পাল যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা

পাল যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা প্রসঙ্গে কৃষি, খনিজ সম্পদ, বস্ত্র শিল্প, চিনি শিল্প, বাণিজ্য, ভূমি ব্যবস্থা, শহর, বন্দর ও সামাজিক দারিদ্র্যতা সম্পর্কে জানবো।

পাল যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা

বিষয় পাল যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা
সাম্রাজ্য পাল সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা গোপাল
শ্রেষ্ঠ রাজা দেবপাল
ভাস্কর ধীমান ও বীতপাল
পাল যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা

ভূমিকা :- পাল যুগের শাসন কালে বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা মোটামুটি স্বচ্ছল ছিল। পাল যুগের ভূমি পট্টলীগুলি পরীক্ষা করলে ভূমির আয় এবং ভূমি হতে কি উৎপাদন হত তা মোটামুটি জানা যায়।

কৃষি

  • (১) কৃষিই ছিল জনসাধারণের প্রধান জীবিকা। চাউল, আখ, আম, নারিকেল, বাঁশ প্রভৃতি দ্রব্য জমিতে প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হত। বাংলা সুগন্ধি শালি ধানের জন্য বিখ্যাত ছিল। রামচরিত থেকে জানা যায় যে, বাংলায় নানা জাতের ধানের উৎপাদন হত। অন্যান্য পাল লিপিতে ধান ছাড়া অন্যান্য ফসলের কথা বলা হলেও ধান ছিল প্রধান ফসল।
  • (২) দেবপালের মুঙ্গের লিপি থেকে জানা যায় যে, তার দান করা জমিতে আম ও পুকুরে মাছ উৎপাদিত হত। নারায়ণ পালের ইরদা লিপি থেকে জানা যায় যে, জমি থেকে লবণ উৎপাদনও হত। দক্ষিণ মেদিনীপুরের দাঁতন, তৎকালীন দণ্ডভুক্তি সমুদ্রের জল থেকে লবণ তৈরির জন্য প্রসিদ্ধ ছিল।
  • (৩) উত্তর বাংলায় বিখ্যাত পুণ্ড্রী আখের উৎপাদন হত। এই আখের চিনি খুবই উৎকৃষ্ট ছিল। এছাড়া কাঁঠাল, খেজুর, পান, চাউল, কলা প্রভৃতি প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হত। এছাড়া লবঙ্গ, দারুচিনি, সুপারি, লঙ্কার চাষ হত।
  • (৪) বাংলায় উচ্চমানের তুলা উৎপাদিত হত। ভিনিসীয় পর্যটক মার্কোপোলো বাংলার উচ্চমানের তুলার কথা বলেছেন। চর্যাপদে বাংলার তুলার চাষের কথা উল্লেখ আছে। বাংলায় রেশমের উৎপাদন হত। চর্যাপদে রেশমের গুটিপোকার উল্লেখ আছে।

বন্যপ্রাণী

বন্য প্রাণীর মধ্যে পাহাড়পুরের পোড়ামাটির ফলকের চিত্র থেকে গরু, ঘোড়া, শূকর, উট, হরিণ ও বানরের কথা জানা যায়। বাংলার বাঘ ও হাতির উল্লেখ নেই।

খনিজ সম্পদ

  • (১) পাল যুগে বাংলায় প্রচুর খনিজ দ্রব্যের উৎপাদন হত। মেদিনীপুরে লবণ উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে। বাঁকুড়া, বীরভূম ও রাঢ়দেশের জঙ্গলখণ্ডে প্রচুর লোহা পাওয়া যেত। খনিজ লোহাকে গালাবার প্রণালী এই সময় ভালভাবে জানা ছিল।
  • (২) বাংলার উৎকৃষ্ট মানের ইস্পাত থেকে বিখ্যাত দোফলা বা দুই দিকে ধারযুক্ত তরবারি তৈরি হত। এই তরবারির খুব চাহিদা ছিল। সুবর্ণরেখা অঞ্চলে তামার খনি ছিল। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায়, পুণ্ড্রবর্ধন ও ত্রিপুরাতে সোনার খনি ছিল।
  • (৩) পেরিপ্লাসের মতে, গঙ্গার মোহনায় মুক্তা পাওয়া যেত। বাংলা থেকে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে লবণ রপ্তানি হত। এছাড়া স্বর্ণকাররা নানা ধরনের সোনার গহনা তৈরি করত। বাংলার পিতল ও কাঁসার জিনিস বিখ্যাত ছিল।

বস্ত্র শিল্প

  • (১) পাল যুগে বাংলায় শিল্পের মধ্যে বস্ত্রশিল্প ছিল বিখ্যাত। বাংলার মিহি সুতার কাপড়ের আরব ও চীনা পর্যটকরা উচ্চ প্রশংসা করেছেন। এছাড়া মোটা কাপড় প্রচুর তৈরি হত। চর্যাপদে তাঁত শিল্পের কথা জানা যায়।
  • (২) জনৈক সহজিয়া গুরুর নাম ছিল ভগ্নীপদী তন্ত্রী অর্থাৎ তাঁতী কথাটি তার নামের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বুঝা যায় যে, তিনি তাঁতী ছিলেন। সদুক্তিকর্ণামৃতে বলা হয়েছে যে, বাংলার বারাঙ্গনারা খুবই মিহি সূতার বসন পরত। বাংলায় “দুকুল” নামে নরম রেশমের কাপড় তৈরি হত।

চিনি শিল্প

চিনি শিল্প ছিল বাংলার অন্যতম প্রধান শিল্প। গুড় ও চিনি এবং ঝোলগুড় বাংলায় প্রচুর তৈরি হত। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে, সিংহল, আরবদেশ ও পারস্যে গুড় ও চিনি রপ্তানি হত। ত্রয়োদশ শতকে পর্তুগীজ পর্যটক বারবোসা দেখেন যে, বাংলার চিনির সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের চিনির রপ্তানির প্রতিযোগিতা চলত।

অন্যান্য শিল্প

কুমোর মাটির জিনিস তৈরি করত। ছুতোর কাঠের জিনিস তৈরি করত। ঘর, বাড়ি, মন্দির, পালকি, গরুর গাড়ি, নৌকার জন্য কাঠের কাজের খুব চাহিদা ছিল। বাংলার জাহাজ নির্মাণ শিল্প ছিল বিখ্যাত। বাংলায় নৌ বিতান, নৌ ঘাট প্রভৃতি কথার ব্যাপক ব্যবহার থেকে নৌ শিল্পের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বাণিজ্য

  • (১) পাল যুগে বাংলার বাণিজ্য সম্ভবত খুব সচ্ছল ছিল না। এই যুগে স্বর্ণমুদ্রার চলন ছিল না। পাল সম্রাটরা রূপা ও তামার মুদ্রা চালু করলেও এই মুদ্রার সংখ্যা বেশী ছিল না। ফলে বাণিজ্য ও আদান-প্রদানে বাধা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক ছিল। মুদ্রার অভাবে লোকে ‘কড়ি’ ব্যবহার করত।
  • (২) ধর্মপালের দ্রাক্ষমা নামে রৌপ্য মুদ্রার কথা জানা যায়। কিন্তু এই মুদ্রায় খাদের পরিমাণ ছিল বেশী। সেন যুগে রৌপ্যমুদ্রা লোপ পায়। ডঃ নীহাররঞ্জনের মতে, “এখনও পর্যন্ত পাল-সেন যুগের একটিও স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া যায়নি।” কপর্দ্দক পুরাণ নামে খুবই নিম্নমানের মুদ্রা ছিল। মুদ্রার অভাবে বাণিজ্যের অবনতি হয়।

বৈদেশিক বাণিজ্য

  • (১) মুদ্রা সংকট এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার জন্য পাল যুগে বাংলার বহির্বাণিজ্য হ্রাস পেতে থাকে। উত্তর ভারতে তুর্কী আক্রমণও ছিল এই বাণিজ্য নষ্ট হওয়ার এক প্রধান কারণ। তাছাড়া বাংলায় বাইরে থেকে রূপা আমদানি কমে গেলে মুদ্রা সঙ্কট এবং তার দরুন বাণিজ্যে ঘাটতি দেখা দেয়। এই জন্যই পাল যুগের মুদ্রায় খাদের ভাগ বেশী দেখা যায়।
  • (২) আরব বণিকরা সমুদ্রপথে আধিপত্য দ্বারা বাংলার বহির্বাণিজ্য গ্রাস করে। অষ্টম শতক থেকে ভারত মহাসাগরে ও বঙ্গোপসাগরে আরব নাবিকরা আসতে থাকে। বাংলার সপ্তডিঙা মধুকর আর পণ্য নিয়ে সমুদ্রে যেতে পারেনি।
  • (৩) ডঃ নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, আরব আক্রমণের কোনো নির্দিষ্ট প্রকাশ না থাকলেও, সকল ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একথা সত্য বলে মেনে নেওয়া যেতে পারে। সমাজ কৃষি-নির্ভর হয়ে পড়ে। শ্রেষ্ঠী প্রভৃতি শ্রেণী তাদের প্রভাব হারিয়ে ফেলে।

ভূমি ব্যবস্থা

  • (১) কৃষি-প্রধান সমাজে ভূমি ব্যবস্থাই ছিল অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। পাল যুগের ভূমিপট্টলীগুলিতে তার পরিচয় পাওয়া যায়। রাজা যখন জমি দান করতেন তখন রাজা জমির ক্রেতাকে বংশ-পরম্পরায় রাজস্ব প্রদানের দায় থেকে মুক্তি দিতেন। পাল যুগে ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধ বিহারের জন্য ভূমি দান করা হত। গৃহস্থরা মন্দির ও মঠে ভূমি দান করত।
  • (২) পাল যুগে রাজা যখন জমি দান করতেন তখন জমি গ্রহীতা প্রচলিত দশটি অপরাধের জন্য এই জমিতে অপরাধীর ওপর জরিমানা করার অধিকার পেত। রাজা এই অধিকার ত্যাগ করতেন। রাজা অঙ্গীকার করতেন যে, এই প্রদত্ত জমি থেকে তিনি কোনো কিছু গ্রহণ করবেন না।
  • (৩) এই জমিতে যে কৃষকরা বাস করত তারা নতুন জমি গ্রহীতাকে কর দিত। ভাগ-ভোগ কর বা উৎপন্ন ফসলের ১/৬ ভাগ রাজা গ্ৰহণ করতেন। এই কর দ্রব্যের মাধ্যমে দেওয়া যেত। হিরণ্য কর নগদে, প্রত্যয় বা অন্যান্য কর দ্রব্যে দেওয়া হত। অকর্ষিত বা কর্ষনের অযোগ্য জমিতে কর নেওয়া হত না। জমি শর্তহীনভাবে দান বা বিক্রয় করা হত।

জমির শ্রেণী

পাল যুগের আগে পর্যন্ত শস্যের মান অনুযায়ী জমির শ্রেণী স্থির করা হত। পাল আমলে জমি কিসের ভিত্তিতে মাপা হত ও শ্রেণীবদ্ধ হত তা জানা যায়নি। হয়ত পাল যুগের আগের প্রথা কুল্যবাপ, দ্রোণ, আঢ়বাপ প্রভৃতি মাপ চালু ছিল। এ সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা যায়নি।

জমির মালিক

পাল যুগে জমির মূল মালিকানা ছিল রাষ্ট্রের বা রাজার। যাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল তারা মধ্যসত্ব হিসেবে ভোগ করত।

শহর ও নগর

পাল যুগে কয়েকটি নগর বা শহরের নাম জানা যায়, যথা, তাম্রলিপ্ত, পুণ্ড্রবর্ধন, রামাবতী, সোমপুরী, দণ্ডভুক্তি, কর্ণসুবর্ণ, নবদ্বীপ, পাট্টকেরা প্রভৃতি। কোটিবর্ষ ছিল পুনর্ভবা তীরে একটি শাসন কেন্দ্র। নগরগুলিতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়। নগর জীবনে বিলাসিতা ও আড়ম্বর ছিল।

বন্দর

এ যুগে বাংলার প্রাচীন বন্দর তাম্রলিপ্তের পতন ঘটে। সপ্তম খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হিউয়েন সাঙ তাম্রলিপ্ত বন্দরের সমৃদ্ধির কথা বলেছেন। অষ্টম খ্রিস্টাব্দ থেকে আর কেউ তাম্রলিপ্তের উল্লেখ করেন নি। তাম্রলিপ্তের পরিপুরক বন্দর দীর্ঘকাল বাংলায় গড়ে উঠে নি। পরে সপ্তগ্রাম বন্দরের উদ্ভব হয়।

সমাজে দারিদ্র্যতা

সমাজে দরিদ্র, শ্রমজীবি, কৃষক, কারিগর শ্রেণী ছিল। তারা অর্থহীন বলে দরিদ্র শ্রেণী হিসাবে কায়ক্লেশে দিন কাটাত। পাশাপাশি উচ্চশ্রেণীর লোকেরা সমৃদ্ধি ও স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করত। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের নিয়ম অনুযায়ী সামন্তরাই সমাজের অর্থ ও সমৃদ্ধি ভোগ করে স্ফীত হতে থাকে। সমকালীন সাহিত্যে এই অবস্থার ছায়া দেখা যায়।

উপসংহার :- উচ্চ শ্রেণীর বিলাস বৈভবের কথা সদুক্তি কর্ণামৃত, উদয়সুন্দরী কথায় পাওয়া যায়। এর ফলে কৃষকদের উপর শোষণ বৃদ্ধি পায়। সাধারণ লোকে ছিন্ন বস্ত্র ও ভগ্ন কুটীরে বাস করত বলে সমকালীন সাহিত্যে উল্লিখিত আছে।

(FAQ) পাল যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে?

গোপাল।

২. গোপালের পর কে সিংহাসনে আরোহণ করেন?

ধর্মপাল।

৩. কোন পাল রাজার সময় ত্রিশক্তি দ্বন্দ্ব শুরু হয়?

ধর্মপাল।

৪. পাল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

দেবপাল।

৫. পাল যুগের বিখ্যাত ভাস্কর কারা ছিলেন?

ধীমান ও বীতপাল।

Leave a Reply

Translate »