হোমরুল আন্দোলন

হোমরুল আন্দোলন, অ্যানি বেশান্তের মতে হোমরুল, তিলকের উদ্দোগ, হোমরুল লীগের জন্ম, তিলকের হোমরুল লীগ, ইন্ডিয়ান হোমরুল লীগ প্রতিষ্ঠা, উদ্দেশ্য, বেশান্তের হোমরুল লীগ, দুই হোমরুল লীগের এলাকা, হোমরুল আন্দোলনের প্রসার, সরকারি দমননীতি, প্রতিবাদের ঝড়, বেশান্তের কারাবরণ, আন্দোলনের অবসান ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

তিলক ও বেশান্তের নেতৃত্বে হোমরুল আন্দোলন

হোমরুল অর্থস্বায়ত্তশাসন
সময়কাল১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ
নেতৃত্বড. অ্যানি বেশান্ত ও বাল গঙ্গাধর তিলক
কেন্দ্রমহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, বেরার প্রভৃতি
হোমরুল আন্দোলন

ভূমিকা :- ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ -এর কালে নরমপন্থী নিয়ন্ত্রিত জাতীয় কংগ্রেস প্রাণহীন হয়ে পড়ে এবং ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনও গতিহীন হয়ে যায়। যুদ্ধকালীন করভার, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং সীমাহীন বেকারত্ব সাধারণ মানুষকে সরকার ও নরমপন্থীদের সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ করে তোলে।

হোমরুল আন্দোলন

এই সময় নির্বাসন-প্রত্যাগত বাল গঙ্গাধর তিলক ও ভারতে থিওসফিক্যাল সোসাইটি’-র প্রতিষ্ঠাত্রী শ্রীমতী অ্যানি বেশান্তের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘হোমরুল আন্দোলন’ নিথর, নিস্তব্ধ জাতীয় জীবনকে আবার প্রাণবন্ত ও গতিশীল করে তোলে।

বেশান্তের চিন্তা

১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শ্রীমতী বেশান্ত উপলব্ধি করেন যে, ভারতে ‘হোমরুল’ বা স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে ভারতের উন্নতির কোনো সম্ভাবনা নেই। এই কারণে তিনি আয়ারল্যাণ্ডের রেমণ্ডস্-এর ‘হোমরুল লীগ’-এর অনুকরণে ভারতে হোমরুল বা স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তনের কথা চিন্তা করেন।

বেশান্তের মতে হোমরুল

হোমরুল বলতে তিনি বুঝতেন গ্রাম্য পঞ্চায়েত থেকে মিউনিসিপ্যালিটি, জেলা বোর্ড, প্রাদেশিক ব্যবস্থা পরিষদ ও নিখিল ভারতীয় পার্লামেন্ট পর্যন্ত সর্বত্রই ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার অনুরূপ স্বায়ত্তশাসন এবং প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক ব্যতীত শাসনব্যবস্থার প্রতিটি বিষয়ে ভারতীয়দের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।

তিলকের পরিবর্তিত রাজনৈতিক মতাদর্শ

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে দীর্ঘ কারাবাসের পর তিলক যখন ভারতে ফিরে আসেন তখন তিনি এক নতুন মানুষ। ইতিমধ্যে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যথেষ্ট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

  • (১) তিনি উপলব্ধি করেন যে, নরমপন্থী পরিচালিত জাতীয় কংগ্রেসই হল ভারতীয় রাজনীতির মূল স্রোত। সুতরাং জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ভিন্ন গত্যন্তর নেই।
  • (২) একদা পূর্ণ স্বাধীনতা ও চরমপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী তিলক ঘোষণা করেন যে, তিনি সর্বপ্রকার হিংসাত্মক কর্মধারার বিরোধী এবং তাঁর লক্ষ্য ব্রিটিশ সরকারের উচ্ছেদ নয়। আয়ারল্যাণ্ডের আইরিশ হোমরুল আন্দোলনকারীদের মত তিনিও চান ভারতে কিছু প্রশাসনিক সংস্কার।

বেশান্তের উদ্দোগ

১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে শ্রীমতী বেশান্ত হোমরুল আন্দোলনের পক্ষে প্রচারকার্য শুরু, করেন। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ২রা জানুয়ারি ‘কমনউইল’ এবং ১৪ ই জুলাই ‘নিউ ইণ্ডিয়া পত্রিকা‘ নামে দু’টি পত্রিকা প্রকাশ করে তিনি তাঁর মতাদর্শ প্রচার করতে থাকেন। তাঁর সুললিত ভাষণেও জনগণের মধ্যে সাড়া জাগে।

তিলকের উদ্দোগ

বাল গঙ্গাধর তিলকও ‘মারাঠা’ ও কেশরী পত্রিকা দু’টির মাধ্যমে তাঁর মতাদর্শ প্রচার করতে থাকেন।

কংগ্রেসের ধারণা

শ্রীমতী বেশান্ত ও তিলক উভয়েই জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুগ্মভাবে এই আন্দোলন পরিচালনার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু নরমপন্থী পরিচালিত জাতীয় কংগ্রেস এতে যোগদান করে নি বা চরমপন্থী তিলককেও তারা জাতীয় কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি হয় নি।

হোমরুল লীগের জন্ম

নরমপন্থী নেতৃত্ব মনে করত যে, হোমরুল লীগের কর্মধারা জাতীয় কংগ্রেসকে দুর্বল করে দেবে। এই অবস্থায় নিজের রাজনৈতিক কার্যকলাপ অব্যাহত রাখার জন্য তিলকের কিছু করার প্রয়োজন ছিল। এই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নিল ‘হোমরুল লীগ’।

তিলকের ‘ইণ্ডিয়ান হোমরুল লীগ’

  • (১) ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে পুণেতে অনুষ্ঠিত তিলকের অনুগামীদের এক সভায় স্থির হয় যে, “কংগ্রেসের লক্ষ্য ও কাজ সম্পর্কে গ্রামবাসীদের অবহিত করার জন্য’ একটি সমিতি স্থাপিত হবে এবং এটিই হবে তাঁদের কাজকর্মের প্রথম ধাপ।
  • (২) এই উদ্দেশ্যে আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মধ্যে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে এই জাতীয় বেশ কিছু সমিতি গড়ে ওঠে।
  • (৩) ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে ও ২৪শে ডিসেম্বর তিলক পুণেতে বোম্বাই, মধ্যপ্রদেশ ও বেরারের চরমপন্থীদের এক সম্মেলন আহ্বান করেন।

ইন্ডিয়ান হোমরুল লীগ প্রতিষ্ঠা

পুণের সম্মেলনের ভিত্তিতেই ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৮ শে এপ্রিল বেলগাঁও-এ অনুষ্ঠিত বোম্বাই প্রাদেশিক সম্মেলনে তিলকের ‘ইণ্ডিয়ান হোমরুল লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়।

সভাপতি ও সম্পাদক

তিলকের হোমরুল লীগের সভাপতি ছিলেন জোসেফ ব্যাপ্টিস্টা ও এন. সি. কেলকার সম্পাদক নিযুক্ত হন।

তিলকের হোমরুল লীগের উদ্দেশ্য

বলা হয় যে, এই লীগের উদ্দেশ্য হল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ‘হোমরুল’ বা স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা এবং সেই উদ্দেশ্যে জনমতকে শিক্ষিত ও সংগঠিত করে তোলা।

শ্রীমতী বেশান্তের হোমরুল লীগ

১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে শ্রীমতী বেশান্ত নিজ দায়িত্বে হোমরুল লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর আধ্যাত্মিক অনুগামী জর্জ আর্নডেল ছিলেন এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

সদস্য

বেশান্তের হোমরুল লীগের পদাধিকারীদের মধ্যে ছিলেন সি. পি. রামস্বামী ও বি.পি.ওয়াদিয়া। মতিলাল নেহরু, জওহরলাল নেহরু, তেজ বাহাদুর সপ্রু এর সদস্য হন।

শাখা

অচিরেই বোম্বাই, কানপুর, এলাহাবাদ, মথুরা, বারাণসী, কালিকট, মাদ্রাজ প্রভৃতি স্থানে এই সংস্থার শাখা স্থাপিত হয়।

দুই হোমরুল লীগের এলাকা

একই উদ্দেশ্য নিয়ে একই সময়ে দু’টি লীগ প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের মধ্যে কোন সংঘাত ছিল না। উভয় লীগ নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে নেয়।

  • (১) তিলকের লীগের কর্মক্ষেত্র সংগঠন ও প্রচারকার্য ছিল মহারাষ্ট্র (বোম্বাই শহর বাদে), কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ ও বেরার।
  • (২) শ্রীমতী বেশান্ত ভারতের অবশিষ্ট অঞ্চলে তাঁর কর্মক্ষেত্র বিস্তার করেন।

দুই লীগের আলাদা থাকার কারণ

দু’টি লীগ কেন একসঙ্গে মিশে যায় নি, তার কারণ হিসেবে শ্রীমতী বেশান্ত বলেন যে, “তিলকের কিছু অনুগামী আমাকে পছন্দ করেন না, আবার আমারও কিছু অনুগামী তাঁকে পছন্দ করেন না। আমাদের নিজেদের মধ্যে অবশ্য কোনো ঝগড়া নেই।”

সংস্কৃত নরম পন্থী আন্দোলন

হোমরুল আন্দোলন স্বদেশী ও বয়কটের মত কোনো সক্রিয় প্রতিবাদী গণ-আন্দোলন ছিল না। এই আন্দোলনকে ‘সংস্কৃত নরমপন্থী আন্দোলন’ বলা চলে।

লীগের শাখা

আন্দোলনের অঙ্গ হিসেবে দুই লীগই ভারতের বিভিন্ন অংশে প্রচুর শাখা স্থাপন করে। শ্রীমতী বেশাস্তের লীগের ২০০টি শাখা স্থাপিত হয় এবং এর মধ্যে ১৩২টিই ছিল মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সীতে।

চাঞ্চল্যের সৃষ্টি

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তিলক ও শ্রীমতী বেশান্তের বক্তৃতা, তিলকের ‘মারাঠা’ ও ‘কেশরী’ পত্রিকা, শ্রীমতী বেশান্তের ‘কমনউইল’ ও ‘নিউ ইণ্ডিয়া’ পত্রিকা এবং হাজার হাজার ইস্তাহার সাধারণের মনে প্রবল চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

প্রচার

তিলক মারাঠিতে ছ’টি এবং ইংরেজিতে দু’টি ইস্তাহার বা প্রচারপত্র প্রকাশ করেন। এগুলির ৪৭,০০০ কপি বিক্রি হয়। এছাড়া তিনি গুজরাটি ও কানাড়ি ভাষাতেও পুস্তিকা প্রকাশ করেন। শ্রীমতী বেশান্তের সংগঠন ২৬টি ইংরেজি এবং বিভিন্ন ভারতীয় ভাষাতেও বেশ কিছু পুস্তিকা প্রকাশ করে।

জনমত গঠনের কাজ

জনমত গঠনের মাধ্যম হিসেবে বক্তৃতা ও প্রচারপুস্তিকা প্রকাশ করা ছাড়াও লীগের সদস্যরা পাঠাগার স্থাপন, আলোচনা-চক্র গঠন, সমাজ-সেবামূলক কর্ম পরিচালনা, স্বদেশীর প্রচার, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ প্রভৃতি কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতেন।

তিলকের গুরুত্ব আরোপের বিষয়

এই সময় তিলক ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান ও অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

তিলকের বক্তব্য

তিনি বলেন- “মারাঠি, তেলেগু ও কানাড়ি ভাষাভাষীদের জন্য পৃথক পৃথক রাজ্য গঠন করা হোক। ………মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের নীতি স্বতঃসিদ্ধ ও স্পষ্ট। ইংরেজরা কি তাদের দেশের মানুষদের ফরাসি ভাষায় শিক্ষা দেয়? জার্মানরা কি ইংরেজিতে কিংবা তুর্কীরা ফরাসিতে শিক্ষা দেয়?”

লোকমান্য তিলক

এই সময় তিলক প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং ‘জাতীয় বীর -এ পরিণত হন। জনতা তাঁকে দেবতার মত শ্রদ্ধা করতে থাকে এবং তিনি ‘লোকমান্য’ আখ্যায় ভূষিত হন।

সুমিত সরকারের অভিমত

অধ্যাপক সুমিত সরকার বলেন যে, হোমরুল আন্দোলন উপলক্ষে তিলক যে ভাষণগুলি দেন এবং যে ভাবধারা প্রচার করেন তা পরবর্তী যুগের গান্ধীবাদী ভাবধারার পথপ্ৰদৰ্শক।

আন্দোলনের প্রসার

  • (১) প্রথমে এই আন্দোলন শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও যুদ্ধকালীন করভার ও ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের দিনে নেতৃবৃন্দের প্রচারাদি সাধারণ মানুষের অসন্তোষে ঘৃতাহুতি দেয়। এইভাবে এই আন্দোলন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং গ্রাম ও শহরে বিভিন্ন বর্ণ ও শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সম্প্রসারিত হয়।
  • (২) ১৯১৬ ও ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজ, মধ্যপ্রদেশ ও বোম্বাই সরকারের রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, এই আন্দোলন ছাত্র, যুবক, ছোট সরকারি কর্মচারী, এমনকি গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের মনেও গভীর রেখাপাত করে।
  • (৩) মাদ্রাজ সরকারের রিপোর্ট থেকে মাদ্রাজে এই আন্দোলনের জনপ্রিয়তা এবং গুন্টুর জেলায় গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে জানা যায়।
  • (৪) মহিলা এবং সাধু-সন্তদের ব্যাপক যোগদানে এই আন্দোলন এক বিশেষ রূপ ধারণ করে। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে তিলকের লীগের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৪ হাজার এবং ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৩২ হাজার।
  • (৫) ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাই ও মধ্যপ্রদেশ ব্যতীত সমগ্র ভারতে কর্মরত বেশান্তের সংগঠনের সদস্যসংখ্যা ছিল ২৭ হাজার।
  • (৬) কেবলমাত্র ভারতের অভ্যন্তরেই নয়-ভারতের বাইরে লণ্ডন ও সানফ্রান্সিসকোতেও এর শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • (৭) এইভাবে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসে যোগদানের পূর্বেই চরমপন্থীরা নিজস্ব একটি পৃথক সংগঠন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।

সরকারি দমননীতি

আন্দোলনের ব্যাপকতায় ভীত হয়ে সরকার

  • (১) তিলক ও বিপিনচন্দ্র পাল -এর দিল্লী ও পাঞ্জাব এবং বেশান্তের মধ্যপ্রদেশ ও বেরারে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
  • (২) হোমরুল লীগ অনুষ্ঠিত সভা-সমিতিতে যাতে ছাত্ররা যোগদান করতে না পারে সেই মর্মে কেবলমাত্র বাংলা ব্যতীত অন্যান্য সকল প্রাদেশিক সরকার সর্বত্র আদেশ জারি করে।
  • (৩) বিপ্লবাত্মক বক্তৃতা করার অভিযোগে সরকার তিলককে গ্রেপ্তার করে এবং তাঁকে অন্তত এক বছর ‘সদ্ভাবে’ থাকবার জন্য ২০ হাজার টাকার ব্যক্তিগত বণ্ড ও দু’জন জামিনদার রাখার নির্দেশ দেন (জুলাই, ১৯১৬ খ্রিঃ)। অবশ্য হাইকোর্ট -এ আপিল করে তিলক জয়যুক্ত হন।
  • (৪) বেশান্তের ‘নিউ ইণ্ডিয়া’ পত্রিকার জন্য প্রথমে দু-হাজার টাকা এবং পরে দশ হাজার টাকা জামিন চাওয়া হয়।

প্রতিবাদের ঝড়

এই সব ঘটনায় সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। গান্ধীজি, জিন্না প্রমুখ নেতারা প্রতিবাদ জানান এবং জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ প্রবল আন্দোলনের হুমকি দেয়।

লক্ষ্ণৌ কংগ্রেস

  • (১) আন্দোলনের ব্যাপকতা এবং তিলক ও বেশান্তের প্রতি সরকারি আচরণ কংগ্রেসকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে।
  • (২) ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের লক্ষ্ণৌ অধিবেশনে এই দুই নেতাকে বিপুল সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। সভাপতির ভাষণে অম্বিকাচরণ মজুমদার তাঁদের ওপর আক্রমণের তীব্র নিন্দা করেন।
  • (৩) কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ এই সময় হোমরুল লীগের সঙ্গে সহযোগিতার নীতি ঘোষণা করেকরে এবং লক্ষ্মৌ চুক্তি স্বাক্ষর করে।
  • (৪) উত্তরপ্রদেশের গভর্নর তিলক সম্বন্ধে লিখছেন যে, “এই অধিবেশন তিলকের ব্যক্তিগত বিজয় সূচিত করেছে এবং তাঁর অভাবনীয় জনপ্রিয়তা সর্বক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে।”

বেশান্তের গ্রেপ্তার

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই জুন মাদ্রাজ সরকার শ্রীমতী বেশান্ত ও তাঁর দুই সহকর্মী বি.পি. ওয়াদিয়া ও জর্জ আর্নডেলকে অন্তরীণ করলে সারা দেশে এমনকি বিদেশেও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

নেতৃবৃন্দের প্রতিবাদ

নরমপন্থী মদনমোহন মালব্য ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মুসলিম লীগের প্রাচীনপন্থী নেতা আগা খাঁ, এমনকী মহাত্মা গান্ধী, জিন্না প্রমুখ নেতৃবৃন্দ প্রতিবাদ জানান। গান্ধীজি এই ঘটনাকে ‘গুরুতর ভ্রান্তি’ বলে অভিহিত করেন। স্যার সুব্রহ্মণ্য আয়ার ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করেন।

নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের প্রস্তাব

তিলকের নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেস এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে এবং নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ বা আইন অমান্য আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহণ করে।

মিছিলের প্রস্তুতি

গান্ধীজির পরামর্শে শঙ্করলাল ব্যাঙ্কার ও যমনাদাস দ্বারকাদাস সহ এক হাজার মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে অন্তরীণের নির্দেশ অমান্য করে যেখানে বেশান্তকে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছিল সেখানে মিছিল করে যেতে প্রস্তুত ছিলেন।

ভারত সচিবের মন্তব্য

আন্দোলনের ব্যাপকতায় সরকার ভীত হয়ে ওঠে। ভারত সচিব মন্টেণ্ড মন্তব্য করেন যে, “শিব তাঁর পত্নীকে ৫২ টি টুকরো করে কাটার পর দেখলেন যে, তাঁর ৫২টি পত্নী বিদ্যমান। শ্রীমতী বেশান্তকে অন্তরীণ করে ভারত সরকারেরও ঐ একই দশা হয়েছে।”

বেশান্তের মুক্তিলাভ

শেষ পর্যন্ত সরকার বাধ্য হয়ে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই সেপ্টেম্বর সরকার শ্রীমতী বেশান্তকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। এই বিজয়ী বীরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে তাঁকে সভানেত্রী নির্বাচিত করা হয়।

মন্টেগুর ঘোষণা

ভারত সচিব মন্টেগু ঘোষণা করেন যে, ব্রিটিশ সরকার ভারতে দায়িত্বশীল প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার স্থাপনকেই তার আশু লক্ষ্য বলে মনে করেন এবং সেই লক্ষ্য পূরণ করার জন্য যথাযোগ্য ব্যবস্থা অবলম্বন করতে চলেছেন।

মন্টেগু চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার

হোমরুল আন্দোলনের তীব্রতাই সরকারকে এই ঘোষণা করতে বাধ্য করে। এই ঘোষণার ওপর ভিত্তি করেই ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে মন্টেগু চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার প্রবর্তিত হয়।

আন্দোলনের অবসান

১৯১৮ সাল থেকে হোমরুল আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়তে থাকে। কারণ,

  • (১) সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং বেশান্তের মুক্তির পর নরমপন্থীদের উন্মাদনা হ্রাস পায়।
  • (২) ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই-এ সংস্কার কর্মসূচি প্রকাশিত হওয়ার পর সংস্কারকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী কর্মীদের মধ্যে জোর বিতর্ক শুরু হয়। এর ফলে সকলের দৃষ্টি ঐ সংস্কারের দিকেই নিবদ্ধ হয় এবং হোমরুল লীগের কার্যাবলী গৌণ হয়ে পড়ে।
  • (৩) শ্রীমতী বেশান্ত নিজেও এ ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এই সময় তিলককে একটি মামলার ব্যাপারে ইংল্যাণ্ডে যেতে হয়। এর ফলে এই আন্দোলন ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়ে।

গুরুত্ব

ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন যে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে হোমরুল আন্দোলন এক নব যুগের সূচনা করে।

(১) আন্দোলনে গতিবেগ সঞ্চার

এই আন্দোলন নরমপন্থী কংগ্রেস নেতৃত্বের অসারতা প্রমাণ করে জাতীয় আন্দোলনে নতুন গতিবেগ সঞ্চার করে এবং দেশবাসীকে জানিয়ে দেয় যে, গণ-আন্দোলনই জাতির মুক্তির একমাত্র উপায়।

(২) নরমপন্থীদের প্রভাব হ্রাস

এই আন্দোলনের চাপে বক্তৃতাসর্বস্ব নরমপন্থী নেতৃত্ব জাতীয় আন্দোলনের মূল প্রবাহ থেকে দূরে সরে যান, বা বলা যায় যে, ভারতীয় রাজনীতিতে নরমপন্থী নেতৃবৃন্দের প্রভাব হ্রাস পায়।

(৩) ন্যাশনাল লিবারেল ফেডারেশন গঠন

নরমপন্থী নেতৃবৃন্দ জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ‘ন্যাশনাল লিবারাল ফেডারেশন’ নামে একটি পৃথক সংগঠন গড়ে তুলে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে সচেষ্ট হন।

(৪) ঐক্যবোধ গঠন

এই আন্দোলন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনগণের মধ্যে সম্প্রসারিত হয়ে জনগণের মধ্যে একটি ঐক্যবোধ গড়ে তোলে। শহর, গ্রাম, ধর্ম, ভাষা, বৃত্তি বা সামাজিক মর্যাদার গণ্ডী অতিক্রম করে বহু অনগ্রসর ও রাজনৈতিক অচেতন অঞ্চলে এই আন্দোলন পরিব্যাপ্ত হয়।

(৪) স্বায়ত্তশাসনের দাবি স্বীকৃত

এই আন্দোলন ‘স্বরাজ’ বা স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে জনপ্রিয় করে তোলে। আন্দোলনের তীব্রতার ফলেই ভারত সচিব মন্টেণ্ড নীতিগতভাবে ভারতবাসীর স্বায়ত্তশাসনের দাবি মেনে নেন।

(৫) তিলকের নেতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত

এই আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয় রাজনীতিতে তিলকের নেতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি তাঁর অসামান্য রাজনৈতিক প্রতিভা, দূরদৃষ্টি ও সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় প্রদান করেন। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন যে, এই “হোমরুল আন্দোলন হল তিলকের মহান রাজনৈতিক জীবনের যথাযোগ্য শেষ অনুচ্ছেদ।”

উপসংহার :- এই হোমরুল আন্দোলন গান্ধীজির আবির্ভাবের পথ প্রস্তুত করে। এই আন্দোলনের নীতি, কর্মপদ্ধতি, সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়েই ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধীজির আবির্ভাব। তাই বলা যায় যে, এই হোমরুল আন্দোলন হল ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে গান্ধীযুগের পূর্বাভাষ।

(FAQ) হোমরুল আন্দোলন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. হোমরুল আন্দোলনের দুজন নেতার নাম লেখ।

ড. অ্যানি বেশান্ত ও বাল গঙ্গাধর তিলক।

২. ইন্ডিয়ান হোমরুল লীগ কে কবে প্রতিষ্ঠা করেন?

২৮ এপ্রিল ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বাল গঙ্গাধর তিলক বেলগাঁও-এ।

৩. কে কবে হোমরুল আন্দোলন শুরু করেন?

বাল গঙ্গাধর তিলক ২৮ এপ্রিল ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Reply

Translate »