ষোড়শ মহাজনপদ: কুরু

ঐতিহাসিক স্থান কুরু -র অবস্থান, ইতিহাস, ধর্মীয় অর্থনৈতিক সংস্কৃতির গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হল। খ্রিস্ট পূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভারতে কোনাে কেন্দ্রীয় রাজশক্তি ছিল না। ভারতে কোনাে অখণ্ড সর্বভারতীয় রাষ্ট্র এই সময় ছিল না। একটা অখণ্ড রাষ্ট্রের পরিবর্তে ছিল যােলটি রাজ্য বা যােড়শ মহাজনপদ।

ষোড়শ মহাজনপদ:- যেমন – কাশী, কোশল, অঙ্গ, মগধ, বৃজি, মল্ল, চেদি, বৎস্য, কুরু, পাঞ্চাল, মৎস, শূরসেন, অশ্মক, অবন্তী, গান্ধার এবং কম্বোজ

মহাজনপদ: কুরু

পরিচিতিমহাজনপদ
অবস্থানবর্তমান ভারতের দিল্লি, হরিয়ানা, পাঞ্জাব রাজ্যের অন্তর্গত
রাজধানীহস্তিনাপুর, ইন্দ্রপ্রস্থ
উল্লেখযোগ্য রাজাপরীক্ষিৎ, জনমেজয়
মহাজনপদ: কুরু

ভূমিকা :- বৈদিক ইন্দো-আর্য উপজাতীয় রাজ্য হল কুরু, যা আধুনিক যুগের দিল্লি, হরিয়ানা, পাঞ্জাব এবং উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাংশের কিছু অংশকে নিয়ে মধ্য-বৈদিক যুগে গঠিত হয়েছিল।

প্রতিষ্ঠা কাল

আনুমানিক ১২০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ থেকে ৯০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ সময়কালে কুরু রাজ্যের উত্থান ঘটে।

রাষ্ট্র স্তর

তথ্য অনুসারে, কুরু রাজ্যই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নথিভুক্ত রাষ্ট্র-স্তরের সমাজ হিসাবে বিকশিত হয়েছিল।

শ্রোত আচার

কুরু রাজবংশ তাদের আচারের স্তবকে বেদ নামে সংকলনে সাজিয়ে তোলে এবং নতুন আচারের বিকাশ ঘটায় যা ভারতীয় সভ্যতায় শ্রৌত আচার হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এই সংমিশ্রণটি তথাকথিত “শাস্ত্রীয় সংশ্লেষণে” বা “হিন্দু সংশ্লেষে” বিশেষ অবদান রাখে।

রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

পরীক্ষিৎ এবং জনমেজয়ের রাজত্বকালে মধ্য বৈদিক যুগের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল কুরু রাজ্য।

গুরুত্ব হ্রাস

বৈদিক যুগের শেষ দিকে আনুমানিক ৯০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে কুরু রাজ্যের গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছিল।

দুর্বল ষোড়শ মহাজনপদ

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে ষোড়শ মহাজনপদ আমলে কুরুরাজ্য একেবারেই পিছনের সারিতে চলে যায়।

মহাভারতের ভিত্তি

কুরু বংশ সম্পর্কে ঐতিহ্য এবং কিংবদন্তিগুলি উত্তর-বৈদিক যুগেও অব্যাহত ছিল, যা মহাভারত মহাকাব্যটির ভিত্তি গঠন করেছিল।

উৎস

কুরু রাজ্য সম্বন্ধে জানতে প্রধান উৎসগুলি হল সমসাময়িক প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থগুলি, যেখানে তদানীন্তন ঐতিহাসিক ব্যক্তি, ঘটনাবলী এবং সাধারণ জীবনের বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে।

সংস্কৃতি

কুরু রাজ্যের সময়সীমা এবং ভৌগোলিক পরিধি (বৈদিক সাহিত্যের সাংস্কৃতিক ভাষাতত্ব দ্বারা নির্ধারিত) থেকে এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক চিত্রিত ধূসর সংস্কৃতির সমসাময়িক বলে মনে করা হয়।

কুরু রাজবংশ

মধ্য বৈদিক যুগে তদানীন্তন পারুষ্ণী (আধুনিক ইরাবতী) নদীর তীরে দশ রাজার যুদ্ধ -এর পরে ভরত এবং অন্যান্য পুুরু বংশের মধ্যে জোটবদ্ধকরণ এবং একীকরণের ফলে কুরু রাজবংশ (১২০০ থেকে ৯০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ) গড়ে ওঠে বলে মনে করা হয়।

প্রথম শক্তিশালী রাজনৈতিক কেন্দ্র

কুরুক্ষেত্র অঞ্চলে তাদের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের সাথে সাথে কুরুরা বৈদিক যুগের প্রথম শক্তিশালী রাজনৈতিক কেন্দ্র গঠন করেছিল যা প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ৮০০ বছর অবধি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রভাবশালী ছিল।

রাজধানী

প্রথম কুরু রাজধানী ছিল আধুনিক হরিয়ানার আসন্ধের কাছে, আসন্দিভাতে। পরবর্তী সাহিত্যে ইন্দ্রপ্রস্থ (আধুনিক দিল্লি) এবং হস্তিনাপুরকে প্রধান কুরু শহর হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বৈদিক যুগে

ঋগ্বেদ -এর পরবর্তী সময়কালের বৈদিক সাহিত্যে কুরুরাজ্যের বিশেষ উল্লেখ রয়েছে। এখানে কুরু বংশজাতদের মূলত গঙ্গা-যমুনা দোয়াব ও আধুনিক হরিয়ানার শাসক এবং প্রারম্ভিক ইন্দো-আর্যদের একটি শাখা হিসাবে দেখানো হয়েছে।

পরবর্তী বৈদিক যুগে

পরবর্তী বৈদিক যুগের সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দুটি ধীরে ধীরে পাঞ্জাবের বাইরে হরিয়ানা ও দোয়াব অঞ্চলের সংস্কৃতি এবং কুরুবংশ কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে।

পতনের সূত্রপাত

অ-বৈদিক সালভা (বা সালভী) উপজাতির দ্বারা পরাজিত হওয়ার পরে কুরুবংশের পতন শুরু হয়েছিল এবং বৈদিক সংস্কৃতির কেন্দ্রটি প্রধানত পূর্ব দিকে উত্তর প্রদেশের পাঞ্চাল অংশে স্থানান্তরিত হয়েছিল।

রাজধানী পরিবর্তন

উত্তর-বৈদিক সংস্কৃত সাহিত্যের মতে বন্যা এবং কুরু পরিবারেই পারিবারিক বিরোধের কারণে হস্তিনাপুর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে কুরুরাজ্যের রাজধানী নিম্ন দোয়াবের কৌশাম্বিতে স্থানান্তরিত হয়েছিল।

কুরু ও বৎস জনপদ

বৈদিক পরবর্তী সময়ে (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে) কুরু রাজবংশ কুরু ও বৎস জনপদে বিবর্তিত হয় এবং যথাক্রমে উচ্চ দোয়াব, দিল্লি, হরিয়ানা এবং নিম্ন দোয়াব অঞ্চল শাসন করতে থাকে।

শাখা বিভাগ

কুরু রাজবংশের বৎস শাখাটি পরে কৌশাম্বি এবং মথুরা শাখায় বিভক্ত হয়েছিল।

সমাজ

  • (১) যে উপজাতিগুলি কুরু রাজ্য বা ‘কুরু প্রদেশ’ -এ বসতি স্থাপন করেছিল তারা মূলত আধা যাযাবর, প্রকৃতিপূজক উপজাতি ছিল।
  • (২) ধীরে ধীরে যখন গঙ্গার পশ্চিম সমভূমিতে বসতি স্থানান্তরিত হতে থাকল তখন কৃষিকার্য, বিশেষ করে ধান এবং যবের চাষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
  • (৩) এই সময়ের বৈদিক সাহিত্য উদ্বৃত্ত উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিশেষী কারিগর এবং শিল্পীদের উত্থানের ইঙ্গিত দেয়।
  • (৪) এই যুগের একটি গ্রন্থ অথর্ববেদ -এ প্রথমে লোহাকে আয়াম আয়াস (আক্ষরিকভাবে “কালো ধাতু”) হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
  • (৫) এই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ ছিল চতুর্বর্ণ ব্যবস্থা, যা ঋগবৈদিক কালের আর্য ও দাস -এই দ্বিবিধ শ্রেণী ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপন করেছিল।

প্রশাসন

  • (১) কুরু রাজারা যাজক (পুরোহিত), গ্রামের প্রধান, সেনাবাহিনীর প্রধান, খাদ্য বিতরণকারী, দূত, এবং গুপ্তচরবৃন্দসহ প্রাথমিক প্রশাসনের সহায়তায় শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করতেন।
  • (২) বৈদিক রাজারা তাদের প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে, বিশেষত পূর্ব এবং দক্ষিণে ঘন ঘন অভিযান পরিচালনা করেছিল।
  • (৩) শাসন ব্যবস্থায় সহায়তার জন্য রাজা এবং তাদের ব্রাহ্মণ পুরোহিতেরা বৈদিক স্তবকে সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছিলেন।

নতুন রীতি গঠন

সামাজিক ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য এবং শ্রেণিবৃত্তিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য একটি নতুন রীতিনীতি (বর্তমানে শ্রৌত রীতিনীতি) গড়ে তোলে।

অশ্বমেধ যজ্ঞ

অনেক আচার-অনুষ্ঠান প্রাথমিকভাবে প্রজাদের উপরে রাজার মর্যাদাকে উচ্চতর করে তুলেছিল। অশ্বমেধ যজ্ঞ একজন শক্তিশালী রাজার আধিপত্য দৃঢ় করার একটি উপায় ছিল।

মহাভারতের বর্ণনা

মহাকাব্যটিতে সম্ভবত ১০০০ খ্রিস্টপূর্বের কুরু গোত্রের দুটি শাখার মধ্যে দ্বন্দ্বের কথা বলা হয়েছে। তবে বর্ণিত ঘটনার কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে কিনা তা নিয়ে চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ

মহাভারতের বিখ্যাত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ কুরুক্ষেত্র রাজ্যের হস্তিনাপুর শহরে সংঘটিত হয়।

কুরু বংশীয় কাহিনী

মহাভারতের বিদ্যমান ভাষ্য বহু বিকাশের স্তর পেরিয়ে মূলত ৪০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ থেকে ৪০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেকার কুরু বংশীয় কাহিনী বর্ণনা করে।

উল্লেখযোগ্য রাজা

ঐতিহাসিক রাজা পরীক্ষিত এবং জনমেজয়ের উল্লেখযোগ্য চিহ্ন আছে। তাছাড়া রাজা যুধিষ্ঠিরের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

উপসংহার :- পরবর্তীকালে কুরু রাজ্য মগধ সাম্রাজ্য -এর অধিকারে চলে যায়।

(FAQ) অঙ্গ হতে জিজ্ঞাস্য ?

১. হস্তিনাপুর কোথায় অবস্থিত ?

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মিরাট জেলায় অবস্থিত একটি শহর এবং নগর পঞ্চায়েত।

২. কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ কোন মাসে কত তারিখে হয় ?

২১ কার্তিক (অনুমেয়)।

৩. যুধিষ্ঠিরের রাজধানী কোথায় ছিল ?

ইন্দ্রপ্রস্থ।

Leave a Reply

Translate »