কার্বোনারি আন্দোলন

কার্বোনারি আন্দোলন সমিতির নামকরণ, লক্ষ্য, প্রকৃতি, প্রধান কেন্দ্র, সদস্য, ঐক্য সাধনের চেষ্টা, নৈতিকতার উপর গুরুত্ব, বিভিন্ন বিদ্রোহ, ব্যর্থতার কারণ ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

কার্বোনারি আন্দোলন

ধরণগুপ্ত সমিতি
লক্ষ্যইতালির মুক্তি
সমিতির প্রধানমোরলে সালভাতি, জেনারেল পেপ
নেতৃত্বম্যাৎসিনী, গ্যারিবল্ডী
কার্বোনারি আন্দোলন

ভূমিকা :- বৈদেশিক শাসন, সরকারের দমননীতি, জাতীয়তাবাদের উন্মেষ, ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য উপযুক্ত পরিবেশের অভাব প্রভৃতি কারণে উনিশ শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে ইতালিতে বেশ কিছু গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠে।

বিভিন্ন সমিতি

সমিতিগুলির মধ্যে লম্বার্ডির ওয়েলফি, এ্যাডেলফি, পিয়েডমন্টের ফেডারিটি এবং কার্বোনারির কথা বলা যায়।

সমিতি গুলির লক্ষ্য

এই গুপ্ত সমিতি গুলির লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র পথে বিপ্লবের মাধ্যমে ইতালির বন্ধন মোচন।

উল্লেখযোগ্য সমিতি

এইসব গুপ্ত সমিতির মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ছিল ‘কার্বোনারি।

নামকরণ

ইংরেজিতে ‘কার্বন’ কথার অর্থ কাঠকয়লা। ধর্মীয় প্রথা অনুসারে এর সদস্যরা কাঠকয়লা পোড়াত বলে এদের ‘কার্বোনারি’ বলা হত।

কার্বোনারি সমিতির লক্ষ্য

সন্ত্রাস, গুপ্তহত্যা ও বিপ্লবের পথে বিদেশির কবল থেকে ইতালিকে মুক্ত করে সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য।

নৈতিকতার উপর গুরুত্ব

বাস্তব জগতের সঙ্গে তাদের কোনও যোগ ছিল না এবং এক ধরনের ধর্মীয় উন্মাদনা তাদের সব চিন্তাধারাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। ব্যক্তিগত নৈতিকতার উপর তারা খুব গুরুত্ব আরোপ করত।

প্রকৃতি

সমিতির প্রকৃতি সম্পর্কে ম্যারিয়ট লিখছেন যে, “রীতির দিক থেকে আংশিক ধর্মীয়, আদর্শবাদের দিক থেকে কিছুটা উদ্ভট কার্বোনারি ছিল মুষ্টিমেয়তান্ত্রিক এবং সাংগঠনিক ভাবে প্রায় স্বৈরতন্ত্রী। ……. এ সত্ত্বেও এই সংগঠন স্বাধীনতা ও প্রগতির পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।”

ঐক্য সাধনের প্রয়াস

সাধারণ মানুষের সঙ্গে এদের কোনও যোগ ছিল না বা কোনও নির্দিষ্ট কর্মসূচি ছিল না। ষড়যন্ত্র, গুপ্তহত্যা ও নাশকতামূলক কাজকর্মের মাধ্যমে তারা ইতালির ঐক্যসাধনে প্রয়াসী হন।

প্রধান কেন্দ্র

নেপলস -এর প্রধান কেন্দ্র হলেও সম্প্র ইতালি, এমনকী ইতালির বাইরেও এর শাখা ছিল। এই সমিতির বিশেষ কোনও শ্রেণিভিত্তি না থাকলেও এখানে মধ্যবিত্তদেরই সংখ্যাধিক্য ছিল।

সদস্য

দেশের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় বহু মানুষ ও বুদ্ধিজীবী এই সমিতিতে যোগদান করে। কেবল সিসিলি ও নেপলসেই এর সদস্য সংখ্যা ছিল বেশ কয়েক হাজার।

বিদ্রোহ

  • (১) ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ‘কার্বোনারি’-র উদ্যোগে এবং জেনারেল পেপ -এর নেতৃত্বে নতুন সংবিধানের দাবিতে নেপলস্-এ বিদ্রোহ দেখা দেয়।
  • (২) আন্দোলনের চাপে বুরবোঁ বংশীয় রাজা প্রথম ফার্দিনান্দ একটি সংবিধানের প্রতিশ্রুতি দেন। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রিয়ার হস্তক্ষেপে এই বিদ্রোহ দমিত হয়। প্রস্তাবিত সংবিধানটি বাতিল হয় এবং বহু বিপ্লবীকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়।
  • (৩) ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে সান্তা রোসা-র নেতৃত্বে পিডমন্ট-এ বিদ্রোহ শুরু হয় এবং অচিরেই তা লম্বার্ডি, পোপের রাজ্য, পার্মা ও মডেনা-য় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রিয়ার সেনাবাহিনী সর্বত্রই তা কঠোর হস্তে দমন করে।
  • (৪) ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের জুলাই বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কার্বোনারি ও অন্যান্য গুপ্ত সমিতির উদ্যোগে মধ্য ইতালির বিভিন্ন রাজ্যে প্রবল গণ-অভ্যুত্থান শুরু হয়।
  • (৫) মধ্য ইতালিতে প্রথমে পোপের রাজ্যে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং সেখানে একটি স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • (৬) এরপর পিডমন্ট, পার্মা ও মডেনায় এই বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। বিপ্লবীদের সাফল্য ছিল সাময়িক। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রিয়া ও পোপের বাহিনী এই বিপ্লবগুলি স্তব্ধ করে দেয়।

ব্যর্থতা

‘কার্বোনারি’ আন্দোলনের ব্যর্থতার পেছনে নানা কারণ ছিল। যেমন –

  • (১) এই বিদ্রোহগুলি ছিল বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন, অপরিকল্পিত এবং আঞ্চলিক। জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ আবেগ তাড়িত কিছু মানুষ এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
  • (২) এই আন্দোলনের পেছনে কোনও জনসমর্থন ছিল না।
  • (৩) বিদ্রোহী নেতৃবৃন্দ এমন কোনও কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেন নি, যার ফলে জনগণ তাঁদের আন্দোলনে সামিল হয়।
  • (৪) যোগ্য নেতৃত্বের অভাব।
  • (৫) উপযুক্ত রাজনৈতিক আদর্শ ও গঠনমূলক পরিকল্পনার অভাব।
  • (৬) সামরিক দুর্বলতা।
  • (৭) বিদ্রোহীদের মধ্যে অনৈক্য ‘কার্বোনারি দের ব্যর্থতার জন্য দায়ী ছিল।

গুরুত্ব

ব্যর্থতা সত্ত্বেও এই আন্দোলনের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। যেমন –

(১) নতুন পন্থার উপলব্ধি

এই আন্দোলনের ব্যর্থতা তাদের কর্মপদ্ধতির ত্রুটির কথাই প্রমাণ করে। অনেকেই উপলব্ধি করেন যে, আন্দোলনের পদ্ধতি ও পন্থার পরিবর্তন আবশ্যক।

(২) রিসরর্জিমেন্টোর সূচনা

এই আন্দোলনের ব্যর্থতার পর সমগ্র ইতালিতে জাতীয়তাবাদী জাগরণ বা ‘রিসরর্জিমেন্টো’ (Risorgimento) বা পুনরজাগরণের দ্বিতীয় পর্বের সূচনা হয়।

(৩) ইতালিবাসীর জাগরণ

এই আন্দোলনের ফলে ইতালিবাসী তাদের অতীত গৌরব সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনের প্রথম পর্বের সূচনা হয়েছিল ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তীকালে। ইতালির ঐক্য আন্দোলন -এ দ্বিতীয় পর্বের এই জাগরণের মূল্য অপরিসীম।

(৪) সাহিত্য ও পত্রিকা প্রকাশ

বিভিন্ন গ্রন্থাদি ও সাময়িকপত্র মারফত ইতালীয়দের মনে বিদেশি শাসনের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ সঞ্চার এবং জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানানো হয়। জিওবার্টি এবং আজেগলিয়ো ছিলেন এই পর্বের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য লেখক। কাউন্ট ক্যাভুর সম্পাদিত ‘রিসরর্জিমেন্টো’ ছিল এই পর্বের সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী পত্রিকা।

উপসংহার :- ইতালি বুঝতে পারে যে, বিভিন্ন রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত শাসকেরা নিজেরা অতি দুর্বল। অস্ট্রিয়ার শক্তি তারা শক্তিমান এবং তাদের প্রধান শত্রু অস্ট্রিয়া।

(FAQ) কার্বোনারি আন্দোলন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কার্বোনারি দলের প্রধান কারা ছিলেন?

মোরলে সালভাতি ও জেনারেল পেপ।

২. কার্বোনারি দলের দুজন নেতার নাম লেখ।

ম্যাৎসিনী ও গ্যারিবল্ডী।

৩. কার্বোনারি দলের লক্ষ্য কী ছিল?

সন্ত্রাস, গুপ্তহত্যা ও বিপ্লবের পথে বিদেশির কবল থেকে ইতালিকে মুক্ত করা।

Leave a Reply

Translate »