পোপতন্ত্র-রাজতন্ত্র দ্বন্দ্ব

পোপতন্ত্র-রাজতন্ত্র দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে পোপতন্ত্র, পোপতন্ত্রের উত্থান, পোপতন্ত্রের বিকাশ, খ্রিস্টান ধর্মের প্রসারে দ্বিতীয় হেনরির অবদান, দ্বিতীয় কনরাড ও পোপতন্ত্র, তৃতীয় হেনরী ও পোপতন্ত্র, সপ্তম গ্ৰেগরী ও পোপতন্ত্র, জার্মানিতে পোপতন্ত্র, পোপতন্ত্র বনাম রাজতন্ত্র, ফ্রেডারিক বারবারোসা ও পোপতন্ত্র, পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট ও পোপতন্ত্র, ইনভেস্টিচার সংগ্ৰাম, ডিকটেটাস প্যাপী, চতুর্থ হেনরীর দুর্বলতা ও পোপতন্ত্র, পোপতন্ত্র ও ক্যানোসার আত্মসমর্পণ, ব্রিক্সেন সম্মেলন ও পোপতন্ত্র, পোপতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের দ্বন্দ্বের সাময়িক অবসান সম্পর্কে জানবো।

ইউরোপে পোপতন্ত্র-রাজতন্ত্র দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে ইউরোপীয় যুদ্ধ এবং কূটনীতিতে পোপতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ, পোপতন্ত্রের সাথে রাজতন্ত্রের সংঘর্ষ এবং পোপতন্ত্র-রাজতন্ত্র দ্বন্দ্বের সাময়িক অবসান সম্পর্কে জানব।

পোপতন্ত্র-রাজতন্ত্র দ্বন্দ্ব

ঐতিহাসিক ঘটনাপোপতন্ত্র-রাজতন্ত্র দ্বন্দ্ব
শার্লামেনের অভিষেক৮০০ খ্রি
ডিকটেটাস প্যাপীপোপ সপ্তম গ্ৰেগরী
শক্তিশালী পোপতন্ত্রপোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট
পবিত্র শয়তানপোপ সপ্তম গ্ৰেগরী
ক্যানোসার আত্মসমর্পণ২৫ জানুয়ারি ১০৭৭ খ্রি
ব্রিক্সেন ধর্মসভা১০৮০ খ্রি
ওয়ার্মসের চুক্তি১১২২ খ্রি
পোপতন্ত্র-রাজতন্ত্র দ্বন্দ্ব

ভূমিকা :- খ্রিস্টান ধর্মের ধর্মীয় গুরু হিসাবে পোপ নিজেকে সর্বেসর্বা মনে করতেন। পোপের নেতৃত্বে চার্চগুলি ধর্মীয় কেন্দ্ররূপে উল্লেখযোগ্য ছিল। পোপ মধ্যযুগের ইউরোপ-এর বিভিন্ন প্রান্তে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে মনোযোগ দিয়েছিলেন।

পোপতন্ত্ৰ

  • (১) অ্যান্টিয়োক, আলেকজান্দ্রিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে খ্রিস্টান ধর্মের বিস্তার হয়েছিল। খ্রিস্টান ধর্মের বিস্তারের প্রথমদিকে খ্রিস্টান ধর্মের সমর্থকগণ চার্চের সাহায্যে ধর্মপ্রচার করেছিলেন। খ্রীস্টান ধর্মের অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে বিশপ ও আর্চ-বিশপদের ভূমিকা ছিল।
  • (২) রোম ও কনস্টান্টিনোপল খ্রিস্টান ধর্ম ও চার্চের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই পোপের আবির্ভাব। খ্রিস্টানধর্মের শক্তিশালী নেতা রূপে পোপের উত্থান ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার প্রচেষ্টায় মধ্যযুগের ইউরোপ নানাভাবে আন্দোলিত হয়েছিল।

পোপতন্ত্রের উত্থান

  • (১) মধ্যযুগের ইউরোপে প্রধানত পশ্চিম ইউরোপে বহিরাগতদের আক্রমণ জনগণকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। এই রকম জটিল ও সংকটজনক মুহূর্তে খ্রিস্টান ধর্মকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা ছিল। খ্রিস্টানদের একমাত্র আশা-ভরসা ছিল স্বয়ং পোপ। সুতরাং খ্রিস্টানধর্মের রক্ষার ক্ষেত্রে জনগণ পোপের উপরই বেশী নির্ভরশীল ছিল।
  • (২) বহিরাগতদের আক্রমণের ফলে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় নেতাদের উপর খ্রিস্টান ধর্ম রক্ষার দায়িত্ব এসে পড়েছিল। জনগণও পোপ ও ধর্মীয় নেতাদের উপর আস্থা রাখতে শুরু করেছিল। Venantius Fortunatus ‘Nantes এর বিশপ ফেলিক্সকে বলেছিলেন, “আপনি হলেন আপনার স্বদেশকে রক্ষার প্রধান অবলম্বন।”
  • (৩) ইতালিতেও পোপগণ নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মধ্যযুগের পোপদের মধ্যে রোমকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। “প্রথম গ্রেগরী” যিনি মধ্যযুগের ইউরোপের পোপদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছিলেন।

পোপতন্ত্রের বিকাশ

  • (১) L. B. Moss পোপতন্ত্রের বিকাশের ক্ষেত্রে প্রথম গ্রেগরীর অবদানের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ইতালির জনগণের কাছে তিনি অলৌকিক শক্তির অধিকারী ছিলেন। ৮০০ খ্রিস্টাব্দে পোপ তৃতীয় লিও-এর সহায়তায় শার্লামেনের অভিষেক হয়েছিল। ৮০০ খ্রিস্টাব্দের এই ঘটনার মধ্যেই সম্রাট ও পোপের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার বিষয়টি ছিল।
  • (২) সম্রাট ও পোপের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব মধ্যযুগের ইউরোপের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। পোপদের মধ্যে সপ্তম গ্রেগরী, চতুর্থ হেনরী ছিলেন উল্লেখযোগ্য। পোপতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছিলেন অষ্টম বোনিফেস, তৃতীয় ইনোসেন্ট, সপ্তম গ্রেগরী প্রমুখরা। পোপতন্ত্রের উত্থান ও বিকাশের ক্ষেত্রে জার্মানির দ্বিতীয় হেনরী, দ্বিতীয় কনরাড ও তৃতীয় হেনরীরও বিশেষ অবদান ছিল।

খ্রিস্টান ধর্মের প্রসারে দ্বিতীয় হেনরির অবদান

  • (১) জার্মানির সম্রাট হিসাবে শাসনতান্ত্রিক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় হেনরীর (১০০২-১০২৪ খ্রিস্টাব্দ) বিশেষ অবদান ছিল না। কিন্তু ধর্মীয় দিক থেকে তিনি চার্চ ও খ্রিস্টানধর্মের প্রসারে মনোযোগী হয়েছিলেন। বিশপ নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি নিজেই সর্বেসর্বা ছিলেন। জার্মানীর মঠগুলির ভূসম্পত্তি পুনর্বণ্টনের ক্ষেত্রে তাঁর মতামত গুরুত্ব পেয়েছিল।
  • (২) দ্বিতীয় হেনরী যে কেন্দ্রকে অবলম্বন করে খ্রিস্টানধর্ম প্রচার করেছিলেন তা হল ব্যামবার্গ। ১০২৪ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যু হলেও দ্বাদশ শতকের খ্রিস্টান ধর্মের সর্বোচ্চ সম্মান “The Saint” অভিধা তিনি পেয়েছিলেন পোপ তৃতীয় ইউজেনিয়াসের কাছ থেকে।

দ্বিতীয় কনরাড ও পোপতন্ত্র

১০২৪ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কোনিয়ার শাসক দ্বিতীয় কনরাড জার্মানীর সম্রাট হয়েছিলেন। জার্মানীতে চার্চ ও পোপতন্ত্র তার সময়কালে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইতালিতেও তিনি চার্চের সাহায্যে রাজশক্তির ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও চার্চ ও রাজতন্ত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। ইতালিতে বিশপের অধীন অঞ্চলগুলিতে তিনি জার্মান বিশপ নির্বাচনের ব্যবস্থাও করেছিলেন।

তৃতীয় হেনরী ও পোপতন্ত্র

  • (১) ১০৩৯ থেকে ১০৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তৃতীয় হেনরী জার্মানীতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। ধর্ম বিষয়ে তিনি একনিষ্ঠ ছিলেন। অ্যাগনেসকে বিবাহ করার পর ধর্ম সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ বেড়েছিল। ধর্মীয় ক্ষেত্রে ও চার্চের বিষয়ে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
  • (২) হাঙ্গেরিতে খ্রিস্টান বিরোধী প্রবল আন্দোলনকে দমন করার জন্য তৃতীয় হেনরী তিনটি সামরিক অভিযান করিয়েছিলেন। এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে, তৃতীয় হেনরী খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি মনোযোগী হবার রাজনৈতিক কারণও ছিল। কারণ খ্রিস্টান ধর্মের যাজক সম্প্রদায়ের সমর্থন রাজশক্তিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল।
  • (৩) তিনি চার্চ ও খ্রিস্টান ধর্মকে সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে চার্চের সংস্কার সাধনের চেষ্টাও করেছিলেন। “Canon Law” বা যাজকীয় আইনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ক্লুনির মঠের সঙ্গে তৃতীয় হেনরীর যোগাযোগ ছিল। খ্রিস্টান ধর্মের সংস্কারের সাথে তিনি পোপতন্ত্রকেও যুক্ত করতে চেয়েছিলেন।
  • (৪) পোপদের দুর্নীতি, চরিত্রহীনতা, অনৈতিকতাকে লক্ষ্য করে তিনি ১০৪৬ খ্রিস্টাব্দে Sudger কে পোপ দ্বিতীয় ক্লেমেন্ট রূপে নির্বাচিত করেছিলেন। খ্রিস্টান ধর্মীয় গুরুকে ঈশ্বরের সার্থক প্রতিনিধিরূপে দেখানোটাই ছিল তৃতীয় হেনরীর প্রধান লক্ষ্য।

পোপ সপ্তম গ্রেগরী ও পোপতন্ত্র

  • (১) ১০২০ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে হিলডিব্রান্ড জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সময়কাল ছিল ১০২০ থেকে ১০৮৫ খ্রিস্টাব্দ। হিলডিব্রান্ড পোপ সপ্তম গ্রেগরী নামে পরিচিত ছিলেন। পোপ দ্বিতীয় আলেকজান্ডার হিলডিব্রান্ডকে ১০৭৩ খ্রিস্টাব্দে পোপ নির্বাচিত করেছিলেন। রোমান চার্চকে দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্দেশ্যে তিনি সংস্কারকার্য করেছিলেন।
  • (২) পোপতন্ত্রের সঙ্গে রাজতন্ত্রের মধ্যে সংঘাত পোপ সপ্তম গ্রেগরীর সময়ে প্রকাশ্যে এসেছিল। পোপ সপ্তম গ্রেগরী বিচক্ষণতা ও কুটনীতির দিক থেকে অন্য পোপদের থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক এগিয়ে ছিলেন। পোপতন্ত্রকে খ্রিস্টান জগতের সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রচেষ্টা তাঁর মধ্যে দেখা যায়।
  • (৩) যাজক ও পোপতন্ত্র বিরোধীদের ধ্বংস করতে বদ্ধ পরিকর ছিলেন। খ্রিস্টান জগতে সংস্কারের মধ্যে দিয়ে দুর্নীতিমুক্ত করতে তাঁর অবদান কম নয়। খ্রিস্টান জগতে বিশপ, অ্যাবট ও নির্বাচনের ক্ষেত্রে সম্রাটের ভূমিকা ছিল। কিন্তু সপ্তম গ্রেগরী ক্লুনি মঠের আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সম্রাটের ভূমিকার দিকটিকে অবজ্ঞা করেছিলেন।
  • (৪) পোপের নির্বাচনে সম্রাটের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করায় তার সঙ্গে জার্মান সম্রাটের সংঘাত বেধেছিল। ১০৭৩ খ্রিস্টাব্দে পোপের পদ পাওয়ার পর ১০৭৩ খ্রিস্টাব্দে পোপ সপ্তম গ্রেগরী “Dictatus Papae” নামক লেখায় পোপতন্ত্রকে শ্রেষ্ঠ বলে উল্লেখ করেন।

জার্মানীতে পোপতন্ত্র

  • (১) G. Barraclough তাঁর “The Origins of Modern Germany” গ্রন্থে জার্মান রাজতন্ত্রের দিকটি আলোচনা করেছিলেন। জার্মান রাজতন্ত্র নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য চার্চের শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিল। দশম ও একাদশ শতকে স্যাক্সন ও সালিয়ান ফ্রাঙ্ক সম্রাটরা জার্মানীকে সুসংগঠিত করার কাজে যাজক সম্প্রদায়ের সাহায্য পেয়েছিলেন।
  • (২) জার্মানীতে যাজক সম্প্রদায় ও চার্চের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয় হেনরী এবং তৃতীয় হেনরী চার্চের শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিল। চার্চ ও সম্রাটের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব ছিল। ফলে পোপতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছিল। ধর্মীয় ক্ষেত্রে পোপতন্ত্র নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করেছিল।

পোপতন্ত্র বনাম রাজতন্ত্র

  • (১) একাদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে পোপতন্ত্র বিশেষ শক্তি অর্জন করেছিল। পোপতন্ত্র স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সম্রাটের পরিবর্তে নিজেদের সর্বেসর্বা মনে করতে থাকায় সম্রাট ও পোপতন্ত্রের মধ্যে সংঘাতের সূচনা হয়। চতুর্দশ শতকের মধ্যেই পোপতন্ত্র খ্রিস্টান জগতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
  • (২) সম্রাট ও পোপতন্ত্রের দ্বন্দ্বের উদাহরণ হিসাবে চতুর্থ হেনরী ও সপ্তম গ্রেগরীর কথা বলা যায়। ওয়ার্মসের চুক্তির মাধ্যমে সম্রাট পঞ্চম এবং পোপ Calixtus II-এর সংঘাতের অবসান সাময়িকভাবে দেখা যায়। ১১২২ খ্রিস্টাব্দে ওয়ার্মস-এর চুক্তি অনুসারে স্থির হয়েছিল – (i) যাজকদের পরিষদ বিশপ ও অ্যাবট নির্বাচন করবে এবং পোপ তার অনুমোদন দেবে। (ii) বিশপ ও অ্যাবটদের মনোনীত করার পর এরা সামন্তপ্রভুর কাছ থেকে ইনভেস্টিচার গ্রহণ করবে। ফ্রেডারিক বারবারোসা ও পোপ তৃতীয় আলেকজান্ডার

ফ্রেডারিক বারবারোসা ও পোপতন্ত্র

  • (১) পিটার মুঞ্জ তাঁর “Frederick Barbarossa” গ্রন্থে ফ্রেডারিক বারবারোসার ভূমিকার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন যে, রোমান সাম্রাজ্য-এর গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য ফ্রেডারিক বারবারোসার চেষ্টার অন্ত ছিল না। তিনি নিজেকে শার্লামেন এবং মহান অটোর উত্তরসূরী ছাড়াও নিজেকে সিজার-এর সমকক্ষ মনে করতেন।
  • (২) জার্মান সম্রাট হিসাবে তিনি সম্মানিত হয়েছিলেন। ফ্রেডারিক বারবারোসা সম্রাট হিসাবে অভিষেকের জন্য পোপের স্বীকৃতির পরোয়া করেন নি। তার সঙ্গে পোপ তৃতীয় আলেকজান্ডারের সংঘাত বা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। জার্মানি কর্তৃক ইতালির উপর আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্বের সূচনা হয়।
  • (৩) তিনি ইতালির কাছ থেকে কর আদায় করার জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন। ফলে ইতালীয়দের জাতীয়তাবোধে আঘাত লাগে। তার ফলে তারা ফ্রেডারিক বারবারোসার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুললে ফ্রেডারিক বারবারোসা পরাজিত হয়ে পোপের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন এবং পোপের নির্দেশ মেনে নিয়ে তৃতীয় ক্রুসেড-এ অংশগ্রহণ করেন।

পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট ও পোপতন্ত্র

  • (১) পোপ তৃতীয় ইনোসেন্টের সময়কাল ছিল ১১৯৮-১২১৬ খ্রিস্টাব্দ। এই সময়কালে পোপতন্ত্র ও চার্চ তার সর্বোচ্চ ক্ষমতায় পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছিল। ১২০৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স-এর সম্রাট ফিলিপ অগাস্টাসকে বাধ্য করা হয়েছিল তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে। এক্ষেত্রে পোপের চাপে তিনি বহিষ্কারের ভয়ে স্ত্রীকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।
  • (২) ইংল্যান্ড-এর সম্রাট জনকেও বাধ্য করা হয়েছিল পোপের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে। পোপের নির্দেশ মেনে নিয়ে জন পোপের মনোনীত স্টিফেন লাংটনকে ক্যান্টারবেরী চার্চের আর্চ বিশপ নিযুক্ত করেছিলেন। পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট মধ্যযুগের ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজনীতির ক্ষেত্রেও নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। যার ফলে পোপতন্ত্র শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
  • (৩) অর্থনৈতিক দিক থেকেও তিনি পোপতন্ত্রকে সুদৃঢ় করেছিলেন। তিনিই পবিত্র রোমান সম্রাট হিসাবে দ্বিতীয় ফ্রেডারিককে সিংহাসনে বসিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে (১১৯৭-১২৫০ খ্রিস্টাব্দ) পোপ চতুর্থ ইনোসেন্ট -এর সঙ্গে তাঁর বিরোধ বেধেছিল।

ইনভেস্টিচার সংগ্ৰাম

  • (১) ইনভেস্টিচার ছিল মধ্যযুগের ইউরোপের একটি পরিচিত সামন্ততান্ত্রিক অনুষ্ঠান বিশেষ। G. Barraclough তাঁর “The Origins of Modern Germany” গ্রন্থে মন্তব্য করেছিলেন, “Investiture Contest” এর ফলে জার্মানীতে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ঘটেছিল।
  • (২) ইনভেস্টিচার মধ্যযুগের ইউরোপে সামন্ততান্ত্রিক অনুষ্ঠান হিসাবে বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। যখন কোনো সামন্তপ্রভু তার অনুগত ভ্যাসালের বিশ্বস্ততা ও বিনতির প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করতেন তখন তিনি পদ বা ভূসম্পত্তি দানের প্রতীক হিসাবে পতাকা, দণ্ড বা সনদ দান করতেন।
  • (৩) এই নিয়ম ও রীতি প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী চার্চের ক্ষেত্রেও প্রযুক্ত হত এবং জার্মান সম্রাট সদ্য নির্বাচিত বিশপ বা অ্যাবটকে ক্ষমতার প্রতীক হিসাবে দণ্ড বা আংটি দান করে বিশ্বস্ততা ও বিনতির প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করতেন। জার্মান সম্রাট চতুর্থ হেনরীর সঙ্গে পোপ সপ্তম গ্রেগরীর “Investiture Contest” বা সংগ্রাম হয়েছিল।
  • (৪) পোপ সপ্তম গ্রেগরী চেয়েছিলেন, যেকোন ভাবে চতুর্থ হেনরীর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু চতুর্থ হেনরী এক্ষেত্রে দৃঢ় ভূমিকা নিয়েছিলেন। ১০৭৫ খ্রিস্টাব্দে পোপ সপ্তম গ্রেগরী চার্চের ক্ষেত্রে ইনভেস্টিচার অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এই আদেশকে কেন্দ্র করে পোপ ও সম্রাটের মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তা “Investiture Contest” নামে পরিচিতি লাভ করে।

ডিকটেটাস প্যাপী

  • (১) পোপতন্ত্রের অনুগামীরা ইনভেস্টিচারের প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে মগজ ধোলাই করেছিলেন। তাদের মতে, এই প্রথার ফলে বিনষ্ট ব্যক্তিরা চার্চের সংস্পর্শে আসে। পোপ সপ্তম গ্রেগরী ঘোষণা করেছিলেন, ইনভেস্টিচারের সময় কর্তৃত্বের প্রতীক হিসাবে যে আংটি ও দণ্ড দেওয়া হত এখন থেকে তিনি তা দেবেন।
  • (২) এছাড়া ১০৭৫ খ্রিস্টাব্দে সপ্তম গ্রেগরী পোপতন্ত্রকে সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ২৭টি নির্দেশ সমন্বিত দলিল ঘোষণা করেছিলেন যা “Dictatus Papae” বা পোপের নির্দেশাবলী নামে পরিচিত। “Dictatus Papae”-র কিছু উল্লেখযোগ্য নির্দেশাবলী ছিল। যেমন –

(i) রোমান চার্চকে প্রতিষ্ঠা করেছিল স্বয়ং ঈশ্বর।

(ii) ধর্মীয় গ্রন্থের দ্বারা প্রমাণিত রোমান চার্চ অতীতে ভুল করেনি, ভবিষ্যতেও ভুল করবে না।

(iii) ঈশ্বর ছাড়া পোপকে বিচার করার অধিকার কারোরই নেই।

(iv) ধর্মীয় ক্ষেত্রে পোপ চরম ক্ষমতার অধিকারী।

(v) সম্রাটদের সিংহাসনচ্যুত করার অধিকার পোপের রয়েছে।

(vi) বিশপদের নিযুক্তি বা পদচ্যুতির ক্ষমতা একমাত্র পোপের হাতেই রয়েছে।

চতুর্থ হেনরীর দুর্বলতা ও পোপতন্ত্র

  • (১) J. W. Thompson তাঁর “Feudal Germany” গ্রন্থে মন্তব্য করেন, ১০৭৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৫৩টি কাউন্টি চার্চকে নিয়ন্ত্রণ করত। এই ১০৭৩ খ্রিস্টাব্দেই অর্থাৎ খ্রিস্টিয় একাদশ শতকের শেষ দিকে রোমের জনগণের সমর্থনে হিলিডিব্রান্ড সপ্তম গ্রেগরী নামে পোপ পদে অভিষিক্ত হন। ইতালির সাধক পিটার দামিয়ানি পোপ সপ্তম গ্রেগরীকে ‘পবিত্র শয়তান’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
  • (২) পোপ সপ্তম গ্রেগরী জার্মান সম্রাট চতুর্থ হেনরীকে সিংহাসনচ্যুত করার যে নীতি গ্রহণ করেছিলেন সেই কারণে এবং তার ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক ফলশ্রুতির জন্য তাকে ‘ডেস্ট্রাকটর রেগনি” বলে অভিহিত করা হয়েছিল।
  • (৩) পোপ সপ্তম গ্রেগরী ও চতুর্থ হেনরীর মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। জার্মানীতে তার শক্তি ও সামর্থ্য উপলব্ধি না করার জন্য চতুর্থ হেনরীর দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল। এছাড়া চতুর্থ হেনরীর দূরদর্শিতার অভাবও ছিল। যার ফলে প্রত্যক্ষ সংঘাতের সময় স্যাক্সনি ও দক্ষিণ জার্মানীর যাজক ছাড়াও সাধারণ ভূস্বামীরা অনেকেই চতুর্থ হেনরীর পক্ষে ছিল না।
  • (৪) সম্রাটের বিরোধিতা করার মানসিকতা তাদের মধ্যে তৈরী হয়েছিল। কারণ এর আগেই পোপের দ্বারা সম্রাট সিংহাসনচ্যুত হয়েছিল। চতুর্থ হেনরী ইতালিতে রাজশক্তির দুর্বলতার বিষয় সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। এরকম পরিস্থিতিতে পোপের সম্মিলিত শক্তি জার্মানীর বেশীর ভাগ গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল।

পোপতন্ত্র ও ক্যানোসার আত্মসমর্পণ

  • (১) পোপ সপ্তম গ্রেগরী ও সম্রাট চতুর্থ হেনরীর মধ্যে দ্বন্দ্বের মধ্যেই সম্রাটকে শেষ সুযোগ দেওয়া হয় ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসের মধ্যে পোপের সঙ্গে সমঝোতা করার। তাঁরা পোপকে জার্মানীতে আসবার অনুরোধও করেছিলেন এবং পোপ যাতে চতুর্থ হেনরীর সিংহাসনচ্যুতিকে অনুমোদন করেন ও উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন সেই অনুরোধও রাখা হয়।
  • (২) চতুর্থ হেনরী উপলব্ধি করেছিলেন এই মিলন হলে তার পতন হবেই। সুতরাং তিনি পোপের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি তার অনুগামীদের নিয়ে আল্পস পাড়ি দিয়েছিলেন।পোপ এই খবর পেয়ে ইতালিতেও তিনি যে প্রবেশ করেছেন সেই গোপন খবরও পোপ পেয়ে গেলেন।
  • (৩) তাই ‘টাস্কানির’ কাউন্টের সাহায্য নিয়ে তিনি অ্যাপিনাইন পর্বতের উপর অবস্থিত ‘ক্যানোসার’ এর সুরক্ষিত দুর্গে থেকে ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জানুয়ারী পোপের কাছে নতজানু হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। পোপ সপ্তম গ্রেগরী ক্ষমাপ্রার্থী অনুতপ্ত চতুর্থ হেনরীকে ক্ষমা করলেন এবং এইভাবে পোপ চতুর্থ হেনরীর উপর ধার্য শাস্তি প্রত্যাহার করেছিলে। এই নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা “ক্যানোসার আত্মসমর্পণ” নামে পরিচিত।

ব্রিক্সেন সম্মেলন ও পোপতন্ত্র

  • (১) ক্যানোসার ঘটনায় চতুর্থ হেনরী বিরোধী জার্মান সামন্তবর্গ ক্ষুব্ধ হয়ে ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দে ‘Forchheim’ এর সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন। ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে “Forchheim’ এর সম্মেলনে জার্মানীর নতুন সম্রাট মনোনীত করা হয়েছিল ‘সোয়াবিয়া’র ডিউক রুডলফকে। এই নির্বাচনের ফলে জার্মানীতে সমস্যা সৃষ্টি হয়।
  • (২) জার্মানিতে সমস্যা সমাধানের জন্য পোপ সপ্তম গ্রেগরী ১০৭৯ খ্রিস্টাব্দে জার্মানীতে দুজন প্রতিনিধিকে পাঠিয়েছিলেন। ১০৮০ খ্রিস্টাব্দে চতুর্থ হেনরী পোপের প্রতিনিধিদের আপস প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে চতুর্থ হেনরীকে সমাজচ্যুত ও সিংহাসনচ্যুত ঘোষণা করা হয়। তিনি রুডলফের মনোনয়নকেও মেনে নিয়েছিলেন।
  • (৩) ১০৮০ খ্রিস্টাব্দে জার্মান সম্রাট বাধ্য হয়ে ব্রিক্সেন ধর্মসভা আহ্বান করেন। ব্রিক্সেন ধর্মসভাতে জার্মান ও ইতালীয় যাজকরা র‍্যাভেনার আর্চ বিশপ গুইবার্টকে পোপ তৃতীয় ক্লেমেন্ট হিসাবে নির্বাচিত করেছিলেন। পোপ সপ্তম গ্রেগরী ও চতুর্থ হেনরীর মধ্যে সংঘাতের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। পোপ সপ্তম গ্রেগরীর দুর্ভাগ্য যে এই সময় রুডলফ যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন।

পোপতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের দ্বন্দ্বের সাময়িক অবসান

১০৮৩ খ্রিস্টাব্দে চতুর্থ হেনরী পোপ তৃতীয় ক্লেমেন্টকে পোপের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। পোপ তৃতীয় ক্লেমেন্ট ১০৮৪ খ্রিস্টাব্দেই রোমান সম্রাট হিসাবে চতুর্থ হেনরীর অভিষেক ঘটিয়েছিলেন। ১০৮১ খ্রিস্টাব্দে চতুর্থ হেনরী ইতালির দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। ১০৮১ ও ১০৮২ খ্রিস্টাব্দে তিনি রোম অভিযান করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ১০৮৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি সফলভাবে রোম আক্রমণ করেন। চতুর্থ হেনরী গুইবার্টকে পোপ পদে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

উপসংহার :- ১০৮৫ খ্রিস্টাব্দে পোপ সপ্তম গ্রেগরীর স্যালারনোতে মৃত্যু হয়েছিল। এইভাবে পোপ ও সম্রাটের মধ্যে দ্বন্দ্বের সাময়িক অবসান ঘটেছিল।

(FAQ) পোপতন্ত্র-রাজতন্ত্র দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ক্যানোসার আত্মসমর্পণের সময়কাল কত?

২৫ জানুয়ারি ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দে।

২. কে কাকে পবিত্র শয়তান বলে অভিহিত করেছেন?

ইতালির সাধক পোপ সপ্তম গ্ৰেগরীকে।

৩. কে কখন ডিকটেটাস প্যাপী ঘোষণা করেন?

১০৭৫ খ্রিস্টাব্দে পোপ সপ্তম গ্ৰেগরী।

৪. কোন পোপের আমলে পোপতন্ত্র ও চার্চ সর্বোচ্চ ক্ষমতায় পৌঁছেছিল?

পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment