খিলাফত আন্দোলন

খিলাফত আন্দোলন -এর কারণ, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বৈঠক, আন্দোলনের তিনটি পর্যায়, জুডিথ ব্রাউনের উক্তি, হিন্দুদের কাছে আবেদন, আন্দোলনের বিস্তার, আন্দোলনের অবসান ও সমালোচনা সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

খিলাফত আন্দোলন

সময়কালডিসেম্বর ১৯১৮ – মার্চ ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ
নেতৃত্বমহাত্মা গান্ধী, আলী ভ্রাতৃদ্বয়, মৌলানা আজাদ
কারণতুরস্কের সুলতানকে হৃত মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা
ফলাফলব্যর্থতা
খিলাফত আন্দোলন

ভূমিকা :- ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে খিলাফৎ আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। এই আন্দোলনের ফলে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক নতুন জোয়ার আসে।

খিলাফত আন্দোলন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ -এর পর তুরস্কের সুলতান বা ‘খলিফা’ -কে তাঁর হৃতমর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে ভারতীয় মুসলিমরা যে আন্দোলন শুরু করেন তা খিলাফৎ আন্দোলন নামে খ্যাত।

অসহযোগ আন্দোলনের পূর্ব প্রস্তুতি

খিলাফত আন্দোলন ছিল গান্ধীজি পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্ব বা পূর্বাভাষ।

গণ-আন্দোলন

এই আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠা সহজতর হয় এবং তা অচিরেই অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারতে এক ব্যাপক গণ-আন্দোলন সৃষ্টি করে।

বিপান চন্দ্রের উক্তি

ডঃ বিপান চন্দ্র বলেন যে, “খিলাফৎ আন্দোলন ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে এক নতুন স্রোতধারা নিয়ে আসে।”

খিলাফত আন্দোলনের কারণ

খিলাফত আন্দোলনের পশ্চাতে বিভিন্ন কারণ বিদ্যমান ছিল। যেমন –

(১) প্রথম বিশ্বযুদ্ধ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে জার্মানির পক্ষে যোগদান করে। ফলে ভারতীয় মুসলিম সমাজ এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।

(২) তুরস্কের সুলতানের প্রতি অনুগত

ভারতীয় মুসলিমরা তুরস্কের সুলতানকে ‘খলিফা’ বা মুসলিম জগতের ধর্মগুরু বলে মনে করত। তারা রাজনৈতিক দিক থেকে ব্রিটিশ সরকারের অনুগত হলেও ধর্মীয় দিক থেকে তারা ছিল তুরস্কের সুলতানের অনুগত।

(৩) যুদ্ধে যোগদান

ভারতীয় মুসলমানরা মিত্রপক্ষের সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। কারণ ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ৫ ই জানুয়ারি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, খলিফার অবমাননা বা তার শক্তি খর্ব করার কোন অভিপ্রায় ইংল্যাণ্ডের নেই। মিত্রশক্তির অন্যতম শক্তিশালী অংশীদার মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনও এই আশ্বাসবাণীকে সমর্থন করেন।

(৪) তুরস্কের ব্যবচ্ছেদ

যুদ্ধ শেষে মিত্রপক্ষ তুরস্ক সাম্রাজ্যের ব্যবচ্ছেদ এবং সুলতানের মর্যাদা খর্ব করার চেষ্টা করলে ভারতীয় মুসলিম সমাজে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়।

(৫) কংগ্রেস-মুসলিম লীগের ঐক্য

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ভারতীয় রাজনীতিতে নানা পরিবর্তন সূচিত হয়। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে সম্পাদিত লক্ষ্ণৌ চুক্তির মাধ্যমে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে এক ঐক্যের পরিবেশ গড়ে ওঠে।

(৬) সমকালীন ঘটনার প্রভাব

রাওলাট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য ঘটনা হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়কে সমভাবে প্রভাবিত করে।

(৭) গান্ধীর উত্থান

দক্ষিণ আফ্রিকা-প্রত্যাগত গান্ধীজি খিলাফৎ প্রশ্নে হিন্দু- মুসলিম ঐক্যের বিরাট সুযোগ দেখতে পান। তাঁর মতে “হিন্দু মুসলিম ঐক্যের এমন সুযোগ একশ’ বছরেও আর আসবে না।”

(৮) পত্রিকায় লেখা

ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় তিনি লেখেন “মুসলিমদের যদি আমি আমার ভাই বলে মনে করি রাজনীতি তাহলে তার বিপদ উপস্থিত হলে এবং ন্যায় তার দিকে আছে বুঝতে পারলে তাকে যথাসাধ্য সাহায্য করাই আমার কর্তব্য।”

(৯) গান্ধীর খিলাফত দাবি সমর্থন

জাতীয় আন্দোলনে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের স্বার্থে তিনি খিলাফৎ-এর দাবির প্রতি সমর্থন জানান এবং কারারুদ্ধ আলি-ভ্রাতৃদ্বয়ের মুক্তির দাবি করেন।

কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বৈঠক

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ দিল্লীতে এক বৈঠকে মিলিত হন। মুসলিম লীগ নেতা ডঃ আনসারী মুসলিম রাষ্ট্রগুলির অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সমস্ত পবিত্র স্থান সহ ‘জাজিরাত উল-আরব’ বা সমগ্র আরব অঞ্চল খলিফাকে প্রত্যর্পণের দাবি করেন। কংগ্রেস নেতা হাকিম আজমল খাঁ এই দাবিগুলির প্রতি সমর্থন জানান।

আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়

তিনটি পর্যায়ে খিলাফত আন্দোলন সংঘটিত হয়।

(ক) প্রথম পর্যায়

  • (১) ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর থেকে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল খিলাফৎ আন্দোলনের প্রথম পর্যায়। এই পর্বে বোম্বাইয়ের প্রথম পর্যায় কিছু নরমপন্থী ধনী ব্যবসায়ী মিঞা মহম্মদ ছোটানি-র নেতৃত্বে ‘বোম্বাই খিলাফত কমিটি গঠন করেন (মার্চ, ১৯১৯ খ্রিঃ)।
  • (২) খলিফার প্রতি ন্যায়-বিচারের উদ্দেশ্যে তারা বিভিন্ন সভা-সমিতির ব্যবস্থা করেন এবং লণ্ডন ও প্যারিসে প্রতিনিধি দল পাঠান।
  • (৩) এই নরমপন্থী দলের বিপরীতে ছিল উলেমা ও নিম্ন মধ্যশ্রেণীর সাংবাদিকদের নিয়ে গঠিত লক্ষ্ণৌ-এর মৌলানা আবদুল বারি-র নেতৃত্বাধীন উগ্রপন্থী গোষ্ঠী। গান্ধীজি উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেন।
  • (৪) ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে বোম্বাই ও লক্ষ্ণৌয়ের মুসলিম নেতৃবৃন্দের যৌথ উদ্যোগে ‘সর্বভারতীয় খিলাফত সম্মেলন আহ্বান করা হয়। এই সম্মেলনের উদ্যোগে ১৭ই অক্টোবর সারা ভারত জুড়ে ‘খিলাফৎ দিবস’ পালিত হয়।
  • (৫) ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ২০-২৪ শে নভেম্বর দিল্লীতে ‘সর্বভারতীয় খিলাফৎ সম্মেলন’-এর প্রথম অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, মুসলিম সমাজ মিত্রপক্ষের যুদ্ধজয়ের উৎসবে যোগদান করবে না এবং খিলাফৎ সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান না হলে তারা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ‘অসহযোগ’ নীতি গ্রহণ করবে।
  • (৬) এই সম্মেলনের এক বিশেষ অধিবেশনে গান্ধীজি সভাপতির আসন গ্রহণ করেন এবং খিলাফ দাবির সমর্থনে জাতীয় কংগ্রেস ও হিন্দু জনসাধারণের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
  • (৭) মুসলিম নেতৃবৃন্দও হিন্দু মুসলিম ঐক্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং এই মর্মে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে বকর ইদে গোহত্যা বন্ধের জন্য তাঁরা আবেদন জানান।

দ্বিতীয় পর্যায়

  • (১) ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর থেকে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মে পর্যন্ত হল এই আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরের শেষ দিকে মহম্মদ আলি, সৌকত আলি ও আবুল কালাম আজাদ কারামুক্ত হলে খিলাফৎ আন্দোলনে নতুন গতিবেগ সঞ্চারিত হয়।
  • (২) ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতীয় কংগ্রেসের অমৃতসর অধিবেশনে গান্ধীর নেতৃত্বে গণআন্দোলন চলাকালে গান্ধীজি এবং কংগ্রেস ও খিলাফৎ নেতৃবৃন্দ এক বৈঠকে মিলিত হন।
  • (৩) বৈঠকে স্থির হয় যে, খিলাফৎ সমস্যার সমাধানকল্পে অচিরেই বড়লাট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি প্রতিনিধি দল পাঠানো হবে। এই মর্মে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে জানুয়ারি ডাঃ আনসারীর নেতৃত্বে হিন্দু-মুসলিম মিলিত এক প্রতিনিধি-দল বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ডের সঙ্গে দেখা করে খিলাফৎ সমস্যার সন্তোষজনক মীমাংসার দাবি জানায়।
  • (৪) বড়লাট স্পষ্টই জানান যে, তুরস্ককে তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করতেই হবে। এই সময় থেকে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ও আলি ভ্রাতৃদ্বয় ভারতের বিভিন্ন অংশে খিলাফৎ সমস্যা ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের আদর্শ প্রচার করতে থাকেন।
  • (৫) ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই মার্চ ভারতীয় প্রতিনিধি দল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এখানেও তাঁরা হতাশ হন।
  • (৬) ইতিমধ্যে মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে চাঞ্চল্য লক্ষ্য করে ৭ই মার্চ গান্ধীজি একটি ইস্তাহার প্রকাশ করে ১৯শে মার্চ সারা ভারতে হরতাল ও খিলাফৎ দিবস পালনের নির্দেশ দেন।
  • (৭) তিনি বলেন যে, যদি খিলাফতের দাবি না মানা হয়, তাহলে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করা হবে। এই ইস্তাহারটিতেই প্রথম অহিংস অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে গান্ধীজির ধ্যান ধারণা প্রকাশিত হয়েছে।
  • (৮) এই সময় থেকে বোম্বাইয়ের নরমপন্থী বণিকগোষ্ঠী আন্দোলনের ওপর থেকে কর্তৃত্ব হারান এবং তা সম্পূর্ণভাবে উগ্রপন্থী উলেমা ও সাংবাদিক দ্বারা পরিচালিত আলি-ভ্রাতৃদ্বয়ের নিয়ন্ত্রণে আসে। গান্ধীজিও বোম্বাই গোষ্ঠী থেকে সরে আসেন।

তৃতীয় পর্যায়

  • (১) ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মে মাস থেকে খিলাফৎ আন্দোলনের তৃতীয় পর্যায় শুরু হয়। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই মে পরাজিত তুরস্কের ওপর অপমানজনক সেভরের সন্ধি চাপিয়ে দেওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হলে ভারতীয় মুসলিমদের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
  • (২) গান্ধীজি এই চুক্তিকে ‘ভারতীয় মুসলিমদের ওপর বিরাট আঘাত’ বলে অভিহিত করেন এবং এই অন্যায় প্রতিকারের জন্য অসহযোগ আন্দোলনের কথা বলেন।
  • (৩) কেন্দ্রীয় খিলাফ কমিটি-ও অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে (৮ই জুন)। তাতে (ক) সরকারি খেতাব ও অবৈতনিক পদ বর্জন, (খ) সরকারের বে-সামরিক পদগুলি থেকে ইস্তফা দেওয়া, (গ) পুলিশ ও সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করা এবং (ঘ) খাজনা না দেওয়ার কথা বলা হয়।
  • (৪) গান্ধীজি খিলাফৎ নেতৃবৃন্দকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ইতিমধ্যে পাঞ্জাব হত্যা কাণ্ড সম্পর্কে ‘হান্টার কমিটি’-র রিপোর্ট প্রকাশিত হলে (২৮শে মে) দেশময় প্রবল বিক্ষোভ দেখা দেয়।
  • (৫) ব্রিটিশ শাসকদের প্রতি গান্ধীজির সব আস্থা বিনষ্ট হয় এবং তিনি যথার্থই একজন বিদ্রোহীতে পরিণত হন। এই অবস্থায় গান্ধীজি পাঞ্জাব ও খিলাফৎ ‘অন্যায়’ দু’টিকে একসূত্রে গণিত করে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন (৩০শে জুন)।

জুডিথ ব্রাউনের উক্তি

ডঃ জুডিথ ব্রাউন বলেন যে, খিলাফতের সঙ্গে পাঞ্জাবের প্রশ্নকে জড়িয়ে দিয়ে গান্ধীজি ব্যাপক অসহযোগ আন্দোলনের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। কারণ কেবলমাত্র খিলাফৎ প্রশ্নে হিন্দুদের সহযোগিতা পাওয়া যেত কিনা সন্দেহ।

হিন্দুদের কাছে আবেদন

তিনি জুলাই মাসে সিন্ধুপ্রদেশে আহুত খিলাফৎ সম্মেলনে যোগ দেন এবং ভারতের ৭ কোটি মুসলমানকে সাহায্যের জন্য ২৩ কোটি হিন্দু জনসাধারণের কাছে আবেদন জানান।

অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা

গান্ধীর ডাকে ১লা আগস্ট ভারতব্যাপী এক সর্বাত্মক হরতাল অনুষ্ঠিত হয় এবং ঐ দিন ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘কাইজার-ই-হিন্দ’ স্বর্ণপদক ফেরৎ দিয়ে গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেন।

খিলাফত আন্দোলনের বিস্তার

এই আন্দোলন জনমনে বিশেষ সাড়া জাগাতে পারে নি এবং এর প্রভাব ভারতের সর্বত্র সমভাবে অনুভূত হয় নি।

  • (১) বাংলা ও বিহারে এর বিশেষ প্রভাব পড়ে নি। যুক্তপ্রদেশে কিছু গরিব ও অশিক্ষিত মুসলমান এই আন্দোলনে অংশ নিলেও শিক্ষিত মুসলমানরা এ থেকে দূরে ছিলেন। তাঁদের ধারণা হয় যে, তাঁরা সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করলে হিন্দুরা সেই পদগুলি দখল করবে।
  • (২) এই আন্দোলন সম্পর্কে হিন্দুদেরও কোনো উৎসাহ ছিল না। পাঞ্জাবের গরিব মুসলিম চাষিরা এই আন্দোলন সম্পর্কে নিস্পৃহ ছিল। মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাটের ধনী ব্যবসায়ীরা নিজ স্বার্থে এই আন্দোলন থেকে দূরে ছিল।
  • (৩) গরিব মুসলমান বা হিন্দু জনতার মনে তুরস্কের সুলতানের ভবিষ্যৎ কোনো সাড়া জাগাতে পারে নি।
  • (৪) সিন্ধুপ্রদেশে মোল্লা ও পীররা এই আন্দোলনে যোগ দেয়। এর ফলে গরিব মুসলিম চাষিদের মধ্যেও সাড়া জাগে।
  • (৫) মাদ্রাজে এই আন্দোলন জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও বহু প্রভাবশালী মুসলিম এর বিপক্ষে ছিলেন।

কামাল পাশার ক্ষমতা দখল

শেষ পর্যন্ত খিলাফৎ আন্দোলন ব্যর্থ হয়। তুরস্কের জনসাধারণ ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১লা নভেম্বর তুরস্কের সুলতান বা খলিফা চতুর্থ মহম্মদকে পদচ্যুত করে এবং কামাল পাশার নেতৃত্বে তুরস্কে একটি প্রজাতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয় (২৯শে অক্টোবর, ১৯২৩ খ্রিঃ)।

আন্দোলনের অবসান

ভারতে খিলাফৎ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ‘খলিফা’ কে তাঁর হৃত মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে কামাল পাশা ‘খলিফা’ পদটিই তুলে দেন। ফলে ভারতে খিলাফৎ আন্দোলন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে এবং তা বন্ধ হয়ে যায়।

গুরুত্ব

ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে খিলাফৎ আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারী।

(১) হিন্দু-মুসলিম ঐক্য

এই আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধ ভাবে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে অবতীর্ণ হয়। ১৮৫৭-র মহা-বিদ্রোহের পর হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের এমন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন আর নজরে আসে নি।

(২) মুসলিম আনুগত্যে ফাটল

এতদিন পর্যন্ত মুসলিম সম্প্রদায় সরকারের অনুগত ছিল। দীর্ঘদিন বাদে এই আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ের এই আনুগত্যে ফাটল ধরে এবং তারা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অবতীর্ণ হয়।

(৩) অসহযোগ আন্দোলনের পরিপুষ্টি

ডঃ বিপান চন্দ্ৰ বলেন যে, খিলাফৎ আন্দোলন ভারতের অসহযোগ আন্দোলনকে বিশেষভাবে পরিপুষ্ট করেছিল। এই আন্দোলন শহরাঞ্চলের মুসলিমদের জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এর ফলে জাতীয় আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঞ্চার হয়।

(৪) গান্ধীজির নেতৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত

এই আন্দোলনের মাধ্যমে গান্ধীজি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করেন এবং তিনি সর্বভারতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

(৫) গান্ধীর প্রকৃত ক্ষমতা লাভ

ডঃ জুডিথ ব্রাউন বলেন যে, রাওলাট আইন সত্যাগ্রহের মাধ্যমে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে গান্ধীজির মর্যাদা বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু খিলাফৎ আন্দোলন তাকে প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী করে।

রোম্যাঁ রোলাঁর উক্তি

ফরাসি ঐতিহাসিক রোম্যাঁ রোলাঁ এই আন্দোলনকে ‘খিলাফৎ বিদ্রোহ’ বলে অভিহিত করেছেন।

কে কে আজিজ- এর উক্তি

ঐতিহাসিক কে. কে. আজিজ বলেন যে, খিলাফৎ আন্দোলন মুসলিম আনুগত্যের ধারণা বিনষ্ট করে (“The Khilafat movement destroyed the myth of Muslim loyalty.”)।

বিপান চন্দ্রের উক্তি

ডঃ বিপান চন্দ্র বলেন, মুসলিমদের মনে যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছিল, এই আন্দোলন ছিল তারই একটি অভিব্যক্তি। খিলাফৎ কে কেন্দ্র করেই এই সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল।

সমালোচনা

এই আন্দোলন একেবারে ত্রুটিমুক্ত ছিল না। ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিজীবীরা নানা ভাবে এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন।

  • (১) খিলাফৎ আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল ধর্ম। তুরস্কের সুলতান বা খলিফাকে তাঁর হৃত মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করাই ছিল এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য। ভারতে ব্রিটিশ সরকারের সাম্রাজ্যবাদী অপশাসন বা জনগণের দুর্গতি মোচন এবং স্বাধীনতা লাভের কোন মহত্তর উদ্দেশ্য নিয়ে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে নি।
  • (২) ভারতের স্বাধীনতা লাভ নয় খলিফার মর্যাদা রক্ষাই ছিল এর একমাত্র লক্ষ্য। তুরস্কে কামাল পাশার নেতৃত্বে খলিফাতন্ত্রের অবসান ঘটলে গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতে এই আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে অর্থহীন হয়ে পড়ে।
  • (৩) মুসলিম সমাজ অসহযোগ আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ায় এবং ভারতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য বিনষ্ট হয়।
  • (৪) অসহযোগ ধর্মীয় ভিত্তি আন্দোলন চলাকালে ভারতীয় মুসলিম খলিফার সাহায্যার্থে গঠিত ‘খিলাফৎ’ ও ‘অ্যাঙ্গোরা তহবিলে’ মুক্তহস্তে দান করেছিলেন। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা লাভের উদ্দেশ্যে গঠিত “তিলক স্বরাজ তহবিলে’ সেভাবে দান করেন নি।
  •  (৫) আসলে ব্রিটিশ-বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও এই আন্দোলন ছিল যুক্তিবাদের পরিবর্তে ইসলামিয় রোমান্টিকতায় ভরপুর। সমকালীন কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতা চিত্তরঞ্জন দাশ, লালা লাজপৎ রায় বা তিলক সরাসরি গান্ধীজির খিলাফৎ প্রীতির প্রতিবাদ না করলেও তাঁর কাজকর্মকে পুরোপুরি সমর্থন করতে পারেন নি।
  • (৬) শঙ্করণ নায়ার এবং বি. আর. আম্বেদকর একটি বহির্ভারতীয় ধর্মীয় দাবিকে সমর্থন করার জন্য গান্ধীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হন। মহম্মদ আলি জিন্না ও আগা খাঁর মতো পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিম নেতারা খিলাফৎকে সমর্থন করেন নি।
  • (৭) পরবর্তীকালে লালা লাজপৎ রায় বলেন যে, “রাজনৈতিক ভিত্তির পরিবর্তে ধর্মীয় ভিত্তিতে খিলাফৎ আন্দোলন সংগঠিত হওয়া ছিল দুর্ভাগ্যজনক। …..এটা সরাসরি সাম্প্রদায়িক উদ্দীপনার উন্মেষ ঘটায় এবং ঐক্যবদ্ধ ভারতের আদর্শের পরিপন্থী শক্তিগুলিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।”
  • (৮) ডঃ খালিদ বিন সৈয়দ তার Pakistan The Formative Phase‘ পুস্তকে বলেন যে, খিলাফৎ আন্দোলন মুসলিমদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা প্রসারে সহায়তা করেছিল এবং এই আন্দোলন মুসলিমদের নিজেদের দ্বন্দ্ব, বিভেদ ও সংঘাতকে প্রকাশ্যে এনে দেয়।
  • (৯) রক্ষণশীল মৌলবি ও মোল্লারাই ছিলেন এই আন্দোলনের মূল প্রচারক। আবদুল বারি, আলি ভ্রাতৃদ্বয়, মৌলানা আজাদ বা ডঃ আনসারি প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বিশেষ যোগাযোগ ছিল না।
  • (১০) দরিদ্র গ্রামীণ কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে এই আন্দোলনের বিশেষ কোন সম্পর্ক ছিল না। জওহরলাল নেহরু তাঁর ‘আত্মজীবনী’তে বলছেন যে, গ্রামীণ জনগণ ‘খিলাফৎ’-এর অর্থই বুঝতেন না।”
  • (১১) বলা হয়ে যে, গান্ধীজি তাৎক্ষণিক হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সাধন করতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন এবং সাম্প্রদায়িক শক্তিকে জোরদার করে তোলেন।

উপসংহার :- ডঃ জুডিথ ব্রাউন বলেন যে, “গান্ধীজি যে কৌশল দ্বারা ব্যাপক মুসলিম সমর্থন লাভ করেন তা বুমেরাং হিসেবে কাজ করে।” ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠী বলেন যে, “গান্ধী ভাবতেও পারেননি যে এ ধরনের মৈত্রী তাৎক্ষণিক সাফল্য অর্জন করলেও উলেমাদের প্রাধান্য ভবিষ্যতে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজমকে ঘা দেবে।

(FAQ) খিলাফত আন্দোলন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. খিলাফত দিবস কবে পালিত হয়?

১৭ অক্টোবর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে।

২. খিলাফত আন্দোলনের অন্যতম নেতা কে ছিলেন?

মৌলানা মহম্মদ আলি।

৩. খিলাফত আন্দোলন বা খিলাফতের পরিসমাপ্তি বা পতন ঘটে কখন?

৩ মার্চ ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Reply

Translate »