মুদ্রণ বিপ্লবের কারণ বা পটভূমি

মুদ্রণ বিপ্লবের কারণ বা পটভূমি প্রসঙ্গে প্রাচীন মুদ্রণ, চিনে যান্ত্রিক মুদ্রণ, আরব থেকে ইউরোপে মুদ্রণ কৌশল প্রবেশ, কাগজের প্রচলন, শস্তায় মুদ্রণ, মুদ্রণ যন্ত্রের ব্যবহার, বইয়ের চাহিদা বৃদ্ধি ও নবজাগরণের প্রভাব সম্পর্কে জানবো।

ইউরোপে মুদ্রণ বিপ্লবের পটভূমি বা কারণ প্রসঙ্গে ইউরোপে প্রাচীন মুদ্রণ, আরব থেকে ইউরোপে মুদ্রণ কৌশল প্রবেশ, ইউরোপে মুদ্রণ যন্ত্রের ব্যবহার, ইউরোপে বইয়ের চাহিদা বৃদ্ধি ও মুদ্রণ বিপ্লবের ক্ষেত্রে নবজাগরণের প্রভাব সম্পর্কে জানবো।

মুদ্রণ বিপ্লবের কারণ বা পটভূমি

ঐতিহাসিক ঘটনামুদ্রণ বিপ্লবের পটভূমি বা কারণ
মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারজোহানেস গুটেনবার্গ
কাগজ তৈরির কৌশলচীন
পার্চমেন্টপশুর পাতলা চামড়া
২০০০ পুঁথিএরিস্টটল
মুদ্রণ বিপ্লবের কারণ বা পটভূমি

ভূমিকা :- মধ্যযুগের পরবর্তীকালে কাগজের বহুল প্রচলন, মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার, শিক্ষার প্রসার, নবজাগরণপ্রসূত চেতনার প্রসার প্রভৃতির ফলে ইউরোপ-এ পঞ্চদশ শতকে মুদ্রণশিল্পে অভাবনীয় অগ্রগতি ঘটে। পূর্বেকার হাতে লেখা পুথির দিন ফুরিয়ে যায় এবং পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইউরোপে মুদ্রণযন্ত্রের সাহায্যে বইপত্র ছাপা হতে থাকে। যন্ত্রে মুদ্রিত বইগুলি ছিল তুলনামূলকভাবে সস্তা, সহজলভ্য ও সুদৃশ্য। ফলে এসব বইয়ের চাহিদা যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি বই ছাপার পরিমাণও বেড়ে যায়। এই ঘটনা ইউরোপের মুদ্রণ বিপ্লব নামে পরিচিত।

প্রাচীন মুদ্রণ

মুদ্রণশিল্পের ইতিহাস আজ থেকে অন্তত ৫০০০ বছরের প্রাচীন। আনুমানিক ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়ার বণিকরা মাটির ফলকে সিলমোহরের ছাপ দিত বলে জানা যায়। তবে মুদ্রিত বইপত্রের প্রকাশ শুরু হয় বহুকাল পরে, খ্রিস্টীয় নবম শতকে চিনে। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বই ছাপার আগে হাতে লেখা বই প্রকাশ হত। প্রচুর সংখ্যক অনুলেখক নিযুক্ত করে হাতে বই লেখার কাজ হত। ফলে বইয়ের মূল্য হত খুবই বেশি এবং বই প্রকাশের সংখ্যাও ছিল খুবই কম। একমাত্র ধনীরাই সে যুগে বই কেনার বিলাসিতা দেখাতে পারত।

চিনে যান্ত্রিক মুদ্রণ

নবম শতকে যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করে চিনে মুদ্রণের কাজে অগ্রগতি ঘটলে হাতে লেখা পুথির দিন ফুরোনোর পালা শুরু হয়। যান্ত্রিক কৌশল ব্যবহার করে সর্বপ্রথম আধুনিক ধাঁচের মুদ্রণ ব্যবস্থার অগ্রগতি ঘটে চিনে।

আরব থেকে ইউরোপে মুদ্রণ কৌশলের প্রবেশ

চিন থেকে মুদ্রণ প্রযুক্তি আরবদের হাতে পৌঁছোয়। আরবরা আবার এই প্রযুক্তি ইউরোপে পৌঁছে দেয়। পঞ্চদশ শতকে ইউরোপে নবজাগরণ-প্রসূত চেতনা থেকে যে-সকল বিষয়ের অগ্রগতি ঘটেছিল সেগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ছিল ইউরোপের মুদ্রণশিল্পে চূড়ান্ত অগ্রগতি। জার্মানির জোহানেস গুটেনবার্গ যে আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র উদ্ভাবন করেছিলেন তা ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারগুলির মধ্যে অন্যতম।

মুদ্রণ বিপ্লবের পটভূমি বা কারণ

পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইউরোপে মুদ্রণযন্ত্রের সাহায্যে বই ছাপার কাজ শুরু হলে মুদ্রণশিল্পে বিপ্লব ঘটে যায়। ইউরোপের মুদ্রণ বিপ্লবের পটভূমি বা কারণ হিসেবে বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। যেমন –

(ক) কাগজের প্রচলন

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) হাতে লেখা পুঁথি

মধ্যযুগের ইউরোপে এগজেম্পলার (Exemplar) নামে মূল পুথি হাতে নকল করে প্রকাশ করা হত। তখন ভেড়া বা বাছুরের চামড়া থেকে তৈরি দামি ‘পার্চমেন্ট’-এর ওপর হাতে লিখে পুথি প্রকাশ করা হত। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকে হাতে লেখা অ্যারিস্টলের প্রায় ২০০০ হাজার পুথি পাওয়া গেছে।

(২) কাগজের প্রচলন

পরবর্তীকালে চিনের কাগজ তৈরির কৌশল আরবদের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছোলে সেখানকার মুদ্রণশিল্পে কাগজের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। আরবের বণিকরা খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে স্পেন-এ কাগজ তৈরির কৌশল নিয়ে আসে। পরবর্তী দুশো বছরের মধ্যে এই কৌশল ইতালি (১২৭০ খ্রি.), ফ্রান্স (১৩৪০ খ্রি.), জার্মানি (১৩৯০ খ্রি.), সুইজারল্যান্ড (১৪১১ খ্রি.) প্রভৃতি দেশে পৌঁছে গেলে কাগজে বইপত্র ছাপার বহুল প্রচলন ঘটে। পূর্বেকার পার্চমেন্ট-এর পরিবর্তে বই ছাপায় কাগজের ব্যবহার হুহু করে বাড়তে থাকে। কাগজের প্রচলনের ফলে ইউরোপে বই ছাপার কাজ অনেক বেশি সহজ হয়ে যায়।

(খ) সস্তায় মুদ্রণ

পার্চমেন্টের পরিবর্তে কাগজে বই ছাপার কাজ শুরু হলে সেগুলি যেমন দেখতে সুন্দর হয় তেমনি দামেও সস্তা হয়। কাগজে মুদ্রিত বইগুলি পাঠকদের বেশি করে আকৃষ্ট করে। আবার বহুমূল্য পার্চমেন্টে বই ছাপতে যে বিপুল ব্যয় হত কাগজে ছাপার প্রচলন হলে সে ব্যয় বহুলাংশে হ্রাস পায়। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কাগজের দাম ছিল পার্চমেন্টের ১/৬ অংশ মাত্র। এই সময় চাহিদা অনুযায়ী কাগজের উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ৷

(গ) মুদ্রণযন্ত্রের ব্যবহার

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) মুদ্রণ যন্ত্রের প্রতিষ্ঠা

মুদ্রণ বিপ্লবের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যে বিষয়টি সর্বাধিক যুক্ত ছিল তা হল মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার। চিন বা আরবে কাঠের ব্লকের দ্বারা মুদ্রণের যে কৌশল প্রচলিত ছিল তা পঞ্চদশ শতকের ইউরোপে আমূল পালটে যায়। জোহানেস গুটেনবার্গ পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন। তিনি জার্মানির মেনজ শহরে সর্বপ্রথম মুদ্রণযন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। কয়েক দশকের মধ্যেই ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয়।

(২) মুদ্রণশিল্পে উৎকর্ষ

এই সময় ধাতুশিল্পের অগ্রগতি, স্বর্ণকারদের খোদাই করা নতুন ধরনের সূক্ষ্ম ধাতব অক্ষর প্রভৃতি ছাপার কাজে উৎকর্ষ আনে। ফলে মুদ্রণযন্ত্রের মাধ্যমে বই ছাপার কাজ শুরু হয়। অল্প সময়ে প্রচুর বই মুদ্রিত হতে থাকে। যন্ত্রে বই মুদ্রণের ক্ষেত্রে প্রুফ সংশোধনের প্রথা চালু হলে বইয়ের ভুল ত্রুটি অনেকাংশে হ্রাস পায়। যন্ত্রে মুদ্রিত বইগুলি মানের বিচারে ছিল অনেক উন্নত ও নির্ভুল।

(ঘ) বইয়ের চাহিদা বৃদ্ধি

  • (১) আগে একমাত্র উচ্চবিত্তরাই বই কেনার বিলাসিতা উপভোগ করত। পরবর্তীকালে হাতে লেখার পরিবর্তে যন্ত্রের সাহায্যে মুদ্রণ এবং দামি পার্চমেন্টের পরিবর্তে সস্তা কাগজে ছাপার ফলে মুদ্রিত বইয়ের উৎপাদন ব্যয় খুব কম হত। ফলে সাধারণ পাঠকদের কাছে সস্তায় সুদৃশ্য বই পৌঁছে যেতে থাকে। সর্বস্তরের উৎসাহী মানুষ বই কিনতে থাকে।
  • (২) আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জ্ঞানার্জনের একমাত্র উপায় ছিল শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের বক্তৃতা। কিন্তু বই সুলভ হওয়ায় ছাত্ররাও প্রচুর বই কিনতে থাকে। এই ভাবে ইউরোপে মুদ্রিত বইয়ের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

(ঙ) নবজাগরণের প্রভাব

  • (১) পঞ্চদশ শতকে ইউরোপের নবজাগরণপ্রসূত ভাবধারার প্রসার মুদ্রণ বিপ্লবের বিকাশে বিশেষভাবে সহায়তা করেছিল। নবজাগরণের ফলে সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্পকলা-সহ শিক্ষার সমস্ত শাখায় জ্ঞানের অভূতপূর্ব স্ফূরণ ঘটে। জ্ঞানার্জনের আগ্রহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
  • (২) নবজাগরণপ্রসূত ভাবধারার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অসংখ্য বইপত্র ছাপা হতে থাকে। এই সময় অসংখ্য নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয় এবং শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে। ফলে মানুষের বই কেনার চাহিদাও বহুগুণ বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে নতুন আবিষ্কৃত মুদ্রণযন্ত্র প্রচুর বইপত্র প্রকাশ করে মানুষের জ্ঞানের চাহিদা মেটাতে থাকে।

উপসংহার :- একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন ছাপাখানা থেকে ৬০ লক্ষেরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছিল। অপর একটি পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা দেড় থেকে দু-কোটি বলে উল্লেখ করা হয়।

(FAQ) মুদ্রণ বিপ্লবের কারণ বা পটভূমি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কাগজ আবিষ্কারের পূর্বে কিসের উপর লেখা হত?

পার্চমেন্ট।

২. সর্বপ্রথম কোথায় কাগজ তৈরির কৌশল আবিষ্কৃত হয়?

চিনে।

৩. সর্বপ্রথম কোথায় মুদ্রণযন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়?

জার্মানির মেইনজ শহরে।

৪. কে কখন মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন?

জোহানেস গুটেনবার্গ পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment