কল্যাণের চালুক্য বংশ

কল্যাণের চালুক্য বংশ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠাতা, রাজা সত্যাশ্রয়, রাজা দ্বিতীয় জয়সিংহ, রাজা প্রথম সোমেশ্বর, রাজা দ্বিতীয় সোমেশ্বর, রাজা দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য, রাজা তৃতীয় সোমেশ্বর ও রাজা চতুর্থ সোমেশ্বর সম্পর্কে জানবো।

কল্যাণের চালুক্য বংশ

ঐতিহাসিক বংশকল্যাণের চালুক্য বংশ
প্রতিষ্ঠাতাতৈলপ
রাজধানীকল্যাণ
শ্রেষ্ঠ রাজাদ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য ত্রিভুবনমল্ল
মিতাক্ষরাবিজ্ঞানেশ্বর
কল্যাণের চালুক্য বংশ

ভূমিকা :- সম্ভবতঃ বাতাপির চালুক্য বংশের একটি শাখা ছিল কল্যাণের পশ্চিমাঞ্চলীয় চালুক্য বংশ।

কল্যাণের চালুক্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা

এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা তৈলপ ৯৭৩-৭৪ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রকূট রাজ দ্বিতীয় কর্ককে পরাজিত করে চালুক্য শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তার দীর্ঘ (আনুমানিক ৯৭৩-৯৯৭ খ্রি) রাজত্বকালে তিনি মালবের পারমার রাজ্যের দক্ষিণাংশ সহ এক বিস্তৃত ভূখণ্ডের শাসক হন। তিনি পারমাররাজ মুঞ্জকে পরাজিত ও হত্যা করেন।

কল্যাণের চালুক্য বংশের রাজা সত্যাশ্রয়

মুঞ্জের কাছ থেকে অধিকৃত মালবের রাজ্যাংশ তৈলপের উত্তরাধিকারী সত্যাশ্রয়ের (৯৯৭-১০০৮ খ্রি) রাজত্বকালে পারমাররাজ সিন্ধুরাজ কর্তৃক অধিকৃত হয়। সত্যাশ্রয়ের রাজ্য রাজরাজ চোল আক্রমণ করেন।

কল্যাণের চালুক্য বংশের রাজা দ্বিতীয় জয়সিংহ

দ্বিতীয় জয়সিংহ জগদেকমল্লের রাজত্বকালে (১০১৫-১০৪৩ খ্রি) কলচুরি গাঙ্গেয়, পারমার ভোজ ও রাজেন্দ্র চোল সংঘবদ্ধ হন এবং একই সময়ে চালুক্য রাজ্য আক্রমণ করেন। জয়সিংহ সম্ভবতঃ তাঁদের সকলকেই প্রতিহত করেন।

কল্যাণের চালুক্য বংশের রাজা প্রথম সোমেশ্বর আহবমল্ল

  • (১) জয়সিংহের পুত্র ও উত্তরাধিকারী প্রথম সোমেশ্বর আহবমল্ল (১০৪৩-১০৬৮ খ্রি) চোলদের সাথে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। রাজরাজ চোল চালুক্য রাজধানী কল্যাণ পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে নগরীটি লুণ্ঠন করেন। আরো দুই বার চালুক্য রাজ্য আক্রান্ত হয়। শেষ যুদ্ধ হয় কোপ্পমে (১০৫৩-৫৪ খ্রি)।
  • (২) চোলরাজ রাজাধিরাজ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন। কিন্তু তাঁর ভ্রাতা দ্বিতীয় রাজেন্দ্র সৈনগণকে পুনরায় সংযত করে যুদ্ধ করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রেই রাজ্যভিষিক্ত হন। ইতিমধ্যে সোমেশ্বর চোল রাজশক্তির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র কাঞ্চী অধিকার করেন।
  • (৩) চোল ও চালুক্যদের এই বিরোধ দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়েছিল। সোমেশ্বর কয়েকবার পরাজিত হন, কিন্তু তাঁহার রাজ্যের কোনো অংশ তাঁর হস্তচ্যুত হয় নাই। তাঁহার রাজত্বকালের শেষের দিকে বীর রাজেন্দ্র চোল কুদালের যুদ্ধে তাহাকে পরাজিত করেন।
  • (৪) চোলবংশ ছাড়াও অন্য অনেক রাজবংশের সাথে সোমেশ্বরের সংঘর্ষ ঘটেছিল। তিনি গুজরাট ও মালব বিধ্বস্ত করেন। তিনি সোলাঙ্কি বংশের ভীম ও কলচুরি বংশের কর্ণকে পরাজিত করেন এবং পারমার বংশের একজন রাজাকে ধারার সিংহাসনে স্থাপন করেন।
  • (৫) কথিত আছে, তিনি বঙ্গ, মগধ, নেপাল, কনৌজ, পাঞ্চাল, কুরু ও আভীর রাজ্য জয় করেন। তিনি গৌড়, কামরূপ, পাণ্ড্য রাজ্য ও সিংহলে অভিযান প্রেরণ করেছিলেন বলেও শোনা যায়। এই সকল অতিশয়োক্তির সম্ভবতঃ কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

কল্যাণের চালুক্য বংশের রাজা দ্বিতীয় সোমেশ্বর

প্রথম সোমেশ্বরের জ্যেষ্ঠ পুত্র ও উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় সোমেশ্বর (১০৬৮-১০৭৬ খ্রি) অত্যাচারী রাজা ছিলেন। অল্পদিন রাজত্ব করেন।

কল্যাণের চালুক্য বংশের রাজা দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য

  • (১) এর পর তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য বা ত্রিভুবনমল্ল (১০৭৬-১১২৬ খ্রি) তাকে অপসারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। বাতাপির প্রাচীন চালুক্য বংশের রাজাদের কথা বিবেচনা করলে তাকে ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য বলতে হবে।
  • (২) বিক্রমাদিত্য (বিক্রমাঙ্ক) কবি বিলহন রচিত ‘বিক্রমাঙ্কদেবচরিতে’র নায়ক। এটি সংস্কৃত ভাষার অল্প কয়েকটি ঐতিহাসিক গ্রন্থের অন্যতম। পশ্চিমাঞ্চলীয় চালুক্যরাজাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে তিনি শ্রেষ্ঠতম ছিলেন। প্রথম সোমেশ্বরের রাজত্বকালের সামরিক সাফল্য তাঁর নেতৃত্ব ও উদ্যমের জন্যই সম্ভব হয়েছিল।
  • (৩) তাঁর সিংহাসন আরোহণের বছর ১০৭৬ খ্রিস্টাব্দ তার প্রবর্তিত ‘চালুক্য বিক্রম অব্দে’র প্রথম বছর। তিনি অনহিলওয়াড়ার সোলাঙ্কি বংশ, চোল বংশ ও হোয়সলরাজ বিষ্ণুবর্ধনের সঙ্গে সাফল্যের সাথে যুদ্ধ করেন। হোয়াসলগণ, গোয়ার কদম্বগণ, কাকতীয়গণ এবং আরও অনেক নৃপতি তাঁর অধীন ছিলেন।
  • (৪) তিনি সিংহলের রাজসভায় দূত প্রেরণ করেছিলেন। শান্তির ক্ষেত্রে বিজয়ের জন্যও তার অর্ধশতাব্দীকাল স্থায়ী রাজত্বকাল কম উল্লেখযোগ্য নয়। তিনি বিদ্যানুরাগী ছিলেন। বিলহন নামে একজন কাশ্মীরী কবি এবং ‘মিতাক্ষরা’ নামক হিন্দু আইন সম্বন্ধে প্রামাণ্য গ্রন্থের রচয়িতা বিজ্ঞানেশ্বর তাঁর রাজসভা অলঙ্কৃত করেন।

কল্যাণের চালুক্য বংশের রাজা তৃতীয় সোমেশ্বর

দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্যের পুত্র ও উত্তরাধিকারী তৃতীয় সোমেশ্বর (১১২৬-১১৩৮ খ্রি) পিতার ন্যায় বিদ্যানুরাগী ছিলেন। তিনি নিজেও ছিলেন একজন গ্রন্থকার। তিনি হোয়সল সাম্রাজ্যের এক অভিযান প্রতিহত করেন। কথিত আছে, অন্ধ্র, দ্রাবিড়, মগধ ও নেপালের রাজারা তার আধিপত্য স্বীকার করেছিলেন। সম্ভবতঃ এটি চিরাচরিত প্রধানুযায়ী প্রশস্তি মাত্র।

কল্যাণের চালুক্য বংশের রাজা দ্বিতীয় জগদেকমল্ল

তাঁর পুত্র দ্বিতীয় জগদেকমল্ল (আনুমানিক ১১৩৮-১১৫১ খ্রি) মালবের একাংশ অধিকার করেন। তিনি অনহিলওয়াড়ার অধিপতি কুমারপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং হোয়সলদের আক্রমণ প্রতিহত করেন।

বিজ্জল বা বিচ্ছন কর্তৃক কল্যাণের সিংহাসন অপহরণ

  • (১) দ্বিতীয় জগদেকমল্লের মৃত্যুর পরে পশ্চিমাঞ্চলীয় চালুক্যদের শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১১৫৬ খ্রিস্টাব্দে কলচুরিদের যুদ্ধসচিব বিজ্জল বা বিচ্ছন কল্যাণের সিংহাসন অপহরণ করেন। দক্ষিণ ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসে তার শাসনকালের স্থান গুরুত্বপূর্ণ।
  • (২) তার মন্ত্রী বাসব ‘বীর শৈব’ বা ‘লিঙ্গায়েত’ নামক ধর্মসম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। এখনও কর্নাটকে ও কানাড়ীভাষী অঞ্চলে এই সম্প্রদায়ের বহু অনুগামী আছেন। এই সম্প্রদায় ‘ভক্তি’র উপর বিশেষ জোর দিত এবং শিব (‘লিঙ্গ’ আকারে) ও তাঁর বাহন নন্দীর পূজা করত।
  • (৩) লিঙ্গায়েত সম্প্রদায় বেদের মাহাত্ম্য স্বীকার করত না এবং বাহ্মণ্য ধর্মবিরোধী বহু রীতিনীতি পালন করত (যেমন- বিধবা বিবাহ, উপবীত পরিত্যাগ ইত্যাদি)।

কল্যাণের চালুক্য বংশের রাজা চতুর্থ সোমেশ্বর

দ্বাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে কল্যাণের চালুক্য বংশের চতুর্থ সোমেশ্বর তার পিতৃপুরুষদের রাজ্যের একটি বৃহদংশ উদ্ধার করেন।

উপসংহার :- দেবগিরির যাদব বংশের অভ্যুত্থান এবং হোয়সল রাজাদের সাথে সংঘর্ষের ফলে পশ্চিমাঞ্চলীয় চালুক্য বংশের পতন হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে চালুক্য শাসনের অবসান হয়।

(FAQ) কল্যাণের চালুক্য বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কল্যাণের চালুক্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

তৈলপ।

২. কল্যাণের চালুক্য বংশের রাজধানী কোথায় ছিল?

কল্যাণ নগরী।

৩. কল্যাণের চালুক্য বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য ত্রিভুবনমল্ল

৪. বিক্রমাঙ্কদেবচরিত কার লেখা?

বিলহন।

Leave a Comment