সরস্বতী পূজা

সরস্বতী পূজা প্রসঙ্গে তিথি, বিশেষ উদ্দীপনা, পশ্চিম ও মধ্য ভারতে পূজা, হাতে খড়ি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অরন্ধন, প্রাচীন কালে বাগেশ্বরীর পূজা, উনবিংশ শতকে পূজা, প্রতিমা নির্মাণ, বর্ধমানের সরস্বতী পূজা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূজা, পুজোর নিয়ম, পুজোর বিবরণ, মন্ত্র, পুষ্পাঞ্জলি প্রদান সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

সরস্বতী পূজা

উৎসব সরস্বতী পূজা
তিথি বসন্ত পঞ্চমী
ধরণ সাংস্কৃতিক উৎসব
পালন হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন
উদযাপন বাৎসরিক
সরস্বতী পূজা

ভূমিকা :- হিন্দু বিদ্যা ও সঙ্গীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত একটি অন্যতম প্রধান হিন্দু উৎসব হল সরস্বতী পূজা।

সরস্বতী পূজার তিথি

শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে সরস্বতী পূজা মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে আয়োজিত হয়। এই তিথিটি শ্রীপঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত।

সরস্বতী পূজার দিন বিশেষ উদ্দীপনা

সরস্বতী পূজা উপলক্ষে উত্তর ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, নেপালবাংলাদেশ -এ বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়।

পশ্চিম ও মধ্য ভারতে সরস্বতী পূজা

পশ্চিম ও মধ্য ভারতে জৈন ধর্ম -অবলম্বীরাও সরস্বতীর পূজা করেন। এছাড়া বৌদ্ধ ধর্ম -এর কোনো কোনো সম্প্রদায়েও সরস্বতী পূজা প্রচলিত।

সরস্বতী পূজা

বসন্ত পঞ্চমী বা শ্রীপঞ্চমীর দিন খুব সকালে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্রছাত্রীদের গৃহ ও সর্বজনীন পূজামণ্ডপে দেবী সরস্বতীর পূজা করা হয়।

সরস্বতীর পূজাতে হাতেখড়ি

সরস্বতী পূজার দিন ধর্মপ্রাণ হিন্দু পরিবারে শিশুদের হাতেখড়ি, ব্রাহ্মণভোজন ও পিতৃতর্পণের প্রথাও প্রচলিত।

দেবী সরস্বতীর পূজা উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

সরস্বতী পূজার দিন সন্ধ্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সর্বজনীন পূজামণ্ডপগুলিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজিত হয়ে থাকে।

সরস্বতীর পূজার দিন অরন্ধন

সরস্বতী পূজার পরের দিনটি শীতলষষ্ঠী নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে কোনো কোনো হিন্দু পরিবারে পূজার পরদিন অরন্ধন পালনের প্রথা চলে আসছে।

প্রাচীন কালে বাগেশ্বরীর পূজা

সরস্বতী বৈদিক দেবী। তবে সরস্বতী পূজার বর্তমান রূপটি আধুনিক কালে প্রচলিত হয়েছে। প্রাচীন কালে তান্ত্রিক সাধকেরা সরস্বতীর মতো দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন বলে জানা যায়।

উনবিংশ শতকে সরস্বতী পূজা

ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে পরিস্কার চৌকির উপর তালপাতার তাড়ি ও দোয়াতকলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিল। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে শিক্ষার্থীরা ঘরে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পূজা করত। এই প্রথা গ্রামাঞ্চলে বিংশ শতাব্দীতেও প্রচলিত ছিল।

দেবী সরস্বতীর পূজা উপলক্ষে দেবী সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ

উনবিংশ-বিংশ শতকে শহরের ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করতেন।

বর্ধমানের সরস্বতী পূজা

বর্ধমান মহারাজার সরস্বতী পূজায় বিশেষ সমারোহের আয়োজন করা হয়। দূর দুরান্ত থেকে বহু মানুষ এই পূজার বিসর্জন দেখতে আসত। এই দিন পূজা উপলক্ষে দুই ঘণ্টা আতসবাজিও পোড়ানো হত।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজা

আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে।

সরস্বতী পুজোর নিয়ম

  • (১) সরস্বতী পূজার দিন সকালে উঠে স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করতে হয়। তবে পুজোর আগে শরীর ও মনের শুদ্ধির জন্য এদিন নিম ও হলুদ বাটা মাখার রীতি প্রচলিত আছে। পূজার স্থানে একটি পিঁড়ির ওপর সাদা কাপড় পেতে সরস্বতীর মূর্তি স্থাপন করতে হবে।
  • (২) মূর্তির সামনে জলভর্তি ঘট বসিয়ে তার ওপরে আম্রপত্র রাখতে হবে। এর পর তার ওপর পান পাতা রাখা হয়। পূজার স্থানে একপাশে হলুদ, কুমকুম, চাল, সাদা ও বাসন্তী রঙের ফুল-মালা দিয়ে সাজিয়ে রাখতে হয়।
  • (৩) কুল-সহ নানা প্রকারের ফল রাখতে হবে। কুলই সরস্বতী পূজার প্রধান ফল। সরস্বতী পূজার আগে কুল খাওয়ার রীতি প্রচলিত নেই। পূজার শেষে অঞ্জলি দেওয়ার পরই সাধারণত কুল খাওয়া হয়ে থাকে।
  • (৪) সরস্বতী প্রতিমার এক পাশে রাখা হয় দোয়াত, খাগের কলম ও বই। আমের মুকুল, পলাশ ফুল অবশ্যই অর্পণ করতে হবে। সঙ্গীত বা নৃত্যশিল্পী হলে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সামগ্রীও মূর্তির পাশে রাখতে পারেন। এর পর সরস্বতী পুজোর মন্ত্রপাঠ পূর্ণ করে দেবীকে ভোগ নিবেদন করতে হয়।

সরস্বতী পূজার বিবরণ

  • (১) শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা হয়। সরস্বতীর পূজা সাধারণ পূজার নিয়ম অনুসারেই হয়। এই পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়।
  • (২) যেমন – অভ্র-আবীর, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ। পূজার জন্য বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুলেরও প্রয়োজন হয়। লোকাচার অনুসারে শিক্ষার্থীরা সরস্বতী পূজার পূর্বে কুল ভক্ষণ করে না। পূজার দিন কিছু লেখাও নিষিদ্ধ।
  • (৩) নিয়ম মেনে পূজার পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, দোয়াত-কলম, পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করার প্রথা প্রচলিত আছে। সরস্বতী পূজার দিন ছোটোদের হাতেখড়ি দিয়ে পাঠ্যজীবন শুরু হয়।
  • (৪) পূজার শেষে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও বিভিন্ন সর্বজনীন পূজা মন্ডপে শিক্ষার্থীদের দল বেঁধে অঞ্জলি দিতে দেখা যায়।

পরের দিনের সরস্বতী পূজা

পূজার পরদিন পুনরায় পূজা হয়। পূজার পর চিড়ে ও দই মিশ্রিত করে দধিকর্মা নিবেদন করা হয়। এরপরেই পূজা সমাপ্ত হয়। সেই দিনেই সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।

দেবী সরস্বতী পূজার দিন সরস্বতীর কাছে জ্ঞানী হওয়ার প্রার্থনা

প্রাচীনকাল থেকে বসন্ত পঞ্চমী জ্ঞান ও শিল্পের দেবী সরস্বতীর জন্মদিন হিসাবে বিবেচিত হয়। যে শিক্ষাবিদরা ভারত এবং ভারতীয়তাকে ভালবাসেন তারা এই দিনে মা সারদার পূজা করে আরও জ্ঞানী হওয়ার জন্য তাঁর কাছে প্রার্থনা জানায়।

সরস্বতী পূজার গুরুত্ব

সৈন্যদের অস্ত্র এবং বিজয়াদশমীর জন্য যে গুরুত্ব আছে, পণ্ডিতদের তাদের বই এবং ব্যাস পূর্ণিমা, দীপাবলির যেমন ব্যবসায়ীদের জন্য তেমনি শিল্পীদের জন্যও বসন্ত পঞ্চমীর একই গুরুত্ব রয়েছে।

দেবী সরস্বতী পূজার স্তব বা মন্ত্র

শ্বেতপদ্মাসনাদেবী শ্বেত পুষ্পোশোভিতা।

শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা।

শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চিতা।

শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারভূষিতা।

বন্দিতা সিদ্ধগন্ধর্ব্বৈরচ্চৈর্তা দেবদানবৈঃ।

পূজিতা মুনিভিঃ সর্ব্বৈঋষিভিঃ সদা।

স্তোত্রেণানেন তাং দেবীং জগদ্ধাত্রীং সরস্বতীম।

যে স্মরতি ত্রিসন্ধ্যায়াং সর্ব্বাং বিদ্যাং লভন্তি তে।

সরস্বতী পূজায় পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া

ঔঁ ভদ্রকালৈ নমো নিত্যং সরস্বতৈ নমো নমঃ।

বেদ-বেদান্ত বেদাঙ্গ-বিদ্যাস্থানেভ্যঃ এব চ।

এষ স-চন্দন বিল্বপত্র পুষ্পাঞ্জলি ঔঁ ঔঁং শ্রী শ্রী সরস্বতৈ নমঃ।

সরস্বতী পূজায় দেবীর কাছে প্রার্থনা জানানো

ওম যা কুন্দেন্দু তুষারহারধবলা যা শ্বেতপদ্মাসনা, যা বীণাধর-দণ্ড মণ্ডিতভূজা যা শুভ্রাবস্ত্রাবৃতা। যা ব্রহ্মচ্যুত-শঙ্কর-প্রভৃতিভিদেবৈঃ সদা বন্দিতা। সা মাং পাতু সরস্বতী ভগবতী নিঃশেষ জাড্যাপহা। যথা ন দেবো ভগবান ব্রহ্মা তোল পিতামহঃ ত্বাং পরিত্যাজ্য সন্তিষ্ঠেৎ তথা ভব বরপ্রদা। বেদা শাস্ত্রানি সর্ব্বাণি নৃত্যগীতাদিকঞ্চ যৎ। ন বিহীনং ত্বয়া দেবি তথা মে সন্তু সিদ্ধয়ঃ। লক্ষ্মীর্মেধা ধারা পুষ্টিঃ গৌরী তুষ্টিঃ প্রভা ধৃতি। এতাভিঃ পাহি তনুভিরষ্টাভির্ম্মাং সরস্বতী।

দেবীকে সরস্বতী পূজায় প্রণাম নিবেদন

ওম জয় জয় দেবী চরাচর সারে।

কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।

বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে ভগবতী ভারতী দেবী নমোস্তুতে।

ওম সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমলোলোচনে।

বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী বিদ্যাং দেবী নমোস্তুতে।

২০২৩ সালে সরস্বতী পূজার সূচী

এই বছর ১১ মাঘ বা ২৬ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সরস্বতী পূজা। পূজা তিথি শুরু ২৫ জানুয়ারি দুপুর ১২ টা ৩৪ মিনিট থেকে ২৬ জানুয়ারি সকাল ১০ টা ২৮ মিনিট পর্যন্ত।

উপসংহার :- কবি বা লেখক, গায়ক বা যন্ত্রশিল্পী, নাট্যকার বা নৃত্যশিল্পী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী প্রত্যেকেই তাদের যন্ত্রের আরাধনা এবং মা সরস্বতীর পূজা দিয়ে এই দিনটি শুরু করেন।

(FAQ) সরস্বতী পূজা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সরস্বতী পূজা কি ধরনের উৎসব?

সাংস্কৃতিক উৎসব।

২. দেবী সরস্বতীর বাহন কি?

হাঁস।

৩. কোন তিথি ও কোন মাসে সরস্বতী পূজা হয়?

শ্রীপঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমী তিথি, মাঘ মাস।

৪. এই বছর কবে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হবে?

২৬ জানুয়ারি।

Leave a Reply

Translate »