চীনে মুদ্রণ বিপ্লব

চীনে মুদ্রণ বিপ্লব প্রসঙ্গে কাঠের ব্লকে মুদ্রণ, চিনে মুদ্রিত প্রথম বই, চিনে আবিষ্কার মুদ্রণের আনুষঙ্গিক প্রযুক্তি, চিনের কৌশল ইউরোপে স্থানান্তর, কালির ব্যবহার, মুদ্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে জানবো।

চীনে মুদ্রণ বিপ্লব

ঐতিহাসিক ঘটনাচীনে মুদ্রণ বিপ্লব
যান্ত্রিক মুদ্রণ৫৯৩ খ্রি
জাইলোগ্রাফিকাঠের ব্লকে মুদ্রণ
পৃথিবীর প্রথম মুদ্রিত বইডায়মণ্ড সূত্র
কাগজ আবিষ্কারচীন
পার্চমেন্টপশুর পাতলা চামড়া
চীনে মুদ্রণ বিপ্লব

ভূমিকা :- খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে আধুনিক ধাঁচের মুদ্রণশিল্পের প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল চিনে। সেদেশে মুদ্রণ ব্যবস্থায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির অগ্রগতি ঘটে কাঠে খোদাই করা ব্লকের দ্বারা মুদ্রণ পদ্ধতির উদ্ভাবন, মুদ্রণের প্রয়োজনীয় কাগজের আবিষ্কার। চীনে এই দুই প্রযুক্তির উদ্ভাবন পরবর্তীকালে ইউরোপে মুদ্রণ বিপ্লবের পটভূমি প্রস্তুত করেছিল।

কাঠের ব্লকে মুদ্রণ

চিনে বস্ত্রে মুদ্রণের প্রথা পূর্বেই চালু হয়েছিল। সর্বপ্রথম যান্ত্রিক মুদ্রণের পদ্ধতি এদেশে আবিষ্কৃত হয় ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ। –

(১) চীনে প্রথম দিকের মুদ্রণ

চিনে তাং রাজবংশের (৬১৮-৯০৭ খ্রি.) আমলে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কাঠের ব্লকের দ্বারা কাগজে ধরণী সূত্র নামে একটি বৌদ্ধ সূত্র ছাপা হয়েছিল যার প্রতিলিপি আবিষ্কৃত হয়েছে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে। ৬৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৯৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চিনে মুদ্রিত অপর একটি গ্রন্থের প্রতিলিপিও পাওয়া গেছে। চীনের প্রতিবেশী কোরিয়াতেও কাঠের ব্লকের মাধ্যমে কাগজে মুদ্রণের কপি আবিষ্কৃত হয়েছে (১৯৬৬ খ্রি.) যা ৬৯০ থেকে ৭০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মুদ্রিত হয়েছিল।

(২) চীনের প্রথম সংবাদপত্র

৭০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ চিনের বেজিং-এ প্রথম সংবাদপত্র মুদ্রিত হয়। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে সেদেশে কাঠ বা পাথরের ব্লকের দ্বারা মুদ্রণের যথেষ্ট বিকাশ ঘটে। ব্লকের দ্বারা মুদ্রণের এই পদ্ধতি ‘জাইলোগ্রাফি’ (Xylography) নামে পরিচিত। চিনে তাং যুগে ৮৭৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৮৮২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ক্যালেন্ডার মুদ্রিত হয়েছিল যা পৃথিবীর প্রাচীনতম মুদ্রিত ক্যালেন্ডার। চিনের লিউ চিং ১১৫৫ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম মুদ্রিত মানচিত্র প্রকাশ করেন।

চীনে মুদ্রিত প্রথম বই

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) কাঠের ব্লকে মুদ্রণ

চীনে আনুমানিক ৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে কাঠের ব্লকের সাহায্যে ‘ডায়মন্ড সূত্র’ নামে একটি বৌদ্ধগ্রন্থের অনুবাদ মুদ্রিত হয়। এটি পৃথিবীর প্রথম মুদ্রিত বই বলে মনে করা হয়। গ্রন্থটি বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

(২) পৃথক টাইপের ব্যবহার

ইতিমধ্যে চিনে বি শেঙ ১০৪০-৪১ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য পৃথক পৃথক টাইপের আবিষ্কার করেন। চীনে ছাপার কাজে পোড়া মাটি ও কাঠের ব্লকের ব্যবহার ত্রয়োদশ শতক নাগাদ যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। চিনের প্রতিবেশী কোরিয়ায় এই সময় ধাতব টাইপের প্রচলন ঘটে। ক্রমে চিনে ব্লক প্রযুক্তিতে মুদ্রণ কৌশলের ক্রমবিকাশ ঘটতে থাকে। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি জার্মানির জোহানেস গুটেনবার্গ যে বিখ্যাত মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন তার কৌশলও ছিল চিনের মুদ্রণ কৌশলের প্রায় সমগোত্রীয়।

চীনে কাগজ আবিষ্কার

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) ব্যয়বহুল পার্চমেন্ট

মুদ্রণ ব্লকের আবিষ্কার হলেও পৃথিবীতে কাগজের প্রচলনের পূর্বে মুদ্রণশিল্পের যথার্থ বিকাশ সম্ভব ছিল না। কারণ, কাগজ প্রচলনের পূর্বে বই ছাপার কাজে ব্যবহার করা হত পশুর পাতলা চামড়া যাকে ‘পার্চমেন্ট’ বলা হত। ‘পার্চমেন্ট’-এ মুদ্রণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল। একটি বাইবেল মুদ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় ‘পার্চমেন্ট’ তৈরির জন্য ৩০০টি ভেড়া ও ১৪০টি বাছুরের চামড়ার প্রয়োজন হত। এরূপ বিপুল ব্যয়ের কারণে ব্যাপক পরিমাণে মুদ্রণের কাজ অসম্ভব ছিল।

(২) সুলভ কাগজের প্রচলন

চিনারা ছেঁড়া কাপড় ও উদ্ভিদ-তন্তুর (বিশেষত তুঁত গাছের ছাল) সংমিশ্রণে কাগজ তৈরির কৌশল আবিষ্কার করে। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে চীনে প্রথম কাগজ তৈরির প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হলে মুদ্রণশিল্পে অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতক নাগাদ চিন থেকে কাগজ তৈরির কৌশল আরবে পৌঁছোয় এবং আরব থেকে তা দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতক নাগাদ ইউরোপে পৌঁছে যায়। কাগজের ওপর মুদ্রণ শুরু হলে মুদ্রণ-ব্যয় যথেষ্ট হ্রাস পায়। ফলে মুদ্রিত বইয়ের মূল্য কমে গেলে বইয়ের চাহিদাও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। চাহিদা অনুসারে বই ছাপার পরিমাণও বহুগুণ বেড়ে যায়।

মুদ্রণের আনুষঙ্গিক প্রযুক্তি

চিনে ছাপার কাজের আনুষঙ্গিক উপাদানের প্রযুক্তিও উন্নত হতে থাকে। যেমন –

(১) কালির ব্যবহার

সেদেশে মুদ্রণের প্রয়োজনীয় কালির উদ্ভাবন ঘটে। অক্ষর-খোদিত কাঠের ব্লকটি একটি টেবিলে শক্তভাবে স্থাপন করে ব্লকের অক্ষরগুলিতে কালি লাগিয়ে দেওয়া হত। ঘোড়ার লোম দিয়ে তৈরি এক ধরনের ব্রাশ দিয়ে ব্লকে কালি লাগানো হত। এরপর ব্লকের উপর মুদ্রণযোগ্য কাগজটি স্থাপন করা হত। তাতে ছাপ বসে গেলে কাগজটি শুকানো হত।

(২) মুদ্রণ পদ্ধতি

ছাপা হত কাগজের এক পিঠে। নমুনা কপি মুদ্রণের ক্ষেত্রে লাল বা নীল কালিতে মুদ্রণের কাজ হলেও ব্যাবসায়িক উৎপাদনের ক্ষেত্রে কালো কালিতে ছাপার কাজ হত। একজন মুদ্রক দিনে অন্তত ১৫০০ থেকে ২০০০ ডবল সিট কাগজ ছাপতে পারত। ছাপার পর ব্লকগুলি সযত্নে রেখে দিয়ে তা আবার ভবিষ্যতে ব্যবহার করা যেত।

চীনের কৌশল ইউরোপে স্থানান্তর

ক্রমে চিনের কৌশল সমগ্ৰ ইউরোপে বিস্তার লাভ করে। –

(১) ইউরোপে চীনের কৌশল

চীনের মুদ্রণ প্রযুক্তি আরবদের মাধ্যমে ইউরোপে প্রবেশ করে সেখানে বিপ্লব ঘটায়। চিনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক যোগাযোগের ফলে ১২৫০ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে চিনের ছাপার উন্নত কৌশল ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এই কৌশল ইউরোপে আরও উন্নত হয়।

(২) গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র

পঞ্চাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে জার্মানির জোহানেস গুটেনবার্গ যে আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন তা ছিল প্রকৃতপক্ষে চীনা ব্লক-মুদ্রণ পদ্ধতিরই উন্নত রূপ। চিনের এক পাতা মুদ্রণের অখণ্ড ব্লকের পরিবর্তে গুটেনবার্গ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য পৃথক পৃথক টাইপের উদ্ভাবন করেন। ফলে মুদ্রণশিল্পের আরও অগ্রগতি সম্ভব হয়।

উপসংহার :- গুটেনবার্গ টানা চার বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ছাপাখানা স্থাপন করলেও ১৪৫৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি একমাত্র বাইবেল ছাড়া অন্য কিছু ছাপার বরাত পান নি। অথচ গুটেনবার্গের বহু আগেই চিনে বইপত্র মুদ্রণের কাজ চালু হয়েছিল।

(FAQ) চীনে মুদ্রণ বিপ্লব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. চীনে যান্ত্রিক মুদ্রণের পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয় কখন?

 ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে।

২. জাইলোগ্রাফি কি?

কাঠ বা পাথরের ব্লকের দ্বারা মুদ্রণের পদ্ধতি জাইলোগ্রাফি নামে পরিচিত।

৩. পৃথিবীর প্রথম মুদ্রিত বই কোনটি?

ডায়মন্ড সূত্র।

৪. প্রথম কাগজ তৈরির প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয় কোথায়?

চীনে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment