আরবে মুদ্রণ বিপ্লব

আরবে মুদ্রণ বিপ্লব প্রসঙ্গে চিন থেকে আরবে মুদ্রণ প্রযুক্তি, ড. রোপারের মত, আরবে কাগজ তৈরির কৌশল আয়ত্ত, আরবে কাগজ তৈরির প্রযুক্তিতে উন্নতি, আরবে কাগজ কলের প্রসার, আরবে বই বাঁধাই, আরব থেকে মুদ্রণ শিল্পের ব্যাপ্তি সম্পর্কে জানবো।

আরবে মুদ্রণ বিপ্লব

ঐতিহাসিক ঘটনাআরবে মুদ্রণ বিপ্লব
তালাসের যুদ্ধ৭৫১ খ্রি
সর্বপ্রথম কাগজ কারখানাসমরখন্দ
স্পেনে কাগজের কল১১৫০ খ্রি
ইতালির কাগজের কল১২৯৩ খ্রি
আফ্রিকার কাগজের কলমরক্কো
আরবে মুদ্রণ বিপ্লব

ভূমিকা :- পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি জার্মানিতে জোহানেস গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পর ইউরোপে যে মুদ্রণ বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল তার পটভূমি রচনায় আরব দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

চিন থেকে আরবে মুদ্রণ প্রযুক্তি

আরবরা চিনের মুদ্রণ প্রযুক্তি ও কাগজ তৈরির কৌশল আয়ত্ত করে মুদ্রণশিল্পের অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটিয়েছিল। যান্ত্রিক মুদ্রণের এই প্রযুক্তি আরবদের মাধ্যমেই ইউরোপে পৌঁছে সেখানে মুদ্রণ বিপ্লবের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব সংঘটিত হয়।

ড. রোপারের মত

বিখ্যাত পণ্ডিত ড. জিওফ্রে রোপার (Dr. Geoffrey Roper) দেখিয়েছেন যে, পঞ্চদশ শতকে জার্মানিতে যখন জোহানেস গুটেনবার্গ মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন তার বেশ কয়েক শতাব্দী পূর্বেই আরব দুনিয়ায় উন্নত মুদ্রণ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। তাঁর ভাষায়, “মুসলিমরা গুটেনবার্গেরও অন্তত ৫০০ বছর আগে থেকে মুদ্রণশিল্পের চর্চা করছিল।” তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আরবের কিছু পুরোনো মুদ্রণ থেকে উপলব্ধি করা যায় যে, সেগুলির নকশা, লিপি, জ্যামিতিক মাপজোখ, রঙের ব্যবহার প্রভৃতি উন্নত মানের ছিল।

আরবে কাগজ তৈরির কৌশল আয়ত্ত

  • (১) কাগজ আবিষ্কারের পূর্বে আরবেও বইপত্র লেখার প্রধান উপাদান ছিল পশুর চামড়া বা পার্চমেন্ট। চিনে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক নাগাদ ছেঁড়া কাপড় ও উদ্ভিদ-তন্তুর সংমিশ্রণে কাগজ তৈরির প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়।
  • (২) ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে চিনের সঙ্গে আরবের মুসলিমদের তালাসের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এই যুদ্ধে পরাজিত চিনের বেশ কয়েকজন সুদক্ষ কাগজ প্রস্তুতকারক আরবদের হাতে বন্দি হয়। আরবরা চিনের এই বন্দি কারিগরদের কাছ থেকে কাগজ তৈরির মূল কৌশলটি শিখে নেয়। এই কৌশল কাজে লাগিয়ে আরবরা পরবর্তীকালে মুদ্রণ শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটায়।

আরবে কাগজ তৈরির প্রযুক্তিতে উন্নতি

  • (১) আরবদের হাতে কাগজ তৈরির প্রযুক্তি আরও উন্নত হয়। তারা কাগজশিল্পে শণের ব্যবহার শুরু করলে উন্নতমানের কাগজ উৎপাদিত হতে থাকে। চিনের কাগজ প্রস্তুতে যুক্ত কারিগররা যেখানে হাতের সাহায্যে কাগজ তৈরির সব কাজ করত সেখানে আরবের মুসলিম কারিগররা ট্রিপ হ্যামারের ব্যবহার শুরু করে।
  • (২) ট্রিপ হ্যামার (Trip Hammer) বা বারংবার আঘাত করা হাতুড়ির সাহায্যে কাগজ তৈরির প্রযুক্তি অনেক উন্নত হয়। ফলে আরবে উন্নত মানের কাগজ তৈরি হতে থাকে। উন্নত মানের কাগজের সঠিক ব্যবহার করে তারা মুদ্রণশিল্পে অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটায়।

আরবে কাগজ কলের প্রসার

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) আরবে কাগজ উৎপাদন

  • (১) কাগজ তৈরির প্রযুক্তি উন্নত হলে আরবের বিভিন্ন স্থানে কাগজ তৈরির কারখানা গড়ে উঠতে থাকে। সর্বপ্রথম আরবের সমরখন্দে কাগজ তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে। নবম শতকের মধ্যে আরব দুনিয়ার বাগদাদে অসংখ্য কাগজের কল স্থাপিত হয়।
  • (২) এখান থেকে কাগজশিল্প আরবের অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। দামাস্কাসে স্থাপিত কাগজের কারখানা থেকে ইউরোপে কাগজ রপ্তানি হতে থাকে। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কাগজের মূল্য হ্রাস পায়, কাগজ সহজলভ্য হয় এবং মানও যথেষ্ট উন্নত হয়।

(খ) আরবের বাইরে কাগজের কল

  • (১) ইরাক, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন প্রভৃতি আরব দেশগুলিতে কাগজের কল স্থাপনের পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার মরক্কোয় নবম শতকে কাগজের কল স্থাপিত হয়। সেই সূত্র ধরে স্পেনে কাগজ তৈরির কৌশল পৌঁছোয়। সেখানে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম কাগজের কল স্থাপিত হয়।
  • (২) পরবর্তী দুই শতাব্দীর মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে কাগজের কল গড়ে ওঠে। দ্বাদশ শতকের “The Art of the Painter” নামের পত্রটিকে ইউরোপের খ্রিস্টান জগতে সর্বপ্রথম কাগজে মুদ্রিত পত্র বলে মনে করা হয়। ইতালির বোলোগনায় ১২৯৩ খ্রিস্টাব্দে কাগজের কল স্থাপিত হয়।

আরবে বই বাঁধাই

  • (১) আরবে কাগজশিল্পের অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটার পর সেখানে কাগজে মুদ্রিত বই বাঁধাইয়ের উন্নত কৌশলের উদ্ভাবন ঘটে। বাঁধাই করা বইগুলি একদিকে যেমন ওজনে হালকা হয় অন্যদিকে তেমনি সুদৃশ্য হয়। বইয়ের পুরু মলাট চামড়া বা সিল্কের আবরণে আবৃত করার ব্যবস্থা হয়। ফলে বইগুলি আগের চেয়ে অনেক টেকসই হয়।
  • (২) মলাটের উপর বাড়তি আবরণের ব্যবস্থা করে বইগুলি সযত্নে রাখার সুব্যবস্থা করা হয়। দ্বাদশ শতক নাগাদ আরবের প্রতিবেশী মরক্কোর মারাকেচ (Marrakech) শহরের একটি সম্পূর্ণ রাস্তাই বইয়ের দোকানে ভরে যায়। সেই রাস্তায় শুধু বইয়ের দোকানের সংখ্যা ছিল ১০০টিরও বেশি।

আরব থেকে মুদ্রণ শিল্পের ব্যাপ্তি

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) কাগজ তৈরির প্রযুক্তির প্রসার

আরবে কাগজের ব্যাপক উৎপাদন এবং কাগজের সুদৃশ্য বই প্রকাশের কৌশল শীঘ্রই ইউরোপে পৌঁছে যায়। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতক নাগাদ আরবরা তাদের কাগজ তৈরির প্রযুক্তিগত কলাকৌশল স্পেন তথা পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে দেয়। ত্রয়োদশ শতক নাগাদ আরবের বণিকদের মাধ্যমে কাগজ তৈরির কৌশল ভারতে প্রবেশ করে। পরবর্তী দুশো বছরের মধ্যে এই কৌশল ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে পৌঁছে যায়।

(২) কাগজের বহুল ব্যবহার

এর ফলে ইউরোপে পার্চমেন্ট-এ মুদ্রণের দিন শেষ হয়ে যায় এবং কাগজের বহুল ব্যবহার শুরু হয়।

উপসংহার :- কাগজে মুদ্রণের ফলে একদিকে মুদ্রিত বইয়ের দাম খুব হ্রাস পায়, অন্যদিকে বইগুলি সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে ওঠে। ফলে বইপত্রের চাহিদাও খুব বৃদ্ধি পায়। এর ফলেই মুদ্রণ বিপ্লব সম্ভব হয়।

(FAQ) আরবে মুদ্রণ বিপ্লব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কাগজ আবিষ্কারের পূর্বে আরবে বইপত্র লেখার প্রধান উপাদান কি ছিল?

 পশুর চামড়া বা পার্চমেন্ট।

২. চীন ও আরবের মুসলিমদের মধ্যে তালাসের যুদ্ধ সংঘটিত হয় কখন?

৭৫১ খ্রিস্টাব্দে।

৩. আরবের কোথায় সর্বপ্রথম কাগজ তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে?

সমরখন্দে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment