স্পেনের সামুদ্রিক অভিযান

স্পেনের সামুদ্রিক অভিযান প্রসঙ্গে অনুকূল পরিবেশ দুঃসাহসী অভিযাত্রী কলম্বাস, আমেরিগো ভেসপুচি, বালবোয়া, ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান, কোর্টেসের অভিযান, পিজারোর অভিযান ও অন্যান্যদের অভিযান সম্পর্কে জানবো।

স্পেনের সামুদ্রিক অভিযান

ঐতিহাসিক ঘটনাস্পেনের ভৌগোলিক অভিযান
নতুন মহাদেশকলম্বাস
নতুন বিশ্বআমেরিগো ভেসপুচি
দক্ষিণ মহাসাগরবালবোয়া
প্রশান্ত মহাসাগরফার্দিনান্দ ম্যাগেলান
আজটেক সভ্যতাকোর্টেস
ইনকা সভ্যতাপিজারো
স্পেনের সামুদ্রিক অভিযান

ভূমিকা :- স্পেন ছিল পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের সামুদ্রিক অভিযানকারী দেশগুলির মধ্যে অন্যতম। পোপ ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের নির্দেশনামার (১৪৯৩ খ্রি.) পরিপ্রেক্ষিতে স্পেন আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিমদিকে নৌ-অভিযান চালায়।

(ক) অনুকূল পরিবেশ

কয়েকটি অনুকূল পরিবেশ স্পেনের সামুদ্রিক অভিযানের সাফল্যে সহায়তা করেছিল। যেমন –

(১) বিপুল সম্পদ

স্পেনের বিপুল সম্পদ তাকে সামুদ্রিক অভিযানে উদ্যোগী হতে সহায়তা করেছিল।

(২) প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনতা

আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিমদিকে অভিযানের ফলে স্পেনকে বিশেষ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয় নি।

(৩) ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার সহায়তা

স্পেনের নাবিকরা সেদেশের রাজা ফার্দিনান্দ এবং রানি ইসাবেলার সহায়তা পেয়েছিল।

(৪) নাবিকদের দক্ষতা

স্পেনের নাবিকদের নৌবিদ্যায় দক্ষতা, দুঃসাহস, অদম্য উৎসাহ প্রভৃতি বিষয়গুলি তাদের সমুদ্রাভিযানকে সহজ করে দিয়েছিল।

(৫) বাজারের সন্ধান

কৃষির অগ্রগতির ফলে স্পেনে বিভিন্ন ধরনের রপ্তানি-পণ্য উৎপাদিত হত। এগুলি দূরদূরান্তে বিক্রির জন্য বাজার খুঁজতে সামুদ্রিক অভিযানের প্রয়োজন ছিল।

(৬) বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ

ফুগার, ওয়েলসার প্রভৃতি সংস্থা-সহ স্পেনের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ভৌগোলিক অভিযানে তৎপরতা দেখিয়েছিল।

(৭) লুণ্ঠনে রাজশক্তির সমর্থন

সামুদ্রিক অভিযানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ দখল করে সেখানকার অর্থসম্পদ লুণ্ঠন ও আগ্রাসন চালানোর ঘটনাকে সেদেশের রাজশক্তিও সমর্থন করেছিল।

(খ) দুঃসাহসী অভিযাত্রীগণ

স্পেনের নাবিকরা মূলত পশ্চিমদিকে সামুদ্রিক অভিযান চালান। এদেশের গুরুত্বপূর্ণ নাবিকরা ছিলেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস, আমেরিগো ভেসপুচি, বালবোয়া, ম্যাগেলান, কোর্টেস, পিজারো প্রমুখ।

(১) কলম্বাস

স্পেনের অভিযাত্রীদের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস (১৪৪১- ১৫০৬ খ্রি.)। জন্মসূত্রে ইতালীয় কলম্বাস স্পেনের নৌবাহিনীতে নাবিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার অভিযানের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(i) সহায়তা প্রার্থনা

প্রথমদিকে তিনি পোর্তুগাল-সহ অন্যান্য কয়েকটি দেশের রাজার কাছে তাঁর ভৌগোলিক অভিযানে সহায়তা প্রার্থনা করে ব্যর্থ হন। অবশেষে স্পেনের রাজা ফার্দিনান্দ এবং রানি ইসাবেলার পৃষ্ঠপোষকতায় কলম্বাস আটলান্টিক মহাসাগরে গুৰুত্বপূৰ্ণ চারটি অভিযান চালান। পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছে ভারতের মূল্যবান সম্পদ ও মশলা হস্তগত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তিনি ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দের ৩ আগস্ট সান্তামারিয়া, পিন্তা ও নিনা নামে তিনটি জাহাজ ও ৮৭ জন নাবিক নিয়ে পালোস বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেন। অবশেষে তিনি মহাসমুদ্রে আত্মগোপনকারী একটি নতুন মহাদেশ আবিষ্কার করেন।

(ii) প্রথম অভিযান

প্রথম অভিযানে তিনি ওই বছরে ২০ নভেম্বর বর্তমান আমেরিকার বাহামা দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছোন। এরপর তিনি একে একে সান সালভাডোর, মাটো, মারিয়া, কিউবার উত্তর-পূর্ব উপকূল, হিসপানিওয়ালা, কোস্টারিকা, হন্ডুরাস ও অন্যান্য কয়েকটি অঞ্চলে পদার্পণ করেন। প্রসঙ্গত বলা দরকার যে, প্রথমে কলম্বাস তাঁর আবিষ্কৃত স্থানকে ভারত বলে ভুল করেছিলেন। এজন্য তিনি এই দ্বীপপুঞ্জের নামকরণ করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ। তিনি এখানকার আদিবাসীদের নাম দেন রেড ইন্ডিয়ান।

(iii) পরবর্তী তিনটি অভিযান

পরবর্তী তিনটি অভিযানে কলম্বাস অ্যান্টিলেস, ভেনিজুয়েলার ক্যারিবিয়ান উপকূল ও মধ্য আমেরিকার হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, কোস্টারিকা প্রভৃতি স্থানে অভিযান চালান।

(২) আমেরিগো ভেসপুচি

আমেরিগো ভেসপুচির ভৌগোলিক অভিযানের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(i) অভিযান

কলম্বাসের অভিযানের কয়েক বছর পর ইতালির নাবিক ও স্পেনের অভিযাত্রী আমেরিগো ভেসপুচি ১৪৯৭ থেকে ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চারবার আমেরিকার অভ্যন্তরে অভিযান চালান।

(ii) বিভিন্ন স্থানে পদার্পণ

তিনি পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ অতিক্রম করে ব্রাজিলের উপকূল এবং সেখান থেকে বেলেম নামক স্থানে পৌঁছোন। এরপর তিনি ত্রিনিদাদের উত্তর-পশ্চিম অংশে পদার্পণ করেন।

(iii) নতুন বিশ্ব

আমেরিগো ভেসপুচি কলম্বাসের আবিষ্কৃত নতুন মহাদেশকে ‘নতুন বিশ্ব’ বলে অভিহিত করেন (১৫০৩ খ্রি.)। আমেরিগো ভেসপুচির নামানুসারে ১৫০৭ খ্রিস্টাব্দে এই মহাদেশের নাম হয় ‘আমেরিকা’।

(৩) বালবোয়া

  • (i) স্পেনের নাবিক ভাস্কো-নুনেজ-ডে বালবোয়া (১৪৭৫-১৫১৯ খ্রি.) ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে স্পেন থেকে দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়ার উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু করেন। তিনি বর্তমান কলম্বিয়া থেকে ৪০ মাইল দক্ষিণে সোনায় ভরা একটি সাগরের সংবাদ শোনেন। এতে আগ্রহী হয়ে তিনি ১৯০ জন স্পেনীয় নাগরিক-সহ অন্যান্য লোকজন ও কয়েকটি কুকুর নিয়ে সেদিকে অভিযান চালান।
  • (ii) এরপর তিনি আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে পানামার পশ্চিমদিকে সেই নতুন সমুদ্রের সন্ধান পান। তিনি এই সাগরের নামকরণ করেন দক্ষিণ মহাসাগর। তিনি ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে হিসপানিওয়ালায় পদার্পণ করেন।

(৪) ম্যাগেলান

নাবিক ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান (১৪৮০- ১৫২১ খ্রি.) স্পেনের রাজার আর্থিক সহায়তায় পাঁচটি জাহাজ নিয়ে ১৫১৯ খ্রি. (১০ আগস্ট) সেভিল থেকে যাত্রা শুরু করেন।

(i) প্রশান্ত মহাসাগর নামকরণ

তিনি মালাক্কা অভিযান করে বালবোয়া কর্তৃক আবিষ্কৃত দক্ষিণ মহাসাগরে পৌঁছোন। এই মহাসাগরে শান্ত ঢেউ দেখে তিনি এর নতুন নামকরণ করেন প্রশান্ত মহাসাগর (Pacific Ocean)।

(ii) ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার

১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে আটলান্টিক মহাসাগর, দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্ত ও প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রম করে তিনি এক দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার করেন। যুবরাজ ফিলিপের নামানুসারে এই দ্বীপের নাম হয় ‘ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ’।

(iii) মৃত্যু

অবশেষে তিনি ফিলিপাইনে ম্যাকটানের যুদ্ধে (Battle of Mactan) স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে নিহত (১৫২১ খ্রি.) হন। তাঁর অভিযানের অবশিষ্ট যাত্রাপথ সম্পূর্ণ করেন জুয়ান সেবাস্টিয়ান এলকানো (Juan Sebastian Elcano)। ম্যাগেলানের পাঁচটি জাহাজের মধ্যে একমাত্র ভিক্টোরিয়া ১৫২২ খ্রিস্টাব্দের ৬ সেপ্টেম্বর স্পেনে ফিরে আসে। পরে এভাবে ম্যাগেলানের অভিযানের দ্বারা সর্বপ্রথম জলপথে পৃথিবী প্রদক্ষিণ সম্পন্ন হয় বলে তাঁকেই জলপথে প্রথম পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী বলে ধরা হয়।

(৫) কোর্টেসের অভিযান

স্পেনের নাবিক হার্মান্দো কোর্টেস মেক্সিকো দখল (১৫১৯-২১ খ্রি.) করেন এবং দু- বছর ধরে অগণিত নিরীহ আদিবাসীদের হত্যা করে সেখানকার সুপ্রাচীন অ্যাজটেক সভ্যতা ধ্বংস করেন। মধ্য আমেরিকার পানামা ১৫২৪ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের দখলে আসে।

(৬) পিজারোর অভিযান

নাবিক পিজারো ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে পেরু অভিযান করেন। পেরুর সুপ্রাচীন ইনকা সভ্যতার অধিবাসীগণ পিজারোদের দেখে স্বর্গের দেবতা মনে করেন এবং তাদের বহুমূল্য উপহার দিয়ে ক্ষমা ও করুণা ভিক্ষা করেন। কিন্তু নির্দয় পিজারোর নির্দেশে অসংখ্য ইনকাবাসীকে নির্বিচারে হত্যা করে পেরু দখল করা হয়। স্পেন ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে ফিলিপাইন্সের বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জ দখল করে।

(৭) অন্যান্যদের অভিযান

স্পেন ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে উত্তর আমেরিকার টেক্সাস, ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এ ছাড়াও স্পেন পশ্চিমদিকের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় ও সেসব স্থানে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এইসব স্থানের মধ্যে অন্যতম হল ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, চিলি, কলম্বিয়া, প্যারাগুয়ে প্রভৃতি।

উপসংহার :- পশ্চিমদিকে পোর্তুগালের অধীনস্থ ব্রাজিল এবং ইংরেজ, ফরাসি ও ডাচদের অধীনস্থ গিয়ানা ছাড়া মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় সমগ্র অংশে স্পেন নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

(FAQ) স্পেনের সামুদ্রিক অভিযান সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা মহাদেশে পৌঁছান কবে?

১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে।

২. কার নাম অনুসারে আমেরিকা মহাদেশের নামকরণ হয়?

ইতালির নাবিক ও স্পেনের অভিযাত্রী আমেরিগো ভেসপুচি।

৩. কলম্বাসের আবিষ্কৃত নতুন মহাদেশকে নতুন বিশ্ব বলে অভিহিত করেন কে?

আমেরিগো ভেসপুচি।

৪. প্রশান্ত মহাসাগর নামকরণ কে করেন?

ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান।

৫. জলপথে প্রথম পৃথিবী প্রদক্ষিণকারি কাকে বলা হয়?

ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান।

৬. আজটেক সভ্যতা ধ্বংস করেন কে?

হার্মান্দো কোর্টেস।

৭. ইনকা সভ্যতা ধ্বংস করেন কে?

পিজারো।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment