ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জুলাই বিপ্লবের ফলাফল

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জুলাই বিপ্লবের ফলাফল প্রসঙ্গে ফিশারের মন্তব্য, গণ উন্মাদনা, বেলজিয়ামের উপর প্রভাব, পোল্যাণ্ডের উপর প্রভাব, ইতালির উপর প্রভাব, জার্মানির উপর প্রভাব, স্পেনের উপর প্রভাব, পর্তুগালের উপর প্রভাব, সুইজারল্যান্ডের উপর প্রভাব, নরওয়ের উপর প্রভাব ও ইংল্যান্ডের উপর প্রভাব সম্পর্কে জানবো।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জুলাই বিপ্লবের ফলাফল

ভিয়েনা বন্দোবস্ত১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ
জুলাই বিপ্লব১৮৩০ খ্রিস্টাব্দ
বেলজিয়ামের স্বাধীনতা২২ জানুয়ারি, ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দ
কার্বোনারি আন্দোলনইতালি
কার্লসবার্ড ডিক্রিমেটারনিখ
চার্টিস্ট আন্দোলনইংল্যান্ড
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জুলাই বিপ্লবের ফলাফল

সূচনা:- জুলাই বিপ্লব কেবলমাত্র ফ্রান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ফ্রান্সের সীমানা অতিক্রম করে এই বিপ্লব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সর্বত্রই ব্যাপক গণ-আন্দোলনের সূচনা করে।

ফিশারের মন্তব্য

ঐতিহাসিক ফিশার বলেন যে, “প্যারিসের চুল্লি থেকে উড়ন্ত অগ্নিকণা সমবায়-শাসিত ইউরোপের কাষ্ঠখণ্ডের উপর পড়ে এক দাবানলের সৃষ্টি করে।”

গণ উন্মাদনা

বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, ইতালি, জার্মানি, স্পেন, পর্তুগাল, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন – সর্বত্রই এক গণ-উন্মাদনা দেখা দেয় এবং এর ফলে ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের ভিয়েনা বন্দোবস্ত চিরতরে বানচাল হয়ে যায়।

বেলজিয়াম

  • (১) ভিয়েনা ব্যবস্থা অনুসারে বেলজিয়ামকে হল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং এজন্য বেলজিয়ামবাসীর কোনও মতামত নেওয়া হয় নি। ভাষা, কৃষ্টি, ধর্ম, ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ কোনওদিক থেকেই দুই দেশের মধ্যে মিল ছিল না। স্বভাবতই বেলজিয়ামবাসী এই সংযুক্তি মানতে পারে নি।
  • (২) ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ফ্রান্সে দশম চার্লস সিংহাসনচ্যুত হলে বেলজিয়ামবাসী উদ্বুদ্ধ হয় এবং ২৫শে আগস্ট ব্রাসেলস শহরে এক গণ-অভ্যুত্থান ঘটে। অচিরেই এই বিদ্রোহ বেলজিয়ামের অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
  • (৩) বিদ্রোহ দমনের জন্য রাজকীয় বাহিনী ব্রাসেলস-এ প্রবেশ করলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের বিতাড়িত করে। বিদ্রোহীরা একটি বিকল্প সরকার গঠন করে এবং ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা অক্টোবর বেলজিয়ামের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। প্রথম লিওপোল্ড হলেন স্বাধীন বেলজিয়ামের প্রথম নির্বাচিত রাজা।
  • (৪) হল্যান্ড এই স্বাধীনতা মানতে রাজি ছিল না। অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া ও রাশিয়াও এর বিরোধী ছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোন-এর উদ্যোগে লন্ডনে পাঁচটি দেশের এক সম্মেলনে বেলজিয়ামের স্বাধীনতা মেনে নেওয়া হয় এবং বলা হয় যে, এই পঞ্চশক্তি বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা রক্ষা করবে।
  • (৫) শেষ পর্যন্ত ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ২২শে জানুয়ারি হল্যান্ড বেলজিয়ামের স্বাধীনতা মেনে নেয়। বেলজিয়ামবাসীর এই সাফল্য জাতীয়তাবাদী শক্তির জয় হিসেবে চিহ্নিত হয়।

পোল্যান্ড

  • (১) ভিয়েনা ব্যবস্থা অনুসারে পোল্যান্ডের বৃহত্তর অংশ রাশিয়ার অধীনে এবং বাকি অংশ প্রাশিয়ার অধীনে রাখা হয়। উদারনীতিতে বিশ্বাসী রুশ জার প্রথম আলেকজান্ডার পোল্যান্ডে স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন করেন এবং সেখানে একটি সংবিধান ও নির্বাচিত প্রতিনিধি সভার ব্যবস্থা করা হয়।
  • (২) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং পোল ভাষাকে তাদের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর প্রথম নিকোলাস সিংহাসনে বসেন। তিনি পোল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহার করে নেন।
  • (৩) ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লবের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নভেম্বর মাসে পোল বিপ্লবীরা ওয়ারশ-তে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পোল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত রুশ সেনাপতি কনস্টানটাইন ভয় পেয়ে পোল্যান্ড ত্যাগ করেন। বিপ্লবীরা একটি অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠা করে জার নিকোলাসের কাছে উদারনৈতিক সংস্কার দাবি করে।
  • (৪)  রুশ সেনাবাহিনী পোল্যান্ডে ঢুকে নিষ্ঠুরভাবে বিদ্রোহ দমন করে। রাজধানী ওয়ারশ কার্যত একটি সেনাছাউনিতে পরিণত হয়। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের সংবিধান বাতিল হয়।
  • (৫) ওয়ারশ ও ভিলনা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। শত শত বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত মানুষকে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং পোল্যান্ডের এই অঞ্চলকে আবার রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ইতালি

  • (১) জুলাই বিপ্লবের ঢেউ ইতালির উপর প্রবল আঘাত হানে। ইতালির জাতীয়তাবাদীরা বৈদেশিক শাসনের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই ব্যাপারে ‘কার্বোনারি’ ও অন্যান্য গুপ্ত সমিতিগুলির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
  • (২) পোপের রাজ্য রোমানা ও বোলোনা এবং মডেনা, পার্মা প্রভৃতি স্থানে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। পোপের রাজ্যদুটি স্বাধীন হয়ে যায়। মডেনার অধিপতি চতুর্থ ফ্রান্সিস ক্ষমতাচ্যুত হন। পার্মার রানি মারিয়া লুহারও একই পরিণতি ঘটে।
  • (৩) শেষ পর্যন্ত মেটারনিখের দমননীতির ফলে এইসব আন্দোলন দমিত হলেও তা চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া সম্ভব হয় নি বা এই বিদ্রোহগুলি একেবারে নিষ্ফল হয় নি।

জার্মানি

  • (১) ভিয়েনা সম্মেলনে জার্মানির ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় নি বা জনগণ কোনও রাজনৈতিক অধিকার লাভ করে নি। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবের ফলে জার্মানি উত্তাল হয়ে ওঠে। গাটিংজেন, কাসেল, ড্রেসডেন, লাইপজিগ, ব্রান্সউইক প্রভৃতি নগরে উদারনৈতিক বিদ্রোহ শুরু হয়।
  • (২) উত্তর জার্মানির হ্যানোভার, হেস, স্যাক্সনি, ব্রান্সউইক প্রভৃতি রাজ্যের শাসকরা জনতার দাবি মেনে উদারনৈতিক শাসনতন্ত্র চালু করতে বাধ্য হন।
  • (৩) দক্ষিণ ব্যাভেরিয়া, উরটেনবার্গ, ব্যাডেন প্রভৃতি রাজ্যে আগে থেকেই সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালু ছিল। গণ-আন্দোলনের ফলে এই রাজ্যগুলিতে সংসদের প্রশাসনিক অধিকার সম্প্রসারিত হয়।
  • (৪) জার্মানবাসীর এই সাফল্য ছিল সাময়িক। মেটারনিখের দমননীতির ফলে অচিরেই পূর্বাবস্থা ফিরে আসে এবং কার্লসবাড ডিক্রিতে আরও ছয়টি দমনমূলক নীতি যোগ করে জার্মান প্রগতিশীলতার কণ্ঠ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়।

স্পেন

  • (১) স্পেনে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় তবে জুলাই বিপ্লব নয়—মূলত উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব এবং অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির জন্যই স্পেনে পরিবর্তন আসে।
  • (২) স্পেন-রাজ সপ্তম ফার্দিনান্দের মৃত্যুর পর স্পেনের সিংহাসন নিয়ে তাঁর কন্যা ইসাবেলা এবং ভাতা ডন কারলস (Don Cartes)-র মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। উদারপন্থীদের হাত করার জন্য ইসাবেলা ফ্রান্সের অনুকরণে একটি সংবিধান প্রণয়ন করেন।
  • (৩) শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের হস্তক্ষেপে স্পেনে গৃহযুদ্ধের অবসান এবং কারলস তাঁর দাবি ত্যাগ করেন।

পর্তুগাল

  • (১) পর্তুগালেও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় তবে জুলাই বিপ্লব নয়—মূলত উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব এবং অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির জন্যই পর্তুগালে পরিবর্তন আসে।
  • (২) পর্তুগালে ডোম মিগুয়েল সেখানকার রানি ডোনা মারিয়াকে সিংহাসনচ্যুত করে ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতা দখল করেন। রানি মারিয়া ছিলেন উদারনীতিবাদ ও প্রগতিশীলতার প্রতীক। অপরদিকে মিগুয়েল ছিলেন রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল।
  • (৩) দীর্ঘ দু’বছর গৃহযুদ্ধের পর ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে মারিয়া সিংহাসন ফিরে পান এবং তাঁর দেওয়া ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দের উদারনৈতিক সংবিধান পুনঃপ্রবর্তন করেন। এর দ্বারা সর্বপ্রকার বংশানুক্রমিক সুবিধা তুলে দেওয়া হয়, মঠগুলি ধ্বংস করা হয়, চার্চের ক্ষমতা বিলুপ্ত হয় এবং চার্চের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

সুইজারল্যান্ড

  • (১) বাইশটি ক্যান্টনে বিভক্ত সুইজারল্যান্ডের সরকারে অভিজাতদের প্রাধান্য ছিল এবং ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অধিকাংশ ক্যান্টনে রক্ষণশীল শক্তি সক্রিয় ছিল। এর পর থেকে কয়েকটি ক্যান্টনে ধীরে ধীরে উদারনৈতিক সংবিধান চালু হতে থাকে।
  • (২) গ্রিসের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দেরজুলাই বিপ্লব এবং বেলজিয়ামের মুক্তিসংগ্রাম সুইজারল্যান্ডবাসীকে গভীরভাবে উদ্দীপ্ত করে। ১৮৩০ থেকে ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অধিকাংশ ক্যান্টনে উদারনৈতিক সংবিধান চালু হয়।
  • (৩) এই সীমিত সাফল্যে সুইজারল্যান্ডবাসী কিন্তু খুশি হয় নি অধিকতর সংস্কারের জন্য তাদের ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

নরওয়ে

  • (১) ভিয়েনা সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্ষুদ্র দেশ নরওয়েকে সুইডেনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। নরওয়েবাসী এই সিদ্ধান্ত মানতে পারে নি।
  • (২) ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবকালে তারা প্রাচীন এইডসভোল্ট সংবিধান দাবি করে। সুইডেন-রাজ বার্নাডোট প্রথমে এই দাবি অস্বীকার করেন। পরে অবশ্য তিনি নরওয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং এইডসভোল্ট সংবিধান মেনে নেন।

ইংল্যান্ড

জুলাই বিপ্লবের প্রভাব ইংল্যান্ডেও অনুভূত হয়। গণ-বিক্ষোভের ফলে ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে আইন প্রণয়ন করে নির্বাচন ব্যবস্থায় কিছু সংস্কার সাধন করা হয়। এই আইন জনসাধারণকে খুশি করতে পারে নি। এই কারণে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডে ‘চার্টিস্ট আন্দোলন’ শুরু হয়।

উপসংহার:- ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিপ্লবী উন্মাদনা জাগ্রত করলেও জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে পারে নি।বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ড ছাড়া বিপ্লবী ভাবধারা আর কোথাও সাফল্যমণ্ডিত হয় নি। তা সত্ত্বেও বলতে হয় যে, বিপ্লবী ভাবধারার জাগরণ একেবারে ব্যর্থ হয় নি, এই ব্যর্থতা আরও বৃহত্তর আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব ছিল জুলাই বিপ্লবের পরিপুরক।

(FAQ) ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জুলাই বিপ্লবের ফলাফল সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কখন কোথায় জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়?

১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে।

২. বেলজিয়াম কখন স্বাধীনতা লাভ করে?

২২ জানুয়ারি, ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে।

৩. জুলাই বিপ্লবের প্রভাবে কোথায় চার্টিস্ট আন্দোলন শুরু হয়?

ইংল্যান্ডে।

৪. কোন বিপ্লবকে জুলাই বিপ্লবের পরিপূরক বলা হয়?

১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব।

Leave a Reply

Translate »