পাল যুগের সামাজিক অবস্থা

পাল যুগের সামাজিক অবস্থা প্রসঙ্গে বর্ণভেদ, বর্ণাশ্রম প্রথার প্রভাব, দৈনন্দিন জীবন, অবসর বিনোদন, পোশাক ও অলঙ্কার, নৈতিক মান ও নারীর অবস্থা সম্পর্কে জানবো।

পাল যুগের সামাজিক অবস্থা

বিষয় পাল যুগের সামাজিক অবস্থা
সাম্রাজ্য পাল সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা গোপাল
শ্রেষ্ঠ রাজা দেবপাল
ভাস্কর ধীমান ও বীতপাল
পাল যুগের সামাজিক অবস্থা

ভূমিকা :- পাল আমলে বাংলায় যেসব জাতির নাম পাওয়া যায় সেগুলো হলো কিরাত, নিষাদ, দামিল,পুন্ড্র। অনুমানকরা হয় যে পাল যুগের বাংলার জনগন তথা এইসব জাতিসমূহ এক উন্নত সভ্যতা ও সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।

বর্ণভেদ

পাল যুগের সমাজে বর্ণভেদ প্রথার তীব্রতা ছিল না এবং এর কারণ ছিল বৌদ্ধধর্মের প্রভাব, বৌদ্ধধর্মের সর্বসম্মত দৃষ্টিভঙ্গী, পাল রাজাদের বৌদ্ধধর্মের প্রতি অনুরক্তি। এছাড়া পাল রাজারা নিজেরা উচ্চ বংশজাত ছিলেন না। এজন্য তারা বর্ণভেদকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন না।

সমাজ ব্যবস্থা

  • (১) বর্ণভেদ না থাকলেও সমাজের শীর্ষে ব্রাহ্মণরা অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই যুগের অধিকাংশ ভূমিপট্টল্লীতে দেখা যায়, ভূমি গ্রহীতা ছিলেন ব্রাহ্মণ শ্রেণী। তাছাড়া পাল রাজাদের দরবারে বংশানুক্রমিকভাবে ব্রাহ্মণ মন্ত্রীরা কাজ করতেন এবং তারা নিজেদের কৃতিত্ব বাদল স্তম্ভলিপিতে জাহির করেছেন।
  • (২) পাল যুগে করণ কায়স্থরা বিশেষ প্রাধান্য ভোগ করতেন। ব্রাহ্মণরাও অনেক সময় করণিকের বৃত্তি নিতেন। বাণিজ্য হ্রাস পাওয়ায় বৈশ্যদের প্রভাব কমে যায়। বৈদ্যরা এই সময় উপবর্ণরূপে গড়ে উঠছিল। কৈবর্তরা বেশ প্রভাবশালী ছিল বলে জানা যায়। দিব্যর বিদ্রোহ কৈবর্ত সম্প্রদায়ের প্রভাব-প্রতিপত্তির প্রমাণ দেয়। সমাজের নিম্নতম স্তরে ছিল চণ্ডাল, শবর, মেদ, ডোম প্রভৃতি সম্প্রদায়।

বর্ণাশ্রম প্রথার প্রভাব

  • (১) পাল যুগে বৌদ্ধগৃহীরা মনুর শাসন মেনে চলত। একমাত্র বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তা থেকে মুক্ত ছিল। তবে বাংলায় তখনও পর্যন্ত স্মৃতি শাস্ত্র রচিত না হওয়ায় সমাজ জীবনে স্মৃতিশাস্ত্রের বাঁধন ও আচারের আঁটসাট কম ছিল।
  • (২) বর্ণাশ্রম প্রথার প্রভাব সেন যুগে যত তীব্র ছিল পাল যুগে তত তীব্র ছিল না। বর্ণভেদ ও স্মৃতি ব্যবস্থার প্রধান প্রচারক ভবদেব ভট্ট পাল যুগের শেষ দিকে জীবিত ছিলেন। এজন্য তাঁর প্রভাব পাল যুগে প্রখর ছিল না।

দৈনন্দিন জীবন

  • (১) পাল যুগের সাহিত্য, ভাস্কর্য, পাহাড়পুর, ময়নামতীর পোড়ামাটির ফলক থেকে দৈনন্দিন জীবনের চিত্র পাওয়া যায়। মাছ ভাত ছিল বাঙালীর প্রধান খাদ্য। মৌরলা মাছের তরকারী, নুতন সুগন্ধি চালের ভাত, নলিতা শাকের ঝোল ছিল উৎকৃষ্ট খাদ্য।
  • (২) পাহাড়পুর ও ময়নামতীর ফলকে মাছ কাটা ও মাছের চিত্র দেখা যায়। ডালের নাম সমকালীন সাহিত্যে না থাকলেও, ডাল ছিল প্রাতাহিক খাদ্য। মাংসেও বাঙালীর অরুচি ছিল না। পাঁঠা ছাড়া, হরিণের মাংস প্রিয় খাদ্য ছিল। হেমন্তে নূতন গুড়ের গন্ধে বাতাস আমোদিত হত। বাংলার নলেন গুড় ও চিনির সুখ্যাতি ছিল। বাঙালীদের মধ্যে ব্রাহ্মণ ছাড়া সকল সম্প্রদায় বেশ সুরা পান করত।

অবসর বিনোদন

পাশা, দাবা খেলে, নাচ, গানে বাঙালীরা অবসর বিনোদন করত। নানা রকম যন্ত্রসঙ্গীতেও বাঙালীরা নিপুণ ছিল। রাজা, সামন্ত ও শাসকশ্রেণী শিকারে আসক্ত ছিল। লোকে পায়ে হেঁটে, পালকি বা ঘোড়া বা হাতী চড়ে যাতায়াত করত। জলপথে নৌকায় যাতায়াত করত। বাড়ীগুলি মাটি, কাঠ ও ইটের দ্বারা তৈরী হত। রাজপ্রাসাদ ইট ও কাঠ দিয়ে তৈরী হত।

পোশাক ও অলঙ্কার

  • (১) লোকে খাটো বহরের ধুতি পরত ও গায়ে চাদর দিত। বাংলার বাইরে গেলে মেরজাই, নাগরা জুতো পরত। নারীরা শাড়ী পরত। ধনী গৃহের নারীরা শাড়ীর সঙ্গে চেলি, ওড়না ব্যবহার করত। পুরুষেরা সাধারণত মাথা সিঁথি রেখে টেরি বাগাত, পাগড়ি বা টুপি পরত না।
  • (২) নারীরা সিঁদুর, কাজল পরত, এলো খোঁপা বাঁধত, কর্পূর ও রং দিয়ে প্রসাধন করত, সোনা-রূপার অলঙ্কার পরত। তবে দরিদ্র নারীদের ও পল্লী রমণীদের ভাগ্যে এ সকল বিলাসিতা অকল্পনীয় ছিল। কবি উমাপতি ধরের মতে, “তারা সোনা ও কুষ্মাণ্ড পুষ্পের মধ্যে কি পার্থক্য তা জানতেন না।”

নৈতিক মান

শহুরে ধনীদের মধ্যে নৈতিক শৃঙ্খলার অভাব ছিল। সভানন্দিনীদের প্রশংসা ও ধনীদের রক্ষিতাদের প্রশংসা কাব্যে দেখা যায়। তবে এই অসংযম সেন যুগের মত ব্যাপক ছিল না। ব্রাহ্মণ লেখকরা এই সকল অনাচারের নিন্দা করেছেন। তাছাড়া সাধারণ লোক এত গরীব ছিল যে, তাদের পক্ষে বিলাসিতা ও ইন্দ্রিয়াশক্তির জন্য ব্যয়-বাহুল্য সাধ্যের অতীত ব্যাপার ছিল। সাধারণ লোক বার, ব্রত, পূজা-পার্বণের দ্বারাই আনন্দ লাভ করত।

নারীর অবস্থা

বাৎস্যায়ণ গৌড় নারীদের মৃদুভাষিণী, শান্ত স্বভাবা, সুন্দরী বলে বর্ণনা দিয়েছেন। বাৎস্যায়ণের এই বিশ্লেষণ সর্বদা সত্য না হলেও অনেকাংশে সত্য। পুরুষেরা সাধারণত একটি বিবাহ করত। তবে বহু বিবাহের উদাহরণও দেখা যায়। যৌতুক প্রথা ছিল। স্ববর্ণে বিবাহ হত। তবে অসবর্ণ বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল না। বিধবাকে সংযম ও কৃচ্ছসাধনার মধ্যে জীবন কাটাতে হত।

উপসংহার :- প্রাচীন বাংলার সমাজ-জীবনে ধর্ণবিন্যাস’ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গুপ্তযুগে আর্যসমাজের বৈশিষ্ট্যগুলি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও, পাল আমলে আর্যদের চতুর্বর্ণের অস্তিত্ব দেখা যায় না।

(FAQ) পাল যুগের সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে?

গোপাল।

২. গোপালের পর কে সিংহাসনে আরোহণ করেন?

ধর্মপাল।

৩. কোন পাল রাজার সময় ত্রিশক্তি দ্বন্দ্ব শুরু হয়?

ধর্মপাল।

৪. পাল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

দেবপাল।

৫. পাল যুগের বিখ্যাত ভাস্কর কারা ছিলেন?

ধীমান ও বীতপাল।

Leave a Reply

Translate »