পল্লব বংশ

পল্লব বংশ প্রসঙ্গে আদি পল্লব, শিবস্কন্দ বর্মন, বিষ্ণুগোপ, সিংহবিষ্ণু, প্রথম মহেন্দ্রবর্মন, প্রথম নরসিংহ বর্মন, দ্বিতীয় মহেন্দ্র বর্মন, দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন, দ্বিতীয় নন্দী বর্মন ও পরবর্তী পল্লব রাজা সম্পর্কে জানবো।

পল্লব বংশ

বিষয় পল্লব বংশ
রাজধানী কাঞ্চী
প্রথম রাজা শিবস্কন্দ বর্মন
শ্রেষ্ঠ রাজা প্রথম নরসিংহ বর্মন
শেষ রাজা অপরাজিত বর্মন
পল্লব বংশ

ভূমিকা :- পল্লব বংশের উৎপত্তি সঠিকভাবে জানা যায়নি। অনেকের মতে, চোল বংশ ও নাগবংশের সম্মিলনে পল্লব বংশের উদ্ভব হয়। পল্লবরা আদিতে সাতবাহন রাজাদের সামন্ত ছিল। পরে তারা স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করে। ডঃ মহালিঙ্গমের মতে, তারা আদিতে সাতবাহনদের একটি শাখা ছিল।

আদি পল্লব

পল্লব বংশের লিপিগুলিকে প্রাকৃত ও সংস্কৃত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। প্রাকৃত লিপিতে দেখা যায় যে, পল্লব রাজারা ২৫০-৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। এর পর পরবর্তী পল্লব রাজারা ৩৫০-৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। এঁদের লিপি ছিল সংস্কৃত ভাষায়। ৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের পর মহান পল্লব রাজাদের রাজত্বকালের সূচনা হয়।

শিবস্কন্দ বর্মন

আদি পল্লব রাজাদের মধ্যে শিবস্কন্দ বর্মন ছিলেন বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর রাজ্য কৃষ্ণা নদী থেকে বেলারি জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাঁর রাজধানী ছিল কাঞ্চীপুর। শিবস্কন্দ বর্মন কয়েকটি বৈদিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন।

বিষ্ণুগোপ

এর পর বিষ্ণুগোপ নামে এক পল্লব রাজার কথা জানা যায়। সমুদ্রগুপ্ত -এর এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায় যে, তিনি কাঞ্চীর বিষ্ণুগোপকে পরাস্ত করেন। ৩৫০-৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ১৫ জন পল্লব রাজার নাম পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের কৃতিত্ব সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি।

সিংহবিষ্ণু

৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে পল্লব ইতিহাসের ধারাবাহিক ঘটনাবলী জানা যায়। ৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে পল্লব বংশের অগ্রগতির সূচনা হয়। এই অগ্রগতির নায়ক ছিলেন সিংহবিষ্ণু (৫৭৫-৬০০ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি কালভ্র আক্রমণ প্রতিহত করে তামিল অঞ্চলে শাস্তি স্থাপন করেন। তিনি চোলমণ্ডল জয় করেন। সিংহল রাজ তার বশ্যতা স্বীকার করেন। কৃষ্ণা থেকে কাবেরী পর্যন্ত ভূভাগে তাঁর আধিপত্য স্থাপিত হয়।

প্রথম মহেন্দ্রবর্মন

  • (১) সিংহবিষ্ণুর পর প্রথম মহেন্দ্র বর্মন (৬০০-৬৩০ খ্রি) সিংহাসনে বসেন। মহেন্দ্র বর্মনের রাজ্য উত্তরে কৃষ্ণা থেকে দক্ষিণে কাবেরী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তার সমসাময়িক ছিলেন উত্তর ভারত -এ হর্ষবর্ধন এবং দাক্ষিণাত্যে চালুক্য দ্বিতীয় পুলকেশী
  • (২) হর্ষবর্ধনের সঙ্গে মহেন্দ্রবর্মনের কোনো রাজনৈতিক মৈত্রী বা সংঘাত কিছুই হয়নি। মহেন্দ্রবর্মনের চির-বৈরী ছিলেন চালুক্য দ্বিতীয় পুলকেশী। তাঁর আমলেই চালুক্য-পল্লব প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরম্ভ হয়, যা প্রায় এক শতক দাক্ষিণাত্যের ইতিহাসকে প্রভাবিত করে।

প্রথম নরসিংহ বর্মন

  • (১) পিতা মহেন্দ্রবর্মনের মৃত্যুর পর নরসিংহ বর্মন (৬৩০-৬৬৮ খ্রি) পল্লব সিংহাসনে বসেন। তিনি “মহামল্ল” উপাধি নেন। তাঁর শাসনকালে পল্লব শক্তি ও সভ্যতা শীর্ষ সীমায় ওঠে। তাই তাকে পল্লব বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা বলা যায়।
  • (২) নরসিংহ বর্মন চালুক্য শক্তির সঙ্গে পৈত্রিক দ্বন্দ্ব চালিয়ে যান। সম্ভবত তিনি চালুক্য দ্বিতীয় পুলকেশীকে পরাস্ত ও নিহত করেন। তার রাজত্বকাল হিউয়েন সাঙ কাঞ্চিতে আসেন।

দ্বিতীয় মহেন্দ্রবর্মন

নরসিংহ বর্মনের পর দ্বিতীয় মহেন্দ্র বর্মন (৬৬৮-৬৭০ খ্রি) মাত্র দুবছর রাজত্ব করেন। ডঃ মহালিঙ্গমের মতে, এই সময় চালুক্য প্রথম বিক্রমাদিত্য পল্লবদের বহু ক্ষয়-ক্ষতি করেন।

প্রথম পরমেশ্বর বর্মন

এরপর প্রথম পরমেশ্বর বর্মন (৬৭০-৬৯৫ খ্রি) পল্লব সিংহাসনে বসেন। তিনি যখন সিংহাসনে বসেন তখন পল্লব রাজ্যের উত্তর ভাগ ছিল চালুক্যদের অধিকারে। তাকে অবিরাম তিন বৃহৎ শক্তি চালুক্য, গঙ্গ ও পাণ্ড্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি সফলতা লাভ করেন।

রাজসিংহ বা দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন

পরমেশ্বর বর্মনের পর দ্বিতীয় নরসিংহ বর্মন ৬৯৫-৭২২ খ্রিস্টাব্দে পল্লব সিংহাসনে বসেন। তিনি রাজসিংহ উপাধি নেন। তাঁর রাজত্বকালে বিশেষ কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ ঘটেনি। রাজসিংহ ছিলেন শৈব ধর্মের অনুরাগী। শৈব মন্দির নির্মাণের জন্য তিনি পল্লব স্থাপত্য, ভাস্কর্যের বিখ্যাত শৈলী সৃষ্টি করেন যাকে রাজসিংহ শৈলী বলা হয়।

দ্বিতীয় পরমেশ্বর বর্মন

পল্লব বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা দ্বিতীয় নরসিংহ বর্মনের পর দ্বিতীয় পরমেশ্বর বর্মন পল্লব সিংহাসনে বসেন। তার আমলে চালুক্য দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য কাঞ্চী অধিকার করলেও তিনি তা পুনরুদ্ধার করেন।

দ্বিতীয় নন্দীবর্মন

দ্বিতীয় পরমেশ্বর বর্মনের পর দ্বিতীয় নন্দী বর্মন পল্লব সিংহাসনে বসেন। তিনি পল্লব সিংহাসনে প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকারী ছিলেন না। তবে তিনি পল্লব রাজবংশের অন্যতর শাখায় জম্মান। দ্বিতীয় নন্দী বর্মন প্রধান নাগরিকদের দ্বারা ৭৩০ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হন।

পরবর্তী পল্লব রাজা

  • (১) দ্বিতীয় নন্দীবর্মনের পর পল্লব শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। দন্তিবর্মন ও তৃতীয় নন্দীবর্মন কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাননি। এর পর নৃপত্তুঙ্গ পল্লব সিংহাসনে বসে পল্লব বংশের শত্রুদের দমনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন।
  • (২) নৃপত্তুঙ্গের সৎভাই অপরাজিত বর্মন সিংহাসন লাভের জন্য গৃহযুদ্ধে রত হন। সম্ভবত তিনি চোল ও গঙ্গদের সাহায্য নিয়ে শ্রীপূরমবিয়মের যুদ্ধে ৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে নৃপত্তুঙ্গ বর্মনকে সিংহাসনচ্যুত করেন। কারণ, এরপর আর নৃপত্তুঙ্গের নাম শোনা যায় নি। তবে এই যুদ্ধে পাণ্ড্য রাজারা হয়ত নৃপত্তুঙ্গের পক্ষে ছিলেন।
  • (৩) অপরাজিত বর্মনের আমলে সামন্ত শক্তির ক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকে। সম্ভবত তোণ্ডামণ্ডলমের মধ্যেই তার অধিকার সীমায়িত হয়। তাঁর সামন্তদের মধ্যে আদিত্য চোল খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠেন।

উপসংহার :- বীর রাজেন্দ্রের কন্যাকুমারী লিপি থেকে জানা যায় যে, আদিত্য চোল জনৈক পল্লব রাজাকে হত্যা করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই পল্লব রাজা ছিলেন সম্ভবত অপরাজিত পল্লব। তিনিই ছিলেন পল্লব বংশের শেষ স্বাধীন রাজা।

(FAQ) পল্লব বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পল্লব বংশের প্রথম রাজা কে ছিলেন?

শিবস্কন্দ বর্মন।

২. পল্লব বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

প্রথম নরসিংহ বর্মন।

৩. পল্লব বংশের শেষ স্বাধীন রাজা কে ছিলেন?

অপরাজিত বর্মন।

৪. পল্লব বংশের রাজধানী কোথায় ছিল?

কাঞ্চী।

৫. কোন পল্লব রাজা রাজসিংহ শৈলী তৈরি করেন?

দ্বিতীয় নরসিংহ বর্মন বা রাজসিংহ বর্মন।

Leave a Comment