মিরকাশিম

বাংলার নবাব মিরকাশিম -এর সিংহাসনে আরোহণ, কোম্পানির প্রাপ্য পরিশোধ, চুক্তির শর্ত পূরণ, আর্থিক অবস্থার উন্নতি, লুন্ঠনের রাজস্ব ব্যবস্থা, জন শোরের অভিমত, গোলাম হোসেনের অভিমত, মিরকাশিমের শক্তি সঞ্চয়, বিনাশুল্কে বাণিজ্য নিয়ে বিবাদ, সংঘর্ষের সূচনা, যুদ্ধের কারণ সম্পর্কে নানা মতবাদ, বক্সারের যুদ্ধ, মিরকাশিমের মৃত্যু, বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্বগুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

মিরকাশিম

রাজত্বকাল১৭৬০-১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দ
পূর্বসূরিমিরজাফর
উত্তরসূরিমিরজাফর
বক্সারের যুদ্ধ২২ শে অক্টোবর, ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দ
মিরকাশিম

ভূমিকা :- ইংরেজ কোম্পানিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে গোপন চুক্তির মাধ্যমে সিংহাসনেবসলেও মিরকাশিম ছিলেন স্বাধীনচেতা পুরুষ, সুদক্ষ শাসক ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। সিংহাসনারোহণের পূর্বে তিনি রংপুর ও পূর্ণিয়ার ‘নায়েব-দেওয়ান’ ছিলেন এবং দক্ষতার সঙ্গেই তিনি সেই দায়িত্ব পালনকরেছিলেন।

কোম্পানির প্রাপ্য পরিশোধ

সিংহাসনে বসে প্রথমেই তিনি কোম্পানির সকল প্রাপ্য মিটিয়ে দেন।কারণ, তিনি মনে করেছিলেন যে, কোম্পানিকে তাদের প্রাপ্য মিটিয়ে দিলে তারা শাসনকার্যে অহেতুক হস্তক্ষেপ করবে না।

চুক্তির শর্ত পূরণ

পূর্বের চুক্তি অনুসারে তিনি কোম্পানিকে (১) বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রামের জমিদারি, (২) নগদ ১০ লক্ষ টাকা, (৩) শ্রীহট্টে চুনের একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার এবং (৪) নিজস্ব মুদ্রা প্রচলনের অধিকার দেন। এছাড়া, (৫) কলকাতা কাউন্সিলের সদস্যদেরও ২৯ লক্ষটাকা দেওয়া হয়।

আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন

মিরকাশিম স্পষ্টই উপলব্ধি করেন যে, মিরজাফরের পতনের প্রধান কারণ হল তাঁর আর্থিক দুর্বলতা। এই কারণে নিজ রাজ্যের আর্থিক অবস্থা সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে তিনি নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং রাজস্ব ব্যবস্থা ঢেলে সাজান। যেমন –

  • (১) তিনি ভূমিরাজস্ব ১২ আনা বৃদ্ধি করেন এবং জমিদারদের ওপর কয়েকটি বাড়তি কর বা ‘আবওয়াব’ আরোপ করেন। এই বাড়তি রাজস্ব-সহ জমিদারদের নিয়মিত রাজস্ব প্রদানে বাধ্য করা হয়।
  • (২) তিনিদুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীদের বরখাস্ত করেন বা তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন। মিরজাফরের দুর্বল শাসনকালে যে সব সরকারি কর্মচারী রাজস্বের অর্থ আত্মসাৎ করেছিল, তাদের সেই অর্থ পরিশোধে বাধ্য করা হয়।
  • (৩) তিনি সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধ করেন। নবাবি দরবারের ব্যয় সংকোচ করা হয়। তিনি নানা অজুহাতে আলিবর্দি ও মিরজাফরের পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে তাদের সর্বস্বান্ত করেন।
  • (৪) জগৎ শেঠের পরিবারের কাছ থেকে তিনি বলপূর্বক ঋণ গ্রহণ করেন এবং এই ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে তাঁর কোনও দায়িত্ব ছিল না। তিনি মেদিনীপুর, বীরভূম ও বিহারের উদ্ধত ও স্বাধীনতাকামী জমিদারদের কঠোর হস্তে দমন করেন।
  • (৫) বিহারের ‘নায়েব-দেওয়ান ইংরেজদের প্রিয়পাত্র উদ্ধত প্রকৃতির রামনারায়ণকে তিনি হত্যা করেন। এইভাবে অতি অল্পদিনের মধ্যে তিনি দেশে সুশাসন প্রবর্তন করেন এবং শক্ত ভিত্তির ওপর বাংলারঅর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

লুণ্ঠনের রাজস্ব ব্যবস্থা

আলিবর্দি খাঁ-র আমলে বাংলার ভূমিরাজস্ব থেকে আদায় হত মোট ১ কোটি ৮৬ লক্ষ ৮৪ হাজার ৬৭ টাকা। মিরকাশিমের আমলে মেদিনীপুর, চট্টগ্রাম ও বর্ধমানের রাজস্ব হস্তচ্যুত হওয়া সত্ত্বেও তিনি আলিবর্দির আমল অপেক্ষা ৩০ লক্ষ টাকা বেশি ভূমিরাজস্ব আদায় করতেন। অনেকের মতে তাঁর রাজস্ব ব্যবস্থা ছিল লুণ্ঠনের নামান্তর।

জন শোরের অভিমত

স্যার জন শোর বলেন যে, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, মিরকাশিম মাত্রাতিরিক্ত হারে রাজস্ব আদায় করতেন এবং তা ছিল লুণ্ঠনের নামান্তর।” ডঃ নন্দলাল চ্যাটার্জী-র মতে, “তার রাজস্ব ব্যবস্থা সংগঠিত লুণ্ঠন ছাড়া অন্য কিছু ছিল না।”

গোলাম হোসেনের অভিমত

ইংরেজ গভর্নর ভ্যান্সিটার্ট তাঁর শাসনব্যবস্থার প্রশংসা করেছেন। সমকালীন ঐতিহাসিক গোলাম হোসেন বলেন যে, অর্থনৈতিক ব্যাপারে তিনি ছিলেন “সত্যই এক তুলনাহীন ব্যক্তিত্ব এবং সে যুগের সর্বাপেক্ষা বিস্ময়কর শাসক।”

মিরকাশিমের শক্তিসঞ্চয়

স্বাধীনচেতা নবাব মিরকাশিম ইংরেজদের হাতের পুতুল হয়ে থাকতে রাজি ছিলেন। না। তিনি তার শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেমন –

(১) আইন সম্মত নবাবের স্বীকৃতি

তিনি বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা রাজস্ব প্রদানের অঙ্গীকার করে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে নবাবি ‘ফরমান’ আনেন এবং এর দ্বারা তিনি দিল্লির বাদশাহের অধীনে আইনসম্মত নবাবে পরিণত হন।

(২) কর্মচারীদের বিতাড়ন

ইংরেজদের প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মচারীদের বিতাড়িত করেতিনি নিজ শাসনকে সুদৃঢ় করেন।

(৩) রাজধানী স্থানান্তর

  • (ক) মুর্শিদাবাদ কলকাতার খুব কাছে হওয়ায় দৈনন্দিন শাসনকার্য পরিচালনায় সেখানে কোম্পানির হস্তক্ষেপ অতি সহজ ছিল। তাই ইংরেজদের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করার উদ্দেশ্যে তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে বিহারের মুঙ্গেরে তাঁর রাজধানী স্থানান্তরিত করেন।
  • (খ) বলা হয় যে, নবাব তাঁর নিজের নৌবাহিনীর দুর্বলতা এবং ইংরেজ নৌবাহিনীর দক্ষতা সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। তিনি স্পষ্টই উপলব্ধি করেন যে, নদী-তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করে দুর্বল নৌবাহিনী নিয়ে শক্তিশালী ইংরেজদের সঙ্গে পারা যাবে না।
  • (গ) এই কারণে তিনি নদী বা সমুদ্র থেকে দূরে মুঙ্গেরে নিজ রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। অধ্যাপক পি. জে. মার্শাল বলেন যে, পূর্ব ভারতে স্বাধীন নবাবি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েই তিনি রাজধানী স্থানান্তরিত করেছিলেন।

(৪) সেনাবাহিনী পুনর্গঠন

  • (ক) তিনি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর গুরুত্ব বুঝতেন।তাই তিনি সেনাবাহিনী পুনর্গঠনের কাজে হাত দেন। মোগল রণকৌশলের পরিবর্তে তিনি ইউরোপীয় রণকৌশল গ্রহণ করেন।
  • (খ) উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের দুর্ধর্ষ তাতার, আফগান ও পারসিক এবং কিছু আর্মেনীয়কে সেনাদলে গ্রহণ করা হয়। অশ্বারোহী বাহিনী পরিচালনায় মোগল সেনাপতিরা থাকলেও পদাতিক ও গোলন্দাজ বাহিনীর দায়িত্ব ইওরোপীয় সেনাপতির ওপর অর্পিত হয়।
  • (গ) কলকাতার আর্মেনীয় বণিক খোজা পিদ্রুর ভাই গ্রেগরী (গুরগিণ খাঁ নামে সমধিক পরিচিত) তাঁর প্রধান সেনাপতি ও গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। ফরাসি সমরু (প্রকৃত নামওয়াল্টার রাইন হাউন্ড) এবং আর্মেনীয় মার্কার, জেন্টিল প্রমুখ তাঁর অন্যান্য সেনাপতি নিযুক্ত হন।
  • (ঘ) মুঙ্গেরের পুরোনো দুর্গগুলির সংস্কার করা হয়। মুঙ্গেরে তিনি একটি কামান বন্দুক ও গোলা-বারুদের কারখানা স্থাপন করেন। বলা বাহুল্য, ইংরেজদের পক্ষে মিরকাশিমের এই সকল কার্যকলাপ সহ্য করা সম্ভব ছিল না।

বিনাশুল্কে বাণিজ্য নিয়ে বিবাদ

  • (১) ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট ফারুখশিয়র প্রদত্ত ‘ফরমান’ অনুযায়ী কোম্পানি বাংলাদেশে বিনাশুল্কে বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে। এই অধিকার কোম্পানিকেই দেওয়া হয়—কোম্পানির কোনও কর্মচারীর ব্যক্তিগত বাণিজ্যের জন্য নয়।
  • (২) কিন্তু কোম্পানির কর্মচারী এবং তাদের অনুগৃহীত ভারতীয় বণিকেরানিজেদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের জন্যও ‘দত্তক’ বা এই ছাড়পত্রের অপব্যবহার করত। এর ফলে একদিকে নবাব যেমন তাঁর বৈধ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতেন, তেমনি অপর দিকে ভারতীয় বণিকেরা এই অসম প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হত।
  • (৩) কোম্পানির কর্মচারীরা নবাবের কর্মচারী ও জমিদারদের কাছ থেকে নানাভাবে উৎকোচ এবং নজরানা আদায় করতে শুরু করে। নবাবের একচেটিয়া বাণিজ্য, যথা— লবণ, সোরা প্রভৃতিতে তারা অংশ নিতে থাকে এবং গ্রামে-গঞ্জে ঢুকে পড়ে তারা সুপারি, চাল, ঘি, মাছ, চিনি, বাঁশ প্রভৃতি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ব্যবসা শুরু করে।
  • (৪) তারা দেশীয় কারিগর ও বণিকদের ভয় দেখিয়ে ইংরেজদের কাছে সস্তায় মাল বিক্রি করতে বাধ্য করত এবং ইংরেজদের পণ্যাদি চার-পাঁচ গুণ বেশি দামে ক্রয় করতে বাধ্য করত। ইংরেজ ঐতিহাসিক পার্সিভ্যাল স্পিয়ার এই যুগকে ‘প্রকাশ্য ও নির্লজ্জ লুণ্ঠনের যুগ’ (‘the period of open and unashamed plunder’) বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সংঘর্ষের সূচনা

  • (১) এই সব কারণে বাংলার অবস্থা জটিলতর রূপ ধারণ করে। দেশীয় বণিকরা শুল্ক না দেবার জন্য নানা ছল-চাতুরির পথ ধরে, বহু ক্ষেত্রে চাষি ও উৎপাদকরা চাষ-বাস ও উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।
  • (২) বহু স্থানে দেশীয় উৎপাদক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চাষিরা কোম্পানির কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এর ফলে আইন-শৃঙ্খলার চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। এ ব্যাপারে মিরকাশিম বারংবার ভ্যান্সিটার্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রতিকার প্রার্থনা করেন।
  • (৩) ভ্যান্সিটার্ট এই ব্যাপারে নবাবের পক্ষেই ছিলেন এবং তিনি চেয়েছিলেন যে কোম্পানির কর্মচারীরা ৯% শুল্ক দিক—তাহলে তাদের অবৈধ বাণিজ্য বৈধতা পাবে, কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীদের অনমনীয় মনোভাবের ফলে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
  • (৪) শেষ পর্যন্ত ক্ষুব্ধ নবাব দেশীয় বণিকদের ওপর থেকেও এই বাণিজ্য শুল্ক তুলে দেন। বলা বাহুল্য, এই ব্যবস্থা ইংরেজ বণিকদের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল।
  • (৫) নবাবের এই নির্দেশে পাটনা কুঠির অধ্যক্ষ এলিস সাহেব উত্তেজিত হয়ে পাটনা শহর দখল করেন। নবাব পাটনা পুনর্দখল করে ইংরেজ কুঠি ধ্বংস করেন।এর ফলে ইংরেজদের সঙ্গে নবাবের প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হয় (১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দ)।

যুদ্ধের কারণ সম্পর্কে  নানা মতবাদ

  • (১) ভেরেলেস্ট (Verelest)-এর মতে, দস্তকের অপব্যবহার বা অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য নয়— মিরকাশিমের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাই এই সংঘর্ষের জন্য দায়ী।
  • (২) এই বক্তব্যের ওপরনির্ভর করে ইংরেজ ঐতিহাসিক ডডওয়েল (Dodwell) বলেন যে, মিরকাশিমের সঙ্গে ইংরেজদের বিরোধ কোম্পানির ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘটনাচক্রে সংঘটিত হয়।
  • (৩) তিনি বলেন যে, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের প্রশ্ন যুদ্ধের প্রকৃত কারণ নয়, যুদ্ধের একটি চমৎকার অজুহাত’ (‘an admirable pretext’)। মিরকাশিমের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ইংরেজদের প্রাধান্য-মুক্ত হওয়া।
  • (৪) কেম্ব্রিজ ঐতিহাসিক পি. জে. মার্শাল (P. J. Marshall) বলেন যে, মিরকাশিম বাংলাদেশে ইংরেজদের শক্তিবৃদ্ধি সুনজরে দেখেন নি। তাঁর লক্ষ্য ছিল পূর্ব ভারতে একটি স্বাধীন নবাবি গড়ে তোলা। সুতরাং অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সমস্যা দেখা না দিলেও তিনি অন্য কোনও অজুহাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতেন।
  • (৫) ডঃ নন্দলাল চট্টোপাধ্যায়-এর মতে কোম্পানির সঙ্গে নবাবের বিরোধ ছিল রাজনৈতিক। পলাশীর যুদ্ধ, দস্তকের অপব্যবহার, মিরজাফরের পদচ্যুতি প্রভৃতির মাধ্যমে কোম্পানি বাংলার সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করে। মিরকাশিম তাদের হাতের পুতুল না হয়ে স্বাধীন নবাবের মতো আচরণ করতে থাকলে কোম্পানি তাকে বিতাড়িত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
  • (৬) ডঃ বিনয় চৌধুরী-র মতে, নবাবের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণ থেকে নিজেকে মুক্ত করার অভিপ্রায় নয়— অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য সংক্রান্ত বিরোধই হল কোম্পানি ও মিরকাশিমের মধ্যে বিরোধের মূল কারণ।
  • (৭) তাঁর মতে, নবাবের সার্বভৌমত্বের দাবি থেকে ব্যক্তিগত অন্তর্দেশীয় বাণিজ্যের বিরাট প্রশ্নটিকে বিচ্ছিন্ন করা অনৈতিহাসিক। ডঃ কালীকিঙ্কর দত্ত-এর মতে বিরোধের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক। মিরকাশিমের শাসননীতি ইংরেজদের অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরোধী হওয়ায় কোম্পানি তাঁকে অপসারিত করতে মনস্থ করে।
  • (৮) পরবর্তীকালে কোম্পানি স্বীকার করে যে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যই হল বিবাদের মূল কারণ। ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে ক্লাইভ কোম্পানির পরিচালক সভাকে জানান যে, বাংলায় সাম্প্রতিক কালের সকল রক্তপাত, গণহত্যা ও ঝামেলার মূলেই হল ব্যক্তিগত বাণিজ্য।
  • (৯) ডঃ বিপান চন্দ্র বলেন, আসলে ঘটনাটা দাঁড়িয়েছিল এই যে, বাংলার তখন দু’জন মালিক—কোম্পানি ও নবাব। এই কথা সকলেরই জানা যে, এক দেশে এক সঙ্গে দু’জন রাজার কর্তৃত্ব চলতে পারে না। একদিকে মিরকাশিম নিজেকে একজন স্বাধীন নৃপতি হিসেবে ভাবছিলেন এবং অন্যদিকে ইংরেজরা তাঁকে তাদের আজ্ঞাবহ পুতুলরূপে কেবল রাজত্ব করতে দিতে চাইছিল, কারণ তারাই তাঁকে ঐ পদে বসিয়েছিল।

কাটোয়া, গিরিয়া, উদয়নালার যুদ্ধ

অতঃপর ইংরেজ সেনাপতি মেজর অ্যাডামস্ মিরকাশিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। কাটোয়া, গিরিয়া ও উদয়নালার যুদ্ধে পর পর পরাজিত হয়ে মিরকাশিম অযোধ্যায় পলায়ন করেন।

বক্সারের যুদ্ধ

অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা ও দিল্লির বাদশাহ শাহ আলমের সঙ্গে মিলিত হয়ে সম্মিলিতভাবে মিরকাশিম ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২২শে অক্টোবর বক্সারের যুদ্ধে এই সম্মিলিত বাহিনী ইংরেজ সেনাপতি মেজর হেক্টর মনরো-র হাতে পরাজিত হয়।

মিরকাশিমের মৃত্যু

বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের ফলেইংরেজ আধিপত্য এলাহাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং মিরকাশিমের সকল আশা নির্মূল হয়। মিরকাশিমের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় প্রকৃত স্বাধীন নবাবিরঅবসান ঘটে। পলাতক অবস্থায় ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।

বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব

বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন –

  • (১) পলাশির যুদ্ধের ফলে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের যে ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, বক্সারের যুদ্ধে তা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনে পলাশির যুদ্ধ অপেক্ষা বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব অনেক বেশি।
  • (২) পলাশিতে কূটনীতি ও বিশ্বাসঘাতকতা এক অনভিজ্ঞ নবাবের ওপর জয়যুক্ত হয়—এই জয় ছিল আকস্মিক ও অনায়াসলব্ধ। তাই এর স্থায়িত্ব সম্পর্কেও যথেষ্ট সন্দেহ ছিল, কিন্তু বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত হন দিল্লির বাদশা-সহ দু’জন ভারতীয় নৃপতি। তাই এই যুদ্ধ হল চূড়ান্ত ফল নির্ণয়কারী যুদ্ধ।
  • (৩) ম্যালেসন (Malleson) বলেন যে, “ভারতে বিভিন্ন যুদ্ধবিগ্রহগুলির মধ্যে বক্সারের যুদ্ধ হল একটি চূড়ান্ত ফল-নির্ণয়কারী যুদ্ধ।”ঐতিহাসিক স্মিথ (Smith)-এর মতে, “পলাশি ছিল কয়েকটি কামানের লড়াই, বক্সার ছিল চূড়ান্ত বিজয়। ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্র-র মতে, “ভারতের ইতিহাসে বক্সারের এই যুদ্ধটি ছিল সর্বাধিক যুগান্তকারী ও তাৎপর্যময়।”
  • (৪) এই যুদ্ধের ফলে ভারতীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা ও ইংরেজদের সামরিক বলের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। এই যুদ্ধের দ্বারা বাংলায় ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নবাব সম্পূর্ণভাবে কোম্পানির হাতের পুতুলে পরিণত হন।
  • (৫) মিরকাশিমের সঙ্গে বিবাদ শুরু হলে কোম্পানি এক চুক্তির মাধ্যমে ইতিমধ্যেই দ্বিতীয়বারের জন্য মিরজাফরকে বাংলার সিংহাসনে বসায় (১৭৬৩ খ্রিঃ)।
  • (৬) স্থির হয় যে, নবাবের দরবারে একজন স্থায়ী ইংরেজ প্রতিনিধি থাকবেন, নবাবের সৈন্যসংখ্যা সীমাবদ্ধ করা হয় এবং লবণের ওপর আড়াই শতাংশ ব্যতীত অন্যান্য সকল পণ্যের ক্ষেত্রে বিনাশুল্কে বাণিজ্যের অধিকার স্বীকৃত হয়।
  • (৭) এছাড়া, তিনি নানা কারণে কোম্পানি ও তার কর্মচারীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ দিতেসন্মত হন। বক্সারের যুদ্ধের অব্যবহিত পরে মিরজাফরের মৃত্যুর (৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৭৬৫ খ্রিঃ) পর তাঁর নাবালক পুত্র নজমউদ্দৌলাকে সিংহাসনে বসানো হয়।
  • (৮) ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের ২০শে ফেব্রুয়ারি এক চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানি নবাবের সামরিক ও প্রশাসনিক সকল ক্ষমতা হস্তগত করে এবং তিনি কোম্পানির বৃত্তিভোগী পুতুলে পরিণত হন।
  • (৯) এই ঘটনার কয়েক বছরের মধ্যেই কলকাতা সুপ্রিম কোর্ট -এর জনৈক বিচারপতি বাংলার নবাবকে এই ছায়া, এই খড়ের পুতুল’ (‘this phantom, this man of straw’) বলে অভিহিত করেন।
  • (১০) ঐতিহাসিক রামসে ম্যুর (Ramsay Muir) বলেন যে, “বক্সার বাংলার ওপর কোম্পানির শাসনের শৃঙ্খল চূড়ান্তভাবে স্থাপন করে।”
  • (১১) বক্সারের যুদ্ধে কেবল মিরকাশিম-ই নয়—অযোধ্যার নবাব সুজাউদৌলা ও দিল্লিশ্বর শাহ আলম পরাজিত হন। এর ফলে এক রকম বাংলা থেকে দিল্লি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা কোম্পানির হস্তগত হয়। অযোধ্যার নবাব কোম্পানির অনুগত মিত্রে পরিণত হন এবং ‘নামসর্বস্ব’ মোগল বাদশা কোম্পানির বৃত্তিভোগী হন।
  • (১২) এইভাবে সমগ্র উত্তর ভারতেকোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রথম সোপান রচিত হয়। স্যার আলফ্রেড লায়াল (Alfred Lyall) বলেন যে, “এই যুদ্ধের ফলে ইংরেজ শক্তি উত্তর ভারতে অনুপ্রবেশ করে।”
  • (১৩) বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে বাংলার বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর কোম্পানিরএকচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলার বুকে শুরু হয় কোম্পানির কর্মচারীদের অবাধ ও নির্লজ্জ শোষণ ও লুণ্ঠন। অপরাপর ইওরোপীয় বণিকরা বাংলা থেকে বহিষ্কৃত হয় এবং দেশীয়বণিকদের দুর্দশা চরমে পৌঁছায়।

উপসংহার :- বক্সারের যুদ্ধের ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোগল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে। এতদিন পর্যন্ত বাংলায় কোম্পানির আধিপত্য স্থাপন, সার্বভৌমত্ব বা রাজস্ব আদায়ের কোনও বৈধতা ছিল না। দেওয়ানি অর্জনের মাধ্যমে বাংলায় কোম্পানির আধিপত্যআইনগত বৈধতা লাভ করে।

(FAQ) মিরকাশিম সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মিরকাশিম মুর্শিদাবাদ থেকে রাজধানী কোথায় স্থানান্তরিত করেন?

বিহারের মুঙ্গেরে।

২. বক্সারের যুদ্ধের আগে মিরকাশিম কোন কোন যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজিত হন?

কাটোয়া, গিরিয়া ও উদয়নালার যুদ্ধে।

৩. বক্সারের যুদ্ধ কখন হয়?

২২ অক্টোবর ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে।

৪. বক্সারের যুদ্ধের সময় বাংলার নবাব কে ছিলেন?

মিরজাফর।

Leave a Reply

Translate »