ইতিহাসের প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান

ইতিহাসের প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান প্রাসঙ্গে প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস রচনার সমস্যা, প্রত্নতত্ত্বের অপরিহার্যতা, বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান, জীবাশ্ম , প্রাচীন মানুষের ব্যবহার্য হাতিয়ার ও অন্যান্য দ্রব্যাদি, গুহাচিত্র, প্রাচীন সমাধি এবং প্রাচীন ধর্মস্থানের ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে জানবো।

ইতিহাসের প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান

ঐতিহাসিক বিষয়ইতিহাসের প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান
উপাদানজীবাশ্ম, হাতিয়ার, গুহাচিত্র
রামাপিথেকাসভারত ও কেনিয়া
অস্ট্রালোপিথেকাসদক্ষিণ আফ্রিকা
পিকিং মানবচীন
হাত কুঠারপ্রাচীন প্রস্তর যুগ
হাতিয়ারের ক্ষুদ্রত্বমধ্য প্রস্তর যুগ
হামানদিস্তানব্য প্রস্তর যুগ
ইতিহাসের প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান

ভূমিকা :- ইতিহাস মানুষের মনগড়া কথা নয়। হাতে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ নিয়ে ঐতিহাসিক তার ইতিহাস রচনার কাজে হাত দেন।

প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস রচনার সমস্যা

প্রাচীন যুগ – বিশেষ করে প্রাগৈতিহাসিক যুগ ও প্রায়-ঐতিহাসিক যুগের ইতিহাস রচনা করা অত্যন্ত জটিল ও সমস্যাবহুল। ঐতিহাসিক যুগের উপাদান হিসেবে কিছু লিখিত বিবরণ ও বইপত্র মিললেও পূর্ববর্তী দুই যুগের ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত।

প্রত্নতত্ত্বের অপরিহার্যতা

প্রাগৈতিহাসিক ও প্রায়-ঐতিহাসিক যুগের ইতিহাস সম্পূর্ণভাবে প্রত্নতত্ত্ব ও পুরাতত্ত্বের ওপর নির্ভরশীল। ঐতিহাসিক যুগের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকলেও বহু ক্ষেত্রে প্রত্নতত্ত্ব অপরিহার্য। যাই হোক, মাটির নীচে খননকার্য চালিয়ে স্মরণাতীত অতীত থেকে প্রাচীন মানুষ, তাদের জীবনযাত্রা ও সভ্যতার বহু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। মাটির নীচে খননকার্য চালিয়ে ভারতে হরপ্পা ও মহেন-জো-দারো এবং পশ্চিম এশিয়ার সুমের, ব্যাবিলন, আসিরিয়া, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ক্রিট, মিশর ও রোমের প্রাচীন সভ্যতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যায়।

বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান

প্রাগৈতিহাসিক ও প্রায়-ঐতিহাসিক যুগ সম্পর্কে জানবার জন্য ঐতিহাসিককে প্রত্নতত্ত্বের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলি হল জীবাশ্ম, প্রাচীন মানুষের ব্যবহার্য হাতিয়ার ও অন্যান্য দ্রব্যাদি, গুহাচিত্র এবং  প্রাচীন সমাধি ও মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ।

জীবাশ্ম

  • (১) জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীর আবহাওয়ায় বারংবার পরিবর্তন ঘটেছে। বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক যুগের বিভিন্ন প্রস্তর-স্তরে এর নানা প্রমাণ রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী কয়েক কোটি বছরের উষ্ণ যুগের পর এসেছে স্বল্পস্থায়ী হিম যুগ। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত চারটি বা তার বেশি হিম যুগের চিহ্ন রয়েছে।
  • (২) হিম যুগের ফলে প্রাণী ও উদ্ভিদ কুলের এক বিরাট অংশের বিলুপ্তি ঘটেছে। এইসব অনেক বিলুপ্ত প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবাশ্ম ছড়িয়ে আছে নানা স্থানে। এগুলি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ ছাড়াও, মানুষের হাড়গোড়, মাথার খুলি, দাঁত প্রভৃতিও আমাদের ইতিহাস রচনায় নানাভাবে সাহায্য করে।
  • (৩) মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে ভারত ও কেনিয়াতে প্রাপ্ত রামাপিথেকাস, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রাপ্ত অস্ট্রালোপিথেকাস ও জিনজেনথপাস, চিনের পিকিং মানব, হাইডেলবার্গ মানব, নিয়ান্ডারথাল মানব, রোডেশীয় মানব, ক্রো-ম্যাগনন মানব উল্লেখযোগ্য।

প্রাচীন মানুষের ব্যবহার্য হাতিয়ার ও অন্যান্য দ্রব্যাদি

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) বিভিন্ন যুগের পাথরের হাতিয়ার

প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষের তৈরি হাতিয়ার ও তাদের ব্যবহার্য দ্রব্যাদি ওই যুগের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

(১) প্রাচীন প্রস্তর যুগ

সৃষ্টির আদি লগ্নে প্রাচীন প্রস্তর যুগে মানুষ পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করত। তারা একটুকরো পাথরকে ভেঙে তা মোটামুটি ব্যবহারের উপযুক্ত করে তুলত। এই হাতিয়ারগুলি ছিল ভোঁতা ও অমসৃণ এবং এগুলির আকারও ছিল বিরাট। এই যুগে একই হাতিয়ার দিয়ে মাংস কাটা, কাঠ কাটা ও শিকারের কাজ চলত। এগুলিকে বলা হত ‘হাত কুঠার’। এ ছাড়াও ছিল পাথরের ছুরি, বর্শা, তিরের ফলা, কাঠ ও পাথর ফুটো করার যন্ত্র প্রভৃতি।

(২) মধ্য প্রস্তর যুগ

মধ্য প্রস্তর যুগের পাথরের হাতিয়ারগুলিতে উন্নতির ছাপ স্পষ্ট। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল ক্ষুদ্রত্ব। এই যুগের শেষ দিকে মানুষ কৃষিকার্য ও মৃৎশিল্পের কাজ শুরু করে।

(৩) নব্য প্রস্তর যুগ

নব্য প্রস্তর যুগ-এর হাতিয়ারগুলি ছিল অনেক বেশি মসৃণ, ধারালো ও ব্যবহারের উপযোগী। শস্যের বীজ বোনা এবং মাটি খোঁড়ার নতুন যন্ত্র তৈরি হল এ যুগেই। ফসল কাটার জন্য তৈরি হল কাস্তে। এল হামানদিস্তা, শিলনোড়া, জাঁতা প্রভৃতি যন্ত্র। এ যুগে কৃষিকাজ ও পশুপালন অনেক বেশি অগ্রসর হয়। মানুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তুলতে শুরু করে।

(৪) তাম্রপ্রস্তর যুগ

নব্য প্রস্তর যুগের পর মানুষ তামার ব্যবহার শুরু করে। কালক্রমে তামার সঙ্গে টিন ধাতু মিশিয়ে ব্রোঞ্জ নামে এক ধাতুসংকর তৈরি হয়। ভারতে নব্য প্রস্তর যুগ এবং ধাতুর যুগের মধ্যে কোনো সীমারেখা টানা সম্ভব নয়, কারণ তামা ও ব্রোঞ্জের ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ পাথরের ব্যবহারও করতে থাকে। তাই এই যুগকে ‘তাম্র- প্রস্তর যুগ’ বলা হয়।

(৫) লৌহ যুগ

এরপর আসে ‘লৌহ যুগ’। এই যুগের মানুষের ব্যবহার্য হাতিয়ার ও বিভিন্ন দ্রব্যাদি থেকে মানবসভ্যতার অনেক কথাই জানা যায়। এগুলি এই যুগের ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান।

(খ) মৃৎশিল্প

নব্য প্রস্তর যুগে কুমোরের চাকা আবিষ্কৃত হলে মৃৎশিল্পের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব সংঘটিত হয়। নানা রঙের ও নানা আকারের মৃৎপাত্র তৈরি হতে থাকে। অনেক সময় হাড়, কাঠি বা নখ দিয়ে নানা চিহ্ন বা চিত্র অঙ্কন করা হত। মৃৎপাত্র ছাড়াও এই আমলের বেশ কিছু মাটির মূর্তি, পাথরের বাটি, পুঁতি, লকেট, ঝিনুক জাতীয় জিনিসের মালা প্রভৃতি আবিষ্কৃত হয়েছে।

(গ) ইতিহাস রচনা দুরূহ

ঐতিহাসিক যুগের পূর্ববর্তী আমলের ইতিহাস রচনার কাজ অতি দুরূহ এবং সেখানে ইতিহাসের মূল উপাদান হল প্রত্নতত্ত্বভিত্তিক। ঐতিহাসিক যুগের ক্ষেত্রে অন্যান্য উপাদান থাকলেও প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলি এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

গুহাচিত্র

আদিম মানব গুহাতে বাস করত। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) আদিম গুহার শিল্পকলা

  • (১) প্রাচীন মানুষের বসবাসের এমন বহু গুহা আবিষ্কৃত হয়েছে যেগুলিতে প্রচুর চিত্র অঙ্কিত আছে, এগুলিকে গুহাচিত্র বলা হয়। গুহাগাত্রে রং ও রেখায় গন্ডার, ম্যামথ, বাইসন, হরিণ, ভালুক প্রভৃতি নানা ধরনের পশুশিকারের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোথাও ফুটে উঠেছে দলবদ্ধ শিকার বা দলবদ্ধ নৃত্য ও আনন্দ উৎসবের ছবি।
  • (২) বলা বাহুল্য, এইসব চিত্রাবলির উদ্দেশ্য কোনো শিল্পচর্চা নয় – ধর্মীয় বা জাদুবিশ্বাসই হল এর লক্ষ্য। সম্ভবত গুহার গভীরে লোকচক্ষুর অন্তরালে কোনো অদৃশ্য শক্তির উদ্দেশ্যে এই চিত্রগুলি অঙ্কিত হয়েছিল। মনে করা হয় আদিম মানব বিশ্বাস করত যে, চিত্রে যা ঘটেছে, বাস্তবেও তাই ঘটবে, অর্থাৎ জঙ্গলের জীবজন্তু শিকারির হাতিয়ারের আওতায় এসে পড়বে।

(খ) পশ্চিম ইউরোপের দৃষ্টান্ত

পশ্চিম ইউরোপ – বিশেষ করে ফ্রান্স ও স্পেনে এই ধরনের প্রচুর গুহাচিত্র মিলেছে। স্পেনের আলতামিরার গুহা-সহ ফ্রান্সের শতাধিক গুহায় প্রায় কয়েক হাজার চিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলি ইতিহাসের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

(গ) ভারতের দৃষ্টান্ত

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকা, বিহারের নওয়াদা জেলা, কাশ্মীর প্রভৃতি স্থানেও এইসব গুহাচিত্র মিলেছে।

প্রাচীন সমাধি এবং প্রাচীন ধর্মস্থানের ধ্বংসাবশেষ

প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রচুর সমাধিক্ষেত্র, ঘরবাড়ি, অট্টালিকা ও ধর্মস্থানের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন –

(ক) সমাধিক্ষেত্র

বিভিন্ন সমাধিক্ষেত্রে প্রাপ্ত মৃতদেহ, কঙ্কাল এবং সঙ্গে প্রাপ্ত দ্রব্যসামগ্রী প্রাচীন মানুষের জীবনচর্চার নানা কথা প্রকাশ করে। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই এই ধরনের প্রচুর সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। অনেক সমাধিক্ষেত্রে একই সঙ্গে একজন পুরুষ ও একজন নারী বা একই সঙ্গে বহু নারী ও পুরুষের দেহ মিলেছে। অনেক সময় মৃতদেহগুলিতে লাল রঙের প্রলেপ দেওয়া হত।

(খ) পিরামিড

এই সময় মানুষ বিশ্বাস করত যে, মৃত্যুতেই জীবনের শেষ নয় – মৃত্যুর পরও জীবন আছে। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে প্রত্যেকটি মৃতদেহের পাশে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, হাতিয়ার, অলংকার, খাদ্য, পানীয় এমনকি তার প্রিয় পশুও রেখে দেওয়া হত। এ সম্পর্কে মিশরের পিরামিডগুলির কথা বলা যেতে পারে। পিরামিড হল মিশরের রাজাদের সমাধি। রাজধানী কায়রোর কাছে নীলনদের অদূরে এই ধরনের প্রায় চল্লিশটি পিরামিড মিলেছে। এগুলি মিশরের রাজা বা সম্রাটদের সমাধিক্ষেত্র। সেখানে মৃত রাজার মরদেহ ‘মমি’ করে রেখে দেওয়া হত। এগুলি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

(গ) ধর্মস্থান

সমাধি ও পিরামিড ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে প্রাপ্ত ঘরবাড়ি ও ধর্মস্থানের ধ্বংসাবশেষ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রাচীন সুমেরে প্রত্যেক নগরে একজন করে নগর-দেবতা ছিলেন এবং প্রত্যেক নগরে একটি করে বিশাল মন্দির ছিল। এগুলির নাম ‘জিগুরাত’। প্রত্যেকটি ‘জিগুরাত’ ছিল যেন এক একটি দুর্গ। শস্যের গোলা থেকে অস্ত্রাগার, ধানভাণ্ডার সবই এখানে ছিল। ইতিহাসের উপাদান হিসেবে এগুলির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

উপসংহার :- ইতিহাসের প্রাচীন যুগ বিশেষ করে প্রাগৈতিহাসিক ও প্রায় ঐতিহাসিক যুগে কোন লিখিত উপাদান পাওয়া যায় নি বা পাওয়া গেলেও তা পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। তাই সেক্ষেত্রে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

(FAQ) ইতিহাসের প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পিকিং মানব কোথায় বাস করত?

চিন।

২. এক ঐতিহাসিক ও প্রায় ঐতিহাসিক যুগের ইতিহাস রচনার প্রধান উপাদান কি?

প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান।

৩. অস্ট্রালোপিথেকাস কোথায় বাস করত?

দক্ষিণ আফ্রিকা।

৪. রামাপিথেকাস পর্যায়ের মানুষের নিদর্শন কোথায় পাওয়া যায়?

ভারত ও কেনিয়া।

৫. প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষের প্রধান হাতিয়ারের নাম কি ছিল?

হাতকুঠার।

৬. হামানদিস্তা কোন সময় ব্যবহৃত হত?

নব্য প্রস্তর যুগে।

Leave a Comment