মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয়

মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শব্দের উৎপত্তি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বীকৃতি বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়, বিশ্ববিদ্যালয় গুলি সম্পর্কে হাসকিনসের মতামত, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মনোমালিন্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবৃন্দের মধ্যে অরাজকতা, সকল শাস্ত্রের জননী প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়, তুলুজ ও প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, হাইদেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, স্পেনের বিশ্ববিদ্যালয় ও ইতালির বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানবো।

মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয়

ঐতিহাসিক ঘটনামধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয়
বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ইতালি
প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ফ্রান্স
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ইংল্যান্ড
হাইদেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়জার্মানি
মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয়

ভূমিকা :- J. W. Thompson এবং E. N. Johnson এর লেখা থেকে মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিচয় পাওয়া যায়। ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে সালার্নো, বোলোগনা, প্যারিস এবং অক্সফোর্ড উল্লেখযোগ্য।

বিশ্ববিদ্যালয় শব্দের উৎপত্তি

University শব্দটির উদ্ভব হয়েছিল লাতিন শব্দ ‘Universitas’ থেকে। যার প্রকৃত অর্থ ছিল ‘সমস্ত শিক্ষক ও ছাত্র।

বিশ্ববিদ্যালয় গুলির স্বীকৃতি

  • (১) সালার্নো বিশ্ববিদ্যালয়টি চিকিৎসাবিদ্যার কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছিল। বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রখ্যাত শিক্ষক ছিলেন Imerius ১১৫৮ খ্রিস্টাব্দে এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন ফ্রেডারিক বারবারোসা।
  • (২) প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রখ্যাত শিক্ষক ছিলেন অ্যাবেলার্ড। ১২০০ খ্রিস্টাব্দে ফিলিপ অগাস্টাস প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়টিকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন অর্থাৎ ১২০০ খ্রিস্টাব্দেই প্যারিস বিশ্ববিদালয়টি গড়ে উঠেছিল।

বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়

  • (১) বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় আসলে গিল্ড হিসাবে গড়ে উঠেছিল। প্রথম গিল্ড রূপে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয় বা University ছিল বোলোগনা। যে প্রতিষ্ঠানে সমস্ত জায়গা থেকে জনগণ আসে তা ‘Studium Generale’ বলে পরিচিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে এই নামে অভিহিত করা হত।
  • (২) বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলাবিদ্যা বা Arts শিক্ষা দেওয়া হত। এছাড়া আইন বা Law শিক্ষারও সুবন্দোবস্ত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘরগুলির এবং খাবারের বেশী দামের বিরুদ্ধে ছাত্রবৃন্দ সোচ্চার হয়েছিল। বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় গুলি সম্পর্কে হাসকিনসের মতামত

  • (১) Haskins তাঁর “Rise of Universities’-এ বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষকদের নিয়মানুবর্তিতার প্রসঙ্গটি তুলে ধরেছেন। যা বর্তমানকালেও ভাবনার বিষয়। একজন অধ্যাপক একদিনের জন্যও অনুপস্থিত থাকতে পারতেন না। যদি তিনি ছুটি নিতেন তাহলে তাকে উপযুক্ত কারণ দেখাতে হত। শহরের বাইরে গেলে কবে তিনি ফিরে আসবেন সে সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলতে হতো।
  • (২) যদি তিনি তাঁর ক্লাসে পড়াতে না পারতেন তাহলে তাকে জরিমানা করা হত। তার পড়ানোর বাইরে কোনো অযৌক্তিক বক্তব্য পেশ করতে পারতেন না এবং অধ্যায়গুলিকে বাকী রাখতে পারতেন না। কোনো অধ্যাপকই সারা বছর ভূমিকা এবং পুস্তকতালিকা বলে নিজের কর্তব্য সারতে পারতেন না।

প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভাগ

ফ্রান্সের প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রূপে অ্যাবেলার্ড বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়কে ভৌগোলিক দিক থেকে চারটি Nation-এ ভাগ করা হয়েছিল। এই চারটি প্রদেশ হল –

  • (i) ফরাসী Nation – ফরাসী, ইতালিয় এবং স্পেনীয়রা ছিল।
  • (ii) Picard – নিম্ন দেশগুলির জনগণ ছিল।
  • (iii) Norman – ইংরেজ ও জার্মানি ছিল।
  • (iv) উত্তর ও পূর্ব ইউরোপ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মনোমালিন্য

  • (১) মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা মাঝেমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ত। তারা তাদের বিনোদন বলতে উদ্দাম আনন্দ ও মদ্যপানকে বেছে নিয়েছিল। মাঝে মধ্যেই ছাত্রবৃন্দ যৌনতায় জড়িয়ে পড়ত।
  • (২) অধ্যাপকরা ছাত্র-ছাত্রীদের সংযত থাকার জন্য এবং নৈতিকতার জন্য বক্তৃতা ও পরামর্শ দিলেও তারা সেগুলি সবসময় মানতে রাজী ছিল না। বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দের মধ্যে অনড় মনোভাব দেখা যায়। ১২২২ খ্রিস্টাব্দে বোলোগনাতে ছাত্রবৃন্দ ও অধ্যাপকদের মতান্তরের কারণে পাড়ুয়াতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবৃন্দের মধ্যে অরাজকতা

  • (১) Coulton এর “Life in the Middle Ages” নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবৃন্দ মাঝে মধ্যেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ত। রাস্তার মধ্যে তারা বন্ধের সময় অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করত। অন্যদের অপমানিত করতেও দ্বিধা বোধ করত না।
  • (২) রোমের ছাত্রবৃন্দও সমাজের নিচু স্তরের ব্যক্তিদের সঙ্গে কলহ করত। চুরি, ডাকাতি ও অন্যান্য অসামাজিক কাজে তাদের জুড়ি মেলা ভার ছিল। নৈতিকতার অনেক দূরে তারা অবস্থান করত। হাসকিনসও তার “Studies in Medieval Culture” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ছাত্রবৃন্দ শাস্তির বদলে অশান্তির বাতাবরণ তৈরী করত।
  • (৩) বেশীরভাগ ছাত্রই রাস্তায় অস্ত্র নিয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ত, নাগরিকদের আক্রমণ করত, ঘরবাড়িতে ভাঙচুর চালাত, নারীদের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করত। হাসকিনস তাঁর “Studies in Medieval Culture” গ্রন্থে ছাত্রবৃন্দের অনৈতিকতার পাশাপাশি পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী ছাত্রবৃন্দের কথাও বলেছেন।

সকল শাস্ত্রের জননী প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়

পোপ সপ্তম গ্রেগরী প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘সকল শাস্ত্রের জননী’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ১২৩১ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে একথা বলেছিলেন। কারণ, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় ধর্মশাস্ত্রের দিক থেকে প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এবং নতুন অনেক বিষয়ের পঠন-পাঠনের কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছিল।

তুলুজ ও প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা

পোপ নবম গ্রেগরী ক্যাথারবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ১২২৯-৩০ খ্রিস্টাব্দে তুলুজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৩৪৭ খ্রিস্টাব্দে চতুর্থ চার্লস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়।

অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়

  • (১) প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু সংখ্যক ইংরেজ শিক্ষাগ্রহণ করত। এই সমস্ত ইংরেজ ছাত্রবৃন্দের প্রচেষ্টায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল ১১৭০ খ্রিস্টাব্দে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছু পণ্ডিত ব্যক্তি বেরিয়ে এসে ১২০৯ খ্রিস্টাব্দে কেমব্রিজ শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলেছিল।
  • (২) বিশপ Ely এর দ্বারা ১২৩০ খ্রিস্টাব্দে কেমব্রিজ শিক্ষাকেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পেয়েছিল। ইংল্যান্ডের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় রূপে অক্সফোর্ড পরিচিত ছিল। অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য ও বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়।

হাইদেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়

জার্মানিতে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় রূপে গড়ে উঠেছিল হাইদেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়। ১৩৮৫ খ্রিস্টাব্দে রাইনের ইলেকটর প্রথম প্যালাটাইন এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা করেন। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুসরণ করে এখানকার পঠন-পাঠন পদ্ধতি গড়ে উঠেছিল।

স্পেনের বিশ্ববিদ্যালয়

  • (১) মধ্যযুগের ইউরোপে আধুনিক শিক্ষার বাহন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। আধুনিক ধর্মচর্চা, বিজ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক জাগরণ এখান থেকেই শুরু হয়েছিল। বুদ্ধি বিভাসিত দর্শনের সূচনাও এখান থেকেই। স্পেনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল।
  • (২) স্পেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি রাজকীয় তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সরকারী নিয়ন্ত্রণেও ছিল। স্পেনের বিশ্ব-বিদ্যালয়গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল Salamanca, Valencia, Valladolid প্রভৃতি।

ইতালির বিশ্ববিদ্যালয়

  • (১) সালার্নো বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা বিষয়ক ও বিজ্ঞানের দিক থেকে উন্নত ছিল। গ্রীকো-রোমান চর্চা অনুসারে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ, সিসিলি থেকে আরবীয় ঔষধপত্র ইতালির বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন এবং বাইজান্টাইন চিকিৎসাবিদদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়।
  • (২) দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতকে ইতালিতে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল। এর মধ্যে বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ছাত্রবৃন্দের দ্বারা গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল। ইতালিতে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে পাড়ুয়া, ভেনিস, নেপলস প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

উপসংহার :- Alan B. Cobban তাঁর “Universities in the Middle Ages” গ্রন্থে বলেছেন, “মধ্যযুগে শিক্ষা চর্চার কেন্দ্র ও জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি গড়ে উঠেছিল। মধ্যযুগেও যেমন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠার প্রাসঙ্গিকতা ছিল বর্তমান যুগেও সেই প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।”

(FAQ) মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় অবস্থিত?

ইতালি।

২. জার্মানির প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় কোনটি?

হাইদেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়।

৩. ইংল্যান্ডের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় কোনটি?

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।

৪. প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয় কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?

চতুর্থ চার্লস ১৩৪৭ খ্রিস্টাব্দে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment