ইতিহাসের যুগ বিভাগ

ইতিহাসের যুগ বিভাগ প্রসঙ্গে ইউরোপের যুগ বিভাজন, ইউরোপের যুগ বিভাজনে বিতর্ক, আধুনিক ইউরোপের বৈশিষ্ট্য, ভারতীয় যুগ বিভাজন, ভারত ইতিহাসের ‘হিন্দু যুগ’, ‘মুসলিম যুগ’ নামকরণে আপত্তির কারণ ও ভারত ইতিহাসের যুগ বিভাজনে সাম্প্রতিক অভিমত সম্পর্কে জানবো।

ইতিহাসের যুগ বিভাগ

ঐতিহাসিক ঘটনাইতিহাসের যুগ বিভাগ
প্রধান বিভাগপ্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক
কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন১৪৫৩ খ্রি
ফরাসি বিপ্লব১৭৮৯ খ্রি
ঔরঙ্গজেব এর মৃত্যু১৭০৭ খ্রি
পলাশির যুদ্ধ১৭৫৭ খ্রি
জৈন শাসকচন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
বৌদ্ধ শাসকঅশোক, কণিষ্ক
ইতিহাসের যুগ বিভাগ

ভূমিকা :- ইতিহাসের যুগ বিভাজন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পৃথিবী বা যে-কোনো দেশের ইতিহাসকে সাধারণত তিনভাগে ভাগ করা হয় – প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ ও আধুনিক যুগ।

ইউরোপে যুগ বিভাজন

ইউরোপের ইতিহাসে যুগ বিভাজনের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) প্রাচীন যুগ

একেবারে স্মরণাতীত অতীত থেকে শুরু করে ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত সময়কে প্রাচীন যুগ ধরা হয়।

(২) মধ্যযুগ

৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মান সেনাপতি কর্তৃক রোম সাম্রাজ্যের অধিপতি রোমুলাসের সিংহাসনচ্যুতি থেকে ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ (কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন) পর্যন্ত সময়কে মধ্যযুগ ধরা হয়।

(৩) আধুনিক যুগ

১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী সময়কে আধুনিক যুগ বলে চিহ্নিত করা হয়।

ইউরোপে যুগবিভাজন বিতর্ক

ইউরোপের ইতিহাসের এই যুগ বিভাজন নিয়েও ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। যেমন –

(ক) মধ্যযুগের সমাপ্তি বিতর্ক

উদাহরণস্বরূপ, ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনকে অনেকে মধ্যযুগের সমাপ্তি ও আধুনিক যুগের সূচনা বলে চিহ্নিত করতে চান। অনেকে আবার ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা আবিষ্কার বা ১৫২০ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে সংস্কার আন্দোলনের সূচনায় মধ্যযুগের সমাপ্তি ও আধুনিক যুগের সূচনা দেখতে পান।

(খ) যুগ বিভাজনে বৃহৎ পরিবর্তনের গুরুত্ব

  • (১) সাধারণত মানুষের চিন্তাভাবনা ও ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করে ইতিহাসে যুগ বিভাজন করা হয়। সামন্তপ্রথা ও ভূমিদাসপ্রথার অবসান আধুনিক যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এদিক থেকে বিচার করলে ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দের পরেও ইউরোপের বহু দেশে মধ্যযুগ বিরাজমান ছিল।
  • (২) ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সে সামন্ততন্ত্রের উচ্ছেদ হয়। প্রাশিয়ায় ভূমিদাসপ্রথা ধ্বংস হয় উনিশ শতকের প্রথম দিকে। রাশিয়ায় তা বিলুপ্ত হয় ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে। আবার অন্যদিকে ইউরোপের চেয়ে এশিয়া মহাদেশে মধ্যযুগের স্থায়িত্ব ছিল অনেক বেশি দিন।

আধুনিক ইউরোপের বৈশিষ্ট্য

গ্রিক ও রোমান সাহিত্য-সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে প্রাচীন ইউরোপীয় সভ্যতা গড়ে ওঠে। –

(১) নবজাগরণের সূচনা

বর্বর জার্মানদের আধিপত্যের ফলে মধ্যযুগে গ্রিক ও রোমান সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা অবলুপ্ত হয়। পুরোনো লুপ্তপ্রায় এই গ্রিক ও রোমান সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প ও দর্শনের পুনরুজ্জীবনের ফলেই পঞ্চদশ শতকে নবজাগরণের সূচনা হয়।

(২) যুক্তিবাদ

যুক্তিবাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবমুক্তি হল নবজাগরণের বৈশিষ্ট্য।

(৩) সাহিত্য-সংস্কৃতিতে পরিবর্তন

প্রচলিত বহু বিশ্বাস ও আচার-আচরণের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা হয়। এর ফলে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন দেখা যায়।

(৪) পোপের আধিপত্য হ্রাস

আধুনিক যুগে প্রবেশের ফলে ইউরোপে পোপের আধিপত্য খর্ব হয়।

(৫) সামন্তপ্রথার বিলোপ

এই সময় ইউরোপে সামন্তপ্রথার বিলোপ ঘটে।

(৬) জাতীয় রাষ্ট্রের উত্থান

বহু জাতি নিয়ে গঠিত বিশাল সাম্রাজ্যের পরিবর্তে জাতীয় চেতনার ওপর ভিত্তি করে ইউরোপে শক্তিশালী জাতীয় রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে।

(৭) অর্থনৈতিক পরিবর্তন

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানা যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে।

(৮) শ্রমবিভাজন

শিল্পক্ষেত্রে শুরু হয় শ্রমবিভাজন নীতি।

ভারতে যুগ বিভাজন

ইউরোপের মতো ভারত ইতিহাসের সময়কালকেও ঐতিহাসিকরা তিন ভাগে ভাগ করে থাকেন। তবে ভাগগুলির নামকরণ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। যেমন –

(ক) জেমস মিলের বিভাজন

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহাসিক জেমস মিল ভারত ইতিহাসকে হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ ও ব্রিটিশ যুগ (খ্রিস্টান যুগ নয়) – এই তিনভাগে ভাগ করেছেন। তাঁর প্রাথমিক ও প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এটাই প্রমাণ করা যে পূর্ববর্তী যুগ দুটি অপেক্ষা ব্রিটিশ শাসন অনেক বেশি অগ্রসর ছিল এবং এই যুগে ব্যাপক হারে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রগতি ঘটেছিল। জেমস মিলের মতে,

  • (i) সুপ্রাচীনকাল থেকে শুরু করে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত সময়কালকে হিন্দু যুগ’,
  • (ii) ১২০৬ থেকে ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু পর্যন্ত সময়কে ‘মুসলিম যুগ’,
  • (iii) ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে পরবর্তী সময়কে ‘ব্রিটিশ যুগ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়।

(খ) জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের বিভাজন

কিন্তু এই ধরনের যুগ বিভাজনের বিরোধিতা করে জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকরা ভারত ইতিহাসকে প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ এই তিনভাগে ভাগ করেছেন।

(গ) সমালোচনা

বলা বাহুল্য, এই ধরনের যুগ বিভাজন যুক্তিসংগত নয়, বা বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ ইতিহাস কখনোই থেমে থাকে না – ইতিহাস অখণ্ড, অবিভক্ত ও অবিভাজ্য এবং তার ধারা চিরপ্রবহমান।

ভারত ইতিহাসের ‘হিন্দু যুগ’, ‘মুসলিম যুগ’ নামকরণে আপত্তির কারণ

আমাদের দেশ ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ নামকরণে আপত্তি করা হয়। কারণ,

(ক) তথাকথিত ‘হিন্দু যুগে’ অন্য ধর্মের গুরুত্ব

তথাকথিত ‘হিন্দু যুগ’-এ ভারতে কেবল বৈদিক হিন্দুধর্মই প্রচলিত ছিল না, বা কেবলমাত্র হিন্দুরাজারাই রাজত্ব করতেন না। এই যুগে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মতো জৈন শাসক এবং অশোক ও কনিষ্কের মতো বৌদ্ধ নরপতিও সগৌরবে রাজত্ব করে ভারত ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন। যুগ যুগ ধরে বৈদিক হিন্দুধর্ম নানাভাবে ও নানারূপে পরিবর্তিত হয়, বহু বিদেশি ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী রাজা ভারতে রাজত্ব করেন এবং এক সময় বৌদ্ধ ও জৈনধর্মও ভারতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। সুতরাং ‘হিন্দু যুগ’ নয়-ভারত ইতিহাসের এই অধ্যায়কে ‘প্রাচীন যুগ’ বলাই যুক্তিসংগত।

(খ) তথাকথিত মুসলিম যুগে অন্য ধর্মের গুরুত্ব

অনুরূপভাবে, মুসলিম যুগ কথাটিও যুক্তিসংগত নয়। তথাকথিত এই মুসলিম যুগ-এ মুসলিম শাসকদের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু হিন্দুরাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ওড়িশা, রাজপুতানা, মধ্যপ্রদেশ, আসাম, ছোটোনাগপুর ও কেরালার বহু অঞ্চল এবং দাক্ষিণাত্যের বিজয়নগর রাজ্য দীর্ঘদিন মুসলিম আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নিজ নিজ স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রেখে সগৌরবে রাজত্ব করেছিল।

ভারত ইতিহাসের যুগ বিভাজনে সাম্প্রতিক অভিমত

সম্প্রতি ভারত ইতিহাসকে প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ ও আধুনিক যুগে বিভাজন করা এবং তার সময়সীমা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। –

(১) বিতর্ক

প্রাচীন যুগের সময়সীমা ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত টানায় প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর সময় থেকে ১২০৬ কালপর্বকে ‘আদি-মধ্য যুগ’ বলে চিহ্নিত করতে চান। হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে ভারতে নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। সাম্রাজ্যিক ঐক্য বিনষ্ট হয় এবং উত্তর ও পশ্চিম ভারতে প্রতিহার, পূর্ব ভারতে পাল, দাক্ষিণাত্যে রাষ্ট্রকূট ও সুদূর দক্ষিণে চোলরা শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা স্থাপন করে। পাল-প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূটদের দ্বন্দ্ব দুশো বছর স্থায়ী হয়। কেবলমাত্র এই নয় – এই সময় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে। তাই এই বিভাজনও সর্বসম্মত নয়।

(২) সিদ্ধান্ত

যাই হোক, মোটামুটিভাবে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে ভারত ইতিহাসে মধ্যযুগ এবং ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তীকালকে আধুনিক যুগ বলে অভিহিত করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজ-উদদৌলাকে পরাজিত করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সূত্রপাত ঘটায়। ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার মনে করেন যে, এই যুদ্ধের পর ভারতে মধ্যযুগ শেষ হয়ে আধুনিক যুগ শুরু হয়।

উপসংহার :- বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক থাকলেও ইতিহাসের যুগ বিভাজনের ক্ষেত্রে পৃথিবীর যে কোনো দেশের ইতিহাসের প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ – এই তিনটি যুগ বিভাজনে কোনো দ্বিমত নেই।

(FAQ) ইতিহাসের যুগ বিভাগ হতে জিজ্ঞাস্য?

১. পৃথিবীর সব দেশের ইতিহাস কে কয়টি ভাগে ভাগ করা হয়?

তিনটি।

২. পৃথিবীর সব দেশের ইতিহাস কি কি যুগে ভাগ করা হয়?

প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ।

৩. ইউরোপে প্রাচীন যুগের সময়কাল কত?

অতীত থেকে ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দ।

৪. ভারতে প্রাচীন যুগের সময়কাল কত?

অতীত থেকে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ।

Leave a Comment