মার্কসবাদ

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদ বা মার্কসবাদ প্রসঙ্গে চারটি স্তম্ভ, ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা হিসেবে মূল প্রেরণা অর্থনীতি, শ্রেণিসংগ্ৰাম, সর্বহারার একনায়কত্ব, শ্রেণিহীন সমাজ, সাম্যবাদী বিপ্লব, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ হিসেবে তিনটি শক্তি, সিনথেসিস, শ্রেণিহীন সমাজ, উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব হিসেবে উদ্বৃত্ত মূল্য, শ্রমের মাপকাঠি, মার্কসবাদের আন্তর্জাতিকতা হিসেবে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধতা, শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান, প্রথম ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠা, মার্কসবাদের সমালোচনা ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদ বা মার্কসবাদ

প্রবক্তা কার্ল মার্কস
অন্য নাম বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদ
ফ্যাক্টরি প্রথা শিল্প বিপ্লব
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ
রুশ বিপ্লব ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে
মার্কসবাদ

 

ভূমিকা:- কার্ল মার্কস প্রচারিত মতবাদ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদ, সাম্যবাদ বা মার্কসবাদ নামে পরিচিত। কেবল ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ বা ‘দাস ক্যাপিটাল’-ই নয় – ‘ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনমি’, ‘দি হোলি ফ্যামিলি’, ‘পভার্টি অব ফিলজফি’, ‘সিভিল ওয়ার ইন ফ্রান্স’ প্রভৃতি গ্রন্থে তাঁর রাজনৈতিক মতবাদ, সমাজতান্ত্রিক আদর্শ, বিপ্লবতত্ত্ব এবং কর্মপদ্ধতি প্রকাশিত হয়েছে।

চারটি স্তম্ভ

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদ বা মার্কসবাদ মূলত চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এগুলি হল –

  • (ক) ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা,
  • (খ) দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ,
  • (গ) উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব এবং
  • (ঘ) আন্তর্জাতিকতা।

(ক) ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা

কার্ল মার্কস ইতিহাসের এক নতুন বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর এই ব্যাখ্যা ‘ইতিহাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা’, ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ এবং ‘অর্থনৈতিক নিমিত্তবাদ’ নামে পরিচিত।

(১) মূল প্রেরণা অর্থনীতি

তাঁর মতে যুদ্ধ, রাজনৈতিক ঘটনা বা মহাপুরুষদের কর্মকাণ্ড ইতিহাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে না। একটি দেশের ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, নৈতিকতা, শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম – সব কিছুর মূল প্রেরণা বা নিয়ন্ত্রক হল অর্থনীতি। উৎপাদন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই ইতিহাসের গতি নিয়ন্ত্রিত হয়।

(২) শ্রেণিসংগ্ৰাম

তাঁর মতে, মানব সমাজের ইতিহাস হল শ্রেণিসংগ্রামের নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে এই শ্রেণিসংগ্রাম বা দ্বন্দ্ব চলছে। প্রাচীন গ্রিস ও রোমে ক্রীতদাস ও স্বাধীন নাগরিক, প্রাচীন রোমে অভিজাত ও সাধারণ নাগরিক, মধ্যযুগে ভূমিদাস ও সামন্তপ্রভু এবং আধুনিক যুগে শ্রমিক শ্রেণি ও পুঁজিপতিদের দ্বন্দ্ব হল সেই নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়।

(৩) সর্বহারার একনায়কত্ব

তাঁর বিশ্বাস আধুনিক যুগের এই সংগ্রামে বিশ্বের সব মেহনতি মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এই সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণির জয় হবেই এবং তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ‘সর্বহারার একনায়কত্ব’ প্রতিষ্ঠা করবে।

(৪) শ্রেণিহীন সমাজ

এইভাবে গড়ে উঠবে এক শ্রেণিহীন সমাজ, যেখানে কোনও অত্যাচার ও শোষণ থাকবে না এবং এর ফলে রাষ্ট্রেরও কোনও প্রয়োজন থাকবে না। তাই বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণির কাছে তাঁর আহ্বান, “দুনিয়ার মজদুর এক হও।”

(৫) সাম্যবাদী বিপ্লব

তিনি বলেছেন, “সাম্যবাদী বিপ্লবের ভয়ে শাসক শ্রেণি কেঁপে উঠুক। দাসত্বের শৃঙ্খল ছাড়া শ্রমিক শ্রেণির হারাবার আর কিছুই নেই। জয় করার জন্য তাদের সামনে আছে সারা বিশ্ব।

(খ) দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ

মার্কসবাদী দর্শনের অন্যতম প্রধান দিক হল দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ। বলা হয় যে, বিশ্বপ্রকৃতির মতো বিশ্বজগৎ ও মানব সমাজ নিয়ত পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তন আসে সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে।

(১) তিনটি শক্তি

প্রত্যেক পরিস্থিতি ও ঘটনার মধ্যে তিনটি শক্তি কার্যকরী থাকে – থিসিস, অ্যান্টিথিসিস ও সিন্থেসিস। কোনও পদার্থ বা ঘটনার মধ্যে রক্ষণশীল শক্তি বা যা বর্তমান অবস্থাকে ধরে রাখতে চায় তা হল থিসিস। পরিবর্তনকামী শক্তি বা যে শক্তি বর্তমান অবস্থাকে বাতিল করে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে চায় তা হল অ্যান্টিথিসিস।

(২) সিন্থেসিস

বিশ্বপ্রকৃতি ও মানব সমাজে সর্বদাই এই দুটি পরস্পর-বিরোধী শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। এই দ্বন্দ্ব থেকেই জন্ম নেয় সিন্থেসিস, বা বলা যেতে পারে যে, দুটি পরস্পর-বিরোধী শক্তির মধ্যে সামঞ্জস্যকারী শক্তি হল সিন্থেসিস। এই সিন্থেসিস থেকেই আবার জন্ম নেয় থিসিস ও অ্যান্টিথিসিস।

(৩) শ্রেণিহীন সমাজের প্রতিষ্ঠা

কোনও সমাজব্যবস্থাই স্থায়ী হবে না, যতক্ষণ তার মধ্যে স্ব-বিরোধিতা থাকবে। বর্তমানে সমাজে পুঁজিপতি বা শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য এবং সেখানে সিন্থেসিস বা সমন্বয়কারী শক্তি হল ‘শ্রেণিহীন সমাজের প্রতিষ্ঠা’।

(গ) উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব

রিকার্ডো-র ‘Labour Theory of Value ‘ ও অপরাপর ইংরেজ অর্থনীতিবিদের রচনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মার্কস ‘উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব নীতি’ প্রচার করেন। দীর্ঘ নয় বছর গবেষণার পর ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘কনট্রিবিউশন টু দি ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনমি’ গ্রন্থে তিনি প্রথম এই মতবাদ ব্যক্ত করেন।

(১) উদ্বৃত্ত মূল্য

তাঁর মতে, উৎপাদনের বিবিধ উপাদান অর্থাৎ জমি, কাঁচামাল, মূলধন – সবই প্রকৃতির দান। এর মালিক সবাই। শ্রমিকের শ্রমের দ্বারাই এগুলি সম্পদ বা সামগ্রীতে রূপান্তরিত হয়। শ্রমিক যা মজুরি পায়, তার চেয়ে সে অনেক বেশি উৎপাদন করে। এইভাবে সৃষ্টি হয় উদ্বৃত্ত মূল্য।

(২) শ্রমের মাপকাঠি

মার্কসের মতে, সকল প্রকার সম্পদ একমাত্র শ্রমের দ্বারাই পাওয়া যায়, সুতরাং সম্পদ শ্রমিকের প্রাপ্য। একমাত্র শ্রমের মাপকাঠিতেই উদ্বৃত্ত সম্পদ বণ্টিত হওয়া উচিত, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না, পুঁজিপতিরা তা আত্মসাৎ করে। এর থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হল শ্রমিক পরিচালিত রাষ্ট্র-কর্তৃক উৎপাদন ও বণ্টন নিয়ন্ত্রণ।

(ঘ) মার্কসবাদের আন্তর্জাতিকতা

মার্কসবাদ কোনও ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়-এর আবেদন আন্তর্জাতিক। যেমন –

(১) শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধতা

তাঁর মতে, শ্রমিকের কোনও দেশ, জাতি বা ধর্ম নেই। পৃথিবীর সব দেশের শ্রমিকই একইভাবে নির্যাতিত ও শোষিত। তাঁর বিশ্বাস পৃথিবীর সব দেশের শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

(২) শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান

তাই শ্রমিক শ্রেণির প্রতি তাঁর আহ্বান, “দুনিয়ার মজদুর এক হও।” এই উদ্দেশ্যে তিনি কয়েকটি সংগঠন স্থাপন করেন। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন ‘কমিউনিস্ট লিগ’।

(৩) ‘প্রথম ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠা

১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘প্রথম ইন্টারন্যাশনাল’ বা ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেনস্ অ্যাসোসিয়েশন’। ইউরোপের বহু দেশের শ্রমিক-প্রতিনিধিরা এতে যোগদান করেন এবং মার্কস এই সংগঠনের নিয়মকানুন ও কর্মসূচি রচনা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ইন্টারন্যাশনাল গঠিত হয়েছে।

মার্কসবাদের সমালোচনা

মার্কসীয় মতবাদ একেবারে ত্রুটিমুক্ত নয়। পণ্ডিতরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মার্কসবাদের সমালোচনা করেছেন। যেমন –

  • (১) মার্কস-কর্তৃক ইতিহাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা ভুল ও অসম্পূর্ণ। ইতিহাসের গতি কেবল অর্থনৈতিক প্রভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয় না। অর্থনীতি ছাড়াও ধর্ম, জলবায়ু, দেশপ্রেম, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, বিভিন্ন ব্যক্তি ও শ্রেণির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের চাপ প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ের উপরেও ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি নির্ভর করে। ঐতিহাসিক হ্যাজেন ইতিহাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যাকে অতিরঞ্জন বলে অভিহিত করেছেন।
  • (২) মার্কস বলেন যে, মানুষের সকল ক্রিয়াশীলতার পশ্চাতে অর্থনৈতিক শক্তির প্রভাব থাকে। এই বক্তব্যও সঠিক নয়। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ববাদ-এর মূলে অর্থনৈতিক কারণ নয় – সৃজনশীলতাই দায়ী ছিল। শেক্সপিয়রের নাটকগুলি নিশ্চয়ই কোনও অর্থনৈতিক কারণে রচিত হয় নি।

গুরুত্ব

নানা ত্রুটি সত্ত্বেও মার্কসবাদের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। সারা বিশ্বে মার্কসবাদ এক যুগান্তকারী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। শিল্প বিপ্লব-প্রসূত ‘ফ্যাক্টরি প্রথা’-র ফলে শিল্পপতিদের অত্যাচারে শ্রমিকদের অবস্থা যখন শোচনীয়, তখন কার্ল মার্কস তাঁর প্রচারের দ্বারা বিশ্ববাসীকে শ্রমিকের দুরবস্থা সম্পর্কে সচেতন করেন। তাঁর প্রচারকার্যের ফলে শ্রমিকদের মধ্যেও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়।

উপসংহার:- সাম্যবাদী মতাদর্শের প্রভাব থেকে শ্রমিক শ্রেণিকে দূরে সরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ইউরোপের বহু দেশে জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশে সমাজতান্ত্রিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়াতে সমাজবাদের প্রতিষ্ঠা ইতিহাসে এক নব যুগের সূচনা করে।

(FAQ) মার্কসবাদ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মার্কসবাদের প্রধান প্রবক্তা কে?

কার্ল মার্কস।

২. কাল মার্কসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের নাম লেখ।

‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’, ‘দাস ক্যাপিটাল’।

৩. কাল মার্কসের প্রধান সহযোগী কে ছিলেন?

ফ্রেডরিক এঙ্গেলস।

৪. মার্কসবাদী দর্শনের অন্যতম প্রধান দিক কি ছিল?

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ।

Leave a Reply

Translate »