তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ -এর সময়কাল, অবস্থান, বিবাদমান পক্ষ, যুদ্ধের পটভূমি, রাজপুত ও ঘুরির সেনাবাহিনী, যুদ্ধের বর্ণনা, ফলাফল ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ

স্থানহরিয়ানার থানেশ্বরের নিকটে তরাইনের প্রান্তরে
সময়কাল১১৯২ খ্রিস্টাব্দে
বিবাদমান পক্ষঘুরি সাম্রাজ্য ও চৌহান রাজপুত সাম্রাজ্য
ফলাফলমহম্মদ ঘুরির বিজয়
তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ

ভূমিকা :- মহম্মদ ঘুরি ও পৃথ্বীরাজ চৌহান -এর মধ্যে তরাইনের প্রান্তরে দুটি যুদ্ধ হয়েছিল (১১৯১ ও ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে), যা যথাক্রমে তরাইনের প্রথম যুদ্ধ ও তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ নামে পরিচিত।

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১১৯২ খ্রিঃ) ভারতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই যুদ্ধে চৌহানবীর পৃথ্বীরাজের পরাজয়ের প্রতিক্রিয়া ছিল সুদূরপ্রসারী।

সময়কাল

১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

স্থান

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয় বর্তমান হরিয়ানার থানেশ্বরের কাছে তরাইন নামক শহরের নিকটে। এই স্থান দিল্লি থেকে ১৫০ কিলোমিটার (৯৩ মাইল) উত্তরে অবস্থিত।

বিবাদমান পক্ষ

মহম্মদ ঘুরির নেতৃত্বাধীন ঘুরি বাহিনী ও পৃথ্বীরাজ চৌহানের নেতৃত্বে চৌহান রাজপুত বাহিনীর মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

যুদ্ধের পটভূমি

গজনি ফিরে আসার পর মহম্মদ ঘুরি পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। লাহোর পৌঁছানোর পর তিনি পৃথ্বীরাজের কাছে আনুগত্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়ে দূত পাঠান। পৃথ্বীরাজ এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।

রাজপুতদের প্রতি আহ্বান

মহম্মদ ঘুরির দূত প্রত্যাখ্যান করার পর পৃথ্বীরাজ চৌহান অন্যান্য রাজপুত নেতাদেরকে তার পাশে দাঁড়নোর আহ্বান জানান।

রাজপুত সেনাবাহিনী

ইতিহাসবিদ ফিরিশতার মতে রাজপুত বাহিনীতে ৩০০০ হাতি, ৩০০০০০ অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈনিক ছিল। তবে এই সংখ্যা সঠিক সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করা হয়।

ঘুরির সেনাবাহিনী

মিনহাজ-উস-সিরাজ লিখেছেন যে, মুহাম্মদ ঘুরির বাহিনীতে ১২০০০০ সশস্ত্র সৈনিক উপস্থিত ছিল।

সন্ধি প্রস্তাব

মিত্ররা এসে উপস্থিত না হওয়ায় পৃথ্বীরাজ আরো কিছু সময় আশা করছিলেন। এই সংবাদ পাওয়ার পর মহম্মদ ঘুরি সন্ধি প্রস্তাব দিয়ে পৃথ্বিরাজকে চিঠি পাঠান।

যুদ্ধের বর্ণনা

  • (১) ভোর শুরু হওয়ার পূর্বে ঘুরি বাহিনী রাজপুতদের উপর আক্রমণ শুরু করে। মহম্মদ ঘুরি তার বাহিনীকে পাঁচটি বিভাগে বিভক্ত করেন। চারটি বিভাগ রাজপুত বাহিনীর পার্শ্বভাগ ও পশ্চাতভাগ আক্রমণ করে।
  • (২) রাজপুতদের সারি ভেঙে ফেলার জন্য মহম্মদ ঘুরি তার পঞ্চম বিভাগকে পালানোর ভান করার আদেশ দেন।
  • (৩) রাজপুতরা পিছু হটতে থাকা ঘুরির সৈন্যদের আক্রমণ করে। এর ফলে পৃথ্বীরাজের বাহিনীর স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যায়।
  • (৪) এই সময় পার্শ্বভাগের আক্রমণের পাশাপাশি ঘুরিদের ১২০০০ অশ্বারোহী আক্রমণ শুরু করে। এর ফলে রাজপুতরা পরাজিত হয়। পৃথ্বীরাজকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

ফলাফল

মহম্মদ ঘুরির এই বিজয় ফলাফল নির্ধা‌রক ছিল। ১১৯৩ সালে তিনি বিহার প্রদেশ জয় করেন এবং ১২০৪ সালে তার বাহিনী বাংলা জয় করে ভারত বিজয় সম্পন্ন করে।

যুদ্ধের গুরুত্ব

ভারতের ইতিহাসে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম।

(১) রাজপুতদের ধ্বংস

তরাইনের প্রথম যুদ্ধে জিতলেও তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে শােচনীয়ভাবে পরাজয়ের ফলে রাজপুত শক্তি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।

(২) তুর্কি আধিপত্য

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে শেষপর্যন্ত জয়লাভ করায় পূর্ব পাঞ্জাব ও দিল্লিতে তুর্কি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

(৩) মুসলিম শাসনের সূচনা

যুদ্ধ জয় করে ঘােরি স্বদেশভূমি গজনিতে ফিরে যান। কিন্তু তার সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবক এদেশে থেকে যান। আইবক দিল্লিতে মুসলিম শাসনের সূচনা ঘটান।

(৪) সামরিক দুর্বলতা প্রকাশ

তুর্কিদের তুলনায় ভারতীয় সেনাদের রণকৌশল যে কতটা নিকৃষ্টমানের ছিল তা তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে ভারতীয়দের পরাজয় থেকে বােঝা যায়।

উপসংহার :- তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের পর হিন্দু যুগের অবসান এবং মুসলিম যুগ তথা মধ্যযুগের সূচনা হয়। ঐতিহাসিক লেনপুলের মতে, এই বিজয় ভারতের ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়।

(FAQ) তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ কখন হয়?

১১৯২ খ্রিস্টাব্দে।

২. তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ কাদের মধ্যে হয়?

মহম্মদ ঘুরির নেতৃত্বাধীন ঘুরি বাহিনী ও পৃথ্বীরাজ চৌহানের নেতৃত্বে চৌহান রাজপুত বাহিনীর মধ্যে।

৩. তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের গুরুত্ব কি ছিল?

এই যুদ্ধের ফলে ভারতের অভ্যন্তরে মুসলমান অধিকার স্থাপিত হয় এবং এই যুদ্ধে সাফল্যের পরেই উত্তর ভারতে মুসলমান রাজ্য বিস্তারের গতি ত্বরান্বিত হয়।

Leave a Reply

Translate »