ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণ

১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২২-২৪ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সে সংঘটিত ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকদের মতামত হিসেবে কোবানের মত, টেলরের মত, প্রুধোঁর মত, গ্ৰেনভিলের মত, লা মার্টিনের মত, বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রাধান্য, জনসমর্থনের অভাব, শ্রমিক অসন্তোষ, দুর্বল বিদেশনীতি, অর্থনৈতিক সংকট, প্রত্যক্ষ কারণ, জুলাই রাজতন্ত্রের অবসান, দ্বিতীয় ফরাসি প্রজাতন্ত্র, প্রথম ফরাসি প্রজাতন্ত্র ও বিপ্লবের মেয়াদ সম্পর্কে জানবো।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণ

সময়কাল২২-২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ
স্থানপ্যারিস
নেতাথিয়ার্স, লা মার্টিন
রাজালুই ফিলিপ
ফলাফলপ্রজাতন্ত্র স্থাপন
ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণ

ভূমিকা:- ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে লুই ফিলিপ ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হন। দীর্ঘ আঠারো বছর শাসনের পর মাত্র তিনদিনের বিপ্লবে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে ফেব্রুয়ারি তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।

ঐতিহাসিকদের মতামত

জুলাই রাজতন্ত্রের অবসানের পর ফ্রান্সে ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়। জুলাই রাজতন্ত্রের পতনবা ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণ সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা একমত নন। যেমন –

(১) কোবানের মত

ঐতিহাসিক কোবান-এর মতে, “এই বিপ্লব ছিল একটি দুর্ঘটনা মাত্র”।তাঁর মতে ১৮৩০ থেকে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সরকার দেশে এমন কোনও মৌলিক পরিবর্তন আনে নি, যার জন্য বিপ্লবহাতে পারে। আসলে ফ্রান্সের রাষ্ট্রকাঠামোর অন্তর্নিহিত দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাই এই বিপ্লবের জন্ম দেয়।

(২) এ জে পি টেলরের মত

ঐতিহাসিক এ জে পি টেলর বলেন যে, যে সব দাবিতে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তার জন্য বিপ্লব দরকার ছিল না। তাঁর মতে, বিপ্লবের জন্যই বিপ্লব হয়েছিল (“The Revolution was, infact its own object.”)।

(৩) প্রুধোঁর মত

সমাজতন্ত্রী প্রুধোঁ (Proudhan) বলেন যে, এই বিপ্লবের পেছনে কোনও চিন্তাভাবনা ছিল না (“It was made without an idea.”)। কোনও কারণ ছাড়াই বিপ্লব ঘটল – এই বক্তব্য অনৈতিহাসিক।

(৪) গ্ৰেনভিলের মত

ঐতিহাসিক গ্রেনভিল বলেন যে, “১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবকে নিছক দুর্ঘটনা ও আকস্মিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।” তিনি বুর্জোয়াদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সাধারণ মানুষের প্রতি সরকারের উদাসীনতাকে বিপ্লবের অন্যতম কারণ বলে অভিহিত করেছেন।

(৫) লা মার্টিনের মত

ফ্রান্সের প্রখ্যাত কবি ও রাজনীতিক লা-মার্টিন (Lamartine) বলেন যে, রাজতন্ত্রের স্থবিরত্বে “ফ্রান্স ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়েছিল।” মানুষ এর থেকে মুক্তি চাইছিল।

বিভিন্ন কারণের সমাহার

সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ও অন্তর্দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক দুর্দশা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা—সব মিলিয়েই বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি হয়।

বুর্জোয়া শ্রেণির প্রাধান্য

  • (১) লুই ফিলিপের সরকার ‘বুর্জোয়া রাজতন্ত্র’ নামে পরিচিত ছিল। তিনি যে পার্লামেন্টকর্তৃক নির্বাচিত হন তা ছিল একটি বুর্জোয়া পার্লামেন্ট। এই পার্লামেন্টের সদস্যরা নির্দিষ্টপরিমাণ সম্পত্তির অধিকারী ব্যক্তিদের ভোটে নির্বাচিত হতেন।
  • (২) তাঁরা সর্বদা বুর্জোয়া বা সম্পত্তিভোগী শ্রেণির স্বার্থই দেখতেন। তকভিল বলেন যে, বুর্জোয়া মানসিকতা গোটা সরকারকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এছাড়া এই পার্লামেন্টে লুই ফিলিপের নির্বাচনও সর্বসম্মত ছিল না। পার্লামেন্টের ৪৩০ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ২১৯ জন তাঁর পক্ষে ভোট দেন।
  • (৩) ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত শ্রমিক, কৃষক ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি এই পার্লামেন্ট বা তার মনোনীত রাজতন্ত্রকে মেনে নিতে পারে নি। ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন বলেন যে, জুলাই বিপ্লবের ফলাফলের মধ্যেই ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পটভূমি সৃষ্টি হয়েছিল।

জনসমর্থনের অভাব

এই সময় ফ্রান্সে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয়। এগুলির মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির যথেষ্ট পার্থক্য ছিল। রাজা লুই ফিলিপের পক্ষে কোনও রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছিল না। যেমন –

  • (১) ন্যায্য অধিকারবাদ বা রাজতন্ত্রের সমর্থকরা মনে করত যে, ফরাসিসিংহাসনের উপর লুই ফিলিপের কোনও বৈধ অধিকার নেই। তাঁদের চোখে লুই ফিলিপ ছিলেন অবৈধ বা বেআইনি শাসক। তাঁরা বুরবোঁ বংশের দশম চার্লসের উত্তরাধিকারী ডিউক অব বেরি-কেই ফরাসি সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকারী বলে মনে করতেন।
  • (২) ক্যাথলিকরা লুই ফিলিপ-প্রবর্তিত ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির ঘোরতর বিরোধী ছিল। তারা তাদের পূর্বতন সুযোগ-সুবিধাগুলি পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হয়।
  • (৩) ‘বোনাপার্টিস্ট’বা নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অনুগামীরা তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র লুই বোনাপার্টকে ফ্রান্সের সিংহাসনে বসাতে উৎসাহী ছিল।
  • (৪) প্রজাতান্ত্রিকরাও এই রাজতন্ত্রের প্রতি প্রবল ক্ষুব্ধ ছিলেন, কারণ সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটাধিকার আইনের ফলে দেশের বৃহত্তম সংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। এছাড়া, লুই ফিলিপের সরকার ভোটগ্রহণে নানা দুর্নীতি ও মিথ্যাচারের আশ্রয় গ্রহণ করে আইনসভা ও গণতন্ত্রকে মিথ্যা প্রহসনে পরিণত করে।
  • (৫) রাজনৈতিক দলগুলির সমর্থন লাভে বঞ্চিত হয়ে লুই ফিলিপ উচ্চবিত্ত ভূস্বামী, বণিক ও শিল্পপতিদের স্বার্থে ও তাদের দ্বারাই শাসনকাজ পরিচালনা করতে থাকেন। সম্পত্তির ভিত্তিতে জাতীয় সভার ভোটাধিকার ও সদস্য হওয়ার অধিকার থাকায় ভোটারদের সংখ্যা ছিল খুবই কম।
  • (৬) নির্বাচনে কারচুপি ও ভোটারদের নানাভাবে প্রভাবিত করে লুই ফিলিপ নিজ ইচ্ছামতো ব্যক্তিদের নির্বাচিত করে আনতেন। এর ফলে আইনসভা তার স্বাধীন চরিত্র হারিয়ে রাজার আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
  • (৭) এই কারণে থিয়ার্স মন্তব্য করেন যে, আইনসভা হল “একটি বড়ো বাজার” যেখানে সদস্যরা নিজেদের “বিবেক বিনিময় করেন কোনও পদ বা মর্যাদার পরিবর্তে।” এইভাবে জুলাই রাজতন্ত্র বুর্জোয়া শ্রেণির নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

শ্রমিক অসন্তোষ

  • (১) ফ্রান্সে শিল্প বিপ্লবের আদি পর্বে শ্রমিকদের সংখ্যা প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ছোটো কারখানাগুলিতে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল পরিবার-পরিজনসহ প্রায় ৫০ লক্ষ। বড়ো কারখানাগুলিতে কাজ করত প্রায় ১০ লক্ষ শ্রমিক। তাদের নানারকম অসহনীয় অবস্থার মধ্যে জীবনধারণ করতে হত।
  • (২) কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের বেশি পরিমাণে খাটাত,কম মজুরি দিত এবং ইচ্ছামতো ছাঁটাই করত। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে শ্রমিকদের বসবাসকরতে হত। শ্রমিকদের কল্যাণসাধনের জন্য জুলাই রাজতন্ত্র কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করে নি। এর ফলে শ্রমিকদের মধ্যে নানারকম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।
  • (৩) লুই ব্ল্যাঙ্ক, সেন্ট সাইমন প্রমুখ সমাজতন্ত্রী শ্রমিক শ্রেণির সমর্থনে এগিয়ে আসেন। বিশিষ্ট সমাজতন্ত্রী লুই ব্র্যাঙ্ক এই সময় ‘অর্গানাইজেশন অব লেবার’ নামে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি বলেন যে, একমাত্র বুর্জোয়া পরিচালিত রাজতন্ত্রের অবসানের মাধ্যমেই শ্রমিকদের দুর্গতিমোচন সম্ভব।
  • (৪) তিনি আরও বলেন যে, কর্মহীন ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এই কারণে তিনি ‘জাতীয় কর্মশালা’ খুলে বেকারদের কর্মসংস্থানের দাবি জানান।
  • (৫) অগাস্তে ব্ল্যাঙ্কি গঠন করেন ‘সোসাইটি অফ ফ্যামিলিস’ নামে এক গোপন সংগঠন। শ্রমিক শ্রেণি প্রজাতন্ত্রীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে রাজতন্ত্র-বিরোধী আন্দোলন শুরু করে এবং বিভিন্ন স্থানে উভয় দলের গুপ্ত সমিতি গড়ে উঠতে থাকে।
  • (৬) লিয়ঁ, নন্টস, প্যারিস, প্রোভেন্স, স্ট্রাসবুর্গ, বোলন প্রভৃতি শহরে শ্রমিকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ঐতিহাসিক ম্যারিয়ট-এর মতে, শ্রমিক অসন্তোষই জুলাই রাজতন্ত্রের পতনের কারণ।

দুর্বল বিদেশ নীতি

  • (১) লুই ফিলিপের নিষ্ক্রিয় ও দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি তাঁর পতনের অন্যতম কারণ। তাঁর পররাষ্ট্র নীতির মূল লক্ষ্য ছিল বৈদেশিক ক্ষেত্রে যুদ্ধ এড়িয়ে চলা এবং যে কোনও মূল্যে শান্তি বজায় রাখা।
  • (২) ফরাসি সিংহাসনে তাঁর কোনও বংশানুক্রমিক অধিকার ছিল না বলে ইউরোপের রাজন্যবর্গ তাঁকে সহ্য করতে পারতেন না। তিনি মনে করতেন যে, কোনওভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে ইউরোপীয় শক্তিগুলি তাঁকে উচ্ছেদ করবে।
  • (৩) এই কারণে তিনি শান্তিপূর্ণ বিদেশ নীতির সমর্থক ছিলেন। পোল্যান্ড ও ইতালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তিনি নিরপেক্ষ ছিলেন। বেলজিয়ামের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব গ্রহণে ফ্রান্স ব্যর্থ হয়। মিশর-তুরস্কের বিরোধে ফ্রান্স ভ্রান্ত নীতি গ্রহণ করে ব্যর্থ হয়।
  • (৪) পারিবারিক স্বার্থে স্পেনের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়ে তিনি ফ্রান্সের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেন এবং ইংল্যান্ডের বিরাগভাজন হন। এর ফলে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আফ্রিকা ও নিকট প্রাচ্যেও ফ্রান্স ব্যর্থ হয়।
  • (৫) তাঁর শান্তিবাদী, নিষ্ক্রিয় নীতির ফলে গৌরব-লোভী ফরাসি জাতি ও বোনাপার্টিস্টরা তাঁর বিরোধী হয়ে ওঠে। হারনশ বলেন যে, “অল্পসংখ্যক মধ্যবিত্ত ছাড়া কেউ তাঁকে চায় নি ও সম্মান করে নি।”

অর্থনৈতিক সংকট

  • (১) ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর হয়ে ওঠে। ১৮৪৪-১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে পরপর কয়েক বছরের অজন্মা, খরা ও শস্যহানির ফলে ফ্রান্সে প্রবল খাদ্য সংকট দেখা দেয়।
  • (২) ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় ১৮৪৭-১৮৪৮ সালে রুটির দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে মন্দা দেখা দেয়, বেকার সমস্যা শুরু হয় এবং কর্মহীন কৃষক ও শ্রমিকদের দারিদ্র্য চরমে পৌঁছায়।
  • (৩) আর্থিক সমস্যা সমাধানে অক্ষম সরকারের পতন ঘটাতে মানুষ তৎপর হয়ে ওঠে। দেশের নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ শুরু হয়। লা-ভেণ্ডি ও প্রোভেন্সে বুরবোঁ রাজতন্ত্রের সমর্থকরা, বোলন ও স্ট্রাসবার্গে বোনাপার্টিস্টরা এবং প্যারিস, লিয়ঁ প্রভৃতি শহরে শ্রমিকরা বিদ্রোহ শুরু করে।
  • (৪) লুই ফিলিপ কাঠোর দমননীতির মাধ্যমে বিদ্রোহ দমন করায় বিভিন্ন শ্রেণির জনগণের মধ্যে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
  • (৫) জ্যাক ডজ অবশ্য এই আর্থ-সামাজিক কারণ মানতে রাজি নন। তাঁর মতে, আর্থ-সামাজিক কারণে বিপ্লব হলে তা ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দেই সংঘটিত হত পরে নয়। তাঁর মতে, ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে মন্দা কেটে যায়। কোবানও তাই মনে করেন।
  • (৬) জ্যাক ড্রজ বলেন যে, লুই ফিলিপ বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করার ফলে এক শ্রেণির সঙ্গে অপর শ্রেণির দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এই শ্রেণিবৈষম্য বা দ্বন্দ্বই বিপ্লবের মূল কারণ।

প্রত্যক্ষ কারণ

  • (১) অ্যালফ্রেড কোবান লিখছেন যে, ফ্রান্সের ঘরে-বাইরে লুই ফিলিপের নিষ্ফল ও ক্লীব নীতিতে জনগণ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কবি লা-মার্টিন মন্তব্য করেছেন যে, “ফ্রান্স ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।”
  • (২) বিপ্লবের কিছু আগে তকভিল লিখছেন—“আমরা একটি আগ্নেয়গিরির উপর ঘুমিয়ে আছি… বিপ্লবের হাওয়া বইছে, দিগন্তে ঝড়ের আভাস।”
  • (৩) জাতীয় জীবনের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে থিয়ার্স, লা-মার্টিন প্রমুখ সংস্কারপন্থী নেতৃবৃন্দ (প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী দল) ভোটাধিকার সংস্কার, সম্প্রসারণ এবং আইনসভার নির্বাচনে দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
  • (৪) নানা স্থানে সভা-সমিতি গড়ে উঠতে থাকে। এই সভাগুলির নাম ছিল ‘সংস্কার ভোজসভা। সমাজের নানা মত ও স্তরের মানুষ এগুলিতে সমবেত হতে থাকে। ভোটাধিকার সম্প্রসারণই ছিল এর মূল কথা।
  • (৫) ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই দাবিতে প্রায় ৭০টি জনসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ১ লক্ষ ৭০ হাজার মানুষ এই দাবির পক্ষে স্বাক্ষর করে।
  • (৬) লুই ফিলিপ ও তাঁর প্রতিক্রিয়াশীল প্রধানমন্ত্রী গিজো এই দাবি অগ্রাহ্য করলে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২২শে ফেব্রুয়ারি বিরোধীদলগুলি প্যারিসে এক বিশাল জনসভা আহ্বান করে। পুলিশ এই জনসভা ভেঙে দিলেসারা প্যারিস উত্তাল হয়ে ওঠে।
  • (৭) শ্রমিক শ্রেণি পথে নামে। রাস্তায় ‘ব্যারিকেড গড়ে ওঠে। ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’-কে পথে নামানো হয়। তারা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে গুলি চালাতে অস্বীকার করে। জনতার কণ্ঠে স্লোগান ওঠে ‘সংস্কার দীর্ঘজীবী হোক”, “গিজো নিপাত যাক।
  • (৮) সন্ত্রস্ত লুই গিজোকে পদচ্যুত করেন এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। ২৩শে ফেব্রুয়ারি বিক্ষুব্ধ জনতা প্রধানমন্ত্রী গিজো-র বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে থাকলে বাসগৃহের রক্ষীদের গুলিতে ২৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়।

জুলাই রাজতন্ত্রের অবসান

গিজোর বাসভবনে হত্যার ঘটনা সারা প্যারিসে প্রবলউত্তেজনার সৃষ্টি করে এবং বিক্ষুব্ধ জনতা লুই ফিলিপের পদচ্যুতির দাবিতে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে। লুই ফিলিপ তাঁর পৌত্রের অনুকূলে সিংহাসন ত্যাগ করে (২৪শে ফেব্রুয়ারি) ইংল্যান্ডে আশ্রয় নিলে জুলাই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে।

দ্বিতীয় ফরাসি প্রজাতন্ত্র

১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত এই ঘটনা ফেব্রুয়ারি বিপ্লব নামে পরিচিত। প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী নেতৃত্ব যুগ্মভাবে ফ্রান্সকে ‘প্রজাতন্ত্র’ বলে ঘোষণা করে (২৬শে ফেব্রুয়ারি)। এই প্রজাতন্ত্র ছিল “দ্বিতীয় ফরাসি প্রজাতন্ত্র।

প্রথম ফরাসি প্রজাতন্ত্র

১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে রাজা ষোড়শ লুই কারারুদ্ধ হওয়ার পর’ন্যাশনাল কনভেনশন’ প্রথমবার ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেছিল।

বিপ্লবের মেয়াদ

এই বিপ্লবের মেয়াদ ছিল মাত্র তিনদিন (২২-২৪ ফেব্রুয়ারি)। তকভিল বলেন যে, “আমাদের সমস্ত বিপ্লবের মধ্যেএই বিপ্লব ছিল ক্ষণস্থায়ী এবং সর্বাপেক্ষা কম রক্তক্ষয়ী।” মাত্র তিনদিনের বিপ্লবেই ফ্রান্সের ইতিহাস পাল্টে যায়।

উপসংহার:- ফেব্রুয়ারি বিপ্লব একমাত্র প্যারিস নগরীতেই সংঘটিত হয়। এই বিপ্লবে ফ্রান্সের অন্য শহর বা গ্রামাঞ্চলের কোনও ভূমিকা ছিল না। প্যারিসই ছিল বিপ্লবের প্রাণকেন্দ্র এবং প্যারিস নগরীই সমগ্র ফ্রান্সের ভাগ্য নির্ধারণ করে।

(FAQ) ফ্রান্সে সংঘটিত ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কখন, কোথায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লব সংঘটিত হয়?

২২-২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে।

২. ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সময় ফ্রান্সের রাজা কে ছিলেন?

লুই ফিলিপ।

৩. কোন বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সে দ্বিতীয় বার প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়?

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফলে।

৪. ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের নেতা কারা ছিলেন?

থিয়ার্স, লা মার্টিন।

Leave a Reply

Translate »