ছাতনা

ছাতনা গ্ৰামটি প্রসঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থান, মধ্যযুগীয় গীতিকার কবির বাড়ি, ঐতিহাসিক দিক, সদর দপ্তর, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বাসুলি দেবীর মন্দির, পঞ্চরত্ন মন্দির ও বাসুলি দেবীর মূর্তি সম্পর্কে জানবো।

ছাতনা গ্রাম

স্থানছাতনা
জেলাবাঁকুড়া
রাজ্যপশ্চিমবঙ্গ
দেশভারত
ছাতনা গ্রাম

ভূমিকা :- পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাঁকুড়া জেলায় অবস্থিত একটি গ্রাম ও থানা হল ছাতনা। বাঁকুড়া সদর মহকুমার ছাতনা সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকে এই গ্রামটি অবস্থিত।

ছাতনার ভৌগোলিক অবস্থান

২৩°১৮′০৬.৩″ উত্তর অক্ষাংশ এবং  ৮৬°৫৮′৫৭.৮″ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে ছাতনা গ্ৰামটি অবস্থিত।

মধ্যযুগীয় গীতিকার কবির বাড়ি ছাতনা

  • (১) ঐতিহাসিক বিনয় ঘোষের মতে তিনটি স্থানকে বাংলার মধ্যযুগীয় গীতিকার কবির বাড়ি বলে দাবি করা হয়েছে বাঁকুড়া জেলার ছাতনা, বীরভূম জেলার নানুর এবং বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম।
  • (২) এই প্রসঙ্গ ঐতিহাসিক দৃশ্যপটকে মেঘলা করে পরস্পরবিরোধী দাবির সাথে বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে। চণ্ডীদাসের নামের সঙ্গে যুক্ত তিন ব্যক্তি আবির্ভূত হয় এবং তাদের আলাদাভাবে ‘বড়ু’, ‘দ্বিজ’ এবং ‘দীন’ উপসর্গ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।

ছাতনার ঐতিহাসিক দিক

  • (১) চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে ছাতনা ছিল সামন্তভূম নামে একটি রাজ্যের রাজধানী। সামন্তভূমের সামন্ত শাসক পরিবার শঙ্খ রায় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে দুই ভাই চণ্ডীদাস ও দেবীদাস বাইরে থেকে এসে শঙ্খ রায়ের নাতি হামির উত্তর রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ছাতনায় বসতি স্থাপন করেন।
  • (২) দেবীদাস বাসুলি দেবীর মন্দিরে পুরোহিত নিযুক্ত হন এবং চণ্ডীদাস ছিলেন কবি। ১৯১৬ সালে বেলিয়াতোড়ের বসন্ত রঞ্জন রায় বিদ্বদবল্লভ চণ্ডীদাসের একটি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি খুঁজে পান। তিনি এটি সম্পাদনা করেন এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন শিরোনামে প্রকাশ করেন।
  • (৩) ছাতনা এবং এর আশেপাশে বাসুলি দেবীর ব্যাপক পূজা হয়, যা বীরভূম-বর্ধমান এলাকায় দেখা যায় না। বীরভূমে পূজিত দেবতা ছিলেন বিশালক্ষ্মী দেবী। তবে বাসুলি নামটি বিশালক্ষ্মী থেকে এসেছে বলে মনে হয়।
  • (৪) হামির উত্তর রায় ১৩৫৩ থেকে ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচনার তারিখ থেকে বোঝা যায় যে চণ্ডীদাস হামির উত্তর রায়ের শাসনামলে বসবাস করতেন। এর দ্বারা সাধারণত গৃহীত হয় যে বড়ু চণ্ডীদাস ছাতনার অন্তর্গত ছিলেন।

সদর দফতর ছাতনা

ছাতনা সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকের সদর দফতর হল ছাতনা। এই ব্লকটি ছাতনা থানার এক্তিয়ারভুক্ত। থানার আয়তন ৪৪১ বর্গ কিমি।

ছাতনার শিক্ষা ব্যবস্থা

২০০৭ সালে ছাতনা চণ্ডীদাস মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হয় ঘোড়ামূলীতে। বর্তমানে বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত এই কলেজে বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব বিষয়ে সাম্মানিক ও কলা বিভাগের পড়াশোনা হয়। ছাতনা কলেজ অফ এগ্রিকালচার চালু হয় ২০১৫ সালে। এই প্রতিষ্ঠানটি বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সম্প্রসারিত শিক্ষাপ্রাঙ্গন।

ছাতনার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ছাতনার কেন্দ্রীয় চিকিৎসাকেন্দ্র হল ছাতনা ব্লক জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র। এখানকার শালচূড়া, জোড়হিরা, ঝাঁটিপাহাড়ি ও ভগবানপুরে চারটি জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া ৩৬টি শাখাকেন্দ্রও রয়েছে।

ছাতনার যোগাযোগ ব্যবস্থা

পুরুলিয়া জেলার সাঁওতালডিহি থেকে নদিয়া জেলার মাঝডিয়া পর্যন্ত প্রসারিত ৮ নং রাজ্য সড়কটি ছাতনার উপর দিয়ে গিয়েছে।

ছাতনায় অবস্থিত বাসলি দেবীর মন্দির

  • (১) শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাসের পূজিত বাসুলি দেবীর মন্দির ছাতনায় অবস্থিত। বর্তমানে ভিত্তিবেদী ও ইতস্তত ছড়ানো প্রাচীন ইমারতের নানান ধ্বংসাবশেষ ছাড়া মূল মন্দিরটির আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
  • (২) বেদীর গায়ে খোদিত ‘১৪৭৫ শক’ কথাটি থেকে অনুমান করা হয় যে মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাকাল ছিল ১৪৭৫ শকাব্দ বা ১৫৫৩ খ্রিষ্টাব্দ। ভিত্তিবেদীর পাথরের চৌকাঠগুলির গায়ে পদ্মের বড়ো বড়ো নকশা থেকে অনুমান করা হয় মন্দিরে অনুরূপ অলংকরণের আরও ব্যবহার হয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ছাতনায় অবস্থিত পঞ্চরত্ন মন্দির

  • (১) ছাতনার দক্ষিণে রাজগড় এলাকায় ইঁটের তৈরি একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এবং তার পাশে ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আরেকটি পঞ্চরত্ন মন্দির রয়েছে।
  • (২) জনশ্রুতি অনুযায়ী বড়ু চণ্ডীদাস পূজিত বাসুলি দেবীর মূর্তিটি তার ভিটের আদি মন্দির থেকে প্রথমে বর্তমানে ভেঙে পড়া মন্দিরটিতে এনে রাখা হয়েছিল। পরে এই মন্দিরটি ভেঙে পড়লে সেটিকে পাশের পঞ্চরত্ন মন্দিরটিতে স্থানান্তরিত করা হয়।

ছাতনায় অবস্থিত বাসুলি দেবীর মূর্তি

বর্তমানে প্রাপ্ত বাসুলির মূর্তিটিই চণ্ডীদাস পূজিত মূর্তি কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে কালো পাথরের পাটার উপর ‘বা-রিলিফ’ শৈলীতে খোদিত ভাস্কর্যটি বর্তমানে সামান্য ক্ষয় পেলেও, এটি যে কোনও শাক্ত দেবীর মূর্তি তা স্পষ্ট বোঝা যায়। এই মন্দিরে টেরাকোটার কিছু মূর্তিসজ্জাও দেখা যায়। তবে তা যথেষ্ট উন্নতমানের নয়।

উপসংহার :- বাঁকুড়া শহর থেকে ১৩ কিমি দূরে বাঁকুড়া-পুরুলিয়া রোডের উপর অবস্থিত ছাতনাই। ছাতনার নিকটেই অবস্থান করছে শুশুনিয়া গ্রামে শুশুনিয়া পাহাড়।

(FAQ) ছাতনা গ্ৰাম সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বাঁকুড়া শহর থেকে ছাতনার দূরত্ব কত?

১৩ কিমি।

২. ছাতনার নিকটে কোন পাহাড় অবস্থিত?

শুশুনিয়া পাহাড়।

৩. ছাতনার বিখ্যাত দেবী কে?

বাসুলি দেবী।

৪. কোন কবির বাসস্থান ছিল ছাতনা?

কবি চণ্ডীদাস।

Leave a Comment