প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ

১৯১৪-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ প্রসঙ্গে কোনও দেশ যুদ্ধ চায়নি, কারণ নিয়ে বিতর্ক, বিভিন্ন কারণে সমাবেশ, শান্তির আড়ালে যুদ্ধের প্রস্তুতি, রাজনৈতিক পরিবেশ বিষাক্ত, সশস্ত্র শান্তির যুগ, অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদ হিসেবে আলসাস-লোরেন সমস্যা, স্লেজউইগ সমস্যা, বলকান জাতীয়তাবাদ, অস্ট্রিয়ার জাতীয়তাবাদী সমস্যা, উগ্র জাতীয়তাবাদ হিসেবে বিদ্বেষ ও জাতিবৈরিতা, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের প্রচার, জার্মানি ও ইংল্যান্ডের প্রচার, ফ্রান্সের নেতাদের প্রচার, বাণিজ্যিক ও ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে শিল্প বিপ্লব, বাজারের প্রয়োজনীয়তা, ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য স্থাপন, জার্মানিতে শিল্প বিপ্লব, কাইজারের ঘোষণা, ইংল্যান্ডের আতঙ্ক, পরস্পর বিরোধী শক্তি জোট গঠন হিসেবে দুটি শক্তি জোট, যুদ্ধের বাতাবরণ তৈরি, সামরিক প্রতিযোগিতা হিসেবে বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা, জার্মানির নৌশক্তি বৃদ্ধি, ইংল্যান্ডের নৌশক্তি বৃদ্ধি, অস্ট্রিয়া-ইতালি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অস্ট্রিয়া-রাশিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সংবাদপত্রের ভূমিকা, কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংকট হিসেবে মরক্কো সংকট, আগাদির ঘটনা, বলকান সংকট ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ

ঘটনাপ্রথম বিশ্বযুদ্ধ
সময়কাল১৯১৪-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ
বিবাদমান জোটত্রিশক্তি মৈত্রী ও ত্রিশক্তি চুক্তি
ত্রিশক্তি মৈত্রীজার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইতালি
ত্রিশক্তি চুক্তিইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ

ভূমিকা:- ১৯১৪-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে এক অতি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ইতিপূর্বে এত ব্যাপক, ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী যুদ্ধ আর কখনও সংঘটিত হয় নি। জল-স্থল ও অন্তরীক্ষ সর্বত্রই এই যুদ্ধ প্রসারিত হয় এবং পৃথিবীর প্রতিটি দেশ কোনও না কোনওভাবে এই যুদ্ধের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।

কোনোও দেশ যুদ্ধ চায়নি

যুদ্ধের এই সর্বাত্মক চরিত্র সত্ত্বেও পৃথিবীর কোনও দেশই কিন্তু এই যুদ্ধ চায় নি। ঐতিহাসিক ফে (Sydney Bradshaw Fay)-র মতে, “কোনও দেশই যুদ্ধ চায় নি।” আলব্রেখট রেনে কেরি বলেন যে, “ইউরোপের দায়িত্বশীল নেতাদের অধিকাংশই জ্ঞানত এই ধরনের কোনও যুদ্ধ চান নি। তা সত্ত্বেও এ যুদ্ধ হল – কোনও একপক্ষ একটু সংযত বা আপোসকামী হলেই হয়তো এ যুদ্ধ এড়ানো যেত।

কারণ নিয়ে বিতর্ক

এই যুদ্ধের কারণ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্কের অন্ত নেই। আজ পর্যন্ত এই নিয়ে বহু গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচিত হয়েছে, বহু মতবাদ উচ্চারিত হয়েছে এবং নানা রকম তর্ক-বিতর্ক চলেছে।

বিভিন্ন কারণের সমাবেশ

কোনও বড়ো ধরনের বিপ্লব বা যুদ্ধ কখনোই আকস্মিকভাবে বা মাত্র কোনও একটি কারণে ঘটতে পারে না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি এবং নানা ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণের সমাবেশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় নি।

জেমস জোলের মন্তব্য

অধ্যাপক জেমস জোল বলেন যে, বিশ্বযুদ্ধের কারণ হিসেবে কোনও একক ব্যাখ্যা অতিসরলীকরণ হয়ে যাবে।

শান্তির আড়ালে যুদ্ধের প্রস্তুতি

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সেডানের যুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের ইতিহাসে যে ঘটনাবলীর সূত্রপাত হয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হল তারই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। এই আমলে (১৮৭০-১৯১০ খ্রিঃ) ইউরোপে কোনও বড়ো যুদ্ধ সংঘটিত হয় নি ঠিকই, কিন্তু এই আপাত শান্তির আড়ালে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে।

রাজনৈতিক পরিবেশ বিষাক্ত

ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে তীব্র ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সমরাস্ত্র নির্মাণের প্রতিযোগিতা, পারস্পরিক সন্দেহ ও বিদ্বেষ এবং অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদ ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে। এর ফলে যে কোনও সময় যুদ্ধ বেধে যেতে পারত।

সশস্ত্র শান্তির মুখ

এই যুগ হল যুদ্ধের প্রস্তুতির যুগ। এই কারণে ১৮৭১-১৯১৩ খ্রিস্টাব্দকে অনেকে ‘সশস্ত্র শান্তির যুগ বলে অভিহিত করেন। ঐতিহাসিক এ. জে. পি. টেলর বলেন যে, এই সময় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে উত্তেজনা থাকলেও, হঠাৎ করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা কেউ কল্পনাও করতে পারে নি।

টমসনের মন্তব্য

অধ্যাপক ডেভিড টমসন বলেন, “প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে, এই যুদ্ধ ছিল অযাচিত ও অভাবিত, এবং ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ থেকে যে ঘটনাবলীর সূচনা হয়, এই যুদ্ধ ছিল তারই চূড়ান্ত পরিণতি পে

অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হল ইউরোপের আহত ও অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদ। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত ভিয়েনা সম্মেলনে জাতীয়তাবাদকে ভূলুণ্ঠিত করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, পরবর্তী একশো বছরে তা ইউরোপে এক ভয়ঙ্কর অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

(১) আলসাস-লোরেন সমস্যা

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সেডানের যুদ্ধে জার্মানির হাতে ফ্রান্সের শোচনীয় পরাজয় এবং জার্মানি কর্তৃক ফ্রান্সের কয়লা ও লৌহ-খনি সমৃদ্ধ আলসাস ও লোরেন দখল ফ্রান্স কখনোই ভুলতে পারে নি। এই পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ এবং স্থান দুটি পুনরুদ্ধারের জন্য ফ্রান্স সর্বদাই সচেষ্ট ছিল। তাছাড়া আলসাস-লোরেনের অধিবাসীবৃন্দও জার্মানির সঙ্গে তাদের অন্তর্ভুক্তি মানতে পারে নি।

(২) ট্রেনটিনো ও ট্রিয়েস্ট

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ইতালি ঐক্যবদ্ধ হলেও তা ছিল অসম্পূর্ণ। কারণ, তখনও ইতালীয় ভাষাভাষী ট্রেনটিনো ও ট্রিয়েস্ট নামক স্থান দুটি অস্ট্রিয়ার অধিকারে ছিল। ইতালীয় জনগণ এই স্থান দুটি পুনরুদ্ধারে বদ্ধপরিকর ছিল। ঐতিহাসিক ল্যাংসাম বলেন যে, ‘অসম্পূর্ণ ইতালি’ ছিল যুদ্ধের অন্যতম কারণ।

(৩) শ্লেজউইগ সমস্যা

শ্শ্লেজউইগ জার্মানির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেখানকার ডেন অধিবাসীরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিল। আয়ারল্যান্ডবাসী ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রামরত ছিল।

(৪) বলকান জাতীয়তাবাদ

  • (ক) ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের বার্লিন চুক্তি দ্বারা বলকান জাতীয়তাবাদী সমস্যার কোনও সমাধান হয় নি। বরং তা জটিলতর হয়ে ওঠে। বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, ম্যাসিডোনিয়া – সর্বত্র অশান্তির আগুন জ্বলে ওঠে।
  • (খ) ‘সর্ব স্লাভ’ আন্দোলনের নেতা সার্বিয়া চাইছিল তার নেতৃত্বে স্লাভ রাজ্যগুলির ঐক্য প্রতিষ্ঠা। বার্লিন চুক্তিতে স্লাভ জাতি-অধ্যুষিত বসনিয়া ও হারজেগোভিনার উপর অস্ট্রিয়ার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কিছুদিন পর অস্ট্রিয়া এই স্থান দুটি নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করে।
  • (গ) এই স্থান দুটির অধিবাসীরা সার্বিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির পক্ষে ছিল। তারা এই উদ্দেশ্যে আন্দোলন শুরু করলে, সার্বিয়া তাদের মদত দেয় এবং এইভাবে বলকানে অস্ট্রিয়া-সার্বিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়।
  • (ঘ) বার্লিন চুক্তিতে বুলগেরিয়াকে ত্রিধা-বিভক্ত করা, এবং রুমানিয়ার কিছু অংশ রাশিয়ার হাতে যাওয়ায় রুমানিয়রা ক্ষুব্ধ হয়। ম্যাসিডোনিয়ার অধিকার নিয়ে গ্রিস, সার্বিয়া ও বুলগেরিয়ার দ্বন্দ্ব প্রবল আকার ধারণ করে।

(৬) অস্ট্রিয়ার জাতীয়তাবাদী সমস্যা

অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত চেক, পোল প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে সোচ্চার হয়। এক কথায়, অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদী আশা-আকাঙ্ক্ষা ইউরোপে এক যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করে।

উগ্র জাতীয়তাবাদ

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর সূচনায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এক ধরনের উগ্র, স্বার্থপর ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব হয়। যেমন –

(১) বিদ্বেষ ও জাতিবৈরিতা

সব জাতিই নিজের দেশ ও জাতিকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করতে থাকে এবং অন্যান্য জাতি ও দেশকে পদানত করে নিজ নিজ দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হয়। এইভাবে ইউরোপের বিভিন্ন জাতির মধ্যে এক ধরনের বিদ্বেষ ও জাতিবৈরিতার সৃষ্টি হয়।

(২) সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের প্রচার

একশ্রেণির সাংবাদিক ও সাহিত্যিক এই ধরনের উগ্র ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ প্রচার করতে থাকেন। জার্মান ঐতিহাসিক হেনরিখ ফন ট্রিটস্কি, বার্নহার্ডি প্রমুখ প্রচার করেন যে, জার্মানির টিউটনিক জাতিই হল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। জার্মান দার্শনিক হেগেল ঘোষণা করেন যে, রাষ্ট্রই ঈশ্বর এবং রাষ্ট্রের গৌরবে জাতির গৌরব।

(৩) জার্মানি ও ইংল্যান্ডের প্রচার

সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম বিশ্বে টিউটনিক জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে থাকেন। ইংরেজ লেখক হোমার লী অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করেন।

(৪) ফরাসি নেতাদের প্রচার

ক্লেমাঁসু ও পয়েনকারী প্রমুখ ফরাসি নেতা ফরাসি ল্যাটিন জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করে ঘোষণা করেন যে, ল্যাটিন সভ্যতার সঙ্গে টিউটনিক সভ্যতার সংঘর্ষ অনিবার্য।

(৫) অন্যান্য দেশে প্রচার

কেবল ইংল্যান্ড, জার্মানি বা ফ্রান্স নয় – রাশিয়া, ইতালি, জাপান এবং পৃথিবীর অপরাপর দেশেও এই ধরনের উগ্র ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ প্রচারিত হয়ে যুদ্ধের আবহাওয়া তৈরি করে।

(৬) লর্ড অ্যাক্টনের মন্তব্য

তাই বিশিষ্ট ইংরেজ চিন্তাবিদ লর্ড অ্যাক্টন জাতীয়তাবাদকে একটি অবাস্তব ও অপরাধমূলক আদর্শ বলে অভিহিত করেছেন।

বাণিজ্যিক ও ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা

মার্কসবাদী ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বাণিজ্যিক ও ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ।

(১) শিল্প বিপ্লব

শিল্প বিপ্লবের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিল্পজাত পণ্যের উৎপাদন প্রভূত পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। নিজ দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত পণ্যাদি বিক্রির জন্য বাজার এবং দেশের কলকারখানাগুলির জন্য কাঁচামাল সংগ্রহের প্রয়োজন হয়।

(২) বাজারের প্রয়োজনীয়তা

শিল্প বিপ্লবের ফলে দেশীয় শিল্পপতি ও পুঁজিপতিদের হাতে প্রচুর মূলধন সঞ্চিত হয়। এই মূলধন বিনিয়োগের জন্য বাজারের প্রয়োজন ছিল। তাই উদ্বৃত্ত পণ্যাদি বিক্রি, কারখানার জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ এবং পুঁজিপতিদের হাতে সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ মূলধন বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশের শিল্পপতি ও পুঁজিপতিরা উপনিবেশ বিস্তারের জন্য নিজ নিজ দেশের সরকারের উপর চাপ দিতে থাকে।

(৩) ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য স্থাপন

শিল্প বিপ্লব আগেই সংঘটিত হওয়ার কারণে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, পর্তুগাল ও স্পেন উপনিবেশ বিস্তারে অনেক অগ্রসর হয় এবং এশিয়া ও আফ্রিকার অনুন্নত অঞ্চলে তাদের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য স্থাপিত হয়।

(৪) জার্মানিতে শিল্প বিপ্লব

জার্মানি ও ইতালিতে শিল্প বিপ্লব শুরু হয় অনেক পরে। শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়ার স্বল্পকালের মধ্যেই, বিশেষ করে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়মের আমলে জার্মানি শিল্পের ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করে। জার্মান কারখানার উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রির বাজার এবং কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য জার্মানিও উপনিবেশ বিস্তারে অগ্রসর হয়।

(৫) অবশিষ্ট স্থান সামান্য

জার্মান পুঁজিপতিরাও সরকারকে উপনিবেশ দখলের জন্য চাপ দিতে থাকে। ইতিমধ্যে এশিয়া আফ্রিকার প্রায় সব স্থানই ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, পর্তুগাল বা স্পেন কর্তৃক অধিকৃত হয়েছে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া বা ইতালির জন্য তখন খুব সামান্য স্থানই অবশিষ্ট ছিল।

(৬) কাইজারের ঘোষণা

এই কারণে জার্মান সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম বলেন, “পৃথিবীর যে-দিকে তাকাই, সেই দিকেই হয় ইংল্যান্ড বা ফরাসি উপনিবেশ। জার্মানিও সূর্যের নীচে বাস করে।” জার্মানির ঐক্য সাধনের পর বিসমার্ক বলেন, “জার্মানি একটি পরিতৃপ্ত দেশ।” কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম কিন্তু ভিন্ন কথা বলেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, জার্মানি পরিতৃপ্ত দেশ নয়, তার সামনে ‘অনন্ত সম্প্রসারণের’ যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।

(৭) ইংল্যান্ডের আতঙ্ক

উপনিবেশ বিস্তারের উদ্দেশ্যে তিনি জার্মান নৌ-শক্তি বৃদ্ধি করার চেষ্টা করেন। এর ফলে ইংল্যান্ড আতঙ্কিত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিটিশ উপনিবেশে বুয়োরদের সঙ্গে ইংল্যান্ডের যুদ্ধের সময় তিনি বুয়োর প্রেসিডেন্ট ক্রুগার-কে সাহায্যদানের প্রস্তাব দিয়ে টেলিগ্রাফ পাঠান।

(৮) মধ্যপ্রাচ্যে জার্মানির হস্তক্ষেপ

মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে কাইজার সেখানে বার্লিন-বাগদাদ রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। ভারতীয় সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে ইংল্যান্ড এই ব্যাপারে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ফরাসি উপনিবেশ মরক্কোতেও তিনি হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেন।

(৯) সামরিক শক্তি বৃদ্ধি

এইভাবে উপনিবেশ বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় রাজনীতি ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং সকলেই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির দিকে নজর দেয়। এরই পরিণতি হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। লেনিন তাঁর ‘সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর’ পুস্তিকায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য এই অর্থনৈতিক কারণকে দায়ী করেছেন।

পরস্পর-বিরোধী শক্তিজোট গঠন

উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাব, উপনিবেশ বিস্তার নিয়ে পারস্পরিক বিবাদ এবং ১৮৭০ থেকে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে পরস্পর-বিরোধী নানা শক্তিজোট গঠন ইউরোপে এক পারস্পরিক সন্দেহ, বিদ্বেষ ও যুদ্ধময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

(১) দুটি শক্তিজোট

ইউরোপ দুটি বিবদমান সশস্ত্র শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে থাকে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইতালি-কে নিয়ে গঠিত ‘ত্রিশক্তি মৈত্রী’ বা ‘ট্রিপল অ্যালায়েন্স’ এবং অপরদিকে থাকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়া-কে নিয়ে গঠিত ‘ত্রিশক্তি চুক্তি’ বা ‘ট্রিপল আঁতাত’।

(২) যুদ্ধের বাতাবরণ তৈরি

নিজ নিজ সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে এইভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সাত বছর আগে ইউরোপ দুটি পরস্পর-বিরোধী যুদ্ধকামী শিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং অচিরেই একটি যুদ্ধের বাতাবরণ তৈরি হয়।

(৩) ল্যাংসাম ও টমসনের মন্তব্য

অধ্যাপক ল্যাংসাম বলেন, “এইভাবে ইউরোপের শান্তি যে কোনও দুর্ঘটনায় বিঘ্নিত হওয়ার মুখে এসে দাঁড়ায়”। ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন মন্তব্য করেন যে, ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কেবল তুরস্কই ইউরোপের ‘রুণ মানুষ’ ছিল না, ইউরোপ নিজেই পরিণত হয়েছিল রুগণ মানুষে।

(৪) এস বি ফে-র মন্তব্য

ঐতিহাসিক এস বি ফে বলেন যে, “১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়া যুদ্ধের পর গোপন চুক্তি-ব্যবস্থার উদ্ভব ছিল বিশ্বযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।” অধ্যাপক টেলর এবং জেমস জোল এই বক্তব্যের বিরোধিতা করলেও অধ্যাপক ফে-র বক্তব্যকে অস্বীকার করা যায় না।

সামরিক প্রতিযোগিতা

পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাসের পরিবেশ থেকেই বিভিন্ন ইউরোপীয় শক্তিবর্গ আত্মরক্ষার জন্য সমরসজ্জা ও সামরিক প্রতিযোগিতা শুরু করে, এবং এই সামরিক প্রতিযোগিতা প্রথম মহাযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। যেমন –

(১) জার্মানি ও ফ্রান্স

জার্মান সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম বিশ্বজয়ের জন্য বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করলে ফ্রান্স আতঙ্কিত হয় এবং মনে করে যে, জার্মানির শক্তি বৃদ্ধি পেলে আলসাস-লোরেন পুনরুদ্ধার হবে না। এর ফলে ফ্রান্স সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে শুরু করে। এতে আতঙ্কিত হয়ে জার্মানিও পুনরায় তার সেনাদল বৃদ্ধির দিকে নজর দেয়। এর ফলে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে এক অন্তহীন সামরিক প্রতিযোগিতা চলতে থাকে।

(২) বাতামূলক সামরিক

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা শুরু হয়। এই ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে জার্মানি। ফ্রান্স ও রাশিয়াতেও অনুরূপ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। ফলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

(৩) জার্মানির নৌশক্তি বৃদ্ধি

১৮৯৭, ১৮৯৮ এবং ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি নতুন নৌ-নিৰ্মাণ নীতি গ্রহণ করে বড়ো ও মাঝারি পাল্লার যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন নির্মাণ শুরু করলে ইংল্যান্ড আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।

(৪) ইংল্যান্ডের নৌশক্তি বৃদ্ধি

১৯০৩ সাল থেকে ইংল্যান্ড জার্মানির এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে উত্তর সাগরীয় নৌবহর নামে নতুন একটি নৌবহর নির্মাণ শুরু করে। আবার ইঙ্গ-ফরাসি আঁতাত কর্ডিয়েল (১৯০৪ খ্রিঃ) দ্বারা ভূমধ্যসাগরে পাহারাদারির দায়িত্ব ফরাসি নৌবাহিনীকে নিয়ে, ব্রিটেন উত্তর সাগর ও ইংলিশ চ্যানেলে তার নৌশক্তিকে সংহত করতে থাকে।

(৫) যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি

বলা বাহুল্য, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা একটি যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে।

(৬) অস্ট্রিয়া-ইতালি প্রতিদ্বন্দ্বিতা

অস্ট্রিয়া তার পুরোনো স্থানগুলি পুনরুদ্ধার করতে পারে – এই আশঙ্কায় ইতালিও সামরিক দিক থেকে তৈরি হয়।

(৭) অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা

বলকান অঞ্চলের অস্ট্রো-রুশ প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্যও উভয় রাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি পায়। এইভাবে সমগ্র ইউরোপে অস্ত্র-উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, বিভিন্ন রাজ্য তাদের সামরিক ব্যয়-বরাদ্দ বৃদ্ধি করে, প্রত্যেক দেশের সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় এবং সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়।

(৮) বারুদের স্তূপ ইউরোপ

অধিক মুনাফার আশায় অস্ত্রনির্মাতাগণ রাষ্ট্রনায়কদের যুদ্ধের প্ররোচনা দিতে থাকেন। এইভাবে সমগ্র ইউরোপ এক বারুদের স্তূপে পরিণত হয়।

সংবাদপত্রের ভূমিকা

প্রথম মহাযুদ্ধের নেপথ্যে সংবাদপত্রের ভূমিকাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন –

(১) পীত সাংবাদিকতা

এই সময় একশ্রেণির সংবাদপত্র মিথ্যা, বিকৃত ও দায়িত্বহীন সংবাদ পরিবেশন করতে থাকে। এর ফলে ওইসব সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা ও বিক্রি বৃদ্ধি পায়। একে পীত সাংবাদিকতা বলা হয়।

(২) যুদ্ধ পরিস্থিতি

এই ধরনের ‘পীত সাংবাদিকতা’ দ্বারা জনমত গভীরভাবে প্রভাবিত হয় এবং বিভিন্ন শক্তির মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে যুদ্ধের উন্মাদনা সৃষ্টি হয় – ইউরোপে সৃষ্টি হয় যুদ্ধ-পরিস্থিতির।

কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংকট

উপরোক্ত কারণগুলির ফলে যখন ইউরোপে এক উত্তেজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তখন কয়েকটি ভান্তর্জাতিক ঘটনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে। যেমন –

(১) মরক্কো সংকট

  • (ক) মরক্কো হল আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র। খনিজ সম্পদে পূর্ণ এই স্থানটির উপর ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি প্রভৃতি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির নজর ছিল।
  • (খ) ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের ইঙ্গ-ফ্রান্স চুক্তি অনুযায়ী মরক্কোর উপর ফ্রান্স, এবং মিশরের উপর ইংল্যান্ডের কর্তৃত্ব মেনে নেওয়া হয়। মরক্কোয় ফ্রান্সের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে জার্মান স্বার্থ বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় জার্মানি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।
  • (গ) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম মরক্কোর তাজিয়ান বন্দরে উপস্থিত হয়ে নিজেকে ‘মুসলিমদের রক্ষাকর্তা’ হিসেবে তুলে ধরেন এবং মরক্কোর অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন।
  • (ঘ) ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে এক চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স মরক্কোয় জার্মানির বিশেষ অর্থনৈতিক স্বার্থ মেনে নেয় এবং জার্মানিও সেখানে ফ্রান্সের রাজনৈতিক স্বার্থকে স্বীকার করে নেয়।

(২) আগাদির ঘটনা

  • (ক) ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ফ্রান্স জার্মান সমঝোতায় কাইজার সন্তুষ্ট হন নি, বরং মরক্কোর উপর ফরাসি প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি প্রবল অসন্তুষ্ট হন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর রাজধানী ফেজ শহরে এক উপজাতি দেখা দেয় এবং তাদের আক্রমণে কিছু ইউরোপীয় প্রাণ হারায়।
  • (খ) এই অবস্থায় ফরাসি নাগরিকদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার স্বার্থে ফরাসি সেনা ফেজ অধিকার করে। জার্মানি এতে প্রবল ক্ষুব্ধ হয় এবং জার্মান স্বার্থ ও রুশ নাগরিকদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার অজুহাতে আগাদির বন্দরে ‘প্যান্থার’ নামক যুদ্ধজাহাজ পাঠায়।
  • (গ) জার্মানির এই আচরণে ট্রিপল আঁতাত ভুক্ত দেশ গুলি ক্ষুব্ধ হয় এবং ইংল্যান্ড ফ্রান্সের সমর্থনে একটি যুদ্ধ জাহাজ পাঠায়। মরক্কোয় যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
  • (ঘ) শেষ পর্যন্ত জার্মানি মরক্কোর উপর ফরাসি কর্তৃত্ব মেনে নেয় এবং এর বিনিময়ে জার্মানি ফরাসি অধিকৃত কঙ্গোতে এক লক্ষ বর্গমাইল এলাকা লাভ করে। এইভাবে আগাদির সমস্যার সমাধান হলেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
  • (ঙ) এই ঘটনার ফলে ট্রিপল আঁতাত ও ইঙ্গ-ফরাসি মৈত্রী আরও সুদৃঢ় হয় এবং জার্মানির সঙ্গে ইঙ্গ-ফরাসি সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে।

(৩) বলকান সংকট

  • (ক) বলকান সমস্যাকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় রাজনীতি জটিলতর রূপ ধারণ করে। বলকান অঞ্চলে রুশ স্বার্থ দীর্ঘদিনের। সেখানে অস্ট্রিয়ার প্রবেশ ঘটলে রাশিয়ার সঙ্গে তার বিবাদ দেখা দেয়।
  • (খ) আবার অস্ট্রিয়া বসনিয়া ও হারজেগোভিনা নামক স্লাভ-জাতি অধ্যুষিত রাজ্যগুলি গ্রাস করলে ‘সর্ব স্লাভ আন্দোলনে’র নেতা সার্বিয়ার সঙ্গে অস্ট্রিয়ার বিরোধ বাধে। স্লাভ রাষ্ট্র রাশিয়া সার্বিয়াকে সমর্থন করে।
  • (গ) সার্বিয়ার জ্ঞাতসারেই বিভিন্ন স্থানের পরাধীন স্লাভরা গুপ্ত সমিতি গঠন করে গুপ্তহত্যার মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনে প্রয়াসী হয়। অন্যদিকে জার্মানি সমর্থন করে অস্ট্রিয়াকে। এইভাবে বলকান জাতীয়তাবাদ, অস্ট্রো-রাশিয়া ও অস্ট্রো-সার্বিয়া বিবাদ বলকান অঞ্চলকে এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করে।

প্রত্যক্ষ কারণ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল নিম্নরূপ –

(১) সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড

এই অবস্থায় অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্কডিউক ফ্রান্সিস ফার্দিনান্দ ও তাঁর পত্নী সোফিয়া বসনিয়ার রাজধানী সেরাজেভো শহরে এলে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে জুন স্লাভ সন্ত্রাসবাদী সংস্থা ‘ব্ল্যাক হ্যান্ড’ বা ‘ইউনিয়ন অব ডেথ’-এর সদস্য ন্যাভরিলো প্রিন্সেপ রাজপথের উপর প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে তাদের হত্যা করেন। এই ঘটনা ‘সেরাজেতো হত্যাকাণ্ড’ নামে পরিচিত।

(২) সার্বিয়াকে চরমপত্র

আততায়ী অস্ট্রিয়ার প্রজা হলেও, জাতিতে স্নাভ এবং সার্বিয়ার অধিবাসীদের সমগোত্রীয় ছিল। এই কারণে অস্ট্রিয়া স্লাভ জাতিকে ‘আততায়ীর জাতি” বলে অভিহিত করে এবং সার্বিয়াকে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে কতকগুলি শর্ত পুরণের দাবিতে এক চরমপত্র পাঠায় (২৩শে জুলাই)। এই দাবিগুলি পুরণের জন্য মাত্র ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়।

(৩) আন্তর্জাতিক বৈঠকের প্রস্তাব

চরমপত্রে উল্লিখিত অনেক দাবিই সার্বিয়া মেনে নেয়। কিন্তু যে দাবিগুলি মানলে তার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হবে, সেগুলি মানতে অস্বীকার করে এবং এই ব্যাপারে আলোচনার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বৈঠক আহ্বানের প্রস্তাব দেয়।

(৪) বেলগ্ৰেড আক্রমণ

অস্ট্রিয়া এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে ২৮শে জুলাই, ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড আক্রমণ করে। অস্ট্রিয়া ও সার্বিয়ার এই যুদ্ধ বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়।

যুদ্ধ ঘোষণা

সার্বিয়া আক্রান্ত হলে রাশিয়া ৩০ জুলাই সার্বিয়ার পক্ষে সেনাসমাবেশ করে। অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার পক্ষে জার্মানি ৩১শে জুলাই সেনাসমাবেশ করে ১লা আগস্ট রাশিয়া ও ৩ রা আগস্ট ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফ্রান্স আক্রমণের উদ্দেশ্যে জার্মানি বেলজিয়ামের উপর দিয়ে তার সৈন্য নিয়ে গেলে বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা ভঙ্গের অভিযোগে ইংল্যান্ড ৪ঠা আগস্ট জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

উপসংহার:- এইভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয় – সংগঠিত হয় ‘মানব ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা বিয়োগান্ত নাটকের’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সবদিক থেকেই ছিল বিশ্বযুদ্ধ।

(FAQ) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল কত?

১৯১৪-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ।

২. প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিবাদমান জোট দুটির নাম কি ছিল?

ত্রিশক্তি মৈত্রী বা ট্রিপল অ্যালায়েন্স এবং ত্রিশক্তি চুক্তি বা ত্রিশক্তি আঁতাত।

৩. ত্রিশক্তি মৈত্রীর অন্তর্ভুক্ত প্রধান দেশ গুলির নাম লেখ।

জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইতালি।

৪. ত্রিশক্তি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত প্রধান দেশ গুলির নাম লেখ।

ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়া।

Leave a Reply

Translate »