সোলাঙ্কি বংশ

সোলাঙ্কি বা চৌলুক্য রাজ বংশ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠাতা, রাজা প্রথম মূলরাজ, রাজা প্রথম ভীম, রাজা প্রথম ভীমের সময় মামুদের সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন, রাজা প্রথম কর্ণ, রাজা জয়সিংহ সিন্ধুরাজ, রাজা কুমারপাল, রাজা অজয়পাল, রাজা দ্বিতীয় ভীম ও রাজা বিশালদেব সম্পর্কে জানবো।

সোলাঙ্কি বা চৌলুক্য রাজ বংশ

ঐতিহাসিক বংশসোলাঙ্কি বংশ
শাসনকেন্দ্রগুজরাট ও কাথিয়াবাড়
প্রতিষ্ঠাতামূলরাজ
সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠনসুলতান মামুদ
শেষ স্বাধীন শাসকদ্বিতীয় কর্ণ
সোলাঙ্কি বা চৌলুক্য রাজ বংশ

ভূমিকা :- প্রায় সার্ধতিন শতাব্দী কাল (আনুমানিক ৯৫০-১৩০০ খ্রিস্টাব্দ) চৌলুক্য বা সোলাঙ্কি বংশ গুজরাট ও কাথিয়াবাড় শাসন করে।

সোলাঙ্কি বংশের সাথে চালুক্য বংশের সম্পর্ক

কোনো কোনো লেখক বলেন, চৌলুক্য বা সোলাঙ্কি বংশের সাথে চালুক্যদের সম্পর্ক ছিল। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে এই মত বিশ্বাসযোগ্য নয়।

সোলাঙ্কি বংশের প্রতিষ্ঠাতা

চারণগণের গীতিতে চৌলুক্যরা প্রসিদ্ধ ‘অগ্নীকুল’-গণের অন্যতম বলে বর্ণিত হয়েছেন। কিন্তু এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা মূলরাজ বোধ হয় চাপোৎকট রাজবংশের কোনো রাজকুমারীর সন্তান। চাপোৎকট বংশ অষ্টম, নবম ও দশম শতাব্দীতে গুজরাট শাসন করতেন।

রাজনৈতিক উন্নতির সুযোগ

দশম শতাব্দীর মধ্যভাগে গুর্জর-প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূট বংশের ক্ষমতাহ্রাসের ফলে যে রাজনৈতিক উন্নতির সুযোগ দেখা দেয়, বহু উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজা তার সদ্ব্যবহার করেন।

সোলাঙ্কি বংশের রাজা প্রথম মূলরাজ

প্রথম মূলরাজ (আনুমানিক ৯৭১-৯৯৭ খ্রি) সরস্বতী নদীর উপত্যকায় একটি ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি চাপোৎকট বংশের শেষ রাজার কাছ থেকে অনহিলওয়াড়া (বা অনহিল পাটক) শহরটি অধিকার করেন।

সোলাঙ্কি বংশের রাজা প্রথম ভীম

এই বংশের পরবর্তী শক্তিশালী নৃপতি প্রথম ভীম (আনুমানিক ১০২২-১০৬৪ খ্রি) তার পূর্বপুরুষদের অনুসৃত নীতি অনুযায়ী সিন্ধুর মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করেন। কলচুরি বংশ ও কল্যাণের চালুক্য বংশের রাজাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তিনি প্রসিদ্ধ পারমার নৃপতি ভোজকে পরাজিত করেন। কথিত আছে, তিনি কলচুরিরাজ লক্ষ্মীকর্ণকেও পরাজিত করেছিলেন।

সোলাঙ্কি বংশের রাজা প্রথম ভীমের সময় মামুদের সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন

  • (১) সুলতান মামুদ প্রথম ভীমের রাজত্বকালে সোমনাথ আক্রমণ করেন। কিন্তু অদ্যাবধি প্রাপ্ত কোনো শিলালিপিতে অথবা জৈন ঐতিহাসিকদের রচনায় এর কোনো উল্লেখ নেই। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটির ইতিহাসের জন্য আমরা একান্তভাবে মুসলমানদের রচনার উপর নির্ভরশীল।
  • (২) মামুদ অনহিলওয়াড়ার কাছে উপস্থিত হলে যুদ্ধের জন্য অপ্রস্তুত থাকায় ভীম সম্ভবতঃ নগর ত্যাগ করেন। মামুদ সোমনাথ মন্দির দ্বারে উপস্থিত হলে স্থানীয় সেনাপতিও সম্ভবতঃ সমুদ্রবক্ষে এক জাহাজে উঠে আত্মরক্ষা করেন। মন্দিরের পুজারীরা অবশ্য পরাজয় অবশ্যম্ভাবী জেনেও অসীম সাহসে আক্রমণকারীদের বাধা দেন।
  • (৩) সমসাময়িক একজন মুসলমান লেখক বলেন, “মন্দিরের চারপাশে পঞ্চাশ হাজার কাফেরকে হত্যা করা হয়। যারা মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায় তারা জাহাজে পলায়ন করে।” বিজয়ী মামুদ মন্দির লুণ্ঠন করেন। তিনি যে ধনরত্ন লুণ্ঠন করেছিলেন একজন আধুনিক লেখকের মতে তার মূল্য ১০,৫০০,০০০ পাউণ্ড।
  • (৪) কথিত আছে যে মন্দিরের পুরোহিতরা বিগ্রহটি নষ্ট না করা হলে মামুদকে বহু স্বর্ণ দেবার প্রস্তাব দেন, কিন্তু মামুদ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে হস্তস্থিত এক দণ্ডের আঘাতে ‘সোমনাথের ফাঁপা উদর’ বিচূর্ণ করে ফেলেন এবং বিগ্রহের অভ্যন্তর থেকে বহু মূল্যবান রত্ন লাভ করেন।
  • (৫) মামুদের মৃত্যুর প্রায় ছয় শতাব্দী পরে এই কাহিনী প্রচলিত হয়। তাই কাহিনীর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে। সোমনাথ থেকে ফিরবার পথে মামুদ অনহিলওয়াড়ায় যান নি। তিনি মনসুরা হয়ে একটি জনবিরল পথে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
  • (৬) পথে সম্ভবতঃ প্রথম ভীম কর্তৃক প্রেরিত একটি সৈন্যদল তাকে উত্ত্যক্ত করেছিল। মামুদ কোনো শহর বা গুজরাটের কোনো অংশ অধিকার করার চেষ্টা করেন নি। তিনি কেবলমাত্র লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে সাফল্যের সাথে একটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন।

সোলাঙ্কি বংশের রাজা প্রথম কর্ণ

প্রথম ভীমের উত্তরাধিকারী প্রথম কর্ণের (আনুমানিক ১০৬৪-১০৯৪ খ্রি) শাসনকাল শান্তিপূর্ণ ছিল।

সোলাঙ্কি বংশের রাজা জয়সিংহ সিন্ধুরাজ

  • (১) তাঁর পুত্র জয়সিংহ সিন্ধুরাজ (আনুমানিক ১০৯৪-১১৪৩ খ্রি) তদানীন্তন কালের একজন শ্রেষ্ঠ নৃপতি ছিলেন। শিলালিপি থেকে জানা যায় যে গুজরাট, কাথিয়াবাড় ও কছ ছাড়াও মধ্য প্রদেশ ও রাজস্থানের বিস্তীর্ণ এলাকা তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
  • (২) তিনি পারমার বংশীয় যশোবর্মনকে পরাজিত করে উজ্জয়িনী সহ পারমার রাজ্যের কিয়দংশ অধিকার করেন। তিনি চান্দেল্ল বংশ, সিন্ধু প্রদেশের মুসলমান ও অন্য কয়েকজন ক্ষুদ্র রাজার সাথেও যুদ্ধ করেন।
  • (৩) ভোজ পারমারের ন্যায় তিনিও বহু সৌধ নির্মাণ করিয়েছিলেন। পাটনে অবস্থিত বিশাল কৃত্রিম হ্রদ (সহস্রলিঙ্গ) তাঁরই অন্যতম কীর্তি বলে পরিচিত। তিনি নানাবিধ শাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং বহু বিশিষ্ট পণ্ডিতকে নানাভাবে অনুগৃহীত করেন।

সোলাঙ্কি বংশের রাজা কুমারপাল

কুমারপাল (আনুমানিক ১১৪৪-১১৭৩ খ্রি) দক্ষ শাসক ছিলেন। তিনি শাকম্ভরীর চাহমান বংশীয় শাসক অর্নোরাজকে পরাজিত করেন। মালব ও আবুর পারমার বংশে রাজগণ, কোঙ্কনের রাজা ও সৌরাষ্ট্রের শাসকের সাথে তাঁর যুদ্ধের উল্লেখ পাওয়া যায়। কুমারপাল জৈন ছিলেন। তিনি নিজ রাজ্যে পশু হত্যা নিষিদ্ধ করেন। বারাণসীতেও পশুক্লেশ নিবারণের জন্য তিনি দূত প্রেরণ করেছিলেন।

সোলাঙ্কি বংশের রাজা অজয়পাল

পরবর্তী শাসক অজয়পালের শাসনকালে (আনুমানিক ১১৭৩-১১৭৬ খ্রি) কুমারপালের জৈন নীতির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তিনি বহু জৈন মন্দির ধ্বংস করেন।

সোলাঙ্কি বংশের রাজা দ্বিতীয় ভীম

  • (১) দ্বিতীয় ভীমের রাজত্বকালে (আনুমানিক ১১৭৮-১২৪১ খ্রি) মহম্মদ ঘুরী গুজরাট আক্রমণ করেন (১১৭৮ খ্রি)। একজন মুসলমান লেখক বলেছেন, বয়সে তরুণ হলেও ভীমের অধীনে অগণিত বাহিনী ও বহু হস্তী ছিল।
  • (২) যুদ্ধ শুরু হলে ইসলামের সৈন্যবাহিনী পরাজিত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। মহম্মদ গজনীতে প্রত্যাবর্তন করলেন। পরবর্তী দুই দশকে তিনি আর গুজরাট আক্রমণের চেষ্টা করেন নি।
  • (৩) ১১৯৫ খ্রিস্টাব্দে কুতুবউদ্দিন অনলিওয়াড়া লুণ্ঠন করেন। দু বছর পরে তিনি আজমীর ও নাড়োলের পথে আবার অভিযান করে স্বল্পকালের জন্য অনহিলওয়াড়া অধিকার করেন। সম্ভবতঃ ভীমকে মালবের পরমারদের, শাকম্ভরীর চাহমানদের এবং দেবগিরির যাদব বংশের আক্রমণও প্রতিরোধ করতে হয়।
  • (৪) এই সকল যুদ্ধের ফলে সম্ভবতঃ রাজার কর্তৃত্ব শিথিল হয়ে পড়ে এবং অধীনস্থ সামন্ত ও মন্ত্রীরা স্বাধীন ক্ষমতা অর্জনে উৎসাহ পান। ভীমের শাসনকালের শেষের দিকে চৌলুক্য বংশের বাঘেলা শাখার প্রধান লবণপ্রসাদ সবরমতী ও নর্মদা নদীর মধ্যবর্তী ঢোলকার আশেপাশে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

সোলাঙ্কি বংশের রাজা বিশালদেব

বিশালদেবের রাজত্বকালে (আনুমানিক ১২৪৪-১২৬২ খ্রি) বাঘেলদের রাজ্যাপহরণের কাজ সম্পূর্ণ হয়। বিশালদেব অনভিলওয়াড়া অধিকার করে চালুক্যদের সিংহাসনে আরোহণ করেন।

উপসংহার :- গুজরাটের শেষ স্বাধীন শাসক দ্বিতীয় কৰ্ণ ১২৯৭ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার রাজত্বকালে গুজরাট আলাউদ্দিন খলজির সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।

(FAQ) সোলাঙ্কি বা চৌলুক্য রাজ বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সোলাঙ্কি বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

মূলরাজ।

২. সোলাঙ্কি বংশের কোন রাজার সময়ে মামুদ সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন করে?

প্রথম ভীম।

৩. সোলাঙ্কি বংশের কোন রাজার সময়ে মহম্মদ ঘোরি গুজরাট আক্রমণ করে?

দ্বিতীয় ভীম।

৪. গুজরাটের শেষ স্বাধীন শাসক কে ছিলেন?

দ্বিতীয় কর্ণ।

Leave a Comment