ফেব্রুয়ারি বিপ্লব

১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে সংঘটিত ফেব্রুয়ারি বিপ্লব প্রসঙ্গে বিপ্লবের কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকদের মতামত, বিভিন্ন কারণের সমাহার, বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রাধান্য, জনসমর্থনের অভাব, শ্রমিক অসন্তোষ, দুর্বল বিদেশনীতি, অর্থনৈতিক সংকট, প্রত্যক্ষ কারণ, বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী বিরোধ, কৃষকদের রক্ষণশীলতা, জাতি বৈরিতা, নেতৃত্বের অভাব, বিপ্লবীদের মধ্যে সংহতির অভাব, বিপ্লবের ফলাফল হিসেবে রাজতন্ত্রের অবসান, আইন সভা গঠন, সাধারণ বুর্জোয়াদের ক্ষমতা লাভ, শ্রমিক শ্রেণির উন্নতি, জাতীয় কর্মশালা প্রতিষ্ঠা, ফ্রান্সের সংহতি, ফ্রান্সের বাইরে প্রভাব, দেশে দেশে বিপ্লব, ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের তাৎপর্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

ফ্রান্সে সংঘটিত ফেব্রুয়ারি বিপ্লব

সময়কাল২২-২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে
স্থানপ্যারিস
নেতাথিয়ার্স, লা মার্টিন
রাজালুই ফিলিপ
ফলাফলপ্রজাতন্ত্র স্থাপন
রাষ্ট্রপতিলুই নেপোলিয়ন
ফেব্রুয়ারি বিপ্লব

ভূমিকা:- ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ইউরোপের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রাথমিকভাবে এই বিপ্লব সারা ইউরোপকে কাঁপিয়ে দেয়। অভিজাতদের সরিয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিয়ামকে পরিণত হয় এবং ইউরোপের দেশে দেশে ভীত-সন্ত্রস্ত শাসকরা প্রজাদের অনুকূলে উদারনৈতিক সংবিধান জারি করতে বাধ্য হন।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণ

১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে সংঘটিত ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পিছনে বেশ কিছু কারণ বিদ্যমান ছিল। যেমন –

(ক) ঐতিহাসিকদের মতামত

জুলাই রাজতন্ত্রের অবসানের পর ফ্রান্সে ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়। জুলাই রাজতন্ত্রের পতন বা ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণ সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা একমত নন। যেমন –

(১) কোবানের মত

ঐতিহাসিক কোবান-এর মতে, “এই বিপ্লব ছিল একটি দুর্ঘটনা মাত্র”। তাঁর মতে ১৮৩০ থেকে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সরকার দেশে এমন কোনও মৌলিক পরিবর্তন আনে নি, যার জন্য বিপ্লব হাতে পারে। আসলে ফ্রান্সের রাষ্ট্রকাঠামোর অন্তর্নিহিত দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাই এই বিপ্লবের জন্ম দেয়।

(২) এ জে পি টেলরের মত

ঐতিহাসিক এ জে পি টেলর বলেন যে, যে সব দাবিতে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তার জন্য বিপ্লব দরকার ছিল না। তাঁর মতে, বিপ্লবের জন্যই বিপ্লব হয়েছিল (“The Revolution was, infact its own object.”)।

(৩) প্রুধোঁর মত

সমাজতন্ত্রী প্রুধোঁ (Proudhan) বলেন যে, এই বিপ্লবের পেছনে কোনও চিন্তাভাবনা ছিল না (“It was made without an idea.”)। কোনও কারণ ছাড়াই বিপ্লব ঘটল – এই বক্তব্য অনৈতিহাসিক।

(৪) গ্ৰেনভিলের মত

ঐতিহাসিক গ্রেনভিল বলেন যে, “১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবকে নিছক দুর্ঘটনা ও আকস্মিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।” তিনি বুর্জোয়াদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সাধারণ মানুষের প্রতি সরকারের উদাসীনতাকে বিপ্লবের অন্যতম কারণ বলে অভিহিত করেছেন।

(৫) লা মার্টিনের মত

ফ্রান্সের প্রখ্যাত কবি ও রাজনীতিক লা-মার্টিন (Lamartine) বলেন যে, রাজতন্ত্রের স্থবিরত্বে “ফ্রান্স ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়েছিল।” মানুষ এর থেকে মুক্তি চাইছিল।

(খ) বিভিন্ন কারণের সমাহার

সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ও অন্তর্দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক দুর্দশা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা—সব মিলিয়েই বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি হয়।

(গ) বুর্জোয়া শ্রেণির প্রাধান্য

  • (১) লুই ফিলিপের সরকার ‘বুর্জোয়া রাজতন্ত্র’ নামে পরিচিত ছিল। তিনি যে পার্লামেন্ট কর্তৃক নির্বাচিত হন তা ছিল একটি বুর্জোয়া পার্লামেন্ট। এই পার্লামেন্টের সদস্যরা নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পত্তির অধিকারী ব্যক্তিদের ভোটে নির্বাচিত হতেন।
  • (২) তাঁরা সর্বদা বুর্জোয়া বা সম্পত্তিভোগী শ্রেণির স্বার্থই দেখতেন। তকভিল বলেন যে, বুর্জোয়া মানসিকতা গোটা সরকারকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এছাড়া এই পার্লামেন্টে লুই ফিলিপের নির্বাচনও সর্বসম্মত ছিল না। পার্লামেন্টের ৪৩০ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ২১৯ জন তাঁর পক্ষে ভোট দেন।
  • (৩) ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত শ্রমিক, কৃষক ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি এই পার্লামেন্ট বা তার মনোনীত রাজতন্ত্রকে মেনে নিতে পারে নি। ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন বলেন যে, জুলাই বিপ্লবের ফলাফলের মধ্যেই ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পটভূমি সৃষ্টি হয়েছিল।

(ঘ) জনসমর্থনের অভাব

এই সময় ফ্রান্সে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয়। এগুলির মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির যথেষ্ট পার্থক্য ছিল। রাজা লুই ফিলিপের পক্ষে কোনও রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছিল না। যেমন –

  • (১) ন্যায্য অধিকারবাদ বা রাজতন্ত্রের সমর্থকরা মনে করত যে, ফরাসি সিংহাসনের উপর লুই ফিলিপের কোনও বৈধ অধিকার নেই। তাঁদের চোখে লুই ফিলিপ ছিলেন অবৈধ বা বেআইনি শাসক। তাঁরা বুরবোঁ বংশের দশম চার্লসের উত্তরাধিকারী ডিউক অব বেরি-কেই ফরাসি সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকারী বলে মনে করতেন।
  • (২) ক্যাথলিকরা লুই ফিলিপ-প্রবর্তিত ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির ঘোরতর বিরোধী ছিল। তারা তাদের পূর্বতন সুযোগ-সুবিধাগুলি পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হয়।
  • (৩) ‘বোনাপার্টিস্ট’ বা নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অনুগামীরা তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র লুই বোনাপার্টকে ফ্রান্সের সিংহাসনে বসাতে উৎসাহী ছিল।
  • (৪) প্রজাতান্ত্রিকরাও এই রাজতন্ত্রের প্রতি প্রবল ক্ষুব্ধ ছিলেন, কারণ সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটাধিকার আইনের ফলে দেশের বৃহত্তম সংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। এছাড়া, লুই ফিলিপের সরকার ভোটগ্রহণে নানা দুর্নীতি ও মিথ্যাচারের আশ্রয় গ্রহণ করে আইনসভা ও গণতন্ত্রকে মিথ্যা প্রহসনে পরিণত করে।
  • (৫) রাজনৈতিক দলগুলির সমর্থন লাভে বঞ্চিত হয়ে লুই ফিলিপ উচ্চবিত্ত ভূস্বামী, বণিক ও শিল্পপতিদের স্বার্থে ও তাদের দ্বারাই শাসনকাজ পরিচালনা করতে থাকেন। সম্পত্তির ভিত্তিতে জাতীয় সভার ভোটাধিকার ও সদস্য হওয়ার অধিকার থাকায় ভোটারদের সংখ্যা ছিল খুবই কম।
  • (৬) নির্বাচনে কারচুপি ও ভোটারদের নানাভাবে প্রভাবিত করে লুই ফিলিপ নিজ ইচ্ছামতো ব্যক্তিদের নির্বাচিত করে আনতেন। এর ফলে আইনসভা তার স্বাধীন চরিত্র হারিয়ে রাজার আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
  • (৭) এই কারণে থিয়ার্স মন্তব্য করেন যে, আইনসভা হল “একটি বড়ো বাজার” যেখানে সদস্যরা নিজেদের “বিবেক বিনিময় করেন কোনও পদ বা মর্যাদার পরিবর্তে।” এইভাবে জুলাই রাজতন্ত্র বুর্জোয়া শ্রেণির নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

(ঙ) শ্রমিক অসন্তোষ

  • (১) ফ্রান্সে শিল্প বিপ্লবের আদি পর্বে শ্রমিকদের সংখ্যা প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ছোটো কারখানাগুলিতে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল পরিবার-পরিজনসহ প্রায় ৫০ লক্ষ। বড়ো কারখানাগুলিতে কাজ করত প্রায় ১০ লক্ষ শ্রমিক। তাদের নানারকম অসহনীয় অবস্থার মধ্যে জীবনধারণ করতে হত।
  • (২) কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের বেশি পরিমাণে খাটাত, কম মজুরি দিত এবং ইচ্ছামতো ছাঁটাই করত। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে শ্রমিকদের বসবাস করতে হত। শ্রমিকদের কল্যাণসাধনের জন্য জুলাই রাজতন্ত্র কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করে নি। এর ফলে শ্রমিকদের মধ্যে নানারকম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।
  • (৩) লুই ব্ল্যাঙ্ক, সেন্ট সাইমন প্রমুখ সমাজতন্ত্রী শ্রমিক শ্রেণির সমর্থনে এগিয়ে আসেন। বিশিষ্ট সমাজতন্ত্রী লুই ব্র্যাঙ্ক এই সময় ‘অর্গানাইজেশন অব লেবার’ নামে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি বলেন যে, একমাত্র বুর্জোয়া পরিচালিত রাজতন্ত্রের অবসানের মাধ্যমেই শ্রমিকদের দুর্গতিমোচন সম্ভব।
  • (৪) তিনি আরও বলেন যে, কর্মহীন ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এই কারণে তিনি ‘জাতীয় কর্মশালা’ খুলে বেকারদের কর্মসংস্থানের দাবি জানান।
  • (৫) অগাস্তে ব্ল্যাঙ্কি গঠন করেন ‘সোসাইটি অফ ফ্যামিলিস’ নামে এক গোপন সংগঠন। শ্রমিক শ্রেণি প্রজাতন্ত্রীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে রাজতন্ত্র-বিরোধী আন্দোলন শুরু করে এবং বিভিন্ন স্থানে উভয় দলের গুপ্ত সমিতি গড়ে উঠতে থাকে।
  • (৬) লিয়ঁ, নন্টস, প্যারিস, প্রোভেন্স, স্ট্রাসবুর্গ, বোলন প্রভৃতি শহরে শ্রমিকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ঐতিহাসিক ম্যারিয়ট-এর মতে, শ্রমিক অসন্তোষই জুলাই রাজতন্ত্রের পতনের কারণ।

(চ) দুর্বল বিদেশনীতি

  • (১) লুই ফিলিপের নিষ্ক্রিয় ও দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি তাঁর পতনের অন্যতম কারণ। তাঁর পররাষ্ট্র নীতির মূল লক্ষ্য ছিল বৈদেশিক ক্ষেত্রে যুদ্ধ এড়িয়ে চলা এবং যে কোনও মূল্যে শান্তি বজায় রাখা।
  • (২) ফরাসি সিংহাসনে তাঁর কোনও বংশানুক্রমিক অধিকার ছিল না বলে ইউরোপের রাজন্যবর্গ তাঁকে সহ্য করতে পারতেন না। তিনি মনে করতেন যে, কোনওভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে ইউরোপীয় শক্তিগুলি তাঁকে উচ্ছেদ করবে।
  • (৩) এই কারণে তিনি শান্তিপূর্ণ বিদেশ নীতির সমর্থক ছিলেন। পোল্যান্ড ও ইতালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তিনি নিরপেক্ষ ছিলেন। বেলজিয়ামের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব গ্রহণে ফ্রান্স ব্যর্থ হয়। মিশর-তুরস্কের বিরোধে ফ্রান্স ভ্রান্ত নীতি গ্রহণ করে ব্যর্থ হয়।
  • (৪) পারিবারিক স্বার্থে স্পেনের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়ে তিনি ফ্রান্সের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেন এবং ইংল্যান্ডের বিরাগভাজন হন। এর ফলে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আফ্রিকা ও নিকট প্রাচ্যেও ফ্রান্স ব্যর্থ হয়।
  • (৫) তাঁর শান্তিবাদী, নিষ্ক্রিয় নীতির ফলে গৌরব-লোভী ফরাসি জাতি ও বোনাপার্টিস্টরা তাঁর বিরোধী হয়ে ওঠে। হারনশ বলেন যে, “অল্পসংখ্যক মধ্যবিত্ত ছাড়া কেউ তাঁকে চায় নি ও সম্মান করে নি।”

(ছ) অর্থনৈতিক সংকট

  • (১) ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর হয়ে ওঠে। ১৮৪৪-১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে পরপর কয়েক বছরের অজন্মা, খরা ও শস্যহানির ফলে ফ্রান্সে প্রবল খাদ্য সংকট দেখা দেয়।
  • (২) ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় ১৮৪৭-১৮৪৮ সালে রুটির দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে মন্দা দেখা দেয়, বেকার সমস্যা শুরু হয় এবং কর্মহীন কৃষক ও শ্রমিকদের দারিদ্র্য চরমে পৌঁছায়।
  • (৩) আর্থিক সমস্যা সমাধানে অক্ষম সরকারের পতন ঘটাতে মানুষ তৎপর হয়ে ওঠে। দেশের নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ শুরু হয়। লা-ভেণ্ডি ও প্রোভেন্সে বুরবোঁ রাজতন্ত্রের সমর্থকরা, বোলন ও স্ট্রাসবার্গে বোনাপার্টিস্টরা এবং প্যারিস, লিয়ঁ প্রভৃতি শহরে শ্রমিকরা বিদ্রোহ শুরু করে।
  • (৪) লুই ফিলিপ কাঠোর দমননীতির মাধ্যমে বিদ্রোহ দমন করায় বিভিন্ন শ্রেণির জনগণের মধ্যে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
  • (৫) জ্যাক ডজ অবশ্য এই আর্থ-সামাজিক কারণ মানতে রাজি নন। তাঁর মতে, আর্থ-সামাজিক কারণে বিপ্লব হলে তা ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দেই সংঘটিত হত পরে নয়। তাঁর মতে, ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে মন্দা কেটে যায়। কোবানও তাই মনে করেন।
  • (৬) জ্যাক ড্রজ বলেন যে, লুই ফিলিপ বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করার ফলে এক শ্রেণির সঙ্গে অপর শ্রেণির দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এই শ্রেণিবৈষম্য বা দ্বন্দ্বই বিপ্লবের মূল কারণ।

(জ) প্রত্যক্ষ কারণ

  • (১) অ্যালফ্রেড কোবান লিখছেন যে, ফ্রান্সের ঘরে-বাইরে লুই ফিলিপের নিষ্ফল ও ক্লীব নীতিতে জনগণ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কবি লা-মার্টিন মন্তব্য করেছেন যে, “ফ্রান্স ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।”
  • (২) বিপ্লবের কিছু আগে তকভিল লিখছেন—“আমরা একটি আগ্নেয়গিরির উপর ঘুমিয়ে আছি… বিপ্লবের হাওয়া বইছে, দিগন্তে ঝড়ের আভাস।”
  • (৩) জাতীয় জীবনের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে থিয়ার্স, লা-মার্টিন প্রমুখ সংস্কারপন্থী নেতৃবৃন্দ (প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী দল) ভোটাধিকার সংস্কার, সম্প্রসারণ এবং আইনসভার নির্বাচনে দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
  • (৪) নানা স্থানে সভা-সমিতি গড়ে উঠতে থাকে। এই সভাগুলির নাম ছিল ‘সংস্কার ভোজসভা। সমাজের নানা মত ও স্তরের মানুষ এগুলিতে সমবেত হতে থাকে। ভোটাধিকার সম্প্রসারণই ছিল এর মূল কথা।
  • (৫) ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই দাবিতে প্রায় ৭০টি জনসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ১ লক্ষ ৭০ হাজার মানুষ এই দাবির পক্ষে স্বাক্ষর করে।
  • (৬) লুই ফিলিপ ও তাঁর প্রতিক্রিয়াশীল প্রধানমন্ত্রী গিজো এই দাবি অগ্রাহ্য করলে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২২শে ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলগুলি প্যারিসে এক বিশাল জনসভা আহ্বান করে। পুলিশ এই জনসভা ভেঙে দিলে সারা প্যারিস উত্তাল হয়ে ওঠে।
  • (৭) শ্রমিক শ্রেণি পথে নামে। রাস্তায় ‘ব্যারিকেড গড়ে ওঠে। ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’-কে পথে নামানো হয়। তারা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে গুলি চালাতে অস্বীকার করে। জনতার কণ্ঠে স্লোগান ওঠে ‘সংস্কার দীর্ঘজীবী হোক”, “গিজো নিপাত যাক।
  • (৮) সন্ত্রস্ত লুই গিজোকে পদচ্যুত করেন এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। ২৩শে ফেব্রুয়ারি বিক্ষুব্ধ জনতা প্রধানমন্ত্রী গিজো-র বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে থাকলে বাসগৃহের রক্ষীদের গুলিতে ২৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়।

জুলাই রাজতন্ত্রের অবসান

গিজোর বাসভবনে হত্যার ঘটনা সারা প্যারিসে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি করে এবং বিক্ষুব্ধ জনতা লুই ফিলিপের পদচ্যুতির দাবিতে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে। লুই ফিলিপ তাঁর পৌত্রের অনুকূলে সিংহাসন ত্যাগ করে (২৪শে ফেব্রুয়ারি) ইংল্যান্ডে আশ্রয় নিলে জুলাই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে।

দ্বিতীয় ফরাসি প্রজাতন্ত্র

১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত এই ঘটনা ফেব্রুয়ারি বিপ্লব নামে পরিচিত। প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী নেতৃত্ব যুগ্মভাবে ফ্রান্সকে ‘প্রজাতন্ত্র’ বলে ঘোষণা করে (২৬শে ফেব্রুয়ারি)। এই প্রজাতন্ত্র ছিল “দ্বিতীয় ফরাসি প্রজাতন্ত্র।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ব্যর্থতা

প্রবল উন্মাদনার মধ্যে গণজাগরণ শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়, এবং স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রই আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের এই ব্যর্থতার জন্য কয়েকটি কারণকে দায়ী করা যায়। যেমন –

(ক) মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী বিরোধ

  • (১) অধ্যাপক সীম্যান বলেন যে, “সমকালীন ইউরোপের সামাজিক বিন্যাস ১৮ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবকে ব্যর্থ করে দেয়।” তাঁর মতে, ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তীকালে ইউরোপের সকল রাজনৈতিক আন্দোলনের পশ্চাতে সবচেয়ে সক্রিয় শক্তি ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির হতাশাবোধ।
  • (২) শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল শিল্পপতি ও ভূস্বামী সম্প্রদায়। পরে আসে অসংখ্য কৃষক ও শহরের শ্রমজীবী মানুষ, যারা দাঙ্গা ও বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে নিজেদের দাবি আনতে সচেষ্ট ছিল।
  • (৩) মধ্যবিত্ত শ্রেণি পরিবর্তন চেয়েছিল, কিন্তু অস্থিরতা বা অরাজকতা নয়। এর ফলে বিপ্লবের দুই শরিকের মধ্যে সংঘাত বাধে, এবং মধ্যবিত্ত বুর্জোয়াদের হাতে বিপ্লবের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে, যা বিপ্লবকে নিশ্চিতভাবে দুর্বল করে দেয়।

(খ) কৃষকদের রক্ষণশীলতা

  • (১) ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব মূলত শহরকেন্দ্রিক হলেও এতে কৃষক ও সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে। কৃষকদের অংশগ্রহণে এই বিপ্লব নতুন মাত্রা পায়, কিন্তু কৃষকদের আদর্শবাদ ও বিপ্লবী চেতনা অতটা গভীর ছিল না।
  • (২) ফ্রান্সে জমির উপর কৃষক-মালিকানা স্বীকৃত হলে তারা রক্ষণশীল ও প্রতি-বিপ্লবী হয়ে পড়ে। অনুরূপভাবে অস্ট্রিয়া-তে সরকার কৃষকদের উপর থেকে সামন্ততান্ত্রিক কর প্রত্যাহার করে নিলে তারা সরকারের সমর্থকে পরিণত হয়। কোনও আদর্শবাদ নয়—সংকীর্ণ স্বার্থচিন্তা-প্রসূত এই আন্দোলন স্বাভাবিকভাবেই ছিল দুর্বল।

(গ) জাতিবৈরিতা

  • (১) জাতিবৈরিতা ও জাতীয়তাবাদী আশা-আকাঙ্ক্ষার পরস্পর-বিরোধিতা এই বিপ্লবের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। বিপ্লবের ফলে হাঙ্গেরিতে লুই কসুথের নেতৃত্বে ম্যাগিয়ার জাতিগোষ্ঠীর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • (২) ম্যাগিয়ার জাতি হাঙ্গেরিকে ম্যাগিয়ার রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করতে উদ্যোগী হলে স্লাভ, সার্ব, ক্রোট, শ্লোভাক জাতিগোষ্ঠী এর বিরোধিতা শুরু করে। অনুরূপভাবে বোহেমিয়ায় চেক ও জার্মানদের দ্বন্দ্ব জটিলতর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এর ফলে এইসব স্থানে সহজেই অস্ট্রিয়ার আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

(ঘ) কর্মপন্থা ও মতাদর্শগত বিরোধ

  • (১) কর্মপন্থা ও মতাদর্শ নিয়ে বিপ্লবীদের মধ্যে মতভেদ ছিল। ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীদের মিলিত চেষ্টায় বিপ্লব জয়যুক্ত হয়, কিন্তু নীতি ও কর্মপন্থা নিয়ে দুই দলের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য ছিল।
  • (২) প্রজাতান্ত্রিক দলের বক্তব্য ছিল যে, প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবের কাজ শেষ হয়েছে—এখন দরকার ফ্রান্সের সংহতি সাধন। অপরদিকে সমাজতন্ত্রীরা মনে করত যে, বিপ্লবের ধ্বংসাত্মক কাজ শেষ হয়েছে— গঠনমূলক কাজ এখনও বাকি।
  • (৩) দুই মতাদর্শের বিরোধের ফলে ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্র ধ্বংস হয়। ইতালির ক্ষেত্রেও অনুরূপ মতপার্থক্য ছিল। সংগ্রামের পদ্ধতি নিয়ে ম্যাৎসিনি ও ক্যাভুরের মধ্যে স্পষ্ট নীতিগত বিরোধ ছিল। এছাড়া ইতালিতে রাজতন্ত্র, পোপতন্ত্র না প্রজাতন্ত্র কি প্রতিষ্ঠিত হবে তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক ছিল, যা ইতালীয় আন্দোলনকে দুর্বল করে দেয়।
  • (৪) ভাবী জার্মান রাষ্ট্রের কাঠামো কি হবে তা নিয়ে ফ্রাস্কফোর্ট পার্লামেন্টের সদস্যদের মধ্যে প্রবল মতপার্থক্য ছিল। এইসব বিবাদ-বিসংবাদের ফলে বিপ্লবী শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

(ঙ) নেতৃত্বের অভাব

  • (১) যোগ্য নেতৃত্বের অভাব বিপ্লবের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং উপযুক্ত প্রস্তুতি ছাড়াই। অনেকেই বিপ্লবের জন্য মানসিকভাবে তৈরি ছিলেন না। তাও বিপ্লব আসে।
  • (২) শহরের মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবী নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন। তাঁদের নেতৃত্ব আবেগ-সঞ্চারী ও আদর্শনিষ্ঠ হলেও তা ছিল বাস্তবতাবর্জিত। ফ্রান্সের লা-মার্টিন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতা ছিলেন না।
  • (৩) ম্যাৎসিনি ছিলেন আদর্শবাদী—রাজনৈতিক বিচক্ষণতা বা দূরদর্শিতা তার ছিল না। জনগণই ছিল এই বিপ্লবের প্রকৃত নেতা।

(চ) সামরিক শক্তি

  • (১) জাতীয়তাবাদ, প্রজাতন্ত্র, সমাজতন্ত্র প্রভৃতি অপেক্ষা বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র ও ধর্মবোধের প্রতি মানুষের আনুগত্য ছিল বেশি। তাই গণ-আন্দোলনের ভয়ে রাজরা উদারনৈতিক শাসনতন্ত্র মঞ্জুর করলে মানুষ রক্ষণশীলতার আবর্তে ফিরে যায়—বিপ্লব স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
  • (২) এই সুযোগে রাষ্ট্রশক্তি বিপ্লবীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বিপ্লব দমিত হয়। তাছাড়া এই সময় কোনও রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী বিপ্লবীদের পক্ষে যোগ দেয় নি। অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার সেনাদল বিপ্লব ধ্বংস করে এবং তাদের সঙ্গে যোগ দেয় রাশিয়ার সেনাবাহিনী।

(ছ) বিপ্লবীদের মধ্যে সংহতির অভাব

  • (১) বিভিন্ন দেশের বিপ্লবীদের মধ্যে কোনও ঐক্য, সংহতি বা পারস্পরিক যোগাযোগ ছিল না। ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, হাঙ্গেরি, বোহেমিয়া প্রভৃতি দেশের বিপ্লবীদের মধ্যে কোনও ঐক্য গড়ে ওঠে নি।
  • (২) যখন এক দেশের বিপ্লবীরা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল, তখন অন্যদেশের বিপ্লবীরা তাদের সাহায্য করতে অগ্রসর হয় নি। ফ্রান্স ছিল বিপ্লবী চেতনার উৎসভূমি। ফ্রান্স কোথাও বিপ্লবীদের সাহায্য করে নি, বরং রোমের প্রজাতন্ত্র ধ্বংস করতে অস্ট্রিয়াকে সাহায্য করে।

(জ) প্রকৃতির বিরূপতা

ঠিক এই সময়েই প্রকৃতিও বিরূপতা সৃষ্টি করে। অধ্যাপক ডেভিড টমসন লিখেছেন যে, এই সময় ইউরোপে প্লেগের মহামারী দেখা দেয়। চিন থেকে আগত এই মারণ-ব্যাধি সারা পশ্চিম ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রচুর জীবনহানি ঘটায়। মৃত্যুভয়ে মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়ে এবং সামাজিক পরিবর্তন ও বিপ্লব সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে যায়।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফলাফল

২২-২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে সংঘটিত ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। ফ্রান্স  ও ইউরোপের ইতিহাসে এই বিপ্লবের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

(১) রাজতন্ত্রের অবসান

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের অবসান এবং প্রজাতন্ত্রের জয় ঘোষিত হয়। লা-মার্টিন এই অস্থায়ী প্রজাতান্ত্রিক সরকারের রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন। ফ্রান্সের জাতীয় সভার ১০ জন সদস্যকে নিয়ে একটি কার্যনির্বাহক সমিতি গঠিত হয়।

(২) সরকারের উদ্দেশ্য

প্রাপ্তবয়স্কের সার্বজনীন ভোটাধিকার, শিক্ষাবিস্তার, বেকারদের কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা, সকল শ্রেণির অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি দান, দারিদ্র্য দূরীকরণ, দাসপ্রথা লোপ, জাতীয় রক্ষীবাহিনীর গণতন্ত্রীকরণ প্রভৃতি এই সরকারের উদ্দেশ্য বলে ঘোষিত হয়।

(৩) সুন্দর বিপ্লব

বিপ্লবের পর ফ্রান্সে কোনও অরাজকতা দেখা দেয় নি। তাই কার্ল মার্কস এই বিপ্লবকে ‘Nice Revolution’ বা ‘সুন্দর বিপ্লব’ বলে অভিহিত করেছেন।

(৪) আইনসভা গঠন

সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ৭৫০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি আইনসভা গঠিত হয়। এই আইনসভা ছিল এককক্ষ বিশিষ্ট। তাতে চার বছরের জন্য একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির ব্যবস্থা হয়। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ভ্রাতুষ্পুত্র লুই নেপোলিয়ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

(৫) দ্বিতীয় সাম্রাজ্য

১৮৫২ খ্রিস্টাব্দের ২রা ডিসেম্বর অকস্মাৎ প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে তিনি রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং তৃতীয় নেপোলিয়ন নামধারণ করে নিজেকে ‘ফরাসিদের সম্রাট’ বলে ঘোষণা করেন। এইভাবে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ফ্রান্সে ‘দ্বিতীয় সাম্রাজ্য’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্রাট পদে আসীন হয়ে তৃতীয় নেপোলিয়ন নিজ সাম্রাজ্যকে “The final flower of the French Revolution” বলে অভিহিত করেন।

(৬) সাধারণ বুর্জোয়াদের ক্ষমতা লাভ

ফেব্রুয়ারি বিপ্লব একেবারে ব্যর্থ হয় নি। ফ্রান্সে স্বৈরশাসন ফিরে এলেও সার্বজনীন ভোটাধিকারের নীতি স্বীকৃতি লাভ করে এবং ভোটাধিকার সম্প্রসারণের ফলে নিম্নবিত্ত সাধারণ বুর্জোয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ করে।

(৭) লিপসনের মন্তব্য

ঐতিহাসিক লিপসন বলেন, “১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লবে অভিজাততন্ত্রের পতন ঘটে। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে মূলধনী উচ্চ বুর্জোয়া শ্রেণির হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় এবং বুদ্ধিজীবী নিম্ন বুর্জোয়া বা পাতি বুর্জোয়া শ্রেণি ক্ষমতা করায়ত্ত করে।”

(৮) শ্রমিক শ্রেণীর উন্নতি

অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের ইতিহাসেও এক যুগান্তর ঘটে যায়। নানা ধরনের সমাজতান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। শ্রমিক শ্রেণির উন্নতির জন্য শ্রম কমিশন গঠিত হয়। তাদের কাজের সময় সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়—স্থির হয় যে প্যারিসে দশ ঘন্টা এবং প্রদেশগুলিতে শ্রমিকরা এগারো ঘন্টা করে কাজ করবে।

(৯) জাতীয় কর্মশালা প্রতিষ্ঠা

সকলের জন্য কাজের অধিকার বা Right of Work স্বীকার করা হয়। বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য জাতীয় কর্মশালা’ (National Workshop) স্থাপিত হয়। এইসব কাজের ফল ছিল সুদূরপ্রসারী।

(১০) অর্ধ বিপ্লব

ঐতিহাসিক গ্রেনভিল ফ্রান্সের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবকে ‘অর্ধ বিপ্লব’ বা ‘Half Revolution’ বলে অভিহিত করেছেন। ফ্রান্সে যে ‘জাতীয় কর্মশালা’ গঠিত হয়েছিল তা কার্যকর হয় নি। এর কারণ প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী দলের বিরোধ।

(১১) ফ্রান্সের সংহতি

প্রজাতন্ত্রীদের বক্তব্য ছিল যে বিপ্লবের উদ্দেশ্য হল গণভোট প্রবর্তন ও প্রজাতন্ত্র গঠন। সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়েছে। তাই এখন আর বিপ্লবের দরকার নেই—দরকার ফ্রান্সের সংহতি।

(১২) জুন বিদ্রোহ

সমাজতন্ত্রীদের বক্তব্য ছিল যে, বিপ্লবের ধ্বংসাত্মক কাজ শেষ হয়েছে, কিন্তু গঠনমূলক কাজ এখনও বাকি। এই বিরোধের ফলে প্রজাতন্ত্রী সরকার থেকে সমাজতন্ত্রীদের বাদ দেওয়া হয়। ‘জাতীয় কর্মশালা’-ও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে শুরু হয় শ্রমিক বিদ্রোহ যা ‘জুন বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমিত হয়।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফ্রান্সের বাইরে প্রভাব

১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবের সূচনা হয় প্যারিসে। কালক্রমে তা সমগ্র ইউরোপে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। যেমন –

(১) জোনাথন স্পেরবারের মন্তব্য

ঐতিহাসিক জোনাথন স্পেরবার (Jonathan Sperber) এই বিপ্লবকে ঊনিশ শতকের ইউরোপে সর্বাপেক্ষা ব্যাপকতম এবং সর্বাপেক্ষা হিংসাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন বলে অভিহিত করেছেন।

(২) টেলরের মন্তব্য

অধ্যাপক এ. জে. পি. টেলর-এর কথায়, “প্যারিস হল বিপ্লবের জননী।” এই বিপ্লব ইউরোপের ১৫টি দেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে গতি সঞ্চার করে।

(৩) শহরের বিপ্লব

এই বিপ্লব ছিল প্রধানত শহরের বিপ্লব। প্যারিস, মিলান, বার্লিন, রোম, ফ্লোরেন্স, বুদাপেস্ট, ভিয়েনা—ইউরোপের এই প্রধান শহরগুলিই ছিল বিপ্লবের প্রাণকেন্দ্র।

(৪) ঝটিকা কেন্দ্র

ডেভিড টমসন বলেন যে, প্যারিসকে পেছনে ফেলে মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপের রাজ্যগুলি অনেক অগ্রসর হয়। তাঁর মতে, প্যারিস নয়—মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপের শহরগুলিই ছিল এই বিপ্লবের ঝটিকা কেন্দ্র।

(৫) বিপ্লবের বৎসর

এই বিপ্লব সংঘটিত হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণির সক্রিয়তায়, যারা মেটারনিখ পদ্ধতি আর মানতে চাইছিল না। এরিখ হবসবমের মতে, এটি ‘প্রথম সম্ভাব্য বিশ্ব বিপ্লব’। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দকে তাই সাধারণভাবে ‘বিপ্লবের বৎসর বলে অভিহিত করা হয়।

(৬) জনতার যুগের সূচনা

ইতালি, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি—সর্বত্রই স্বৈরশাসন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনাচার এবং মেটারনিখ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র জাতীয়তাবাদী গণ-আন্দোলন দেখা দেয়। ডেভিড টমসন তাই বলেন যে, ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ জনতার যুগের সূচনা করে”

দেশে দেশে বিপ্লব

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিপ্লব শুরু হয়। যেমন –

(১) জার্মানি

  • (ক) জার্মানির প্রাশিয়া, হ্যানোভার, স্যাক্সনি, ব্যাভেরিয়া, ব্যাডেন, ব্রান্সউইক প্রভৃতি রাজ্যে উদারনৈতিক গণ-আন্দোলন শুরু হয় এবং এইসব রাজ্যের রাজন্যবর্গ জনগণকে উদারনৈতিক শাসনতন্ত্র মঞ্জুর করতে বাধ্য হন।
  • (খ) ফ্রাঙ্কফোর্ট শহরে সমবেত হয়ে জার্মান জাতীয়তাবাদীরা ঐক্যবদ্ধ জার্মানির জন্য একটি জাতীয় পার্লামেন্ট ও সংবিধান তৈরি করেন। প্রাশিয়া-রাজ চতুর্থ ফ্রেডারিক উইলিয়মকে জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধানের পদ গ্রহণের অনুরোধ করা হয়।
  • (গ) স্বৈরতন্ত্র ও রাজার দৈবস্বত্বে বিশ্বাসী । প্রাশিয়া-রাজ এই পদ গ্রহণে অসম্মত হন। অস্ট্রিয়া বলপূর্বক এই ‘ফ্রাঙ্কফোর্ট পালাে ভেঙে দেয়। এ সত্ত্বেও বলতে হয় যে, এই সংবিধান ও ফ্রাঙ্কফোর্ট পার্লামেন্ট জার্মান ঐক্যের পথ প্রশস্ত করে।

(২) ইতালি

  • (ক) ইতালির পার্মা, মডেনা, মিলান, ভেনিস, টাস্কানি, সিসিলি, নেপলস্ এবং পোপের রাজ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয়। পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার অধিপতি চার্লস অ্যালবার্ট নিজ রাজ্যে একটি উদারনৈতিক শাসনতন্ত্র প্রবর্তন করেন।
  • (খ) ভেনিস প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয় এবং লম্বার্ডি, ভেনেশিয়া ও মিলানের অধিবাসীরা অস্ট্রিয়ার সেনাবাহিনীকে বিতাড়িত করে। বিপ্লবী নেতা ম্যাৎসিনির নেতৃত্বে রোমে একটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

(৩) অস্ট্রিয়া

  • (ক) মেটারনিখের নিজ সাম্রাজ্য অস্ট্রিয়ায় ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। ভিয়েনা, হাঙ্গেরি, বোহেমিয়া—সর্বত্র বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী ভিয়েনাতে মেটারনিখের বাসভবন আক্রান্ত হয়। মেটারনিখ ইংল্যান্ডে আশ্রয় নেন এবং মেটারনিখতন্ত্রের সমাধি রচিত হয়।
  • (খ) অস্ট্রিয়ার সম্রাট একটি উদারনৈতিক সংবিধান প্রবর্তনে বাধ্য হন। ‘হাঙ্গেরির ম্যাৎসিনি’ লুই কসুথের নেতৃত্বে হাঙ্গেরির স্বায়ত্তশাসনের দাবি জয়যুক্ত হয়। বোহেমিয়ায় চেক ও স্লাভ জাতীয়তাবাদীরা তাদের দাবি আদায়ে সক্ষম হয়।

(৪) নেদারল্যান্ড ও ডেনমার্ক

ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডেও এই বিপ্লবের প্রভাব পড়ে। আন্দোলনের চাপে ডেনমার্ক-রাজ সপ্তম ফ্রেডারিক সংবিধান সভার অধিবেশন আহ্বান করতে বাধ্য হন। ডেভিড টমসন বলেন যে, “এইসব বিপ্লবের গতিপ্রকৃতি ছিল একই”।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সীমিত সাফল্য

১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবের সাফল্যও ছিল সীমিত। প্রাথমিক বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলে উঠে অস্ট্রিয়া অচিরেই প্রতি-আক্রমণ শুরু করে এবং তাতে ইতালি, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার বিভিন্ন প্রদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে সাফল্যের জন্য জাতীয়তাবাদীদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের তাৎপর্য

১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যর্থ হলেও নানাদিক থেকে এই বিপ্লব যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। যেমন –

(১) জার্মানি ও ইতালির ঐক্যের পথ প্রশস্ত

এই বিপ্লব ভিয়েনা বন্দোবস্ত ও মেটারনিখ ব্যবস্থার মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। এই বিপ্লবের দ্বারা ইতালি বা জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হয় নি ঠিকই, কিন্তু এই বিপ্লব এই দুটি রাজ্যের ঐক্যের পথ প্রস্তুত করেছিল। স্থির হয়ে গিয়েছিল যে, প্রাশিয়ার নেতৃত্বে জার্মানি এবং পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার নেতৃত্বে ইতালির ঐক্য সম্পন্ন হবে।

(২) সামন্ততন্ত্রের পতন

এই বিপ্লব সামন্ততন্ত্রের পতনকে সুনিশ্চিত করে। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ৭ই সেপ্টেম্বর অস্ট্রিয়ার সরকার ভূমি আইন সংশোধন করে কৃষকদের সামন্তপ্রভুদের শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি দেয়।

(৩) টমসনের মন্তব্য

ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন-এর মতে, সামন্ততন্ত্রের পতনই হল বিপ্লবের ‘সবচেয়ে স্মরণীয় ও দীর্ঘমেয়াদি অবদান।”

(৪) স্বাধীন কৃষক শ্রেনির উদ্ভব

ভূমিদাস প্রথা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এর ফলে হ্যাপসবার্গ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশে স্বচ্ছল, রাজনীতি সচেতন এবং নিজ জমির মালিক স্বাধীন কৃষক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে।

(৫) সমাজতন্ত্রের বিকাশ

এই বিপ্লবের দ্বারা ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং সমাজতান্ত্রিক মতবাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের কাজের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য ‘জাতীয় কর্মশালা’ প্রতিষ্ঠিত হয়।

(৬) শহরকেন্দ্রিক বিপ্লব

এই বিপ্লব ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক বিপ্লব। প্যারিস, ভিয়েনা, বার্লিন, রোম, মিলান, ভেনিস, বুদাপেস্ট প্রভৃতি শহর ছিল এই বিপ্লবের প্রাণকেন্দ্র।

(৭) বুদ্ধিজীবী বিপ্লব

এই বিপ্লব ছিল বুদ্ধিজীবীদের বিপ্লব। কবি, সাহিত্যিক, অধ্যাপক, সাংবাদিক প্রভৃতি মানুষ এই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেন। ফ্রান্সে কবি লা-মার্টিন, বোহেমিয়াতে ঐতিহাসিক প্যালাকি, হাঙ্গেরিতে কবি ও সাহিত্যিক পেটোফ্রি, ইতালিতে পণ্ডিত ও আদর্শবাদী দেশপ্রেমিক ম্যাৎসিনি এই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেন।

(৮) নেমিয়ারের মন্তব্য

ঐতিহাসিক নেমিয়ার ফেব্রুয়ারি বিপ্লবকে ‘বুদ্ধিজীবীদের বিপ্লব’ (‘Revolution of the Intellectuals’) বলে অভিহিত করেছেন।

(৯) জনতার বিপ্লব

ডেভিড টমসন, অধ্যাপক টেলর প্রমুখ ঐতিহাসিক এই বিপ্লবকে ‘জনতার বিপ্লব’ বলে অভিহিত করেছেন। ডেভিড টমসন বলেন যে, ১৮৪৮ সাল জনগণের যুগের সূচনা করে।

(১০) টেলরের মন্তব্য

অধ্যাপক টেলর বলেন যে, ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের প্রকৃত নায়ক ছিল জনগণ। কেবলমাত্র বিপ্লবী নেতাদের উপর নির্ভর করলে এই বিপ্লব আদৌ সংঘটিত হত না। তিনি বলেন যে, ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে রাজনীতি ও দেশের শাসন-সংক্রান্ত বিষয় আর ধনীর বৈঠকখানায় নিয়ন্ত্রিত হত না –এখন থেকে তা রাজপথে সাধারণ মানুষদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া

১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দকে ‘বিপ্লবের বৎসর’ বলে অভিহিত করা হয়। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ফ্রান্সে শুরু হলেও অচিরেই তা দাবানলের মতো ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন –

(ক) অস্ট্রিয়া

  • (১) ফ্রান্সের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সংবাদ অস্ট্রিয়ায় পৌঁছলে অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হাঙ্গেরির বিখ্যাত নেতা লুই কসুথ ৩রা মার্চ ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে তীব্র ভাষায় অস্ট্রিয়ার অনুদার ও জাতীয়তাবাদ-বিরোধী নীতির সমালোচনা করেন। এর প্রতিক্রিয়া হয় তীব্রতর।
  • (২) মেটারনিখের দমননীতিতে বীতশ্রদ্ধ ছাত্র, শ্রমিক, বুর্জোয়া সাধারণ মানুষ উদারনৈতিক সংবিধান এবং ভোটাধিকারের দাবিতে ১৩ই মার্চ রাজধানী ভিয়েনাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। রাস্তায় রাস্তায় অবরোধ গড়ে ওঠে এবং সরকারি সম্পত্তি লুঠ হতে থাকে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ শুরু হয়।
  • (৩) শেষ পর্যন্ত প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে সরকারের সব প্রতিরোধ ভেঙে যায়। প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রতিমূর্তি অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলার মেটারনিখ উপায় না দেখে পদত্যাগ করে ইংল্যান্ডে পালিয়ে যান (১৫ মার্চ)। দীর্ঘ ঊনচল্লিশ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তাঁর পতন ঘটল।
  • (৪) তাঁর পদত্যাগে ইউরোপে ‘দুর্ভেদ্য’ মেটারনিখতন্ত্রের অবসান ঘটে (‘fall of a system hitherto impregnable’)। অধ্যাপক এ. জে. পি. টেলর (Taylor) ভিয়েনার এই অভ্যুত্থানকে বাস্তিল দুর্গের পতনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
  • (৫) অস্ট্রিয়ার সম্রাট প্রথম ফার্দিনান্দ বিপ্লবীদের দাবি মেনে নিয়ে একটি উদারনৈতিক সংবিধান ও জাতীয় সভা গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর ১১ই এপ্রিল এক ‘ঘোষণাপত্র’ মারফত তিনি কৃষকদের বাধ্যতামূলক শ্রমদান থেকে মুক্তি দেন।
  • (৬) কৃষকেরা এই ঘোষণাপত্রটিকে ‘মুক্তির সনদ’ হিসেবে গ্রহণ করে। শেষ পর্যন্ত, এই উদ্যোগ সফল হয় নি। বিপ্লবীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অন্যান্য কারণে ভিয়েনাতে আবার স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

(খ) হাঙ্গেরি

  • (১) হাঙ্গেরি অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং উনিশ শতকের তৃতীয় দশক থেকে হাঙ্গেরির ম্যাৎসিনি’ লুই কসুথ (১৮০২-১৮৯৪ খ্রিঃ)-এর নেতৃত্বে সেখানে রাজনৈতিক সংস্কার ও জাতীয়তাবাদী চেতনার পক্ষে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়।
  • (২) ফ্রান্সের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব হাঙ্গেরিতে নতুন উন্মাদনার সৃষ্টি করে। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৩রা মার্চ লুই কসুথ হাঙ্গেরির পার্লামেন্টে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ হানেন এবং সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি জানান। এর ফল হয় মারাত্মক, গণ-উন্মাদনা নতুন স্তরে উপনীত হয়।
  • (৩) ১৩ই মার্চ মেটারনিখ পদত্যাগ করলে হাঙ্গেরির বিক্ষোভ বিস্ফোরণে পরিণত হয়। হাঙ্গেরি সংসদ একগুচ্ছ নতুন আইন প্রণয়ন করে, যা ‘মার্চ আইন’ নামে পরিচিত। এই আইনগুলি মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়, সামন্ত প্রথা অবলুপ্ত হয়।
  • (৪) অভিজাতদের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের কথা বলা হয়। স্থির হয় যে, অস্ট্রিয়ার সম্রাট হাঙ্গেরির নিয়মতান্ত্রিক প্রধান হিসেবেই থাকবেন, প্রকৃত কর্তৃত্ব থাকবে হাঙ্গেরির সংসদের হাতে। ৩১শে মার্চ ভিয়েনা সরকার এই সংবিধান মেনে নেয়।
  • (৫) বাথিয়ানি-র নেতৃত্বে হাঙ্গেরিতে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় লুই কসুখ ছিলেন এই সরকারের অন্যতম সদস্য। এই সরকার কিন্তু বেশি দিন স্থায়ী নি। হাঙ্গেরিতে বসবাসকারী সার্ব, চেক, ক্রোয়েশিয়, শ্লোভাক, রুখেন প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর মানুষরা কসুথের নেতৃত্বাধীন ম্যাগিয়ার জাতিগোষ্ঠীর কর্তৃত্ব মেনে নিতে রাজি ছিল না।
  • (৬) কেন্দ্রীয় প্রশাসনে ম্যাগিয়ারদের প্রাধান্য, ল্যাটিনের পরিবর্তে ম্যাগিয়ার ভাষাকে হাঙ্গেরির জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি দান প্রভৃতিও তাদের ক্ষুব্ধ করে। অচিরেই অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
  • (৭) ফেব্রুয়ারি বিপ্লবকে কেন্দ্র করে ইতালিতে বিদ্রোহ শুরু হলে এবং বাথিয়ানি সরকার এই বিদ্রোহ দমনের জন্য সেনা পাঠিয়ে ভিয়েনা সরকারকে সাহায্য করলে সরকারের মধ্যেই গোলযোগ শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত এই বিদ্রোহ দমিত হয় এবং হাঙ্গেরিতে অস্ট্রিয়ার আধিপত্য ফিরে আসে। লুই কসুথ ইংল্যান্ডে আশ্রয় নেন।

(গ) বোহেমিয়ায়

  • (১) অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বোহেমিয়ায় চেক জাতিগোষ্ঠী ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শাসক জার্মানরা ছিল সংখ্যালঘু। চেকরা জার্মানদের সমান নাগরিক অধিকার, প্রতিনিধি সভায় সমান প্রতিনিধিত্ব, সমহারে কর প্রদান এবং শিক্ষালয় ও সরকারি কাজে জার্মান ভাষার পাশাপাশি চেক ভাষার সম-মর্যাদা দাবি করে।
  • (২) আন্দোলনের প্রাবল্যে ভিয়েনা সরকার এই দাবিগুলি মেনে নেয়। ইতিমধ্যে ফ্রান্তিসেক পালাকি (Frantisek Palaki)-র নেতৃত্বে চেকরা স্বাধীন চেক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখতে থাকে এবং এই উদ্দেশ্যে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২রা জুন প্রাগ শহরে একটি ‘সর্ব-স্লাভ সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়।
  • (৩) সম্মেলনে উপস্থিত স্লাভ জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত মোরাভিয়ান, পোল, ক্রোট, সার্ব, রুথেনিয়ান, সাইলেসিয়ান প্রভৃতি গোষ্ঠীর মধ্যে প্রবল অনৈক্য ছিল। এই অবস্থায় অস্ট্রিয়ার সেনাপতি ভিন্দিগ্রাস-এর নেতৃত্বে বিশাল সেনাদল বোহেমিয়ার বিপ্লবীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের আন্দোলন দমিত হয় এবং পূর্বে প্রদত্ত তাদের সকল অধিকার বাতিল করা হয়।

(ঘ) ইতালি

  • (১) ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে ইতালি আবার ‘ভৌগোলিক সংজ্ঞা’-য় পরিণত হয়। লম্বার্ডি, ভেনেসিয়া, পার্মা, মডেনা, টাস্কানি ছিল অস্ট্রিয়ার অধীন। নেপলস্ ও সিসিলিতে ছিল বুরবোঁ আধিপত্য। পিডমন্ট-সার্ডিনিয়া ছিল স্বাধীন। রোম ছিল পোপের অধীনে।
  • (২) জুলাই বিপ্লবের সফলতার সংবাদে ইতালির সর্বত্র প্রবল গণ-আন্দোলন শুরু হয়। মিলানে আন্দোলন শুরু হলে অস্ট্রিয়ার ১৩ হাজার সেনা বিনাযুদ্ধে মিলান ত্যাগ করে। ভেনিসে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ড্যানিয়েল ম্যানিন-এর নেতৃত্বে গণ-বিক্ষোভের ফলে অস্ট্রিয় নৌ ও স্থলবাহিনী ভেনিস ত্যাগে বাধ্য হয়।
  • (৩) লম্বার্ডি ও ভেনেসিয়া-য় বিদ্রোহ শুরু হলে অস্ট্রিয়ার শাসকরা পলায়ন করেন। ম্যাসিনির নেতৃত্বে টাস্কানি (৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৪৯ খ্রিঃ) ও রোমে (৯ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৪৯ খ্রিঃ) প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • (৪) পিডমন্ট-সার্ডিনিয়া-র শাসক চার্লস এলবার্ট প্রজাদের দাবি মেনে ‘স্ট্যাটটো’ (Statuto) নামে এক সংবিধান গ্রহণ করেন এবং ইতালি থেকে বিদেশি শাসন বিলোপের উদ্দেশ্যে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের সব উদ্যম ব্যর্থ হয় এবং ইতালিতে স্থিতাবস্থা ফিরে আসে।

(ঙ) জার্মানি

  • (১) ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে জার্মানিতে উদারনৈতিক ভাবধারা বিস্তৃত হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফলে প্রাশিয়া, ব্যাভেরিয়া, ব্যাডেন, স্যাক্সনি, হ্যানোভার, হেগ, উরটেনবার্গ প্রভৃতি জার্মান রাজ্যে প্রবল গণ-আন্দোলন শুরু হয় এবং জনতা উদারনৈতিক সংবিধানের দাবি করতে থাকে।
  • (২) ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৩রা মার্চ ক্ষুদ্র রাজ্য ব্যাডেনে প্রথম উদারনৈতিক সংবিধান চালু হয় এবং এর দ্বারা দায়িত্বশীল মন্ত্রিসভা গঠন, বাক্-স্বাধীনতা, ধর্মাচরণের স্বাধীনতা, জুরি ব্যবস্থা প্রভৃতি প্রগতিশীল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
  • (৩) ক্রমে জার্মানির অন্যান্য রাজ্যে এই ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলেও প্রথমে প্রাশিয়ায় কিন্তু তা হয় নি। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চে কোলন, ব্রেসলাউ এবং বার্লিনে ব্যাপক শ্রমির আন্দোলনে আতঙ্কিত হয়ে প্রাশিয়া-রাজ চতুর্থ ফ্রেডারিক উইলিয়ম একটি সংবিধানের প্রতিশ্রুতি দেন।
  • (৪) এরপর জার্মান জাতীয়তাবাদীরা ফ্রাঙ্কফোর্ট শহরে একটি পার্লামেন্ট আহ্বান করে সমগ্র জার্মানির জন্য একটি সংবিধান রচনার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এটি ছিল জার্মানির ঐক্যের পথে একটি সুদৃঢ় পদক্ষেপ। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয় এবং জার্মানিতে অস্ট্রিয়ার কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

(চ) অন্যান্য দেশে প্রভাব

উপরিউক্ত দেশগুলি ছাড়াও এই বিপ্লব স্পেন, ডেনমার্ক, পর্তুগাল, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে প্রসারিত হলেও দমননীতির চাপে তা স্তব্ধ হয়ে যায়।

উপসংহার:- ঐতিহাসিক ট্রাভেলিয়ান বলেন যে, “১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ ইউরোপের ইতিহাসে দিক-পরিবর্তন, কিন্তু ইউরোপ এই সময় মোড় ঘুরতে ব্যর্থ হয়।”

(FAQ) ফেব্রুয়ারি বিপ্লব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কখন কোথায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লব সংঘটিত হয়?

২২-২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে।

২. ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সময় ফ্রান্সের রাজা কে ছিলেন?

লুই ফিলিপ।

৩. কোন বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সে দ্বিতীয় বার প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়?

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফলে।

৪. ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের নেতা কারা ছিলেন?

থিয়ার্স, লা মার্টিন।

Leave a Reply

Translate »