দ্বিতীয় নন্দী বর্মন

পল্লব রাজা দ্বিতীয় নন্দী বর্মন প্রসঙ্গে সিংহাসন লাভে প্রতিদ্বন্দ্বী, ঘটনাবহুল রাজত্ব, পল্লব-চালুক্য দ্বন্দ্ব, রাষ্ট্রকূটদের সাথে মিত্রতা, পাণ্ড্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, গঙ্গরাজ্য আক্রমণ, পাণ্ড্যদের বিরুদ্ধে জোট গঠন ও তার ধর্মানুরাগ সম্পর্কে জানবো।

দ্বিতীয় নন্দী বর্মন

রাজা দ্বিতীয় নন্দী বর্মন
বংশ পল্লব বংশ
রাজধানী কাঞ্চী
পূর্বসূরি দ্বিতীয় পরমেশ্বর বর্মন
উত্তরসূরি দন্তিবর্মন
দ্বিতীয় নন্দী বর্মন

ভূমিকা :- দ্বিতীয় পরমেশ্বর বর্মনের পর দ্বিতীয় নন্দীবর্মন পল্লব সিংহাসনে বসেন। তিনি পল্লব সিংহাসনের প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকারী ছিলেন না। তবে তিনি পল্লব রাজবংশের অন্যতর শাখায় জন্মান।

সিংহাসন লাভে প্রতিদ্বন্দ্বী

দ্বিতীয় নন্দী বর্মনের সিংহাসন লাভের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন পল্লব চিত্রমায়া। দ্বিতীয় নন্দী বর্মন প্রধান নাগরিকদের দ্বারা ৭৩০ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হন। কিন্তু তার সিংহাসন নিষ্কণ্টক ছিল না।

ঘটনাবহুল রাজত্ব

চিত্রমায়ার পক্ষ নিয়ে দক্ষিণের প্রতিবেশী পাণ্ড্য দেশের রাজা পল্লব রাজ্য আক্রমণ করেন। দ্বিতীয় নন্দী বর্মন দীর্ঘ ৬৫ বছর ধরে বহু ঘটনাবহুল রাজত্ব পরিচালনা করেন।

পল্লব-চালুক্য দ্বন্দ্ব

তাঁর আমলে পুনরায় পল্লব-চালুক্য দ্বন্দ্ব আবম্ভ হয়। চালুক্য দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য নিজে বাহিনী পরিচালনা করে কাঞ্চী অধিকার করেন। নন্দী বর্মন রাজধানী ছেড়ে রাষ্ট্রকূটদের কাছে আশ্রয় নেন।

চিত্রমায়ার সিংহাসন লাভ

চালুক্য দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য চিত্রমায়াকে পল্লব সিংহাসনে বসিয়ে দেন। চিত্রমায়া প্রায় ২০ বছর পল্লব সিংহাসনে স্থায়ী থাকেন। এই কুড়ি বছর দ্বিতীয় নন্দী বর্মন নির্বাসিত জীবন-যাপন করেন।

রাষ্ট্রকূটদের আশ্রয়ে

দ্বিতীয় নন্দী বর্মন উদীয়মান শক্তি রাষ্ট্রকুট দন্তিদুর্গের আশ্রয় নেন এবং দন্তিদুর্গের রাজ্য জয়ে অংশ নেন। এখানে থেকে তিনি তার হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করেন।

সিংহাসন পুনরুদ্ধার

উদয়েন্দিরম পট্ট থেকে জানা যায় যে, নন্দীবর্মনের সেনাপতি উদয়চন্দ্র যুদ্ধে চিত্রমায়াকে ৭৪৫-৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে হত্যা করলে নন্দী বর্মন পল্লব সিংহাসন ফিরে পান। দন্তিদুর্গ নন্দীবর্মন পল্লব মল্লকে সাহায্যের বিনিময়ে চালুক্য শক্তির বিরুদ্ধে তার সাহায্য পান।

চালুক্য কীর্তি বর্মনের আক্রমণ

নন্দী বর্মনের পল্লব সিংহাসন উদ্ধার সুদূর দক্ষিণের শক্তিসামাকে চালুক্যদের বিরুদ্ধে পরিচালিত করে। চালুক্য দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য তখন বার্দ্ধক্যদশায় উপনীত। তাঁর পুত্র যুবরাজ কীর্তি বর্মন চালুক্য এই বিরুদ্ধ শক্তিসাম্যকে ভাঙার জন্য পুনরায় কাঞ্চী জয় করেন।

মহালিঙ্গমের অভিমত

ডঃ মহালিঙ্গমের মতে, ইতিমধ্যে চালুক্য দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্যের মৃত্যু হলে, কীর্তিবর্মন তার সিংহাসনে নিরঙ্কুশভাবে ক্ষমতালাভের উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় নন্দী বর্মনের দাবী মেনে নেন। এর আগে যখন দ্বিতীয় নন্দী বর্মন রাষ্ট্রকূট দন্তিদুর্গের সহকারী ছিলেন তখন তিনি নিষাদ, সৈন্ধব প্রভৃতি শক্তিকে পর্যুদন্ত করেন।

রাষ্ট্রকূটদের সাথে মিত্রতা

দ্বিতীয় নন্দীবর্মনের রাজত্বকাল চালুকা শক্তির পতন ও রাষ্ট্রকূট শক্তির উত্থানের দ্বারা সূচিত হয়েছিল। রাষ্ট্রকূটদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য তিনি রাষ্ট্রকূট দন্তিদুর্গের কন্যা রেবাকে বিবাহ করেন।

পাণ্ড্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

তিনি উদীয়মান পাণ্ড্য শক্তির সঙ্গেও সংঘাতে অবতীর্ণ হন। বৈকুণ্ঠ পেরুমল মন্দিরের তিরুমালাই আলাবার লিপি থেকে জানা যায় যে, নন্দী বর্নন করুরের যুদ্ধে পাণ্ড্য এবং নেনমেলির যুদ্ধে চেরদের পরাজিত করেন।

গঙ্গরাজ্য আক্রমণ

গঙ্গরাজ শ্রীপুরুষ চালুক্য দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্যের সহকারী হিসেবে পল্লব রাজ্য আক্রমণ করেন। এর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য নন্দী বর্মন গঙ্গ রাজ্য আক্রমণ করেন। শ্রীপুরুষ পল্লব বংশের যে পারিবারিক রত্নহার নিয়ে যান, নন্দীবর্মন তাকে বিলন্দার যুদ্ধে পরাস্ত করে সেই রত্নহার পুনরুদ্ধার করেন। তণ্ডনতোট্টন পট্টে এই বিবরণ পাওয়া যায়।

রাষ্ট্রকূটদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

দ্বিতীয় নদী বর্মনের রাজত্বের শেষ দিকে রাষ্ট্রকূট ধ্রুবের বিরুদ্ধে তার ভাই দ্বিতীয় গোবিন্দের পক্ষ নেওয়ায় দ্বিতীয় নন্দী বর্মনের সঙ্গে ধ্রুবের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ধ্রুব নদী বর্মনকে আক্রমণ করে সম্ভবত পরাস্ত করেন বলে জেথোয়াই পট্টে বলা হয়েছে।

পাণ্ড্যদের বিরুদ্ধে জোট গঠন

সুদূর দক্ষিণের উদীয়মান পাণ্ড্য শক্তি সম্পর্কে দ্বিতীয় নন্দীবর্মন সতর্ক ছিলেন। পাণ্ড্য মারবর্মন তার বিরুদ্ধে একদা চিত্রমায়ার পক্ষ নেন। পাণ্ড্য প্রথম বরগুণ কাবেরী নদীর উপত্যকা অঞ্চল তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেন। নন্দীবর্মন এজন্য পাণ্ড্য শক্তির বিরুদ্ধে কেরল, কঙ্গু প্রভৃতি শক্তির সঙ্গে জোট গড়ে তোলেন।

লিপি খোদাই করা মন্দির

তিনি কাঞ্চীর বৈকুণ্ঠ পেরুমল মন্দিরের নির্মাতা ছিলেন কিনা এ বিষয়ে কোনো কোনো ঐতিহাসিক সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে এই মন্দিরের নির্মাণের সময় তাঁর সংযুক্তির বহু প্রমাণ ছড়িয়ে আছে। এই মন্দিরের গায়ে তিনি লিপি খোদাই করে পল্লব বংশের গোটা ইতিহাসের বিবরণ রক্ষা করেন। এরকম লিপি খোদাই করা মন্দির ভারতীয় ভাস্কর্যে বিরল।

ধর্মানুরাগ

দ্বিতীয় নন্দীবর্মন ছিলেন পরম বৈষ্ণব। বৈকুণ্ঠ পেরুমল মন্দিরে ভগবান বিষ্ণুর জীবন কেন্দ্র করে বহু ভাস্কর্য থেকে তা প্রমাণিত হয়। তাছাড়া তিনি মুক্তেশ্বর ও মাতঙ্গেশ্বর মন্দির নির্মাণ করেন। তার সময় থেকে পল্লব লিপিগুলি তামিল ভাষায় রচিত হয়। বৈষ্ণব সন্ত তিরুমঙ্গলই তাঁর সমকালীন ছিলেন।

উপসংহার :- দ্বিতীয় নন্দীবর্মনের পর পল্লব শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। দন্তিবর্মন ও তৃতীয় নন্দীবর্মন কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাননি। অপরাজিত পল্লব ছিলেন পল্লব বংশের শেষ স্বাধীন রাজা।

(FAQ) দ্বিতীয় নন্দী বর্মন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. দ্বিতীয় নন্দী বর্মন কোন ধর্মের অনুরাগী ছিলেন?

বৈষ্ণব ধর্ম।

২. কোন পল্লব রাজা রাষ্ট্রকূট দন্তিদুর্গের কন্যা রেবাকে বিবাহ করেন?

দ্বিতীয় নন্দী বর্মন।

৩. লিপি খোদাই করা মন্দির নির্মাণ কার কৃতিত্ব?

দ্বিতীয় নন্দী বর্মন।

৪. দ্বিতীয় নন্দী বর্মনের রাজধানী কোথায় ছিল?

কাঞ্চী।

Leave a Reply

Translate »