মুদ্রণ বিপ্লবের ফলাফল

মুদ্রণ বিপ্লবের ফলাফল প্রসঙ্গে ত্রুটিমুক্ত বইয়ের প্রকাশ, ধর্মসংস্কার আন্দোলনের পথ প্রশস্তকরণ, বিভিন্ন বিষয়ের বই প্রকাশ, শিক্ষার্থীদের সুবিধা, বিজ্ঞান চর্চা বৃদ্ধি, আধুনিক ভাষার বিকাশ, ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ হ্রাস ও নতুন পেশা সম্পর্কে জানবো।

মুদ্রণ বিপ্লবের ফলাফল

ঐতিহাসিক ঘটনামুদ্রণ বিপ্লবের ফলাফল
কম্পিউটার বিপ্লবইউজিন রাইস
প্রথম দিকের বইবাইবেল
বই ছাপার পূর্বে রীতিপ্রুফ দেখা
পেত্রার্কইতালি
চসারইংল্যান্ড
মুদ্রণ বিপ্লবের ফলাফল

ভূমিকা :- পঞ্চদশ শতক ও তার পরবর্তীকালে ইউরোপে যে মুদ্রণ বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল তা ইউরোপের ধর্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সমাজ প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়কেই স্পর্শ করেছিল।

মুদ্রণযন্ত্র সম্পর্কে ক্যামেরনের মন্তব্য

অধ্যাপক ক্যামেরন মন্তব্য করেছেন যে, “মুদ্রণযন্ত্র একটি বাস্তব সমস্যার ব্যাবহারিক সমাধান করেছিল।”

মুদ্রণ বিপ্লব সম্পর্কে রাইসের মন্তব্য

ইউজিন রাইস পঞ্চদশ শতকের মুদ্রণ বিপ্লবকে বর্তমানকালের কম্পিউটার বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ছাপা বইয়ের পরিসংখ্যান

অধ্যাপক হেস বলেছেন যে, বিপুল সংখ্যক বইয়ের প্রকাশ ছিল মুদ্রণ বিপ্লবের অন্যতম তাৎপর্য। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন ছাপাখানা থেকে ৬০ লক্ষেরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছিল। অপর একটি পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা দেড় থেকে দু-কোটি বলে উল্লেখ করা হয়।

মুদ্রণ বিপ্লবের ফলাফল

ইউরোপে মুদ্রণ বিপ্লবের বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল বা তাৎপর্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন –

(ক) ত্রুটিমুক্ত বইয়ের প্রকাশ

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) পূর্বেকার বইপত্রে ভুলভ্রান্তি

মুদ্রণযন্ত্রে বই ছাপা শুরু হওয়ার আগে হাতে লেখা পুথি প্রকাশের যে ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তাতে পুথি নকলকারী যেমন অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল করতেন, আবার ইচ্ছাকৃতভাবে তার নিজস্ব ধারণাকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে পুথির কোনো কোনো অংশে ঢুকিয়ে দিতেন। এধরনের বইতে প্রুফ সংশোধনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে বইপত্রে প্রচুর ভুলভ্রান্তি থেকে যেত।

(২) নতুন বইপত্রে ত্রুটি হ্রাস

ইউজিন রাইসের মতে, মুদ্রণযন্ত্রের মাধ্যমে ছাপার কাজ শুরু হলে বই ছাপার পূর্বে প্রুফ (Proof) দেখার রীতি চালু হয়। ফলে বইয়ের ত্রুটিবিচ্যুতি অনেকাংশে হ্রাস পায়। বিভিন্ন পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবী বইয়ের মানোন্নয়নের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ফলে পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ের বইপত্রের মানোন্নয়ন সম্ভব হয় ৷

(খ) ধর্মসংস্কার আন্দোলনের পথ প্রশস্তকরণ

পঞ্চদশ শতকের মুদ্রণ বিপ্লব মানুষের মধ্যে সঠিক যুক্তিবাদী ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রসার ঘটিয়ে ইউরোপের ধর্মসংস্কার আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করেছিল। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) সস্তা বইয়ের সুবিধা

ধর্মসংস্কার আন্দোলনের প্রতিবাদী বক্তব্যগুলি সস্তায় মুদ্রিত বইয়ের মাধ্যমে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে প্রচারিত হয়েছিল। ধর্মসংস্কার আন্দোলনকে স্তব্ধ করার উদ্দেশ্যে পোপ ছাপাখানার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি কিংবা নিষিদ্ধ বই পোড়ালেও ধর্মসংস্কারের সপক্ষে প্রচারকে কোনোভাবেই আটকাতে পারেন নি।

(২) লুথারের প্রচার পুস্তিকা

মার্টিন লুথার ১৫১৭-১৫২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ধর্মসংস্কার বিষয়ে ৩০ টি পুস্তিকা মুদ্রণযন্ত্রে ছেপে জনগণের মধ্যে প্রচার করেন। এই সব পুস্তিকা ও প্রচারপত্রগুলির যুক্তিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ক্যাথোলিক ধর্মের কুসংস্কারগুলির বিরুদ্ধে মানুষকে জাগ্রত করে। ফলে সমাজের সর্বস্তরে ধর্মসংস্কার আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে। ছাপানো বইপত্র লুথারের পোপ-বিরোধী বক্তব্যকে বিপ্লবাত্মক রূপ দেয়।

(গ) বিভিন্ন বিষয়ের বই প্রকাশ

ইউরোপের মানুষের ধর্মীয় চাহিদার পাশাপাশি বহুবিধ জ্ঞানের চাহিদা যন্ত্রে মুদ্রিত বইপত্র মেটাতে সক্ষম হয়েছিল। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) ধর্মীয় পুস্তক

প্রথমদিকে বাইবেল, বিভিন্ন সাধুসন্তের জীবনী, সেন্ট টমাস অ্যাকুইনাসের বইপত্র, ক্ষমাপত্র (Indulgence) প্রভৃতি ধর্মের সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলি নিয়ে বইপত্র প্রকাশিত হত।

(২) জ্ঞান-বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ

শীঘ্রই চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিত, আইন, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়েও বইপত্র ছাপা শুরু হয়।

(৩) ধ্রুপদি যুগের রচনা

মুদ্রণযন্ত্রের দৌলতে ক্লাসিকাল যুগের লেখকদের রচনা আবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এদের মধ্যে ভার্জিল, সিসেরো, অ্যারিস্টটল, প্লেটো, হোরেস, টেরেন্স, সেনেকা, প্লিনি প্রমুখের রচনা উল্লেখযোগ্য।

(৪) অন্যান্য গ্রন্থ

পাশাপাশি লাতিন ও গ্রিক ব্যাকরণ, গ্রিক অলংকারশাস্ত্র, কাব্য, নীতিশাস্ত্র, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ের চর্চা মুদ্রণযন্ত্রের প্রভাবে যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। এইসব বইপত্র সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন পেশার মানুষের জ্ঞানের চাহিদা মেটায়।

(ঘ) শিক্ষার্থীদের সুবিধা

  • (১) ইতিপূর্বে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের বক্তৃতাই ছিল শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জনের একমাত্র মাধ্যম। শিক্ষক বহুমূল্য যে বই পড়ে ছাত্রদের শোনাতেন তা ছাত্ররা এতদিন হাতের নাগালে পেত না বলে বাস্তবক্ষেত্রে তাদের জ্ঞানার্জনে ঘাটতি থাকত। মুদ্রণ ব্যবস্থার প্রসারের ফলে লিখিত পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করার আর কোনো প্রয়োজন ছিল না।
  • (২) কারণ, জ্ঞান ব্যক্তিগত মেধার কবল থেকে মুক্ত হয়ে মুদ্রিত বইপত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। মুদ্রণ বিপ্লবের ফলে সস্তা বইপত্র ছাত্রদের হাতে চলে এলে তারা বাড়িতে বসেই প্রকৃত জ্ঞান আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়। ফলে শিক্ষার প্রকৃত মুক্তি ঘটে এবং শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে জ্ঞানার্জনের সুযোগ পায়। তা ছাড়া, বিভিন্ন ধরনের মুদ্রিত বইপত্র পেয়ে শিক্ষকদেরও সুবিধা হয়।

(ঙ) বিজ্ঞানচর্চা বৃদ্ধি

আধুনিক বিজ্ঞানের প্রসারের ক্ষেত্রে মুদ্রণ বিপ্লবের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল। যেমন –

(১) মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি

মুদ্রণযন্ত্রের সহায়তায় পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, বিশ্বকোশ প্রভৃতি শাখার প্রচুর বইপত্র মানুষের কাছে পৌঁছে গেলে বিজ্ঞানের যুক্তিবাদী বক্তব্য ও নব নব আবিষ্কার সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। জীববিদ্যার বইপত্রে সুন্দর সুন্দর চিত্র ব্যবহারের ফলে মানুষ আরও আকৃষ্ট হয়।

(২) বিজ্ঞানচর্চার প্রসার

মুদ্রণযন্ত্রের দৌলতেই কোপারনিকাস, টাইকো ব্রাহে, কেপলার, গ্যালিলিয়ো, উইলিয়াম হার্ডে প্রমুখের গ্রন্থ ও আবিষ্কারের খবরাখবর সাধারণ মানুষ জানতে পারে। মুদ্রণশিল্পের সহায়তায় বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন সাময়িকপত্র প্রকাশ করা সম্ভব হয়। ‘ফিলোজফিক্যাল জার্নাল’ ছিল এমনই একটি সাময়িক পত্রিকা। এক কথায় বিজ্ঞান-বিষয়ক বইপত্র মানুষকে বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহী করে তোলে।

(চ) আধুনিক ভাষার বিকাশ

  • (১) মধ্যযুগের ইউরোপে সাহিত্যের একমাত্র বাহন ছিল লাতিন ভাষা। ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুদ্রিত বইপত্রের প্রায় ৭৭ শতাংশই ছিল লাতিন ভাষায় রচিত। কিন্তু মুদ্রণ বিপ্লবের ফলে এই ধারার পরিবর্তন ঘটে এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্যের বিকাশ ঘটতে থাকে।
  • (২) ইতালির পেত্রার্ক, দান্তে, বোকাচ্চিও, ইংল্যান্ডের চসার, ফ্রান্সে র‍্যাবেলা, স্পেনে সার্ভেন্টেস প্রমুখ স্থানীয় ও কথ্য ভাষায় বিভিন্ন সাহিত্য রচনা করেন। লাতিন ভাষার পাশাপাশি মুদ্রণযন্ত্রের সহায়তায় জার্মান ভাষায় ১১টি, ইতালীয় ভাষায় ৪টি, ফরাসি ও স্প্যানিশ ভাষায় একটি করে বাইবেল প্রকাশিত হয়।

(ছ) ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ হ্রাস

পূর্বে শিক্ষা-সংস্কৃতিতে যাজক ও গির্জা যে একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল মুদ্রণ বিপ্লবের মাধ্যমে তার অবসান ঘটতে শুরু করে। জ্ঞানের বন্ধনমুক্তি ঘটে এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির দরজা সাধারণ মানুষের কাছে খুলে যায়। বইপত্র প্রকাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় যা জ্ঞানের জগৎকে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনতা দেয়।

(জ) নতুন পেশা

মুদ্রণ বিপ্লবের ফলে বইপত্র প্রকাশনার কাজটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মুদ্রণ ব্যবস্থা শীঘ্রই একটি প্রধান শিল্প এবং বইপত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাবসায়িক পণ্য হিসেবে গণ্য হয়। লেখক, প্রকাশক, শ্রমিক প্রভৃতি বিভিন্ন মানুষ মুদ্রণ পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। বইপত্র ছাপা এবং বিক্রির কাজে যুক্ত হয়ে বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে। বইয়ের ব্যাবসা বিপুল মূলধন বিনিয়োগের অন্যতম ক্ষেত্রে পরিণত হয়।

উপসংহার :- পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইউরোপে মুদ্রণ যন্ত্রের সাহায্যে বইপত্র ছাপা হতে থাকে। যন্ত্রের মুদ্রিত বইগুলি ছিল তুলনামূলকভাবে সস্তা, সহজলভ্য ও সুদৃশ্য। ফলে এইসব বইয়ের চাহিদা যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি বই ছাপার পরিমাণও বৃদ্ধি পায়।

(FAQ) মুদ্রণ বিপ্লবের ফলাফল সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মার্টিন লুথার ধর্ম সংস্কার বিষয়ে কতগুলি পুস্তিকা মুদ্রণযন্ত্রে ছাপান?

৩০ টি।

২. প্রুফ দেখার রীতি চালু হয় কখন?

মুদ্রণ যন্ত্রের মাধ্যমে ছাপার কাজ শুরু হলে।

৩. মুদ্রণ যন্ত্রে সর্বপ্রথম কোন বই ছাপানো হয়?

বাইবেল।

৪. মুদ্রণ বিপ্লবকে কম্পিউটার বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করেছেন কে?

ইউজিন রাইস।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment