চোল বংশ

চোল বংশ সম্পর্কে ঐতিহাসিক উপাদান, আদি নিবাস, কারিকল, বিজয়ালয়, প্রথম আদিত্য, প্রথম পরান্তক, প্রথম রাজরাজ চোল, প্রথম রাজেন্দ্র চোল, রাজাধিরাজ চোল, দ্বিতীয় রাজেন্দ্র চোল, বীর রাজেন্দ্র ও প্রথম কুলোতুঙ্গ সম্পর্কে জানবো।

চোল বংশ

বিষয় চোল বংশ
রাজধানী তাঞ্জোর
প্রথম রাজা বিজয়ালয়
শ্রেষ্ঠ রাজা প্রথম রাজেন্দ্র চোল
শেষ শ্রেষ্ঠ রাজা প্রথম কুলোত্তুঙ্গ
চোল বংশ

ভূমিকা :- চোলরা ছিল অতি প্রাচীন জাতি। মহাভারতে চোলদের উল্লেখ দেখা যায়।

ঐতিহাসিক উপাদান

খ্রিস্ট পূর্ব তৃতীয় শতকে অশোকের শিলালিপিতে চোল জাতির উল্লেখ আছে। গ্রীক ও রোমান ঐতিহাসিকরাও চোলদের নাম উল্লেখ করেছেন। পেরিপ্লাসে চোল বন্দরের নাম পাওয়া যায়। টলেমি চোল বন্দর কাবেরীপত্তনম ও নেগাপত্তনমের নামও উল্লেখ করেছেন। মিলিন্দ পনহোতেও চোল বন্দর কাবেরীপত্তনমের নাম পাওয়া যায়।

আদি নিবাস

চোলরা ছিল দক্ষিণের আদি অধিবাসী তামিলভাষী গোষ্ঠী। তাঞ্জোর, ত্রিচিনোপল্লী ও পদুকোট্টাই অঞ্চলে তারা গোড়ায় বসবাস করত।

কারিকল

চোলরা আদিতে খুব শক্তিশালী হলেও চালুক্য, পল্লব ও রাষ্ট্রকূটদের আগ্রাসনের ফলে তারা দীর্ঘকাল হীনবল হয়ে পড়ে। যদিও আদিতে সঙ্গম যুগে চোলরাজ কারিকলের ক্ষমতার কথা জানা যায়।

রাজ্য ও সভ্যতা প্রতিষ্ঠা

অষ্টম শতক পর্যন্ত চোল শক্তি স্তিমিত হয়েছিল। নবম খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি চোল শক্তির পুনরায় অভ্যুত্থান ঘটে এবং প্রায় শতাব্দী ধরে চোলরা তুঙ্গভদ্রার দক্ষিণ তীরে তাদের রাজ্য ও সভ্যতার প্রতিষ্ঠা করে।

বিজয়ালয়

চোল অভ্যুত্থানের প্রথম নায়ক ছিলেন বিজয়ালয় (৮৫০-৮৭১ খ্রি)। পল্লব-পান্ড্য দ্বন্দ্বের সুযোগে তিনি পল্লব সামন্ত হিসাবে ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন এবং তাঞ্জোর জয় করে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন। কাবেরী ও কোলেরণ উপত্যকায় তার আধিপত্য বিস্তৃত হয়।

প্রথম আদিত্য

  • (১) এর পর প্রথম আদিত্য (৮৭১-৯০৭ খ্রি) শ্রীপুরামবিয়ামের যুদ্ধে তাঁর প্রভু পল্লব রাজাকে পান্ড্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিশেষ সাহায্য করে শক্তিমান হন। আদিত্য চোল ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী।
  • (২) তিনি তার প্রভু অপরাজিত পল্লবকে পরাজিত ও নিহত করে পল্লব রাজ্য অধিকার করে চোল শক্তির সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কঙ্গু বা সালেন এবং পশ্চিম গঙ্গ রাজ্য অধিকার করেন।
  • (৩) প্রথম আদিত্য পল্লব রাজ্য অধিকার করায় এবং তার সঙ্গে গঙ্গ রাজ্য ও সালেম জেলা যুক্ত করায়, তিনি কাবেরী তীরের একটি ক্ষুদ্র রাজ্যকে এক সাম্রাজ্যে পরিণত করেন।

প্রথম পরান্তক

  • (১) এর পর রাজত্ব করেন প্রথম পরান্তক (৯০৭-৯৫৫ খ্রি)। তিনি পান্ড্য রাজা রাজসিংহ ও তার মিত্র সিংহল রাজকে পরাস্ত করে মাদুরাই ও পান্ড্য রাজ্যের একাংশ অধিকার করেন। বাণ ও বৈদুম্বদেরও তিনি পরাস্ত করেন। তিনি মাদুরাইকোণ্ড উপাধি নেন।
  • (২) তিনি রাষ্ট্রকুট দ্বিতীয় কৃষ্ণকে বল্লালের যুদ্ধে পরাস্ত করে পেন্নার নদী পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। চোল শক্তির উত্থানে ভীত হয়ে রাষ্ট্রকুট তৃতীয় কৃষ্ণ মহীশূরের গঙ্গ রাজার সঙ্গে জোট বেঁধে ৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে তাক্কোলামের যুদ্ধে প্রথম পরান্তককে পরাস্ত করলে তোণ্ডামন্ডলমে চোল শক্তি হীনবল হয়ে পড়ে।
  • (৩) এর পরে প্রথম পরাস্ক মারা যান। চোল শক্তি প্রায় তিন দশক দুর্বল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রকূট তৃতীয় কৃষ্ণ কাঞ্চী-তাঞ্জোর কোণ্ড” উপাধি নেন। এরপর চোল শক্তির ভাঙন দেখা যায়।

সুন্দর চোল

প্রথম পরান্তকের পরে চোল রাজ্যে যে ভাঙন দেখা দেয় সুন্দর চোল তার অবসান ঘটান। তিনি বীর পান্ড্যকে পরাজিত করেন এবং তোণ্ডামন্ডলম থেকে রাষ্ট্রকূট শক্তিকে হঠিয়ে দেন।

উত্তম চোল

তাঁর পর উত্তম চোল ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে কিছুকাল সিংহাসনে বসেন। উত্তম চোলের পর সুন্দর চোলের পুত্র রাজরাজ সিংহাসনে বসলে চোল ইতিহাসে স্বর্ণ যুগের সূচনা হয়।

প্রথম রাজরাজ চোল

রাজরাজ (৯৮৫-১০১৪ খ্রি) তাঁর পিতা সুন্দর চোলের পর চোল সিংহাসনে বসেন। চোল বংশের মহিমাকে তিনি একটি উচ্চ সীমায় স্থাপন করেন। শ্রেষ্ঠ চোল রাজাদের অন্যতম ছিলেন মহান রাজরাজ। তিনি একটি আঞ্চলিক রাজ্যকে এক বৃহৎ সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। তাঞ্জোর লিপিতে তাঁর মহিমা কীর্তিত হয়েছে।

প্রথম রাজেন্দ্র চোল

রাজরাজের পর প্রথম রাজেন্দ্র (১০১২-১০৪৪ খ্রি) চোল সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন পিতার সুযোগ্য সন্তান। পিতার আরদ্ধ কাজকে তিনি সমাপ্ত করেন। তার আমলে চোল পতাকা সর্বাধিক উচ্চে স্থাপিত হয়। তিরুমালাই পর্বত লিপি থেকে রাজেন্দ্রের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে সকল কথা জানা যায়। রাজেন্দ্র “চোল মার্ত্তন্ড” উপাধি নেন।

রাজাধিরাজ চোল

  • (১) রাজেন্দ্রের মৃত্যুর পর রাজাধিরাজ (১০৪৪-১০৫২ খ্রি) চোল সিংহাসনে বসেন। তাঁর আমল থেকে তুঙ্গভদ্রার উত্তরে পশ্চিম চালুক্য শক্তির সঙ্গে চোল শক্তির তীব্র সংঘাত চলতে থাকে। তিনি পান্ড্য ও সিংহলের বিদ্রোহ দমন করেন। তিনি একাদিক্রমে ধান্যকটকের যুদ্ধে ও পরে কোপপামের যুদ্ধে চালুক্যরাজ সোমেশ্বরকে পরাস্ত করেন।
  • (২) অনেকে বলেন যে, চালুক্য সোমেশ্বরের লিপিগুলিতে এই জয়ের সমর্থন সূচক কোনো বিবরণ নেই। সুতরাং রাজাধিরাজের লিপিতে তার জয় সম্পর্কে অযথা বাগাড়ম্বর করা হয়েছে। যাই হোক, ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে কোপপামের যুদ্ধটি সত্য ঘটনা। এই যুদ্ধে রাজাধিরাজ আহত হন এবং মৃত্যু বরণ করেন।

দ্বিতীয় রাজেন্দ্র চোল

  • (১) রাজাধিরাজের পরে সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র দ্বিতীয় রাজেন্দ্র (১০৫২ – ১০৬২ খ্রীঃ)। তিনি পিতার অসমাপ্ত যুদ্ধ চালিয়ে জয়ক্ষ্মীকে বরণ করেন। তিনি চোল সাম্রাজ্যের সীমা অক্ষুণ্ণ রাখেন।
  • (২) তার আমলে চালুক্য সোমেশ্বরের বাহিনী একদিকে বেঙ্গী, অপরদিকে গঙ্গাবদি আক্রমণ করে চোল শক্তিকে হতবল করার চেষ্টা করে। তিনি এই দুই আক্রমণ প্রতিহত করেন এবং কুডলির যুদ্ধে চালুক্য বাহিনীকে পরাস্ত করেন।
  • (৩) তিনি তার আজন্ম যোদ্ধা পিতার মত আক্রমণাত্মক ভূমিকা না নিলেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিলেন। তিনি পূর্ব চালুক্য যুবরাজের সঙ্গে নিজ কন্যার বিবাহ দেন। এই বিবাহের ফলে ভবিষ্যতে চোল-পূর্ব চালুক্য সিংহাসন সংযুক্ত হয়।

বীররাজেন্দ্র

  • (১) দ্বিতীয় রাজেন্দ্রের পর বীররাজেন্দ্র ১০৬৩ খ্রিস্টাব্দে চোল সিংহাসনে বসেন। তিনি সিংহলের বিদ্রোহ দমন করেন এবং শৈলেন্দ্র রাজ্যে আধিপত্য রক্ষা করেন। তিনি পশ্চিম চালুক্য শক্তিকে দমনে তাঁর প্রধান শক্তি খরচ করেন।
  • (২) বীররাজেন্দ্রের আমলেও যথারীতি চোল চালুক্য যুদ্ধ চলতে থাকে। চালুক্য প্রথম সোমেশ্বর প্রথমে আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিয়ে বেঙ্গী আক্রমণ করলে ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দে তুঙ্গভদ্রার যুদ্ধে বীররাজেন্দ্র তাঁকে পরাস্ত করেন। এরপর সোমেশ্বর তাঁর বাহিনী পুনর্গঠনের চেষ্টা করলে বীররাজেন্দ্র বেজওয়াদার যুদ্ধে তাঁকে পরাস্ত করেন।
  • (৩) এরপর বীররাজেন্দ্র বেঙ্গীর পথে কলিঙ্গ অভিযান করেন এবং বেঙ্গীর পূর্ব চালুক্য রাজা দ্বিতীয় রাজেন্দ্র তাঁর সহায়তা করেন। প্রথম সোমেশ্বরের মৃত্যুর পর তার পুত্র দ্বিতীয় সোমেশ্বর চালুক্য সিংহাসনে বসেন। তার ভাই বিক্রমাদিত্য রাজ্য লোভে বীররাজেন্দ্রের পক্ষে যোগ দেয়।

অধিরাজেন্দ্র

এরপর সিংহাসনে বসেন অধিরাজেন্দ্র (১০৭০-৭৫ খ্রি)। তিনি ছিলেন অযোগ্য ও অত্যাচারী রাজা। এক আততায়ীর হাতে তিনি নিহত হন।

প্রথম কুলোত্তুঙ্গ

অধিরাজেন্দ্রের সম্ভবত কোনো সন্তান ছিল না। তাই বেঙ্গীর পূর্ব চালুক্য রাজ কুলোত্তুঙ্গ চোল সিংহাসনে বসেন। চোল সিংহাসনে কুলোত্তুঙ্গের অধিকার ছিল। তার পিতামহী ছিলেন চোল সম্রাট মহান রাজরাজের কন্যা, তাঁর মাতা ছিলেন সম্রাট প্রথম রাজেন্দ্রের কন্যা, তাঁর পত্নী ছিলেন দ্বিতীয় রাজেন্দ্রের কন্যা। এই অর্থে তার দেহে ছিল চোল রক্ত। কুলোত্তুঙ্গ পূর্ব চালুক্য রাজ্য বেঙ্গী ও চোল সাম্রাজ্যকে সংযুক্ত করেন।

দ্বিতীয় কুলোত্তুঙ্গ

  • (১) কুলোত্তুঙ্গের উত্তরাধিকারীগণ যারা চোল সিংহাসনে বসেন তারা অনেকেই কোনো যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেন নি। বিক্রম চোল, তার পর দ্বিতীয় কুলোত্তুঙ্গ (১১৩৩ খ্রি) চোল সিংহাসনে বসেন। তার রাজত্বকাল তার পিতামহের মতই শান্তি-সমৃদ্ধিতে পূর্ণ ছিল।
  • (২) চিদাম্বরমের শিব মন্দিরের নির্মাণের কাজ তিনি শেষ করেন। এই মন্দিরের বিষ্ণুমূর্তিকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে তার স্থলে শিবলিঙ্গ তিনি স্থাপন করেন। পরে সেই বেঙ্কটশ্বের মূর্তি রামানুজ তিরুপতিতে স্থাপন করেন বলে কিংবদন্তী পাওয়া যায়। দ্বিতীয় কুলোত্তুঙ্গ চিদাম্বরমের মন্দিরের কোনো কোনো অংশ সোনার পাতে মুড়ে দেন।

তৃতীয় কুলোত্তুঙ্গ

  • (১) এরপর দ্বিতীয় রাজরাজ সিংহাসনে বসেন। তারপর দ্বিতীয় রাজাধিরাজ ও তারপর তৃতীয় কুলোত্তুঙ্গ (১১৬৩-১২১৬ খ্রি) চোল রাজ্য শাসন করেন। তৃতীয় কুলোত্তুঙ্গ পান্ড্য রাজ্যে গৃহযুদ্ধ বন্ধ করে এই রাজ্যে চোল অধিকার স্থাপনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন।
  • (২) কিন্তু পান্ড্য রাজার উচ্চাকাঙ্ক্ষী, উদীয়মান সাম্রাজ্যবাদকে নিরস্ত করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাকে অন্তত তিন বার পান্ড্য রাজা বীর পান্ড্যের সম্মুখীন হতে হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি মাদুরা ধ্বংস করে জটাবর্মন কুলশেখরকে পান্ড্য সিংহাসনে বসান।
  • (৩) কিন্তু ১২১৬ খ্রিস্টাব্দে জটাবর্মনের ভাই সুন্দর পান্ড্য চোলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। হোয়শল শক্তির সাহায্যে কোনো রকমে পান্ড্য শক্তিকে সংযত রাখা হয়। ১২১৮ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় কুলোত্তুঙ্গের মৃত্যু হয়

উপসংহার :- এরপর তৃতীয় রাজরাজ, তৃতীয় রাজেন্দ্র রাজত্ব করেন। কিন্তু এই সময় জটাবৰ্মন সুন্দরপান্ড্য পান্ড্য সিংহাসনে বসে পান্ড্য শক্তিকে প্রসারণশীল করেন। তিনি তৃতীয় রাজেন্দ্র এবং তার মিত্র হোয়শল সোমেশ্বরকে পরাস্ত করে তাকে কর দানে বাধ্য করেন। এরপর চোল শক্তির দ্রুত পতন ঘটে।

(FAQ) চোল বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. চোলদের প্রথম রাজা কে ছিলেন?

বিজয়ালয়।

২. চোলদের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

প্রথম রাজেন্দ্র চোল।

৩. চোলদের শেষ শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

প্রথম কুলোত্তুঙ্গ।

৪. চোলদের শেষ রাজা কে ছিলেন?

তৃতীয় রাজেন্দ্র।

৫. চোলদেল রাজধানী কোথায় ছিল?

তাঞ্জোর।

Leave a Reply

Translate »