শবরী

প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী শবরী প্রসঙ্গে শবরীর পরিচিতি, শবরীর শিক্ষা লাভ, রামচন্দ্র আগমনের অপেক্ষায় শবরী, শবরীর আশ্রমে রামচন্দ্রের আগমনের শুভ মুহূর্ত, শবরীর আশ্রমে রাম লক্ষ্মণের আগমন, রাম ও লক্ষ্মণের আতিথেয়তায় শবরীর উদ্যোগ, শবরীর কাছে রামচন্দ্রে প্রশ্ন, বিদুষী শবরী কর্তৃক রামের প্রশ্নের উত্তর প্রদান, শবরীর কাছে রামচন্দ্রের মহাত্মাদের সাক্ষাৎ প্রার্থনা, রামচন্দ্রের নিকট শবরীর আশ্রম বর্ণনা, রামচন্দ্র কর্তৃক শবরীকে অভিলষিত প্রদেশে গমনের নির্দেশ, শবরীর স্বর্গে গমন, শবরীর প্রীতি ও ভক্তি সম্পর্কে জানবো।

প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী শবরী

ঐতিহাসিক চরিত্রশবরী
অন্য নামসিদ্ধা শবরী
পরিচিতিঅন্ত্যজ শ্রেণির তাপসী
বসবাসমতঙ্গ ঋষির আশ্রম
স্বর্গলাভের কারণরামচন্দ্রের দর্শন
প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী শবরী

ভূমিকা :- শবরী সিদ্ধাশবরী নামে পরিচিতা ছিলেন। তিনি ছিলেন মানবের কল্যাণদায়িনী স্নেহময়ী মূর্তি। পুরুষ তাপসদের ন্যায় তিনি বল্কল পরিধান করতেন। কটিদেশ মুক্তনির্মিত কটিবন্ধে আবদ্ধ থাকত। কঠোর তপস্যা করবার ফলে তাঁর শরীর জীর্ণ ও শীর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

শবরীর পরিচিতি

মতঙ্গ ঋষির আশ্রমে শবরী বাস করতেন। শবরীর যে পরিচয় আমরা রামায়ণ হতে পাই তাতে জানতে পারি যে, শবরী নীচজাতীয়া ছিলেন। তিনি প্রাচীন ভারতের কোনও অনার্যজাতিসম্ভূতা ছিলেন, যেমন ছিলেন গুহকচণ্ডাল প্রভৃতি।

শবরীর শিক্ষা লাভ

এই শবরী সেই যুগের মহাতপা মহর্ষিগণের নিকট অনার্য বলে উপেক্ষিতা হন নি, বরং তাঁকে তাঁরা শিক্ষা দিয়েছিলেন। ঋষিদের শিক্ষাদানগুণেই শবরী বেদমন্ত্রোচ্চারণ পূর্বক হোম করতে পারতেন, ব্রাহ্মণগণের সাথে দর্শনশাস্ত্র সম্বন্ধে আলোচনা করতেন, যোগাভ্যাসে নিরতা ছিলেন। অন্ত্যজজাতি হয়েও তিনি শিক্ষাদীক্ষা দ্বারা আপনাকে গৌরবান্বিতা করেছিলেন। শবরী মতঙ্গ ঋষির আশ্রমে তপশ্চর্যা করে সিদ্ধা শবরী নামে অভিহিতা হয়েছিলেন।

রামচন্দ্র আগমনের অপেক্ষায় শবরী

  • (১) মতঙ্গ ঋষি যখন দেহত্যাগ করেন তখন তিনি শবরীকে বলে গিয়েছিলেন রামচন্দ্র একদিন তোমার এই সুপুণ্য আশ্রমে আগমন করবেন। সেদিন থেকে শবরী তাঁর গুরু, তাঁর শিক্ষক, মতঙ্গ ঋষির বাক্যটিকে চিরন্তন সত্যরূপে গ্রহণ করে আশাপথ চেয়ে রইলেন।
  • (২) রাম কখন আসবেন শববী তা জানেন না। তার দিন, তারিখ, সময়, ক্ষণ, কিছুই নির্দিষ্ট নেই। তবে তিনি আসবেন রামচন্দ্র একদিন এক শুভমুহূর্তে আসবেন। সে কবে কোন শুভ বসন্তের প্রীতিজাগরণে, কোকিলকূজনের মধ্য দিয়ে আসবেন, কবে কোন সন্ধ্যায় যেদিন সরোবরে নীলপদ্ম ফুটে থাকবে, মল্লিকা যুথিকার মধুর সৌরভে চারিদিক সুরভিত হবে সে দিন কবে কে জানে ?
  • (৩) তাই তিনি যৌবনের প্রীতি, আনন্দ ও উৎসাহের সাথে তাঁর প্রাঙ্গণতল পরিচ্ছন্ন রাখতেন। চন্দন লেপে গৃহদ্বার সুরভিত করতেন। মৃগচর্মখানি সুগন্ধি ফুলে সাজিয়ে রাখতেন। কিন্তু সে কোথায়! সে কোথায় !
  • (৪) যৌবনের প্রদীপ্ত তেজ, দেহের শক্তি ও মনের বল ধীরে ধীরে চলে গেল। প্রৌঢ়বয়সও উত্তীর্ণ হয়ে গেল। বাৰ্দ্ধক্য উপস্থিত হল। শবরীর দেহ অশক্ত হয়ে উঠল। তবু তিনি আশার মোহে আচ্ছন্ন, তাঁর প্রাণাবাম রামচন্দ্র যে আসবেনই, কারণ মতঙ্গ ঋষি বলে গেছেন। সাধুবাক্য কি কখনও মিথ্যা হতে পারে?

শবরীর আশ্রমে রামচন্দ্রের আগমনের শুভ মুহূর্ত

  • (১) শ্রীরামচন্দ্রের পুণ্য ত্যাগবার্তা তখন দেশে দেশে সুপ্রচারিত। যিনি পতিতা পাষাণী অহল্যাকেও উদ্ধার করেছিলেন, যাঁর স্পর্শে জটায়ুপক্ষীর স্বর্গলাভ হয়েছিল, সেই রামচন্দ্র তাঁর আশ্রমকুটীরে আসবেন। এ কি কম সৌভাগ্যের কথা? তারপর এক শুভদিনে শুভমুহূর্তে শ্রীরামচন্দ্র শবরীর তপোবনে এলেন।
  • (২) এতদিন যৌবনে, প্রৌঢ়ত্বে ও বার্দ্ধক্যে যার প্রতীক্ষা করেছেন, সেই রামচন্দ্র আজ বিরহিণী শবরীর পুণ্য-আশ্রম পদার্পণ করে তা পুণ্যতর করলেন, তখন শবরী আনন্দে পরিপ্লুত হলেন। প্রিয় আকাঙ্ক্ষিত অতিথিকে সম্বোধন করে  বললেন, আজ আমার তপস্যা সিদ্ধ হয়েছে, কারণ আজ যে, প্রভু, আমি তোমাকে দেখতে পেয়েছি।
  • (৩) আজ আমার জন্ম সফল, আমার গুরুপূজা সার্থক হয়েছে। হে প্রাণারাম রামচন্দ্র, আজ তোমার চক্ষু আমার উপর পতিত হয়েছে। হে শত্রুজয়ী, আজ আমি তোমার প্রসাদে অক্ষয় স্বর্গলাভ করেছি।

শবরীর আশ্রমে রাম লক্ষ্মণের আগমন

সীতাহারা রামচন্দ্র যখন বিরহব্যাকুল হৃদয়ে লক্ষ্মণের সাথে ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ করছিলেন তখন পম্পা সরোবরের পশ্চিম তীর দিয়ে ভ্রমণ করতে করতে অবশেষে একদিন শবরীর মনোরম আশ্রমে এসে উপস্থিত হলেন। শবরীর আশ্রমটি ছিল অতি রমণীয়। তরুলতাসমাকীর্ণ। আশ্রমটি দেখতে পেয়ে তাঁরা দুজনে মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়েছিলেন।

রাম ও লক্ষ্মণের আতিথেয়তায় শবরীর উদ্যোগ

শবরীর চরিত্রও ছিল অতি নির্মল ও পবিত্র। অতিথিসেবাকে তিনি শ্রেষ্ঠধর্ম বলিয়া মনে করিতেন। রাম ও লক্ষ্মণ যখন তাঁর আশ্রমে এসে উপনীত হলেন তখন তপঃসিদ্ধ শবরী রাম ও লক্ষ্মণকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বদ্ধাঞ্জলি হয়ে তাদেরকে প্রণাম করে খাদ্য ও আচমনীয় প্রভৃতি অতিথিদের সমস্ত দ্রব্য প্রদান করলেন।

শবরীর কাছে রামচন্দ্রে প্রশ্ন

শ্রীরামচন্দ্র শবরীকে দেখে ও তার আতিথেয়তায় অত্যন্ত প্রীতিলাভ করে শবরীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে তপোধনে! তুমি সকল বিঘ্ন নিবারণ করেছ ত? তোমার তপস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ত? তুমি শোক ও আহার সংযম করেছ ত ? বিহিত নিয়মসকল তোমার দ্বারা নিয়মিত ভাবে অনুষ্ঠিত হয় ত? তোমার চিত্ত নিয়ত প্রসন্ন থাকে ত? হে চারুভাষিণি ! তোমার গুরু শুশ্রূষা ফলবতী হয়েছে ত?”

বিদুষী শবরী কর্তৃক রামের প্রশ্নের উত্তর প্রদান

  • (১) শবরী রামের এই প্রশ্ন শুনে বললেন “হে নরশ্রেষ্ঠ রাম! অদ্য যখন আপনি আমার দর্শনপথের পথিক হলেন এবং আমার সেবা গ্রহণ করলেন, তখন অবশ্যই আমার তপস্যা সিদ্ধ হয়েছে। হে প্রাণাভিরাম রাম! অদ্য আমার জন্ম, গুরুসেবা ও তপস্যাচরণ সফল হল। অদ্যই আমি স্বর্গলাভের অধিকারিণী হলাম।
  • (২) আপনার শুভদৃষ্টি, আপনার স্নেহ ও প্রীতির দ্বারা অভিষিক্ত হয়েছি, এক্ষণে নিশ্চয়ই আমি অক্ষয় স্বর্গ লাভ করব। আপনি যখন চিত্রকূট পর্বতে বাস করছিলেন তখন আমি যাদের সেবা করতাম, তাঁরা সকলেই স্বর্গে গমন করেছেন।
  • (৩) স্বর্গে যাবার সময় সেই ধর্মজ্ঞ মহর্ষিরা আমাকে বলেছিলেন ‘রাম, লক্ষ্মণের সাথে তোমার এই পুণ্য আশ্রমে আগমন করবেন; তুমি সেই দুই প্রিয় অতিথিকে সমাদর সহকারে পূজা করো। তুমি রামকে দর্শন করে অক্ষয় উৎকৃষ্ট লোকসমূদয় লাভ করবে।’ “হে প্রভু আমার! আমি আপনার জন্য পম্পাতীরজাত বিবিধ সুখাদ্য বন্যদ্রব্য সঞ্চয় করে রেখেছি।”

শবরীর কাছে রামচন্দ্রের মহাত্মাদের সাক্ষাৎ প্রার্থনা

শ্রীরামচন্দ্র আনন্দিত হয়ে বললেন, “আমি সেই মহাত্মাদের ও তোমার প্রভাব শ্রবণ করেছি, আমি সেই সকল প্রত্যক্ষ করতে বাসনা করি। যদি তোমার অভিমত হয় প্রদর্শন কর।”

রামচন্দ্রের নিকট শবরীর আশ্রম বর্ণনা

  • (১) শবরী রামের কথা শ্রবণ করে তাদের দুইজনকে সেই বৃহৎ বন পরিদর্শন করতে বললেন, হে রঘুনন্দন রাম! এই বিখ্যাত বন দর্শন করুন। এই বন ‘মাতঙ্গ বন’ নামে পরিচিত। এই বনে আমার গুরুরা বেদমন্ত্র পাঠ করতেন। এই স্থানে যজ্ঞ করবার জন্য বেদমন্ত্রানুসারে হবন করতেন। এই বেদীর নাম প্রত্যস্থলী। আমার গুরুদের এই বেদী তাদের তপস্যা প্রভাবে আজও প্রভাবিত।
  • (২) একবার তারা উপবাসে কাতর হয়েছিলেন, শ্রম করবার ক্ষমতা ছিল না; তখন তাঁরা চিন্তা করা মাত্র ঐ স্থানে সপ্তসাগর এসে মিলিত হয়েছিল। এই যে তরুশ্রেণী, স্নান শেষে তাপসেরা এদের শাখার উপর বল্কল শুকোতে দিতেন। তারা দেবগণের উদ্দেশ্যে নীলপদ্ম, অন্যান্য পুষ্প ও যে যে দ্রব্য দান করতেন এখনও সেগুলি মলিন হয় নি। যা যা আপনাদেরকে বলবার সেই সমুদয় কথাই বললাম।
  • (৩) এবার আমাকে শরীর পরিত্যাগ করিবার অনুমতি প্রদান করুন। আমি এতদিনে যাদের পরিচারিকা রূপে ছিলাম, এই আশ্রমে যারা বাস করতেন, আমি সেই বিশুদ্ধচিত্ত ঋষিদের নিকট যেতে বাসনা করছি।

রামচন্দ্র কর্তৃক শবরীকে অভিলষিত প্রদেশে গমনের নির্দেশ

বনবাসী রাম ভক্তিপরায়ণা শবরীর মুখে এ সমুদয় কথা শ্রবণ করে অনুপম আনন্দ লাভ করলেন। পরে বললেন “আমি যা দেখলাম, তাতে অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত ও আনন্দিত হয়েছি। হে ভদ্ৰে! আমি তোমার সেবায় সম্যকরূপে তৃপ্তিলাভ করেছি, আমি তোমাকর্তৃক সম্যকরূপে অর্চিত হয়েছি ; তুমি তোমার অভিলষিত প্রদেশে গমন করতে পার।”

শবরীর স্বর্গে গমন

চীর ও কৃষ্ণাজিনপরিহিতা জটাধারিণী শবরী রাম কর্তৃক শরীর মোচনের অনুজ্ঞা লাভ করে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিমধ্যে নিজের দেহ হবন করে অনুলেপন ও মাল্যধারিণী, দিব্যবস্ত্রপরিহিতা, দিব্যাভরণবিভূষিতা, প্রজ্জ্বলিত অনলের ন্যায় দীপ্তিসমন্বিতা ও প্রিয়দর্শনা হলেন এবং বিদ্যুতের ন্যায় সেই প্রদেশ উদ্ভাসিত করে স্বর্গে গমন করলেন।

ঋষিতাপসদের নিকট শবরীর জ্ঞান লাভ

শবরী তাঁর গুরু ঋষিতাপসদের নিকট হতে বেদ-উপনিষদাদি সম্বন্ধে দিব্য জ্ঞান লাভ করেছিলেন।

শবরীর প্রীতি ও ভক্তি

শ্রীরামচন্দ্রের সেবার জন্য তাহার দীর্ঘকালের প্রতীক্ষা অপূর্ব প্রীতি ও ভক্তির নিদর্শন স্বরূপ বিদ্যমান রয়েছে।

উপসংহার :- শববীর এই প্রতীক্ষার করুণ কাহিনী আমাদের চিত্তকে আনন্দরসে অভিষিক্ত করে। তার রামচন্দ্রের দর্শনপিপাসার এই ইতিহাসটুকু বিরহিণী চিত্তের চিরন্তন যৌবনশ্রীকে সঞ্জীবিত করে ত্যাগের মহিমায় সার্থক করে দিয়েছে।

(FAQ) প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী শবরী সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. শবরী কে ছিলেন?

প্রাচীন ভারতের অন্ত্যজ শ্রেণির একজন অন্যতম তাপসী ছিলেন শবরী।

২. শবরী কার আশ্রমে বাস করতেন?

মতঙ্গ ঋষির।

৩. তপশ্চর্যা করে শবরী কি নামে পরিচিত হন?

সিদ্ধা শবরী।

৪. কার দর্শনে শবরী স্বর্গে গমন করেন?

শ্রীরামচন্দ্র।

অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি

Leave a Comment