বেলজিয়ামের স্বাধীনতা যুদ্ধ

বেলজিয়ামের স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রসঙ্গে ভিত্তিহীন সংযুক্তি, দুই দেশের মিল নেই, বেলজিয়াম ও হল্যান্ডের বৈষম্য, জুলাই বিপ্লবের প্রভাব, গণ অভ্যুত্থান, বেলজিয়ামের স্বাধীনতা ঘোষণা, ভিয়েনা চুক্তির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ, ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়া, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের ভূমিকা, লণ্ডন বৈঠক, পামারস্টোনের বক্তব্য, সমস্যা ধামাচাপা, বেলজিয়াম নীতির সমর্থন, বেলজিয়াম আক্রমণ ও বেলজিয়ামের স্বাধীনতা লাভ সম্পর্কে জানবো।

বেলজিয়ামের স্বাধীনতা যুদ্ধ

স্বাধীনতা যুদ্ধ১৮৩০-১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দ
প্রভাবিতজুলাই বিপ্লব দ্বারা
লণ্ডন বৈঠকনভেম্বর, ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দ
বেলজিয়ামের রাজাপ্রথম লিওপোল্ড
স্বাধীনতা লাভ২২ জানুয়ারি, ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দ
বেলজিয়ামের স্বাধীনতা যুদ্ধ

ভূমিকা:- ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের ভিয়েনা সম্মেলনে বৃহৎ শক্তিবর্গের ইচ্ছানুসারে বেলজিয়ামকে হল্যান্ডের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, এবং এই ব্যাপারে বেলজিয়ামবাসীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয় নি।

ভিত্তিহীন সংযুক্তি

বেলজিয়ামবাসীর পক্ষে এই সংযুক্তি মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না এবং এই সংযুক্তির পক্ষে কোনও দৃঢ় ভিত্তিও ছিল না।

দুই দেশের মিল নেই

ভাষা, ধর্ম, ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা কোনওদিক থেকেই দুই দেশের মধ্যে কোনও মিল ছিল না।

বেলজিয়াম ও হল্যান্ডের বৈষম্য

  • (১) ভাষাগত দিক থেকে বেলজিয়ানরা ছিল কেল্টিক বা ল্যাটিন ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে হল্যান্ডবাসী ওলন্দাজ বা ডাচরা ছিল টিউটনিক।
  • (২) ধর্মের দিক থেকে বেলজিয়ানরা ছিল ক্যাথলিক এবং ডাচরা ছিল ক্যালভিনপন্থী বা প্রোটেস্টান্ট।
  • (৩) অর্থনৈতিক দিক থেকে বেলজিয়ানরা ছিল শিল্পনির্ভর এবং শিল্পে সংরক্ষণের পক্ষপাতী। অপরদিকে, ডাচরা ছিল কৃষি ও বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল এবং এই কারণে অবাধ বাণিজ্যের পক্ষপাতী। বেলজিয়ানরা মনে করত যে, অবাধ বাণিজ্যনীতির ফলেই তাদের বিকাশমান শিল্পগুলি ধ্বংসের সম্মুখীন হচ্ছে।
  • (৪) সংযুক্ত রাষ্ট্রে বেলজিয়ানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সরকারি চাকরি এবং প্রশাসনে ডাচরাই ছিল সর্বেসর্বা। সরকারি পদগুলির প্রায় সবই ছিল তাদের জন্য সংরক্ষিত।
  • (৫) বেলজিয়ানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও আইনসভায় দুই গোষ্ঠীর প্রতিনিধি সংখ্যা ছিল সমান সমান। এইসব কারণে বেলজিয়ানরা এই সংযুক্তির প্রবল বিরোধী ছিল।

জুলাই বিপ্লবের প্রভাব

১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে জুলাই বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সের বুরবোঁ রাজতন্ত্রের উচ্ছেদের ঘটনায় বেলজিয়ানরা উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে।

গণ অভ্যুত্থান

১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে আগস্ট ব্রাসেলস শহরে এক গণ-অভ্যুত্থান ঘটে এবং অচিরেই তা অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে রাজকীয় বাহিনী ব্রাসেলসে পৌঁছলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের বিতাড়িত করে।

বেলজিয়ামের স্বাধীনতা ঘোষণা

বিদ্রোহী জনতা একটি সাময়িক সরকার প্রতিষ্ঠা করে এবং ৪ঠা অক্টোবর বেলজিয়ামের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। সেখানে একটি উদারনৈতিক সংবিধান প্রবর্তিত হয়।

ভিয়েনা চুক্তির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ

রক্ষণশীল শক্তিগুলির পক্ষে বেলজিয়ামের এই নবজাগ্রত জাতীয়তাবাদকে সহ্য করা সম্ভব ছিল না। বেলজিয়ামের স্বাধীনতা ঘোষণা ছিল ভিয়েনা চুক্তির বিরুদ্ধে এক চ্যালেঞ্জ স্বরূপ।

ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়া

বেলজিয়ামের এই বিদ্রোহ দমনের জন্য রুশ-জার ৬০ হাজার সেনা পাঠাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রাশিয়াও যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে। অস্ট্রিয়ার মনোভাবও ছিল তাই।

ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের ভূমিকা

এই অবস্থায় আত্মরক্ষার তাগিদে বেলজিয়াম ফ্রান্সের সাহায্য প্রার্থনা করে এবং ফরাসি সীমান্তের বেশ কিছু স্থান ফ্রান্সকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়। অপরদিকে ইংল্যান্ড বেলজিয়ামে রাশিয়া বা ফ্রান্স কারো হস্তক্ষেপেই রাজি ছিল না এবং বেলজিয়ামের স্বাধীনতার সমর্থক ছিল।

লণ্ডন বৈঠক

এই অবস্থায় ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোন ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে লন্ডনে পঞ্চশক্তির (রাশিয়া, প্রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড) এক বৈঠক ডাকেন।

পামারস্টোনের বক্তব্য

বৈঠকে লর্ড পামারস্টোন অসাধারণ কূটনৈতিক দক্ষতা প্রদর্শন করেন।তিনি বলেন যে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বেলজিয়ামকে পুনরায় হল্যান্ডের কর্তৃত্বাধীনে প্রতিষ্ঠিত করা অবাস্তব এবং সেরকম কিছু হলে তা বৃহৎ শক্তিবর্গের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

সমস্যা ধামাচাপা

ইতি মধ্যে ইতালি, জার্মানি ও পোল্যান্ডে বিদ্রোহ শুরু হলে রাশিয়া, প্রাশিয়া ও অস্ট্রিয়া বিদ্রোহ দমনে তৎপর হয়ে ওঠে।ফলে বেলজিয়াম সমস্যা আপাতত ধামাচাপা পড়ে যায়।

বেলজিয়াম নীতির সমর্থন

বিপ্লবে জর্জরিত ফ্রান্স ইংল্যান্ডের মিত্রতা লাভের আশায় ইংল্যান্ডের বেলজিয়াম নীতিকে সমর্থন করে।

স্বাধীনতার স্বীকৃতি

১৮৩২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ইউরোপের বেশ কিছু দেশ বেলজিয়ামের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি জানায়। স্যাক্সকোবার্গ বংশের প্রথম লিওপোল্ড স্বাধীন বেলজিয়ামের রাজা নির্বাচিত হন।

বেলজিয়াম আক্রমণ

হল্যান্ড কিন্তু তখনও বেলজিয়ামের স্বাধীনতা মেনে নেয় নি। লিওপোল্ড-এর সিংহাসন আরোহণের কয়েকদিনের মধ্যেই হল্যান্ড আবার বেলজিয়াম আক্রমণ করে। বেলজিয়াম পরাজিত হয়।

বেলজিয়ামের স্বাধীনতা লাভ

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের প্রত্যক্ষ বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত হল্যান্ড বেলজিয়ামের স্বাধীনতা মেনে নিতে বাধ্য হয়।তারিখটি ছিল ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২২শে জানুয়ারি।

গুরুত্ব

বেলজিয়ামের স্বাধীনতা লাভ ইউরোপের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যময় ঘটনা। যেমন –

  • (১) বেলজিয়ামের স্বাধীনতা লাভ ছিল ভিয়েনা চুক্তির বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত দ্বারা হল্যান্ড ও বেলজিয়াম সংযুক্ত হয়েছিল। এখন তা বিনষ্ট হল।
  • (২) এই ঘটনা প্রমাণ করল যে শত বিরোধিতা সত্ত্বেও জাতীয়তাবাদের জয় অবশ্যম্ভাবী-তাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।

উপসংহার:- ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লবে যেমন বৈধ অধিকার নীতি পরিত্যক্ত হয়েছিল, তেমনই বেলজিয়ামের স্বাধীনতা লাভ শক্তিসাম্য নীতির উপরেও প্রবল আঘাত হানে।

(FAQ) বেলজিয়ামের স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কোন বিপ্লবের প্রভাবে বেলজিয়ামে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়?

১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লব।

২. বেলজিয়ামকে কার সাথে সংযুক্ত করা হয়েছিল?

হল্যাণ্ড।

৩. কাকে বেলজিয়ামের রাজার স্বীকৃতি দেওয়া হয়?

প্রথম লিওপোল্ড।

৪. লণ্ডন বৈঠক কবে অনুষ্ঠিত হয়?

ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোনের উদ্যোগে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে।

৫. বেলজিয়াম কখন স্বাধীনতা লাভ করে?

২২ জানুয়ারি, ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Reply

Translate »