প্রথম রাজরাজ চোল

চোল রাজা প্রথম রাজরাজ চোল প্রসঙ্গে চোল সাম্রাজ্য গঠন, সৃজনী প্রতিভা, কেরল জয়, পাণ্ড্য নীতি, সিংহল নীতি, গঙ্গ রাজ্য দখল, চালুক্য নীতি, সুশাসন, ধর্মানুরাগ ও শিল্পানুরাগ সম্পর্কে জানবো।

প্রথম রাজরাজ চোল

রাজা প্রথম রাজরাজ চোল
বংশ চোল বংশ
রাজধানী তাঞ্জোর
প্রথম রাজা বিজয়ালয়
শ্রেষ্ঠ রাজা রাজেন্দ্র চোল
শেষ রাজা তৃতীয় রাজেন্দ্র
প্রথম রাজরাজ চোল

ভূমিকা :- পিতা সুন্দর চোলের পর রাজরাজ চোল (৯৮৫-১০১৪ খ্রি) চোল সিংহাসনে বসেন। চোল বংশের মহিমাকে তিনি একটি উচ্চ সীমায় স্থাপন করেন। শ্রেষ্ঠ চোল রাজাদের অন্যতম ছিলেন মহান রাজরাজ।

চোল সাম্রাজ্য গঠন

তিনি একটি আঞ্চলিক রাজ্যকে এক বৃহৎ সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। তাঞ্জোর লিপিতে তার মহিমা কীর্তিত হয়েছে। রাজরাজ চোল রাজ্যের স্থলশক্তিকে শুধুমাত্র দৃঢ় করেননি, তিনি একটি বিরাট নৌবহর গঠন করেন। চোল নৌবহরের প্রতাপে বঙ্গোপসাগর চোল হ্রদে পরিণত হয়।

সৃজনী প্রতিভা

রাজরাজ শুধু বিজেতা ছিলেন না। শাসন ও সেনাদলের সংগঠন, শিল্প স্থাপত্যের উন্নতি সকল ক্ষেত্রেই তাঁর সৃজনী প্রতিভার স্বাক্ষর দেখা যায়। রাজরাজের রাজনৈতিক প্রতিভা ছিল বিরাট। তাঁর প্রস্তর লিপিগুলিতে তাঁর রাজত্বকালের প্রধান ঘটনাগুলির বিবরণ তিনি রেখে গেছেন।

কেবল জয়

  • (১) রাজরাজ তাঁর রাজ্য জয় নীতির প্রথম দিকেই তার তিন সামুদ্রিক প্রতিবেশী পাণ্ড্য, কেরল ও সিংহলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন। এই যুদ্ধে স্থল সেনার সঙ্গে নৌবাহিনীর ভূমিকাও ছিল। নতুবা এই সমুদ্রসেবিত অঞ্চল জয় করা সম্ভব ছিল না।
  • (২) রাজরাজ ত্রিভান্দমের নৌযুদ্ধে রাজা রবিবর্মাকে পর্যুদস্ত করেন। তিনি কেরল ও কুইলন অধিকার করেন। রোমিলা থাপার বলেন যে, রাজরাজের কেরল যুদ্ধের পশ্চাতে গভীর ও সুদূরপ্রসারী কারণ ছিল। আরব বণিকরা এই সময় মালাবার উপকূলে বাণিজ্য উপলক্ষে এসে বসবাস করতে থাকে এবং মালাবারের বন্দরে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে।
  • (৩) মালাবারের মোপালাগণ হল এই সকল আরবদের বংশধর। আরব বণিকরা তাদের নৌশক্তির দ্বারা চীন ও মালাবারের বাণিজ্যকে অধিকারের চেষ্টা করে। চের বা কেরালা ছিল আরব বণিকদের স্বপক্ষে। রাজরাজ কেরল অধিকার করে আরব আগ্রাসনের পথ বন্ধ করেন।

বাহুবল

তিনি একই কারণে পাণ্ড্য রাজ্য ও সিংহল আক্রমণ করেন। সুতরাং বৈদেশিক আধিপত্য ও বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যবাদকে রাজরাজ তাঁর বাহুবলে রোধ করেন।

পাণ্ড্য নীতি

কেরল জয়ের পর রাজরাজ পান্ড্য রাজাকে পরাস্ত করে মাদুরাই অধিকার করেন। পান্ড্য রাজা অমরভুজঙ্গ তাঁর হাতে বন্দী হন। দক্ষিণঘাটের উদ্‌গাই দুর্গ তিনি অধিকার করেন। এর ফলে পান্ড্য ও কেরলে তাঁর আধিপত্য স্থাপনের সুবিধা হয়।

সিংহল নীতি

  • (১) ভারতের মূল ভূখণ্ড ছাড়িয়ে রাজরাজের নৌবাহিনী আরব সমুদ্রে মালদ্বীপ অধিকার করে। রাজরাজের সিংহল নীতির বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, তিনি সিংহল রাজের বশ্যতা চাননি, সিংহল দ্বীপকে তিনি চোল ভূখণ্ডে পরিণত করতে চান।
  • (২) চোল বাহিনী সিংহল রাজ পঞ্চম মহেন্দ্ৰকে পরাস্ত করে সিংহলের একাংশ অধিকার করে এবং তাঁর বিজয়কে স্মরণীয় করার জন্য রাজরাজ একটি পাথরের শিব মন্দির নির্মাণ করেন। রাজরাজ আরব সমুদ্রের পথে আরব অনুপ্রবেশের পথ বন্ধ করে ভারতের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেন।

গঙ্গ রাজ্য দখল

রাজরাজ তুঙ্গভদ্রার উত্তর তীরে আধিপত্য বিস্তার করেন। তিনি গঙ্গ রাজ্য বা মহীশূর অধিকার করেন। ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রকূট শক্তির পতনের ফলে গঙ্গ রাজ মিত্রহীন ও দুর্বল হয়ে পড়েন। এতকাল তিনি রাষ্ট্রকূট মৈত্রীর সাহায্যে চোলদের বিরুদ্ধে হামলা চালান। এখন গঙ্গ শক্তির পতন হয়।

চালুক্য নীতি

  • (১) চোল-চালুক্য দ্বন্দ্বের পশ্চাৎপটের কথা স্মরণ রাখা দরকার। পল্লব আমলে পল্লব চালুক্য দ্বন্দ্ব দীর্ঘকাল চলেছিল। পল্লব শক্তির পতনের পর চোল শক্তির উত্থান হলে সেই দ্বন্দ্ব এখন চোল-চালুক্য দ্বন্দ্বে পরিণত হয়। এর মূলে রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ ছাড়া ভৌগোলিক কারণগুলি পল্লব যুগে যা ছিল, চোল যুগেও তাই ছিল।
  • (২) গোদাবরী ও কৃষ্ণার মাঝের ব-দ্বীপে বেঙ্গী ছিল দোয়াব ও অত্যন্ত উর্বরা ব-দ্বীপ। পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের নদীগুলি ঢালু উপত্যকা দিয়ে পূর্বমুখী হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলেছিল। এই পথে শ্রেষ্ঠ নদী ছিল কৃষ্ণা-গোদাবরী। স্বভাবতই এই অঞ্চলে ক্ষমতা বিস্তারের জন্য রাজরাজ আগ্রহী হন।
  • (৩) বেঙ্গীতে চালুক্য বংশের পূর্ব শাখা রাজত্ব করত। নিরন্তর রাষ্ট্রকূট যুদ্ধে তারা দুর্বল হলে তিনি পূর্ব চালুক্য রাজধানী বেঙ্গী অধিকার করে তাঁর প্রতিনিধি বিমলাদিত্যকে বেঙ্গীর সিংহাসনে বসান। তিনি বিমলাদিত্যের সঙ্গে নিজ কন্যা কুন্দভাকের বিবাহ দিয়ে বেঙ্গীর ওপর প্রভাব স্থাপন করেন।
  • (৪) এরপর তিনি পশ্চিম চালুক্য রাজ্য আক্রমণ করে চালুক্যরাজ সত্যাশ্রয়কে পরাস্ত করেন। পশ্চিম চালুক্য রাজ্য লুণ্ঠন করে তিনি বিরাট ধনরত্ন পান।
  • (৫) পশ্চিম চালুক্য নৃপতি সত্যাশ্রয় ১০০৬ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গী আক্রমণ করলে, তিনি যুবরাজ রাজেন্দ্রকে পশ্চিম চালুক্য আক্রমণের আদেশ দেন। রাজেন্দ্র রায়চুর দোয়াব দখল করে, মান্যখেত পুড়িয়ে দেন এবং সত্যাশ্রয়কে বেঙ্গী থেকে পিছু হঠতে বাধ্য করেন।

সাম্রাজ্যের বিশালতা

প্রাচীন ভারতের রাজাদের মধ্যে চোল রাজরাজ তাঁর নৌশক্তি ও নৌসাম্রাজ্যের জন্য অনন্য স্থান পেয়েছেন। তাঁর সাম্রাজ্য ছিল বিশাল। সমগ্র মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সী, কুর্গ, মহীশূর, সিংহলের একাংশ ও মালদ্বীপ নিয়ে এই সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল।

সুশাসন

সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি তিনি একটি সুন্দর শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন এবং স্বায়ত্ব শাসনের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।

ধর্মানুরাগ

রাজরাজ ছিলেন শৈব ধর্মাবলম্বী। তিনি শৈব হলেও অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহিষ্ণুতা দেখান। বিষ্ণু ও বৌদ্ধ মন্দিরে তিনি মুক্ত হস্তে দান করেন।

শিল্পানুরাগ

তাঞ্জোরের বিখ্যাত রাজরাজেশ্বর মন্দির তিনি নির্মাণ করেন। এই মন্দিরের স্থাপত্য-শৈলী চোল স্থাপত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দেয়। এই মন্দিরের দেওয়ালে রাজরাজের বিভিন্ন অভিযানের কাহিনী খোদাই করা হয়।  

উপসংহার :- “রাজরাজের স্থাপিত রাজ্য ও শাসন ব্যবস্থার মজবুত ভিতের ওপর রাজেন্দ্র চোল তাঁর সৌধ নির্মাণ করেন পুত্রের কীর্তি ছিল পিতার কর্মের নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য।”

(FAQ) প্রথম রাজরাজ চোল সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. চোলদের প্রথম রাজা কে ছিলেন?

বিজয়ালয়।

২. শ্রেষ্ঠ চোল রাজা কে ছিলেন?

প্রথম রাজেন্দ্র চোল।

৩. চোলদের শেষ রাজা কে ছিলেন?

তৃতীয় রাজেন্দ্র।

৪. চোলদের রাজধানী কোথায় ছিল?

তাঞ্জোর।

Leave a Reply

Translate »