। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৪০০ মিলিমিটার।

বনভূমি

বাঁকুড়া জেলায় বনভূমির পরিমাণ ২৪৭.৭০ হাজার হেক্টর। মূলত শুষ্ক ক্রান্তীয় পর্ণমোচী অরণ্য বা শালবন বেশি দেখা যায়। এছাড়া পিয়াশাল, সেগুন, বহেড়া, পলাশ, কুসুম, মহুয়া, পিপুয়া, বাবলা, আম, কাঁঠাল, প্রভৃতি গাছও দেখা যায়।

মহকুমা

বাঁকুড়া জেলায় তিনটি মহকুমা। – বাঁকুড়া সদর, খাতড়া ও বিষ্ণুপুর।

ব্লক

বাঁকুড়া জেলা মোট ২২টি সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকে বিভক্ত। যথা –

  • (১) ইন্দপুর সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (২) ইন্দাস সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (৩) ওন্দা সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (৪) কোতুলপুর সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (৫) খাতড়া সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (৬) গঙ্গাজলঘাটি সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (৭) ছাতনা সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (৮) জয়পুর সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (৯) তালডাংরা সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (১০) পাত্রসায়ের সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (১১) বড়জোড়া সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (১২) বাঁকুড়া ১ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (১৩) বাঁকুড়া ২ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (১৪) বিষ্ণুপুর সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (১৫) মেজিয়া সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (১৬) রাইপুর সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (১৭) রাণীবাঁধ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (১৮) শালতোড়া সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (১৯) সারেঙ্গা সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (২০) সিমলাপাল সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (২১) সোনামুখী সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক,
  • (২২) হিড়বাঁধ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক।

বাঁকুড়া জেলার পুরসভা

বাঁকুড়ায় মোট তিনটি পুরসভা আছে। এগুলি হল –

  • (১) বাঁকুড়া পৌরসভা,
  • (২) বিষ্ণুপুর পৌরসভা ও
  • (৩) সোনামুখি পৌরসভা

জনসংখ্যা

বাঁকুড়া জেলার মোট জনসংখ্যা ৪০ লক্ষের কাছাকাছি। এই জেলার গ্রামীণ জনসংখ্যা ৯১.৭০% ও পৌর জনসংখ্যা ৮.৩০%। বাঁকুড়া জেলার ৭০.৯৬% মানুষ সাক্ষর।

ভাষা

বাঁকুড়া জেলার প্রধান ভাষা বাংলা। মোট জনসংখ্যার ৯০.৬৭% মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। এছাড়া কুরমালী (০.৮২%), সাঁওতালি (৭.৯৬%) ও হিন্দী (০.৩৫%) ভাষাতেও অনেক মানুষ কথা বলে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

বাঁকুড়া জেলায় সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ১৫ টি। এছাড়া ৮৭টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ৫০৮টি ক্লিনিক, ৪২টি ডিসপেনসারি র্আছে। বাঁকুড়া পুরসভায় ৩টি, বিষ্ণুপুর ও সোনামুখী পুরসভায় ১টি করে হাসপাতাল বর্তমান। বাঁকুড়া জেলায় চব্বিশটি সমষ্টি প্রাণী স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চব্বিশটি অতিরিক্ত সমষ্টি প্রাণী স্বাস্থ্য কেন্দ্র ছাড়াও তিনটি রাজ্য প্রাণী স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে।

অর্থনীতি

  • (১) বাঁকুড়া জেলার অর্থনীতি মূল ভিত্তি কৃষিকাজ। জেলায় শতকরা ৮২ জন কৃষিজীবী। এই জেলার প্রধান উৎপন্ন ফসলগুলি হল ধান, গম, ডাল, তৈলবীজ, পাট, আলু, শুকনো লঙ্কা ও আদা। এছাড়া রেশমকীটের খাদ্য তুঁতগাছের চাষও হয়।
  • (২) বাঁকুড়ায় বৃহদায়তন শিল্প গড়ে না উঠলেও ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে এই অঞ্চল ঐতিহ্যবাহী। রেশম, সুতি ও তসরের বয়ন এখানকার প্রধান শিল্প। লাল ‘ধূপছায়া’ শাড়ি, রেশম ও সুতি মিশ্রিত ‘খুটনি’ কাপড়, ‘ফুলম’ শাড়ি ও বিশেষত বিষ্ণুপুরের ‘বালুচরি’ শাড়ি জগদ্বিখ্যাত।
  • (৩) বাঁকুড়া সদর মহকুমার শুশুনিয়ায় পাথর কেটে দেবদেবীর মূর্তি ও থালাবাসন তৈরির শিল্প বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া পিতলের ডোকরা শিল্প আজ দেশ-বিদেশে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বাঁকুড়ার সাংস্কৃতিক আইকন হল ঘোড়া। হাতি, ঘোড়া ও মনসার ঝাঁপি তৈরির জন্য খাতড়া মহকুমার তালডাংরা ব্লকের পাঁচমুড়া বিখ্যাত। চামড়ার জুতো তৈরিতেও জেলার ঐতিহ্য রয়েছে।
  • (৪) বাঁকুড়া একটি খনিজ সমৃদ্ধ জেলা। শালতোড়া, মেজিয়া, বড়জোড়া ও গঙ্গাজলঘাটি অঞ্চলের কয়লা, থানাপাহাড়, চেরাডংরি অঞ্চলের টাংস্টেন, রানিবাঁধের ঝিলিমিলি অঞ্চলের অভ্র ও রাইপুর অঞ্চলের চিনামাটি এই জেলার উল্লেখযোগ্য খনিজ সম্পদ।

যোগাযোগ

  • (১) বাঁকুড়া জেলা রেলপথে রাজধানী কলকাতা ও অন্যান্য জেলার সঙ্গে যুক্ত। দক্ষিণ-পূর্ব রেলপথের লাইন এই জেলাকে পুরুলিয়া-আদ্রা ও খড়গপুরের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। ন্যারোগেজ রেলপথে বর্ধমান জেলার সঙ্গে বাঁকুড়ার যোগাযোগ রক্ষিত হচ্ছে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশনগুলি হল বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, ওন্দা, সোনামুখী ও পাত্রসায়ের।
  • (২) সড়কব্যবস্থা বাঁকুড়ার সদর থেকে প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রসারিত। জেলার পথে মোটর সাইকেল, স্কুটার, ট্যাক্সি, ভাড়ার গাড়ি, ট্রাক্টর ও ট্রলারের সংখ্যা অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়েছে অন্যান্য গাড়ির সংখ্যাও। তবে বাঁকুড়া জেলায় বিমান পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
  • (৩) বাঁকুড়া জেলার দ্বারকেশ্বর, কংসাবতী, দামোদর, শিলাই, ভৈরববাঁকী প্রভৃতি নদনদীতে প্রায় ৩২টি ফেরি সার্ভিস চালু আছে। এর মধ্যে শালতোড়া, মেজিয়া, কোতুলপুর, ওন্দা ও সোনামুখিতে ৪টি করে, ইন্দাস, সারেঙ্গা, বিষ্ণুপুর ও পাত্রসায়েরে ২টি করে এবং রানিবাঁধ ও জয়পুরে একটি করে ফেরি সার্ভিস চালু আছে।

বিশিষ্ট ব্যক্তি

বাঁকুড়া জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও শিক্ষিকা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশিষ্ট ব্রিটিশ অ্যাথলেট গডফ্রে ব্রাউন (বাঁকুড়া শহরে জন্ম), বিশিষ্ট ভারতীয় ভাস্কর ও চিত্রকর রামকিঙ্কর বেইজ, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী হেমন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিশিষ্ট তন্ত্র লেখক অটলবিহারী ঘোষ। বাঁকুড়ায় জন্ম, বিশিষ্ট সাধক ও নিম্বার্ক সম্প্রদায়ভুক্ত মঠের প্রধান ধনঞ্জয় দাস কাঠিয়াবাবা, বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী ও রাজবন্দী ননীবালা গুহ, বিশিষ্ট বৈষ্ণবধর্মসাধক হরনাথ ঠাকুর।

দর্শনীয় স্থান

বাঁকুড়া জেলার কয়েকটি দর্শনীয় স্থান হল মুকুটমণিপুর, কংসাবতী বাঁধ, পরেশনাথ শিব মন্দির, ঝিলিমিলি, তালবেরিয়া বাঁধ, ঝিলিমিলি-বারো মাইল জঙ্গল, বিষ্ণুপুর রাসমঞ্চ, মৃন্ময়ী মন্দির, জোড়বাংলা মন্দির,শ্যাম রায় মন্দির, মদনমোহন মন্দির, জয়রামবাটির শ্ৰী শ্ৰী মাতৃ মন্দির, আমোদার ঘাট এবং মায়ের ঘাট, শুশুনিয়া, নরসিংহ মন্দির, শুশুনিয়া লিপি, বিহারিনাথ পাহাড়, বিহারিনাথ মন্দির।

উপসংহার :- রাঙামাটির শহর “বাঁকুড়ার” অতুলনীয় সৌন্দর্য সমস্ত ভারতবর্ষের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই শহরের মনমুগ্ধকর রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে শ্যামল সবুজ জঙ্গল ও পাহাড়, লম্বা ইতিহাস, হস্তশিল্পের আঁতুড়ঘর, আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য, ও টেরাকোটার গল্পগুচ্ছ।

(FAQ) বাঁকুড়া জেলা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বাঁকুড়া জেলার আইকন কি?

ঘোড়া।

২. বাঁকুড়া জেলার কোন স্থান মল্লভূম নামে পরিচিত ছিল?

বিষ্ণুপুর।

৩. বাঁকুড়া জেলার কোথায় দলমাদল কামান আছে?

বিষ্ণুপুর।

৪. শুশুনিয়া ও বিহারিনাথ পাহাড় কোথায় অবস্থিত?

বাঁকুড়া জেলা।

Leave a Reply

Translate »