ইতিহাসের কাল চেতনা

ইতিহাসের কাল চেতনা প্রসঙ্গে গ্রিক ও রোমানদের কালচেতনার অভাব, ভারতীয়দের কাল চেতনার অভাব, আরব-ঐতিহাসিকদের কালচেতনা, ইতিহাসের সময়রেখার দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিহাসের রৈখিক কাল চেতনা ও চক্রাকার কালচেতনা সম্পর্কে জানবো।

ইতিহাসের কাল চেতনা

ঐতিহাসিক ঘটনাইতিহাসে কাল-সম্পর্কিত ধারণা
কাল চেতনার অভাবগ্ৰিক, রোমান, ভারত
উন্নত কাল চেতনাআরব ঐতিহাসিক
সময়রেখারৈখিক ও চক্রাকার
ভারতে যুগসত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি
একরৈখিক কালপঞ্জীগুপ্তাব্দ, শকাব্দ
ইতিহাসের কাল চেতনা

ভূমিকা :- সময় বা কাল হল ইতিহাসের ভিত্তিভূমি। কালনির্ঘণ্ট ছাড়া ইতিহাস অসম্পূর্ণ ও অর্থহীন।

গ্রিক ও রোমানদের কালচেতনার অভাব

দেখা যায় যে, গ্রিক, রোমান প্রমুখ ঐতিহাসিকরা সঠিকভাবে সন-তারিখের হিসাব রাখতেন না। বাকলে-র মতে, ইউরোপে সন-তারিখ নিরূপণের প্রথা ১৫৯৭ খ্রিস্টাব্দের আগে শুরু হয় নি। এইসব দিক থেকে বিচার করলে আরবদের ইতিহাস রচনা পদ্ধতি সত্যিই উন্নততর ছিল।

ভারতীয়দের কালচেতনার অভাব

স্যার যদুনাথ সরকার বলেন যে, কালনির্ঘণ্ট-সংক্রান্ত চেতনা হিন্দুদের মধ্যে সঠিকভাবে বিকশিত হয় নি। কারণ, হিন্দুরা ইহজগৎ এবং তার ক্ষণস্থায়ী ঘটনাবলিকে ঘৃণার চোখে দেখত। মুসলিম বিজয়ের পূর্বে হিন্দুরা কোনো কালানুক্রমিক ইতিহাস রচনা করে নি।

আরব-ঐতিহাসিকদের কালচেতনা

অন্যদিকে, আরব ঐতিহাসিকরা তাঁদের বর্ণনার যথার্থতা সুনিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রতিটি ঘটনার বৎসর, মাস, এমনকি তারিখ নিরূপণের ওপর জোর দিতেন। আরবদের বুদ্ধিমত্তা ছিল সুশৃঙ্খল ও বাস্তববাদী। তাদের সমস্ত নথিপত্রে একটি কালক্রমানুসারী কাঠামো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পৃথিবীর সব দেশেই মুসলিম ঐতিহাসিকদের সাহিত্য বিশাল, বিভিন্ন এবং সুন্দরভাবে তারিখযুক্ত।

ইতিহাসের সময় রেখার দৃষ্টিভঙ্গি

অতীতের সময়কাল-সংক্রান্ত ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। যথা – রৈখিক বা তিরবৎ (Linear) সময়রেখা এবং চক্রাকার (Cyclical) বা বৃত্তাকার সময়রেখা।

দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিরোধ

ইতিহাসের রৈখিক অগ্রগতির সমর্থক ঐতিহাসিক ও চক্রাকার অগ্রগতির সমর্থক ঐতিহাসিকদের মধ্যে তীব্র বিরোধ বিদ্যমান।

ইতিহাসের রৈখিক কালচেতনা

এর বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) সূচনা ও সমাপ্তি

  • (১) কোনো কোনো মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাসের কালের অগ্রগতি ঘটে রৈখিক ধারায়। অর্থাৎ, ইতিহাসের সময়ের একটি সূচনাপর্ব এবং একটি সমাপ্তিপর্ব আছে। তাই ইতিহাস সূচনাপর্ব থেকে যাত্রা শুরু করে ক্রমশ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলে।
  • (২) খ্রিস্টানধর্ম অনুসারে, একদিন-না-একদিন কালের এই অগ্রগতির সমাপ্তি ঘটবে। অর্থাৎ, কালের অগ্রগতি সর্বদা সম্মুখবর্তী, অনেকটা তিরের মতো, যা অতীত থেকে বর্তমান এবং বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হয়। এজন্য অতীতের কোনো যুগের পুনরাবৃত্তি ভবিষ্যতে ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই।

(খ) পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গি

খ্রিস্টান দৃষ্টিভঙ্গি এবং পাশ্চাত্যের অধিকাংশ ঐতিহাসিকের দ্বারা ঐতিহাসিক সময়কালের রৈখিক ধারা সমর্থিত হয়। বাইবেলে লেখা আছে যে, “শুরুতে ঈশ্বর স্বর্গ ও পৃথিবীর সৃষ্টি করেছেন।” খ্রিস্টান ধর্মমত অনুসারে, একদা ঐতিহাসিক যুগের ‘শুরু’ হয়েছে এবং যার শুরু আছে তার শেষও আছে।

ইতিহাসের চক্রাকার কালচেতনা

অনেকে মনে করেন যে, ইতিহাসের যুগ বা সময়ের ধারা চক্রাকার পথে আবর্তিত হয়। এর অর্থ হল ইতিহাসের বিভিন্ন যুগগুলি চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে। তাই আজ বা আগামীকালের ঘটনায় কোনো নতুনত্ব নেই। কেননা ইতিহাসের সময়ের ধারা চক্রাকারে এগিয়ে অতীতের কোনো যুগই আবার বর্তমানে ফিরে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও আবার ফিরে আসবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) ভারতীয় ধারণা

  • (১) প্রাচীন ভারতীয় ধারণাতেও কালের গতি চক্রাকারে (Cyclical) আবর্তিত হয়। পুরাণ অনুসারে সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর এবং কলি – এই চারটি যুগ অনন্তকাল ধরে আবর্তিত হয়ে চলেছে। এই মতানুসারে, প্রতিটি পরবর্তী যুগ প্রতিটি পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় হীনতর। অর্থাৎ সত্যযুগ যেমন শ্রেষ্ঠতম, তেমনই কলিযুগ হল নিকৃষ্টতম।
  • (২) সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি যখন অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছোয়, তখন কলিযুগের সার্বিক ধ্বংসসাধন হয়। ধ্বংসসাধন মানেই কিন্তু চূড়ান্ত সর্বনাশ নয়, কারণ এর পরেই সময়ের চক্রাকার পথে এগিয়ে পুনরায় সত্যযুগের প্রত্যাবর্তন হয়।
  • (৩) এরপর ধীরে ধীরে আবার ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি যুগের আগমন ঘটে। অর্থাৎ সমগ্র বিষয়টি চক্রাকারে আবর্তিত হয়। এর ফলে পুনরাবর্তন আছে, কিন্তু কোনো পরিবর্তনের বা নতুন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নেই।

(খ) ইবন খালদুন-এর অভিমত

আরবের ঐতিহাসিক ইবন খালদুন মনে করেন যে, এই চক্রাকার গতিতে তিনটি স্তর ঘুরে ঘুরে আসে। যথা –

  • (১) যুদ্ধ ও বিজয়,
  • (২) বসতির প্রসার ও নগরায়ণ,
  • (৩) অবক্ষয় ও ধ্বংস।

(গ) টয়েনবির অভিমত

আর্নল্ড টয়েনবি চক্রাকার যুগ পরিবর্তনে যে তিনটি স্তরের কথা বলেছেন সেগুলি হল –

  • (১) জন্ম,
  • (২) বৃদ্ধি,
  • (৩) ধ্বংস।

(ঘ) থাপারের অভিমত

ড. রোমিলা থাপার দেখিয়েছেন যে, চতুর্যুগের ধারণার পাশাপাশি কালের পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কে সম্যক ধারণাও ভারতে প্রচলিত ছিল। তাঁর মতে, সাধারণত গ্রহনক্ষত্রের অবস্থানগত আলোচনার ক্ষেত্রে বৃত্তাকার কালচেতনা ব্যবহৃত হত। আর একরৈখিক কালপঞ্জি ব্যবহৃত হত রাজকীর্তি বিবরণের ক্ষেত্রে, যার উদাহরণ ‘গুপ্তাব্দ’, ‘শকাব্দ’।

উপসংহার :- সময় বা কাল নদীর স্রোতের মতো বয়ে যায়। ইতিহাসের ক্ষেত্রেও তা লক্ষণীয়। আর এই সময় বা কাল চেতনা ব্যতীত ইতিহাস অসম্পূর্ণ ও অর্থহীন।

(FAQ) ইতিহাসের কাল চেতনা হতে জিজ্ঞাস্য?

১. কত খ্রিস্টাব্দের আগে ইউরোপের সন তারিখ নিরূপণের প্রথা শুরু হয় নি?

১৫৯৭ খ্রিস্টাব্দ।

২. কাদের ইতিহাস চর্চায় কাল চেতনার অভাব রয়েছে?

গ্ৰিক, রোমান ও ভারতীয়দের।

৩. ইতিহাস রচনায় কাদের কাল চেতনা ছিল সর্বোৎকৃষ্ট?

আরব ঐতিহাসিকদের।

৪. ইতিহাসের সময় রেখার কয়টি দৃষ্টিভঙ্গি কি কি?

দুটি। রৈখিক সময়রেখা ও চক্রাকার সময়রেখা।

Leave a Comment