বইমেলা

বইমেলা প্রসঙ্গে বইমেলার স্বরূপ, সাংগঠনিক দিক, উদ্দেশ্য, দেশে বইমেলার চিত্র, আনন্দমুখর পরিবেশে, সমস্যা, সমাধান, ধারাবাহিকতা রক্ষায় বই, সমাজ পরিবর্তনে বইমেলা, দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে বইমেলা ও বইমেলার গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

বইমেলা

বিষয় বইমেলা
পালনকারী প্রতিটি দেশ
বিখ্যাত বইমেলা কলকাতার বইমেলা
সূচনা ৫ মার্চ, ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ
উদ্বোধন শিক্ষা মন্ত্রী মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়
বইমেলা

ভূমিকা :- মানুষের ধূসর নিরানন্দ সমতল জীবনে প্রাণের প্রবাহ বয়ে আনে উৎসব। উৎসব আয়োজনের সেই পথ ধরেই এদেশে মেলা তার বিস্তৃত পরিসর দখল করে আছে। মেলা এই দেশের সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম অঙ্গ। আর মেলার জগতে মিলনপিয়াসী সভ্যতার কনিষ্ঠ সন্তান ‘বইমেলা’। এখানে ঘটে সভ্যতার প্রাণের চিহ্ন বিভিন্ন বইয়ের সমাহার। যেখানে দেশি-বিদেশি কোনো বই-ই বাদ যায় না।

বইমেলা

‘মেলা’ শব্দের উৎস ‘মিল’ ধাতু। মেলার অর্থ মিলিত হওয়া। ‘বইমেলা’ সেই মিলন প্রসঙ্গের ইঙ্গিত বাহক। তাই বছরের কোনো এক সময়ে একটি নির্দিষ্ট উপলক্ষে কোনো স্থানে বইয়ের স্টল সাজিয়ে কিছু দিনের জন্য বই প্রদর্শন এবং বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হলে তাকে বইমেলা বা গ্রন্থমেলা বলা হয়। পৃথিবীর সকল দেশেই এমন গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশ ভারতবর্ষ -এও প্রতিবছর বিভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে এমন বইমেলা বসে।

বইমেলার স্বরূপ

  • (১) পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই বছরে একাধিকবার আয়োজিত হয়ে থাকে বইমেলা বা গ্রন্থ মেলা। বই ছাড়া শিক্ষিত জ্ঞান পিপাসু মানুষের জীবন একপ্রকার অচল। অন্যদিকে মানুষের জ্ঞানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপাদান হলো বই বা গ্রন্থ।
  • (২) পারস্যের কবি ওমর খৈয়াম বলেছেন, “রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ / ঘোলাটে হয়ে যাবে; কিন্তু একখানা বই  / অনন্তযৌবনা যদি তেমন বই হয়।” সেই অনন্তযৌবনা বইগুলির খোঁজ মিলবে “বইমেলা” নামক রাজ্যে।
  • (৩) বইমেলা একটি স্বতন্ত্র প্রকৃতির মেলা। কলকাতা বইমেলা এবং ঢাকা বইমেলা এমনই দুটি আন্তর্জাতিক মানের বইমেলার উদাহরণ। ১৯৭৬ সালের ৫ই মার্চ প্রথম কলকাতার বইমেলার উদ্বোধন করেন তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রী মৃত্যুঞ্জয় বন্দোপাধ্যায়।

বই মেলার সাংগঠনিক দিক

  • (১) বই মেলা সংগঠনের পেছনে থাকে প্রধানত তিন শ্রেণীর মানুষ। মেলার উদ্দ্যোক্তা বা যারা মেলা পরিচালনা করেন। প্রকাশক সংস্থা বা যারা বিভিন্ন বইয়ের সম্ভার নিয়ে হাজির হয়ে বই মেলাকে সাজিয়ে তোলেন। আর এক শ্রেনি হল দর্শক বা সময় বিশেষে ক্রেতা।
  • (২) মেলা উদ্যোক্তা, প্রকাশক, দর্শক এই তিনের সমন্বয়ে বই মেলা হয়ে ওঠে সার্থক। বই আমাদের পরম বন্ধু। সমাজকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে প্রয়োজন সঠিক শিক্ষা আর সেই শিক্ষা আমরা পেয়ে থাকি বই থেকে। ম্যাক্সিম গোর্কি বলেছেন, “আমার মধ্যে উত্তম বলে যদি কিছু থাকে তার জন্যে আমি বইয়ের কাছে ঋণী।”

উদ্দেশ্য

  • (১) বই মেলার উদ্দেশ্যই হল মানুষ বেশি করে গ্রন্থ প্রেমিক হোক, নানা রকমের বই দেখা, নাড়া চাড়া করার মধ্য দিয়ে জ্ঞানের প্রতি গড়ে উঠুক আকর্ষণ; নানা বিধ বইয়ের সঙ্গে গড়ে উঠুক সখ্যতা।
  • (২) কর্মমুখী মানুষ যারা সাধারণত সময় পান না বই কেনার, তারাও মেলার আকর্ষণে ছুটে আসেন পরিবার ছেলে মেয়েদের নিয়ে। বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা মেলার আনন্দের মধ্য দিয়ে নতুন নতুন বই এর সাথে পরিচিত হয়। মেলার আনন্দের মধ্য দিয়ে এভাবেই শিক্ষার বিস্তার ঘটে।

বইমেলার ইতিহাস

  • (১) বইমেলা আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও এর জন্ম হয়েছে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে। দশম শতাব্দীর প্রথম দিকে স্টুরব্রিজের মেলা প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলার বইয়ের অংশের নাম ছিল ‘বুক ন সেলার্স রো’।
  • (২) ম্যাথু কেরীর উদ্যোগে ১৮০২ সালে সর্বপ্রথম আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে পূর্ণাঙ্গ বইমেলার আয়োজন করা হয়। বইয়ের একক উপস্থিতিতে ১৯২৪ সালে লিপজিগের বইমেলা আয়োজন হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ -এ র পর বইমেলার পর্যায়ক্রমিক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
  • (৩) ১৯৪৯ সালে ফ্রাঙ্কফুটে বইমেলার সূচনা হয়। এরপর ধীরে ধীরে বইমেলা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে জার্মানির লিপজিগ বা ফ্রাঙ্কফুর্ট ছাড়াও ইংল্যান্ড -এর লন্ডন, সিঙ্গাপুর, মিশর -এর কায়রো, ফ্রান্স -এর প্যারিস, জাপান -এর টোকিও, ভারত -এর কোলকাতা প্রভৃতি বইমেলাও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল।

বাংলাদেশে বাইমেলা

  • (১) বাংলাদেশের বইমেলার ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শহিদদের স্মৃতিকে বাঙালি জাতির মানসে চির জাগরুক রাখার প্রয়াসেই প্রথম বইমেলার আয়োজন করা হয়।
  • (২) বর্তমানে মেলাটি ‘একুশে বইমেলা’ নামে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপি অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় জীবনে ‘একুশে বইমেলা’র প্রভাব এতটাই ব্যাপক যে, এটি প্রতিনিয়তই সৃষ্টি করছে নতুন নতুন পাঠক ও বইপিপাসুদের।
  • (৩) ১৯৯৫ সাল থেকে সরকারি উদ্যোগে নিয়মিত আয়োজিত হচ্ছে ‘ঢাকা বইমেলা’। ১লা জানুয়ারি থেকে পনেরো দিনের এই মেলায় দেশের বিশিষ্ট প্রকাশকরা অংশগ্রহণ করে।
  • (৪) বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনও বার্ষিক বইমেলার আয়োজন করে। বাংলাদেশের বইমেলার আয়োজনে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতীয় পর্যায় ছাড়াও বিভিন্ন জেলা, থানা, পৌরসভাতে প্রকাশনা সংস্থাসমূহ বইমেলার আয়োজন করে।

দেশের বইমেলা চিত্র

  • (১) বইমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা, লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের মিলন মেলা। সারা দেশ থেকে আসা লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে বইমেলা প্রাঙ্গণ।
  • (২) মেলায় পরিচ্ছন্ন-সুন্দর, বর্ণোজ্জ্বল থরে থরে সাজানো থাকে নতুন পাতার গন্ধে মোড়ানো নতুন নতুন বই। এই বই গ্রন্থ প্রেমিকদের যে শুধু বিমোহিত করে তাই নয়, এখানে এসে লেখক-পাঠক-প্রকাশকগণ পরস্পর ভাব বিনিময়ের সুযোগ পায়।
  • (৩) বইমেলার অংশ হিসেবে এখানে অনুষ্ঠিত হয় নতুন প্রকাশিত বইয়ের উপর আলোচনা, বিখ্যাত লেখকদের আলোচনা। তাছাড়া লেখকের অসুবিধা, প্রকাশকের প্রকাশনা সংকট, পাঠকের বই কেনার অনাগ্রহ প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা হওয়ার সাথে সাথে বইমেলা সম্পর্কে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ও পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়।

বইমেলায় আনন্দমুখর পরিবেশ

  • (১) কর্মব্যস্ততার চাপে পড়ে আমাদের দেশে অভিভাবকগণ তাদের নিজেদের ও ছেলেমেয়েদের জন্য পছন্দের বই, প্রিয় লেখকদের বই কিনতে পারেন না। কিন্তু বইমেলার আয়োজন হলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে চলে আসেন বইমেলায়।
  • (২) বই কেনার সাথে সাথে বেড়ানোর আনন্দটাও তারা উপভোগ করেন। বইমেলায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ পুরনো বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা হয়ে যাওয়া, জ্ঞানী-গুণীদের সান্নিধ্য লাভও কম আনন্দের নয়।
  • (৩) আনন্দঘন ছোটো ছোটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বইমেলায় নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়। প্রতিদিনের আয়োজন সাংস্কৃতিক সন্ধ্যাও বইমেলার পরিবেশকে আনন্দমুখর করে রাখে।

বইমেলার সমস্যা

  • (১) আমাদের দেশে প্রতিবছর সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বেশ কিছু বইমেলার আয়োজন করা হয়, যা প্রশংনীয়। কিন্তু বিশৃঙ্খলা ও অন্তঃকারণে বইমেলায় অনেক সময় অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়।
  • (২) আমাদের দেশের বইমেলায় অনিয়ম সংঘটনের অন্যতম কারণ রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য। তাছাড়া বখাটেদের উৎপাত, মেলায় স্টল বরাদ্দ নিয়ে অনিয়ম, স্বল্প পরিসরে অধিক স্টল বরাদ্দ প্রভৃতি কারণে বইমেলা বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়ে থাকে।

বইমেলায় বিদ্যমান সমস্যা সমাধান

দেশের সকল শ্রেণির মানুষ যাতে বইমেলায় আসতে ও বই কিনতে আগ্রহী হয় তার জন্য বইমেলার সমস্যা দূরীকরণে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন –

  • (১) বইয়ের কমিশন ২৫ শতাংশের পরিবর্তে ৩৫-৪০ শতাংশ করা।
  • (২)  শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দক্ষ কর্তৃপক্ষ নিয়োগ।
  • (৩) দল-মত নির্বিশেষে সকালের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ।
  • (৪) আইন-শ‌ঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন।
  • (৫) স্টল বরাদ্দ নিয়ে অনিয়ম বন্ধ।
  • (৬) স্থান প্রশস্তকরণ।
  • (৭) বইমেলার বাইরে গড়ে ওঠা অন্যান্য সামগ্রীর জন্য নির্ধারিত স্থান নির্ধারণ।

ধারাবাহিকতা রক্ষায় বই

  • (১) পুরাতন কালের উপর নতুন কালের অধিষ্ঠান না হলে সভ্যতার ধারাবাহিকতা বিনষ্ট হয়। এই ধারাবাহিকতার অভাবে সমাজ ও ব্যক্তি জীবন বিপর্যস্ত হয়। বই এর সাহায্যে সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়।
  • (২) পুরাতন কালের চিরন্তন সত্য গুলির সংরক্ষন ও অসত্য গুলির বর্জনে  বইই আমাদের পথ নির্দেশ করে। পুরাতন কালের সকল প্রকার  আচার-আচরণ এবং সংস্কার নতুন যুগের সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতি সূচক নয় – ইতিহাসের পাতায় এই সত্য লিপিবদ্ধ আছে। বই আমাদের সেই সকল আচরণের স্বরূপ উদঘাটন তথা সঠিক প্রয়োগের শিক্ষা দেয়।
  • (৩) পৃথিবীতে ভালোবাসার অভাবে যুগে যুগে যে বিভিন্ন সভ্যতা ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে সেই সত্য আমরা বইয়ের পাতা থেকে জানতে পারি। এইভাবে বই আমাদের মানবিক মূল্যবোধ গুলি সংরক্ষণের শিক্ষা দেয়।
  • (৪) কত নদী, সমুদ্র, পর্বত অতিক্রম করে মানুষের কন্ঠ বইতে লিপিবদ্ধ হয়েছে; কত শত সহস্র প্রান্ত হতে মানুষের সুর বইয়ের আধারে রক্ষিত আছে তার ঠিক নেই।
  • (৫) শিল্প-সাহিত্যের মূল্যায়নের জন্য আজও আমরা কোন সুদূরকালের অ্যারিস্টটল -এর ‘পোয়েটিকস’ গ্রন্থটি পাঠ করি। এই ভাবেই বই ইতিহাসের সাথে বর্তমানে সংযোগ গড়ে তুলে সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে সমাজের পরম বন্ধু হয়ে ওঠে।

সমাজ পরিবর্তনে বইমেলা

  • (১) সমাজ পরিবর্তনে বা উন্নতিতে বইয়ের অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদ তথা টমাস পেইন এর ‘এজ অফ রীজন’ -এর যুক্তিবাদ আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ফরাসি বিপ্লব -এর অন্যতম কারণ। এর ফলে জগৎজুড়ে সামন্ততান্ত্রিক শাসনের অবসানের অনুপ্রেরণা এসেছে। পৃথিবীতে গণতন্ত্র মাথা তুলে শ্বাস নিতে পেরেছে।
  • (২) গণতন্ত্রে শুধু সমাজের মুক্তিই ঘটেনি, ঘটেছে ব্যক্তির মুক্তি। উনবিংশ শতাব্দীর ছয়ের দশকের শেষ দিকের ইতালিতে ম্যাৎসিনি, গ্যারিবল্ডির জীবনী বাংলাদেশে বিপ্লবী মুক্তি আন্দোলনের প্রেরণা যুগিয়েছে।
  • (৩) বইয়ের মাধ্যমে ভগিনী নিবেদিতা ইতালির বিপ্লবীদের সংগঠন পদ্ধতির সঙ্গে ভারতবর্ষে অবিভক্ত বাংলার বিপ্লবীদের পরিচয় ঘটিয়েছিলেন। বই কালে কালে সর্ববিধ শোষণ অত্যাচার অনাচার প্রভৃতি থেকে মুক্তির পথ নির্দেশ করেছে।
  • (৪) বইমেলার মত বিশাল প্রাঙ্গণ আমাদের ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়ার বিপুল সুযোগ করে দিচ্ছে প্রতিবছর। শুধু তাই নয়, বইমেলায় প্রত্যেক বছর পৃথিবীর প্রতিটি কণার বিপুল সম্ভাবনাময় নানা নতুন লেখক-কবিদের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। তাদের এই সুপ্ত সম্ভাবনাময় প্রতিভার কথা হয়তো বইমেলা ছাড়া আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব হতো না।

পারস্পরিক ভাব বিনিময়

  • (১) মেলা মানেই মিলন, তা গ্রামীণ মেলা হোক বা বই -এর মেলা। প্রতি দিনের ব্যস্ত একঘেয়েমি জীবনকে দূরে সরিয়ে মেলা এনে দেয় আনন্দ প্রশান্তি।
  • (২) বই মেলার উন্মুক্ত পরিবেশে একে অপরের সাথে আলাপ আলোচনায় নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে, প্রকাশকরা বুঝতে পারেন ক্রেতার চাহিদা। সারা দেশ থেকে আসা কবি, সাহিত্যিক, লেখক সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মেলার প্রাঙ্গণ।
  • (৩) ভক্ত পাঠকরা নিজের প্রিয় লেখকের সাথে দেখা করার সুযোগও পেয়ে থাকে পেয়ে থাকে বইমেলায়। পাঠকের সাথে লেখকদের মিলনের এক সহজ সরল মাধ্যম বইমেলা।

দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে বইমেলা

  • (১) বই আমাদের এক রহস্য পথের সংযোগস্থলে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমাদের অন্তর্নিহিত প্রবণতা সেই সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে পথ খুঁজে পায়। রামনাথ বিশ্বাসের ভ্রমণ বৃত্তান্ত পড়ে অনেক নিরীহ বাঙালি যুবক বিশ্ব পরিভ্রমণের স্বপ্ন দেখেছে।
  • (২) বইয়ের সহস্র পথের চৌমাথায় দাঁড়িয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও নিজের পথ নির্দেশ পেয়েছিলেন, হয়ে উঠতে পেরেছিলেন বিশ্বকবি। হিতৈষী মানুষের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আগ্রহ এবং বইয়ের মাধ্যমে তার নিবারণ, জীবনের প্রতি অনন্য এক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে।

বইমেলা ও গণচেতনা

  • (১) পাঠকের মননে বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম একটি বই। বিভিন্ন গণমাধ্যম যেমন রেডিও, টিভি, খবরের কাগজ প্রভৃতির মতো বইও গণচেতনা সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গণচেতনা বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল।
  • (২) সামাজিক বোধ সৃষ্টি, সুস্থ সাংস্কৃতিক বোধের উন্মেষ, বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার বিকাশ প্রভৃতি। আপামর জনসাধারণের মধ্যে এই সমস্ত গুণের বিকাশ ঘটাতে পারলে অস্বীকার করার অবকাশ থাকেনা যে গণচেতনা সৃষ্টিতে বইমেলার ভূমিকা যথেষ্ট।
  • (৩) যে দেশে নিরক্ষর মানুষের পরিমাণ এতো বেশি সেই দেশে বইমেলা গণচেতনা সৃষ্টিতে কতখানি সফল তা নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। বই মেলা যেখানে সাধারণত প্রভাবিত করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও কিছু আগ্রহী মানুষদের, সেখানে অক্ষর জ্ঞানহীন আপামর জনসাধারণের গ্রন্থ জগতের আনন্দভোজে অংশ নেওয়ার ক্ষমতা থাকে কি?

বইমেলার গুরুত্ব

ব্যক্তি, সমাজ তথা জাতীয় জীবনে বইমেলার গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন –

  • (১) বইমেলায় লেখক, প্রকাশক ও ক্রেতাদের মধ্যে এক অপূর্ব মিলনের সুযোগ ঘটে। ফলে লেখক ও প্রকাশকের উপস্থিতি ক্রেতাদের বই কিনতে উৎসাহিত করে। বইমেলার রুচিকর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ক্রেতাকে বই কিনতে অনুপ্রাণিত করে।
  • (২) মেলা উপলক্ষে সদ্য প্রকাশিত বিভিন্ন বিষয়ের বিপুল সমাবেশ পাঠকদের বইয়ের প্রতি আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে তোলে। বিক্রেতারা অল্প লাভে বই বিক্রি করে নতুন পাঠক তৈরির আশায়। ফলে প্রকাশক আরো বই প্রকাশে উৎসাহিত হয়।
  • (৩) বইমেলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লেখকদের আলোচনা চক্র পাঠকের সাংস্কৃতিক রুচিকে উদ্দীপ্ত করে।

বইমেলার প্রভাব

বইমেলা মূলত আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলের মিলন মেল। এর প্রভাবে মানুষে মানুষে সৃষ্টি হয় প্ৰীতিপূর্ণ বন্ধন। মুছে যায় সামাজিক ভেদবুদ্ধির ফলে সৃষ্ট ব্যবধান। বিখ্যাত লেখকদের বিক্রিত বইয়ে স্বাক্ষর দান, খ্যাতিমান কবির স্বরচিত কাব্য আবৃত্তি স্বাভাবিকভাবেই দর্শক-পাঠকদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে। দর্শক-পাঠক আবিষ্কার করে তার নীরব সঙ্গী বইকে।

উপসংহার :- বইমেলা মানুষের চিন্তার পরিমাপক। এর মাধ্যমে মানুষের রুচি ও আদর্শের উন্নতি ঘটে। তাই বইমেলার উন্নয়নে আমাদের আন্তরিক হতে হবে। কারণ, বই মানুষকে দেয় জ্ঞান, জ্ঞান মানুষকে করে মহীয়ান। আর মহীয়ান মানুষই জাতিকে করে উন্নত। তাই শিক্ষা সংস্কৃতির প্রসারে বইমেলার অবদানকে আমদের স্বাগত জানাতে হবে।

(FAQ) বইমেলা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মেলা শব্দের অর্থ কি?

মিলন।

২. মেলার জগতে মিলন পিয়াসি সভ্যতার কনিষ্ঠ সন্তান কাকে বলা হয়?

মেলা।

৩. কলকাতায় প্রথম কবে বইমেলা আয়োজন করা হয়?

৫ মার্চ, ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ।

৪. কলকাতায় প্রথম বইমেলার উদ্বোধন করেন কে?

তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রী মৃত্যুঞ্জয় বন্দোপাধ্যায়।

Leave a Reply

Translate »