প্রাচীন ভারতের মহাজনপদ

প্রাচীন ভারতের মহাজনপদ প্রসঙ্গে অর্থ, উত্থানকাল, উদ্ভবের সূত্র, সম্পদ, কর ব্যবস্থা, ষোড়শ মহাজনপদ, মহাজনপদ গুলির বৈশিষ্ট্য ও মগধের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জানবো।

প্রাচীন ভারতের মহাজনপদ

ঐতিহাসিক বিষয়মহাজনপদ
উত্থানকালখ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক
শ্রেষ্ঠ মহাজনপদমগধ
কাশিবারাণসি
অঙ্গচম্পা
কোশলশ্রাবস্তি
গান্ধারতক্ষশিলা
শূরসেনমথুরা
প্রাচীন ভারতের মহাজনপদ

ভূমিকা :- খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের পূর্বে সুনির্দিষ্ট সন-তারিখসহ ভারতের ধারাবাহিক রাজনৈতিক ইতিহাস জানা খুবই দুঃসাধ্য। তবে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে মোটামুটি স্পষ্টভাবে উত্তর ভারতের ধারাবাহিক রাজনৈতিক ইতিহাস জানা যায়। এজন্য ইতিহাসবিদ ড. এ. এল. বাসাম মন্তব্য করেছেন যে, এই সময় থেকে “ভারতের ইতিহাস তার অতীত অনিশ্চয়তা কাটিয়ে নতুন আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।”

জনপদ

প্রথমদিকে আর্য সমাজব্যবস্থায় উপজাতিগোষ্ঠীর বসতি এলাকা ‘জন’ নামে পরিচিত ছিল। এই ‘জন’ গুলিই পরবর্তীকালে জনপদে পরিণত হয়। মহাকাব্যের যুগের (১০০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্ব) প্রথমদিকে জনপদগুলির চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে।

মহাজনপদ

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের পূর্বে ভারতে উপজাতিগোষ্ঠীভিত্তিক বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদের অস্তিত্ব ছিল। এই জনপদগুলি নিজেদের মধ্যে সর্বদা সংঘর্ষে লিপ্ত থেকে একে অন্যের ভূখণ্ড দখল করত। এভাবে বিভিন্ন সময়ে দুই বা ততোধিক জনপদ সংযুক্ত হয়ে অপেক্ষাকৃত বৃহদায়তন রাজ্যের উত্থান ঘটে। জনপদ অপেক্ষা বৃহৎ এই রাজ্যগুলি ‘মহাজনপদ’ নামে পরিচিত।

মহাজনপদের অর্থ

‘মহা’ অর্থে বৃহৎ এবং ‘জনপদ’ অর্থে কোনো ভূখণ্ডে কোনো ‘কৌম’ বা উপজাতিগোষ্ঠীর পদার্পণ বোঝায়। এই অর্থে মহাজনপদ হল প্রাচীন ভারতের বৃহৎ রাজ্য বা রাষ্ট্র।

মহাজনপদের উত্থানকাল

জনপদগুলির মধ্যে ধারাবাহিক লড়াইয়ের ফলে একাধিক জনপদ সংযুক্ত হয়ে বৃহৎ মহাজনপদ গড়ে ওঠে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক নাগাদ মহাজনপদগুলির চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে ৷

মহাজনপদ গুলির উদ্ভবের সূত্র

মহাজনপদগুলির মধ্যে অবিরাম সংঘর্ষের পরিণতিতে সুবৃহৎ ও ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে।

মহাজনপদ গুলির সম্পদ

মহাজনপদের যুগে কৃষি ব্যবস্থার পরিপূর্ণ বিকাশের ফলে সম্পত্তি হিসেবে উৎপাদিত শস্যের গুরুত্ব বাড়ে। এই সময়ের বিভিন্ন সাহিত্যিক উপাদানে কৃষিপণ্য হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ধানের উল্লেখ পাওয়া যায়।

মহাজনপদ গুলির কর ব্যবস্থা

মহাজনপদের যুগে সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। এই যুগে নাগরিকরা রাজাকে নিয়মিত কর প্রদানে বাধ্য ছিলেন।

ষোড়শ মহাজনপদ

বৌদ্ধগ্রন্থ অঙ্গুত্তরনিকায়, জৈনগ্রন্থ ভগবতীসূত্র, হিন্দু পুরাণ প্রভৃতি থেকে জানা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারতে কোনো ঐক্যবদ্ধ কেন্দ্রীয় শক্তির অস্তিত্ব ছিল না। এই সময় ভারতে ষোলোটি ছোটো ছোটো রাজ্য বা মহাজনপদের অস্তিত্ব ছিল। এই রাজ্যগুলিকে একত্রে ষোড়শ মহাজনপদ বলা হয়। আফগানিস্তানের কাবুল থেকে দক্ষিণ ভারতের গোদাবরী নদীর উপকূলের মধ্যবর্তী অঞ্চলে এগুলি অবস্থিত ছিল। এগুলি হল –

(১) কাশী

বর্তমান উত্তরপ্রদেশের পূর্ব অংশে কাশী রাজ্যটি অবস্থিত ছিল। এর রাজধানী ছিল বারাণসী।

(২) কোশল

এর অবস্থান ছিল বর্তমান অযোধ্যা। এর রাজধানী ছিল শ্রাবস্তী।

(৩) অঙ্গ

এর অবস্থান ছিল বর্তমান বিহারের দক্ষিণ- পূর্বাংশে। অঙ্গের রাজধানী ছিল চম্পা।

(৪) মগধ

মগধ বর্তমান বিহারের গয়া ও পাটনা জেলায় অবস্থিত ছিল। মগধের প্রথম রাজধানী ছিল গিরিব্রজ। পরে যথাক্রমে রাজগৃহ ও পাটলিপুত্রে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়।

(৫) অবন্তি

বর্তমান মালব ও মধ্যপ্রদেশের কিছু অংশে অবন্তি রাজ্যটি অবস্থিত ছিল। এর উত্তরাংশের রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী ও দক্ষিণাংশের রাজধানী ছিল মাহিস্মতী।

(৬) বৎস

এর অবস্থান ছিল বর্তমান এলাহাবাদের নিকটবর্তী গঙ্গার দক্ষিণ তীরে। এর রাজধানী ছিল কৌশাম্বী।

(৭) বৃজি

এর অবস্থান ছিল বর্তমান উত্তর বিহারে বা বৈশালীতে। এর রাজধানী ছিল বৈশালী।

(৮) মল্ল

এর অবস্থান ছিল বর্তমান উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলায়। এর রাজধানী ছিল কুশীনগর বা পাবা।

(৯) কুরু

বর্তমান দিল্লি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কুরু রাজ্যটি অবস্থিত ছিল। এর রাজধানী ছিল ইন্দ্রপ্রস্থ।

(১০) পাশাল

এর অবস্থান ছিল বর্তমান রোহিলখণ্ড। উত্তর পাঞ্চালের রাজধানী ছিল অহিচ্ছত্র এবং দক্ষিণ পাঞ্চালের রাজধানী ছিল কাম্পিল্য।

(১১) চেদি

এর অবস্থান ছিল বর্তমান বুন্দেলখণ্ড ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। এর রাজধানী ছিল শুকতিমতী।

(১২) মৎস্য

এর অবস্থান ছিল বর্তমান রাজস্থানের জয়পুরে। এর রাজধানী ছিল বিরাটনগর।

(১৩) শূরসেন

এর অবস্থান ছিল যমুনা নদীর তীরে মথুরা অঞ্চলে। এর রাজধানী ছিল মথুরা।

(১৪) অস্মক

এর অবস্থান ছিল দক্ষিণ ভারতের বর্তমান গোদাবরীর উপত্যকা অঞ্চলে বা পাটলিতে। অস্মকের রাজধানী ছিল পোটালি বা পোটান।

(১৫) গান্ধার

এর অবস্থান ছিল বর্তমান রাওয়ালপিন্ডি বা তক্ষশিলা ও কাশ্মীর উপত্যকায়। এর রাজধানী ছিল তক্ষশিলা।

(১৬) কম্বোজ

এর অবস্থান ছিল বর্তমান দক্ষিণ-পশ্চিম কাশ্মীরে। এর রাজধানী ছিল রাজপুর।

মহাজনপদগুলির বৈশিষ্ট্য

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভারতে যে মহাজনপদগুলি গড়ে উঠেছিল সেগুলির বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন –

(১) অবিরাম লড়াই ও সংঘর্ষ

মহাজনপদগুলি নিজেদের মধ্যে অবিরাম লড়াই ও সংঘর্ষের মাধ্যমে নিজ নিজ শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল। এই সংঘর্ষের দ্বারা শক্তিশালী মহাজনপদগুলি দুর্বল মহাজনপদকে দখল করে নিতে থাকে। ফলে একাধিক জনপদ সংযুক্ত হয়ে আরও বৃহৎ মহাজনপদের উত্থান ঘটে।

(২) বৈদেশিক আক্রমণকারীকে সাহায্য

মহাজনপদ গুলির নিজেদের মধ্যে বিরোধের ফলে তারা প্রতিবেশী মহাজনপদের বিরুদ্ধে বৈদেশিক আক্রমণকারীকেও সহায়তা করতে প্রস্তুত ছিল।

(৩) শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি

মহাজনপদগুলির মধ্যে চোদ্দোটি মহাজনপদই ছিল রাজতান্ত্রিক। বৃজি ও মল্ল নামে দুটি মহাজনপদ ছিল প্রজাতান্ত্রিক।

(৪) অবস্থান

পনেরোটি মহাজনপদই উত্তর ভারতে অবস্থিত ছিল। একমাত্র অস্মক নামে মহাজনপদটি দক্ষিণ ভারতে গোদাবরী নদীর তীরে অবস্থিত ছিল।

(৫) রাজনৈতিক চেতনা

মহাজনপদের যুগে ভারতীয়দের রাজনৈতিক চেতনার যথেষ্ট বিকাশ ও অগ্রগতি ঘটেছিল।

(৬) চারটি মহাজনপদের প্রাধান্য

ক্রমাগত লড়াই ও যুদ্ধের মাধ্যমে বহু মহাজনপদ দুর্বল বা অবলুপ্ত হয় এবং অবন্তি, বৎস, কোশল ও মগধ নামে চারটি মহাজনপদ প্রাধান্য লাভ করে।

(৭) মগধের শ্রেষ্ঠত্ব

এই চারটি মহাজনপদের মধ্যে অবশ্য শেষপর্যন্ত একক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে মগধ নামে মহাজনপদটি।

উপসংহার :- খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মগধের নেতৃত্বে উত্তর ভারতে একটি কেন্দ্রীয় রাজশক্তি ও সুবৃহৎ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়। এজন্য ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার এই যুগকে ‘রাজকীয় ঐক্যের যুগ’ বা “The Age of Imperial Unity’ বলে অভিহিত করেছেন।

(FAQ) প্রাচীন ভারতের মহাজনপদ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মহাজনপদ গুলির উত্থান ঘটে কখন?

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে।

২. কাশী মহাজনপদের রাজধানী কোথায় ছিল?

বারাণসি।

৩. মগধ মহাজনপদের প্রথম রাজধানী কোথায় ছিল?

রাজগৃহ বা গিরিব্রজ।

৪. শক্তিশালী মহাজনপদ গুলির নাম লেখ।

অবন্তি, বৎস, কোশল ও মগধ।

৫. কোন মহাজনপদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়?

মগধ।

Leave a Comment