দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজ্য জয়

গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজ্য জয় প্রসঙ্গে রাজ্য জয়, শক যুদ্ধ, শক যুদ্ধের পরোক্ষ প্রমান, শক যুদ্ধের ফলাফল, মেহরৌলি লিপির সাক্ষ্য সম্পর্কে জানবো।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজ্য জয়

বিষয় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজ্য জয়
সাম্রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্য
রাজা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
পূর্বসূরি রামগুপ্ত
উত্তরসূরি প্রথম কুমারগুপ্ত
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজ্য জয়

ভূমিকা :- সমুদ্রগুপ্তের পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রামগুপ্ত কিছুকাল রাজ্য শাসন করে বলে মনে করা হয়। তারপর সিংহাসনে আরোহণ করেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। তিনি পিতা সমুদ্রগুপ্তের রাজ্যসীমা মোটামুটি অক্ষুণ্ণভাবে লাভ করেন।

রাজ্য জয়

সমতট বা পূর্ব বাংলা ছিল সমুদ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমা। কামরূপের রাজারা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সার্বভৌমত্ব সম্ভবত মেনে নেন। মথুরা সমুদ্রগুপ্তের অধীন ছিল। মথুরায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শিলালিপি পাওয়া গেছে। সুতরাং এই অঞ্চল দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের অধীন ছিল সন্দেহ নেই। পূর্ব পাঞ্জাবের উপজাতি রাজারা সমুদ্রগুপ্তের আমলের মতই দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আধিপত্য মেনে নেন বলা যায়। পাঞ্জাবের অপর অংশে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আধিপত্য ছিল কিনা সন্দেহ।

শক যুদ্ধ

  • (১) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যজয় সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল শক যুদ্ধ। শকদের জয় করা সম্পর্কে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তাঁর নিজের শিলালিপিতে কোনো উল্লেখ করেননি। সুতরাং ডঃ পিএল গুপ্ত প্রমুখ গবেষক শক যুদ্ধ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ডঃ গুপ্তের মতে, আমাদের উচিত গুপ্ত রাজাদের দেওয়া প্রমাণ ও শক রাজাদের দেওয়া প্রমাণের ভিত্তিতে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শক যুদ্ধ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত করা।
  • (২) শক-ক্ষত্রপদের যে মুদ্রাগুলি পাওয়া গেছে তাতে কোথাও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের নাম নেই। এদিকে শকদের উচ্ছেদ করে গুজরাট জয় সম্পর্কে চন্দ্রগুপ্তের কোনো লিপিতে প্রত্যক্ষ উল্লেখ নেই। সুতরাং দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শক যুদ্ধ জয় সম্পর্কে সঙ্গতভাবে সন্দেহ প্রকাশ করা যায়। তাছাড়া গুজরাটে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কোনো লিপি পাওয়া যায় নি।
  • (৩) এমতাবস্থায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শক যুদ্ধ জয় সম্পর্কে আমাদের হাতে কয়েকটি পরোক্ষ প্রমাণ আছে। এই প্রমাণের ওপর নির্ভর করে এবং দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শক ধরণের মুদ্রার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত করা হয় যে, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সৌরাষ্ট্র ও গুজরাটের শক-ক্ষত্রপদের দীর্ঘ যুদ্ধে পরাস্ত করেন।

শক যুদ্ধের পরোক্ষ প্রমাণ

শক যুদ্ধ সম্পর্কে পরোক্ষ প্রমাণগুলি হল –

(১) উদয়গিরি লিপি

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী বীরসেনের উদয়গিরি লিপি। এই লিপিতে বলা হয়েছে, বীরসেন যখন তার প্রভু দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে উদয়গিরি যান, তখন তিনি পৃথিবী জয়ের চেষ্টায় রত ছিলেন। কিন্তু এতে শকদের নাম বা যুদ্ধের সন, তারিখ নেই।

(২) সাঁচী লিপি

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সেনাপতি আম্রকাদ্দবের সাঁচী লিপি। এই লিপিতে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সেনাপতি “বহু যুদ্ধ জয়ের” কথা বলেছেন। এই লিপি ৪১২-৪১০ খ্রিস্টাব্দের। এছাড়া দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সামন্ত সনকানিক মহারাজার ৪০১-৪০২ খ্রিস্টাব্দের একটি ভূমিদান পত্রও উদয়পুরে পাওয়া গেছে।

(৩) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রৌপ্যমুদ্রা যাতে গুপ্তবংশের চিরাচরিত “ময়ূর” প্রতীকের স্থলে শত্রুদের অনুকরণে চৈত্য, অর্ধচন্দ্র ও তারকা চিহ্ন খোদাই করা হয়।

ডঃ গুপ্তের অভিমত

ডঃ পিএল গুপ্ত বলেছেন যে, চন্দ্রগুপ্তের শক রাজ্যজয় সম্পর্কে এই তিন প্রমাণ যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ এতে চন্দ্রগুপ্ত শক-ক্ষত্রপকে পরাজিত করেন এমন কথা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। যাই হোক, অধিকাংশ পণ্ডিত এই তিনটি প্রমাণের ওপর নির্ভর করে বলেন যে, চন্দ্রগুপ্ত শক-ক্ষত্রপ তৃতীয় রুদ্ৰসিংহ বা রুদ্রসেনকে দীর্ঘ যুদ্ধে পরাস্ত করে আরব উপসাগর পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। ডঃ গয়াল বলেন যে, এমনিতেই শক শক্তি এসময় খুব হীনবল হয়ে পড়েছিল। সুতরাং দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে দীর্ঘ যুদ্ধ করতে হয় একথা বলা চলে না।

শক যুদ্ধের ফলাফল

  • (১) শক যুদ্ধের ফল গুপ্ত সাম্রাজ্যের পক্ষে খুবই অনুকূল হয়েছিল সন্দেহ নেই। শক-ক্ষত্রপদের শেষতম মুদ্রা ৩৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। গুপ্ত সম্রাটদের শক চিহ্নিত মুদ্রার তারিখ হল ৪০২ খ্রিস্টাব্দ। ৩৮৮-৪০২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনো সময়ে চন্দ্রগুপ্ত শক শক্তিকে ধ্বংস করেন।
  • (২) শক যুদ্ধে জয় লাভের ফলে পশ্চিম ভারতে গুপ্ত সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়। বঙ্গোপসাগর থেকে আরব সাগর পর্যন্ত গুপ্ত অধিকার স্থাপিত হয়। সৌরাষ্ট্র ও গুজরাট অঞ্চল এর ফলে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় বলে অনেকে মনে করেন।
  • (৩) পশ্চিম উপকূলের বিখ্যাত ভূগুকচ্ছ বা বারিগাজা বন্দর গুপ্ত অধিকারে চলে আসে। এই বন্দর হতে রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতের প্রভূত বাণিজ্য চলত। রোম, বাইজানটিয়াম প্রভৃতি রোমান নগরীতে ভারতীয় রেশমের কাপড়, মশলার খুব চাহিদা ছিল। তাছাড়া চীনের রেশম ভারতের পথ ধরে এই বন্দর হয়ে রোমে রপ্তানি হত। এই বিরাট বাণিজ্য এর ফলে গুপ্ত সম্রাটদের হাতে চলে আসে।
  • (৩) উজ্জয়িনী নগরীর গুরুত্ব বাড়ে। এটি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের দ্বিতীয় রাজধানীতে পরিণত হয়। বাণিজ্য, সংস্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে উজ্জয়িনী খ্যাতি পায়। অনেকের মতে, “শকারি বিক্রমাদিত্যের” কিংবদন্তী বহু শতক পরে এই শক যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।
  • (৪) অনেকে মনে করেন যে, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে পশ্চিম ভারতের সঙ্গে রোমের বাণিজ্যের অবনতি হয়েছিল। কারণ কুমারগুপ্তের মান্দাসোর লিপি থেকে জানা যায় যে, গুজরাট থেকে কিছু রেশম শিল্পী দাসপুরে চলে আসেন। তারা অনুমান করেন যে, রোমান সাম্রাজ্যে তখন গথ জাতির আক্রমণ চলায় বাণিজ্যে মন্দা হয়।
  • (৫) এই মতের বিরুদ্ধে বলা হয় যে, রোমে ভারত ও চীনদেশের দ্রব্য ও মালমশলার চাহিদা গথ আক্রমণের জন্য কমেনি। স্বয়ং গথ সেনাপতি আালারিক রোমের মুক্তিপণ হিসেবে বিরাট পরিমাণ গোলমরিচ ও রেশম দাবী করেন।
  • (৬) রোম ছাড়া বাইজানটিয়ামের সঙ্গেও ভারতের বাণিজ্য চলত। রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ান রেশমের বদলে রোমান মুদ্রার বিনিময়ের হার ঠিক করে দেন যাতে রোম থেকে ভারতে বেশী স্বর্ণ মুদ্রা চলে না আসে।

মেহরৌলী লিপির সাক্ষ্য

  • (১) দিল্লীর কুতবমিনারের কাছে মেহরৌলী গ্রামে একটি লোহার থামে জনৈক চন্দ্র নামধারী রাজার একটি লিপি খোদাই দেখা যায়। এই লিপিতে কোনো সন, তারিখ নেই। ডঃ মজুমদার প্রমুখ ঐতিহাসিক এই “চন্দ্র” কে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বলে চিহ্নিত করেছেন। অবশ্য এ সম্পর্কে বিতর্ক আছে এবং বহু ঐতিহাসিক এই মত স্বীকার করেননি।
  • (২) বিরোধী মতের প্রবর্তকরা বলেন যে, সম্ভবতঃ এই “চন্দ্র” হলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য অথবা গুপ্তবংশীয় প্রথম চন্দ্রগুপ্ত। ডঃ মজুমদার বলেন যে, এই “চন্দ্র” হলেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। কারণ, অন্য কোনো রাজা মেহরৌলী লিপির মতে একদিকে বঙ্গ ও অন্যদিকে সিন্ধু অঞ্চলে অভিযান করতে সক্ষম ছিলেন না। একমাত্র সমুদ্রগুপ্তের পুত্র ও উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তই তা পারতেন।
  • (৩) ডঃ গয়াল বলেন যে, মেহরৌলী লিপিতে বলা হয়েছে যে, এই “চন্দ্র” রাজা বৈষ্ণব ছিলেন, দীর্ঘকাল রাজত্ব করেন এবং তাঁর খ্যাতি তাঁর মৃত্যুর বহু পরেও স্থায়ী ছিল। এই ইঙ্গিতগুলি অবশ্যই দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের দিকেই নির্দেশ করে। তবে তা সমুদ্রগুপ্তের প্রতিও প্রয়োগ করা যায়।
  • (৪) গয়ালের মতে, ‘চন্দ্র’ যদি নাম হিসেবে না নিয়ে রাজার দেহ-সুষমা বর্ণনার জন্য বিশেষণ হিসেবে ধরা যায় তবে মেহরৌলী স্তম্ভের বর্ণনা সমুদ্রগুপ্তের প্রতিও প্রযুক্ত হতে পারে। যাই হোক, যদি এই ব্যক্তি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত হন তবে এই লিপি অনুসারে তিনি বঙ্গদেশ ও বাহ্লীক দেশ জয় করেন।
  • (৫) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বঙ্গদেশ জয় কেন করবেন এই প্রশ্ন গবেষকরা তুলেছেন। কারণ সমুদ্রগুপ্ত আগেই বঙ্গদেশের অধিপতি ছিলেন। তাছাড়া বাংলা ছিল গুপ্তদের আদি বাসস্থান। ডঃ মজুমদার বলেছেন যে, হয়ত দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বাংলার রাজাদের বিদ্রোহ দমন করেন অথবা সমতট বা পূর্ব বাংলা জয় করেন।
  • (৬) বাহ্লীক দেশ বা ব্যাকট্রিয়া জয় করা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের পক্ষে অসম্ভব ছিল। কারণ, পশ্চিম পাঞ্জাব ও আফগানিস্থান তার এক্তিয়ারের বাইরে ছিল। এ্যালানের মতে, এক্ষেত্রে বাহ্লীক বলতে সিন্ধু ও পাঞ্জাব অঞ্চলের আর্য সংস্কৃতির বাইরের উপজাতিদের বোঝান হয়। ডঃ বি. এন. মুখার্জীর মতে, সিন্ধু নদ অঞ্চলের উপজাতিদেরই এক্ষেত্রে বাহ্লীক বলা হয়েছে।

সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত খুব পরাক্রান্ত রাজা ছিলেন বলা চলে না। তিনি তাঁর পিতার মত সাম্রাজ্য গঠন করেননি। কয়েকজন হীনবল শাসককে তিনি পরাস্ত করেন মাত্র। মেহরৌলী লিপিতে কৃতিত্ব যাকে পৃথিবী বিজেতা বলা হয়েছে তিনি সম্ভবতঃ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নন, তিনি সমুদ্রগুপ্ত। যাই হোক, এ সম্পর্কে স্থির কিছু জানা যায়নি।

উপসংহার :- দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কৃতিত্ব তার রাজ্যজয়ের দ্বারা স্থাপিত না হলেও, শিল্প, সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকরূপে তিনি খ্যাতি পেয়েছেন। তাঁর কীর্তি অনেকাংশে তাঁর পিতার অপেক্ষা জনমানসে বেশী স্থান পেয়েছে। কিংবদন্তী তাকে শকারি বিক্রমাদিত্য আখ্যা দিয়ে অমরত্ব দিয়েছে।

(FAQ) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজ্য জয় সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. শকারি কাকে বলা হত?

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত।

২. কোন গুপ্ত সম্রাটকে বিক্রমাদিত্য বলে মনে করা হয়?

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত।

৩. দেবী চন্দ্রগুপ্তম কার লেখা নাটক?

বিশাখদত্ত।

৪. কোন গুপ্ত রাজা শকদের পরাজিত করেন?

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত।

Leave a Reply

Translate »