তৃতীয় পৃথ্বিরাজ চৌহান

রাজপুত রাজা তৃতীয় পৃথ্বিরাজ চৌহান প্রসঙ্গে জন্ম ও বংশ পরিচয়, প্রেমকাহিনী, বিবাহ, তুর্কী নীতি, চালুক্য নীতি, প্রথম তরাইনের যুদ্ধ, দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধ, হরিরাজা ও চৌহান বংশের পতন সম্পর্কে জানবো।

তৃতীয় পৃথ্বিরাজ চৌহান

রাজা তৃতীয় পৃথ্বিরাজ চৌহান
রাজত্ব ১১৭৮-১১৯২ খ্রি:
রাজ্য দিল্লী ও আজমের
বংশ চৌহান বংশ
তরাইনের প্রথম যুদ্ধ ১১৯১ খ্রি:
তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ ১১৯২ খ্রি:
তৃতীয় পৃথ্বিরাজ চৌহান

ভূমিকা :- একাদশ শতকে চৌহান শক্তি শকাম্বরী অঞ্চলে শাসন করত। চৌহান বংশের অজয় রাজা উজ্জয়িনী অধিকার করেন এবং অজয় মেরু বা আজমীরের প্রতিষ্ঠা করেন। তৃতীয় পৃথ্বিরাজ ছিলেন চৌহান বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

সাহসী এবং পরাক্রমশালী যোদ্ধা, যিনি শুধুমাত্র ভারত নয়, বিশ্বের মহান রাজাদের তালিকায় গণিত হয়েছিলেন, তিনি ১১৪৯ সালে ভারতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল মহারাজা সোমেশ্বর, তিনি তখন রাজস্থানের আজমির রাজ্যের রাজা ছিলেন, অন্যদিকে পৃথ্বীরাজ চৌহানের মায়ের নাম ছিল কাপুরী দেবী।

বন্ধুত্ব

পৃথ্বীরাজ চৌহান ও তার বাল্যবন্ধু চাঁদ বরদাইয়ের মধ্যে প্রচুর প্রেম ছিল। তারা দুজনেই একে অপরকে বন্ধুর চেয়ে ভাই হিসাবে বেশি মনে করেছিল।  চাঁদ বরদাই ছিলেন অনঙ্গপালের কন্যার পুত্র। অনঙ্গপাল ছিলেন তোমর বংশের রাজা। চাঁদ বরদাই পৃথ্বীরাজ চৌহানের সহায়তায় দিল্লিতে পিথোরাগড় তৈরি করেছিলেন, যা এখন পুরানো দুর্গ নামে পরিচিত।

প্রেমকাহিনী

  • (১) পৃথ্বীরাজ চৌহান ও সংযুক্তা একে অপরকে প্রথম দেখেই হৃদয় বিনিময় করেছিলেন। সংযুক্তার বাবা জয়চাঁদ এই কথা জানতে পেরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। কারণ, তিনি আগে থেকেই মহারাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানের প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন। তাই তিনি পৃথ্বীরাজ চৌহান ও সংযুক্তার মধ্যে সম্পর্কের ঘোর বিরোধী ছিলেন।
  • (২) পৃথ্বীরাজের প্রতি ঈর্ষার কারণে জয়চাঁদ সর্বদা পৃথ্বীরাজকে অপমান করার সুযোগ খুঁজতেন এবং তিনি এই সুযোগে তিনি তার কন্যার স্বয়ম্বর আয়োজন করেছিলেন। সংযুক্তার স্বয়ম্বরে তিনি সমস্ত পরাক্রমশালী রাজাদের আমন্ত্রণ করলেও পৃথ্বীরাজ চৌহানকে আমন্ত্রণ জানাননি।  কিন্তু পৃথ্বীরাজ চৌহান, তার প্রেমের জন্য সংযুক্তার ইচ্ছায়, স্বয়ম্বর শুরু হওয়ার আগেই প্রাসাদে আসেন এবং তাকে ঘোড়ায় চড়িয়ে নিয়ে যান।

বিবাহ

১১৭৫ সালে তিনি কনৌজের রাজা জয়চন্দ্রের কন্যা সংযুক্তাকে অপহরণ করে বিয়ে করেন তার অসম্মতিতে, যে ঘটনাটি ভারতে একটি জনপ্রিয় প্রেম উপাখ্যান হিসেবে প্রচলিত রয়েছে।

শেষ শ্রেষ্ঠ হিন্দু রাজা

অনেকে তাকে প্রাচীন যুগের শেষ শ্রেষ্ঠ হিন্দু রাজা বলে মনে করেন। সম্ভবত এই ধারণা অতিরঞ্জিত। তবে পৃথিবাজকে কেন্দ্র করে বহু কিংবদন্তী, পৃথ্বিরাজ বসো ও পৃথ্বিরাজ বিজয় কাব্য রচিত হয়েছে।

তুর্কী ঐতিহাসিকদের বর্ণনা

তুর্কী ঐতিহাসিকরাও পৃথ্বিরাজ সম্পর্কে বহু তথ্য দিয়েছেন। তুর্কী ঐতিহাসিকরা তাকে রায়পিথোরা বলে অভিহিত করেছেন।

তুর্কী নীতি

চৌহান শক্তি পূর্ব পাঞ্জাব পর্যন্ত বিস্তৃত হলে স্বভাবতই প্রসারণশীল তুর্কী শক্তির সঙ্গে চৌহান শক্তির সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। গজনীর সুলতানের নির্দেশে এই সময় পাঞ্জাবের মধ্য দিয়ে ভারতে তুর্কী অভিযান চলছিল। তুর্কীদের ছিল দ্রুতগামী যুদ্ধনিপুণ অশ্বারোহী যাদের বলা হত “তুরুক সওয়ার”। এর সঙ্গে পদাতিক রাজপুত সেনার পাল্লা দেওয়া কষ্টসাধ্য ছিল।

হিন্দু রাজাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

  • (১) প্রথমে নাগার্জুনকে পরাজিত করে পারিবারিক বিবাদের সমাধান করেন তিনি। নাগার্জুনের দখলিকৃত দুর্গ পুনরুদ্ধার করেন পৃথ্বীরাজ। জেজাকাভুক্তির চান্দেল্ল বংশীয় রাজা পরমার্দিকেও পরাজিত করেছিলেন তিনি।
  • (২) চালুক্য বংশের সঙ্গেও তার পারিবারিক বিবাদ ছিল। চালুক্যরাজ দ্বিতীয় ভীমের সঙ্গে তাঁর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চালুক্যরাই পৃথ্বীরাজের বাবা সোমেশ্বরকে হত্যা করেছিল।
  • (৩) এছাড়াও গাহড়বাল রাজ্যের রাজা জয়চাঁদের কন্যা সংযুক্তাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিলেন পৃথ্বীরাজ। পরবর্তীকালে সংযুক্তাকে বিবাহ করেন তিনি।

চালুক্য নীতি

  • (১) ১১৭৮ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় পৃথ্বিরাজ এক দারুণ উভয় সঙ্কটে পড়েন। সুলতান মহম্মদ ঘুরী গুজরাটের চালুক্য শক্তিকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে চৌহান পৃথ্বিরাজের মিত্রতা-প্রার্থনা করেন। এক্ষেত্রে মহম্মদ ঘুরীর মতই গুজরাটের চালুক্যরাও ছিল পৃথ্বিরাজের ঘোর শত্রু।
  • (২) যে কোনো একটি পক্ষে যোগ দিলে অপর পক্ষ দুর্বল হয়ে পড়ত এবং শেষ পর্যন্ত ত্রিশক্তি দ্বন্দ্ব, দ্বিশক্তি দ্বন্দ্বে পরিণত হতে পারত। সুতরাং মন্ত্রীদের পরামর্শে পৃথ্বিরাজ নিরপেক্ষতা নীতি নেন। গুজরাটের চালুক্য রাজা মহম্মদ ঘুরীকে আবু পাহাড়ের যুদ্ধে পরাস্ত করলে, আপাতত বিপদ কেটে যায়।

চালুক্য জয়

মুসলিম আক্রমণের সম্ভাবনা দূর হলে পৃথিবাজ রেওয়ারি জেলা অধিকার করেন। তিনি গুজরাটের চালুক্য দ্বিতীয় ভীমকেও আক্রমণ করে সন্ধি স্থাপনে বাধ্য করেন।

তরাইনের প্রথম যুদ্ধ

১১৯০ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ ঘুরী হিন্দুস্থান অধিকারের উদ্দেশ্যে তবরহিন্দ অধিকার করলে পৃথ্বিরাজের নিরাপত্তা বিপন্ন হয়। তিনি মহম্মদ ঘুরীর অগ্রগতিকে বাধাদানের জন্য ১১৯১ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের প্রথম যুদ্ধে মহম্মদকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন। মহম্মদ নিজে আহত অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন। পৃথ্বিরাজ তবরহিন্দ অধিকার করেন।

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ

  • (১) ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ ঘুরী পুনরায় তার বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসেন। তিনি ১ লক্ষ ২০ হাজার সেনা নিয়ে তররহিন্দ দখল করে পুনরায় তরাইনে হাজির হলে পৃথ্বিরাজ তাঁকে দ্বিতীয় বার যুদ্ধের ডাক দেন। পৃথ্বিরাজ ১৫০ জন রাজার একটি জোট তুর্কী আক্রমণ রোধ করতে গড়েন।
  • (২) কনৌজের জয়চন্দ্র এই জোটে যোগ না দিয়ে দূরে থাকেন। তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বিরাজের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি স্কন্দ সেনা পরিচালনা না করায় খুবই ক্ষতি হয়। স্কন্দ অন্যত্র যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকায় আসতে পারেন নি। মহম্মদ রণ কৌশলে পৃথ্বিরাজকে পরাস্ত করেন। তাঁকে বন্দী করে হত্যা করা হয়।

চৌহান বংশের পতন

দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধে কেবলমাত্র চৌহান শক্তির পতন হয়নি, এর ফলে উত্তর ভারতে রাজপুত শক্তির পতনের পথ প্রস্তুত হয়। তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধকে একটি যুগান্তকারী ঘটনা বলা চলে।

হরিরাজা

তরাইনের যুদ্ধে জয়লাভের পর মহম্মদ ঘুরী আজমীর ও দিল্লী অধিকার করেন। পৃথ্বিরাজের ভ্রাতা হরিরাজা আজমীরের সিংহাসনে বসে স্বাধীনতা ঘোষণার চেষ্টা করলে মহম্মদ ঘুরীর সেনাপতি কুতউদ্দিন আইবক তাকে বিতাড়িত করেন।

উপসংহার :- পরবর্তীতে চৌহান শক্তি আজমীর থেকে রণথম্ভোরে চলে যায় এবং ক্ষীয়মান শক্তি হিসেবে টিকে থাকে। ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দিন খলজি রণথম্ভোর অধিকার করলে চৌহান শক্তির চূড়ান্ত পতন ঘটে।

(FAQ) তৃতীয় পৃথ্বিরাজ চৌহান সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. চৌহান বংশ কোথায় শাসন করত?

দিল্লী ও আজমের।

২. চৌহান বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

তৃতীয় পৃথ্বিরাজ চৌহান।

৩. তরাইনের প্রথম যুদ্ধ কখন হয়?

১১৯১ খ্রিস্টাব্দে।

৪. তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ কখন হয়?

১১৯২ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Reply

Translate »