রাইপুর

রাইপুর স্থানটি প্রসঙ্গে ভৌগলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, থানা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, ঐতিহাসিক দিক, নাম বিতর্ক, অধিষ্ঠাত্রী দেবী, প্রবীণ মানুষদের উক্তি, বর্তমানে রাজবংশ ও বিডিওর মন্তব্য সম্পর্কে জানবো।

রাইপুর

শহররাইপুর
পূর্ব নামগড় রাইপুর
জেলাবাঁকুড়া
রাজ্যপশ্চিমবঙ্গ
দেশভারত
রাইপুর

ভূমিকা :- পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার একটি শহর ও থানা হল রাইপুর। খাতড়া মহকুমার রাইপুর সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকে এই শহরটি অবস্থিত।

রাইপুরের ভৌগোলিক অবস্থান

রাইপুর শহরটি ২২°৪৮′  উত্তর অক্ষাংশ ও ৮৬°৫৭′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত।

রাইপুরের জনসংখ্যা

বর্তমানে রাইপুর শহরের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। এখানে সাক্ষরতার হার ৮৩.৬৭ শতাংশ। দাপ্তরিক ভাষা বাংলা, ইংরেজ ও সাঁওতালি।

রাইপুরের থানা

২৫২ বর্গকিমির বেশি ক্ষেত্রবিশিষ্ট রাইপুর সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক এই রাইপুর থানার অন্তর্গত।

রাইপুরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

রাইপুর শহর তথা রাইপুর সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকের কেন্দ্রীয় হাসপাতাল হল রাইপুর গ্রামীণ হাসপাতাল। তাছাড়া এই ব্লকের ডুমুরতোড়, ফুলকুসমা ও মটগোদায় তিনটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৩৩টি শাখাকেন্দ্র আছে।

রাইপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা

পুরুলিয়া জেলার ঝাড়গ্রাম থেকে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার দীঘা পর্যন্ত বিস্তৃত ৪ নং রাজ্য সড়ক এবং পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর থেকে ঝাড়গ্রাম জেলার নয়াগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ৯ নং রাজ্য সড়কের ওপর রাইপুর বাজার শহরটি অবস্থিত।

রাইপুরের ঐতিহাসিক দিক

  • (১) চারপাশে জঙ্গল, দুপাশ দিয়ে ঘিরে রেখেছে তিনটি নদী – কংসাবতী, ভৈরববাঁকি ও তারাফেনি। শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে এমনই জায়গায় কয়েকটি গড় তৈরি করেছিলেন রাজারা। ইতিহাসের বহু স্মৃতি নিয়ে এখনও জেগে রয়েছে ওই জনপদ রাইপুর।
  • (২) সময়ের আঘাতে অতীতের সেইসব গড় এখন আর টিকে নেই। রাজা মহারাজারাও নেই, নেই কারও জমিদারি। ‘গড়রাইপুর’-এর নাম থেকে ‘গড়’ শব্দ খসে গিয়ে এখন রয়েছে শুধু ‘রাইপুর’।
  • (৩) ৫০০ বছর আগে কাঁসাই নদীর তীরে এই এলাকার নাম ছিল শিখরভূম ও তুঙ্গভূম। কথিত আছে যে, দক্ষিণ বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলে একসময় শিখর ও তুঙ্গ পদবিধারী দু’টি রাজ পরিবার রাজত্ব করেছেন।
  • (৪) তথ্য অনুযায়ী, মোঘল আমলে রাজপুতানা থেকে চৌহান বংশ -এর এক রাজপুত ভাগ্যান্বেষী গড় রাইপুরে এসেছিলেন। তিনি ‘শিখররাজা’ উপাধি নিয়ে এখানে বসতি স্থাপন করেন। সম্ভবত এই বংশের শেষ রাজা ছিলেন মিরণশাহ।
  • (৫) তিনি বিষ্ণুপুর -এর কুরমান শাহের মতোই সশস্ত্র বাহিনীর ফকির নায়ক ছিলেন। প্রজাদের নিকট তিনি ছিলেন একজন সন্ত। তাঁর আমলেই এই অঞ্চলে মারাঠা আক্রমণ হয়। মারাঠীদের সঙ্গে যুদ্ধে শিখর রাজা মিরণশাহ প্রাণ হারান।
  • (৬) শিখরগড় নামে একটি প্রাচীন দুর্গ এই জনপদের মধ্যেই ছিল। সেই দুর্গের পাশেই ছিল এক গভীর দিঘি, রাজপ্রাসাদ ও মন্দির। ওই দিঘির পূর্বপাড়ে ‘মিরণ শাহের সমাধি’ আছে।
  • (৭) শিখর রাজ বংশের অবসানের পর রাজপুরোহিত রাজদণ্ড হাতে নিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। তবে তাঁর শাসনকেন্দ্র ছিল রাইপুরের পাশে ‘গুরুপাড়া’ বা বর্তমান গুড়েপাড়া এলাকায়। তাঁর রাজত্ব ছিল ক্ষণস্থায়ী।
  • (৮) কিছুদিনের মধ্যেই মল্লরাজা কৃষ্ণ সিংহের ছোট ভাই ফতে সিংহ বরাহভূম রাজার সাহায্যে রাজপুরোহিতের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে রাইপুরে বসবাস শুরু করেন। তিনি পূর্বে বিষ্ণুপুর থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে ফতে সিংহ মুর্শিদাবাদ -এর নবাবের কাছ থেকে রাজসনদ পান।
  • (৯) গড় রাইপুর, নতুনগড়, কামারডিহা, ধোবাশোল, বনপাথরি, ধরমপুর, নীলজোড়া, সিমলি, উপরবাঁধা, দুবনালা, খড়িগেড়্যা, কেলেপাড়া, যাদবনগর, যশপাড়া সহ ২৭ টি মৌজা নিয়ে গঠিত ছিল ফতে সিংহের বংশধর রাজা দুর্জন সিংহের জমিদারি। চুয়াড় বিদ্রোহ -এর সময় দুর্জন সিংহকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
  • (১০) পরবর্তীতে ১৭৯৯ সালের ব্রিটিশ সরকার সমঝোতা করে এবং দুর্জন সিংহকে মুক্তি দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট অঙ্কের ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে দুর্জন সিংহের বড় ছেলে ফতে সিংহের হাতে জমিদারির অধিকার পুনরায় প্রত্যাপর্ণ করা হয়।
  • (১১) বাঁকুড়া ডিস্ট্রিক্ট গেজেটের তথ্য অনুসারে, উনিশ শতকের শেষদিকে রাইপুরের জমিদার পরিবার অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। গিসবন কোম্পানি এই জমিদারির ইজারা নেয়। ১৮০৫ সালে জঙ্গলমহল জেলা গঠিত হয় এবং ১৮৩২ সালে অবলুপ্ত হয়।
  • (১২) ১৮৫৭ সালে রাইপুর প্রথমে মানভূম জেলার অন্তর্গত ছিল। ১৮৭৯ সালে মানভূম জেলা থেকে যে সব এলাকা বাঁকুড়া জেলায় স্থানান্তরিত হয় তার মধ্যে ছিল রাইপুর।

রাইপুরের নাম বিতর্ক

বাঁকুড়া জেলার রাইপুরের নাম নিয়েও বিতর্ক আছে। লোকসংস্কৃতি গবেষক তথা বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজের অধ্যাপক অরবিন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “রাইপুরের প্রাচীন নাম ছিল ধরমপুর। পরে রাজাদের কুলদেবী ‘রাই’ এর নাম অনুসারে ওই জনপদের নাম রাইপুর হয়েছে। আকবরনামায় এর নাম ‘রায়পুর’ রয়েছে। তখন রায়পুর সরকার জল্লেশ্বরের বা অধুনা ওড়িশা রাজ্যের অন্তর্গত ছিল।

রাইপুরের প্রবীণ মানুষদের উক্তি

এলাকার প্রবীণ মানুষেরা জানিয়েছেন, নতুনগড়ে রাজা দুর্জন সিংহের কাছারিবাড়ি ছিল। সেখানে ছিল প্রকাণ্ড দুর্গ। রাইপুরের পার্শ্ববর্তী সারংগড়ে একটি দুর্গ ছিল। পরবর্তীকালে সেই দুর্গ অবশ্য মাটির তলায় চাপা পড়ে গিয়েছে। বর্তমানে রাইপুর ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছে নতুনগড়ে। রাইপুর ব্লক কার্যালয় যেখানে তৈরি হয়েছে সেটিও পূর্বে রাজাদেরই ছিল। পরে তা সরকারের কাছে হস্তান্তর হয়।

রাইপুরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মহামায়া

  • (১) রাইপুরের অধিষ্ঠাত্রী ‘কোকামুখা’ দেবী মহামায়া। আলমসায়রের পাড়ে চাঁদুডাঙায় এই দেবী মহামায়ার মন্দির আছে। প্রচলিত মতে, রাইপুরের দেবী চণ্ডী ছিলেন আদিতে একটি শিলাখণ্ড, পরে তাতে মা মহামায়ার আগমন ঘটে। অবশ্য এ নিয়ে বিতর্ক আছে।
  • (২) দেবী মহামায়ার মূর্তি অথবা পুরনো গড়ে শেষ রাজবংশের স্মৃতি বিজড়িত ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ প্রমাণ দেয় যে, এক সময় জঙ্গলমহলের এই এলাকায় রাজাদের ‘গড়’ বা দুর্গ ছিল। আর দেবী মহামায়ার প্রস্তর মূর্তি প্রমাণ করে যে, এই নগর সভ্যতা ছিল অস্ট্রিক সংস্কৃতির দেশ।

বর্তমানে রাইপুরের রাজবংশ

  • (১) খাতড়া-রাইপুর রাস্তার পাশে হরিহরগঞ্জ গড়ে এখনও আছে রাজবাড়ি, জগন্নাথ ও হনুমানজীর মন্দির। সেই বাড়িতেই বর্তমানে থাকেন রাজা হরিহর সিংহদেবের বর্তমান বংশধরেরা।
  • (২) রাজ পরিবারের বংশধর মধুসূদন সিংহদেব, গোপীনাথ সিংহদেব বলেন, “সরকারিভাবে উদ্যোগ নিলেই আগেকার রাজাদের স্মৃতি অমর অক্ষয় হয়ে থাকবে। নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে রাজাদের ইতিকথা।”

রাইপুর ব্লকের বিডিওর মন্তব্য

রাইপুরের বিডিও দীপঙ্কর দাস বলেন, “রাইপুরে রাজপরিবারের মন্দির সংস্কারের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। রাজবাড়ির ঐতিহ্য ও স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্যই এই বিষয় গুলি রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।”

উপসংহার :- এক সময়ের জঙ্গলে ঘেরা এই জনপদের বুক চিরে চলে গিয়েছে পিচ ঢালা বাঁকুড়া-ঝাড়গ্রাম রাজ্য সড়ক। বৃদ্ধি পাচ্ছে পাকাবাড়ি, তৈরি হয়েছে মার্কেট কমপ্লেক্স, অতিথি আবাস। রাইপুরের এই বর্তমান ছবি জানিয়ে দিচ্ছে একসময়ের তুঙ্গভূমি, শিখরভূমি বদলে গিয়েছে।

(FAQ) রাইপুর স্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. রাইপুর শহরটি পূর্বে কি নামে পরিচিত ছিল?

গড় রাইপুর।

২. রাইপুর শহরটি কোন জেলায় অবস্থিত?

বাঁকুড়া জেলা।

৩. রাইপুরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কে?

কোকামুখা দেবী মহামায়া।

৪. রাইপুর কে ঘিরে রেখেছে কোন কোন নদী?

কংসাবতী, ভৈরববাঁকি ও তারাফেনি।

Leave a Comment