গুপ্ত যুগের বাণিজ্য

গুপ্ত যুগের বাণিজ্য প্রসঙ্গে পশ্চিম ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ, বাণিজ্য কেন্দ্র, রোমের সঙ্গে বাণিজ্য, রোমে রপ্তানি দ্রব্য, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য, নিগম প্রথা ও মুদ্রা সম্পর্কে জানবো।

গুপ্ত যুগের বাণিজ্য

বিষয় গুপ্ত যুগের বাণিজ্য
সাম্রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত
শ্রেষ্ঠ রাজা সমুদ্রগুপ্ত
শকারি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
গুপ্ত যুগের বাণিজ্য

ভূমিকা :- গুপ্ত যুগে রাজনৈতিক ঐক্য এবং দেশের সর্বত্র শান্তির জন্য অন্তর্বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বহির্বাণিজ্যেরও প্রভূত প্রসার ঘটেছিল। কুষাণ যুগ থেকে পশ্চিম ভারতের বন্দরগুলির মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে যে বাণিজ্যের সূত্রপাত হয়, গুপ্ত যুগে তা অব্যাহত ছিল। অনেকে মনে করেন যে, গুপ্ত যুগের অসাধারণ বৈষয়িক সমৃদ্ধির মূলে ছিল রোমান বাণিজ্য।

পশ্চিম ভারতের সাথে যোগাযোগ

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত পশ্চিম ভারতের শক-ক্ষত্রপদের দমন করার ফলে গঙ্গা-যমুনা উপত্যকার সঙ্গে পশ্চিম ভারতের বন্দরগুলির প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপিত হয়। দক্ষিণ ভারতের সঙ্গেও গুজরাটের বন্দরগুলির যোগ ছিল। বাংলার পুণ্ড্রী আখের চিনির কদর সারা ভারতে এমন কি পশ্চিম এশিয়ায় খুব ছিল।

বাণিজ্য কেন্দ্র

পশ্চিম ভারতের ভৃগুকচ্ছ বন্দর ছিল বহির্বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। এছাড়া কল্যাণ, চৌল, কাবেরীপত্তনম প্রভৃতি বন্দরও ছিল। উজ্জয়িনী ছিল অন্তর্বাণিজ্যের কেন্দ্রগুলির সঙ্গে প্রধান যোগসূত্র। উজ্জয়িনীর সঙ্গে রাস্তার দ্বারা গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা সংযুক্ত ছিল। উজ্জয়িনী থেকে ভারুচ বা ভৃগুকচ্ছে মাল রপ্তানি হত। নাসিক, পৈঠান, বারাণসী, তক্ষশিলা প্রভৃতি নগর ছিল বিখ্যাত অন্তর্বাণিজ্যের কেন্দ্র।

রোমের সঙ্গে বাণিজ্য

  • (১) রোমের সঙ্গে গুপ্ত ভারতের বাণিজ্যে শেষ পর্যন্ত মন্দা দেখা দেয়। এর কারণ হিসেবে বলা যায় যে, রোমান সাম্রাজ্য দুভাগ হয়ে গেলে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয়। তাছাড়া পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যে হূণ আক্রমণ হলে রোমান বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয়।
  • (২) পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বা বাইজানটিয়ামের সঙ্গে গুপ্ত ভারতের অবশ্য আরও অনেকদিন বাণিজ্য চলে। খননকার্যের ফলে ভারতের নানাস্থানে বাইজানটাইন মুদ্রার বিপুল সঞ্চয় আবিষ্কৃত হয়েছে। এর থেকে বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের কথা প্রমাণ হয়।
  • (৩) পারসিকরা ভারত ও চীন থেকে রেশম কিনে তা রোমান সাম্রাজ্যে রপ্তানি করত। পারসিকরা এত চড়া দামে রেশম বিক্রি করত যে, সম্রাট জাষ্টিনিয়ান বাধ্য হয়ে রেশমের দাম বেঁধে দেন। এক পাউণ্ড রেশম ১৮ খণ্ড রোমান স্বর্ণমুদ্রার বেশী দাম হবে না বলে তিনি ফতোয়া জারী করেন।
  • (৪) পারসিকদের একচেটিয়া রেশমের ব্যবসা নষ্ট করার জন্য তিনি আবিসিনীয়দের সাহায্যে ভারত থেকে রেশম আমদানীর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর এই চেষ্টা সফল হয়নি। অবশেষে কয়েকজন খ্রীষ্টীয় সন্ন্যাসী তাদের আলখাল্লার ভাঁজে করে চীন থেকে রেশমের গুটিপোকা লুকিয়ে আনলে রোমে রেশমের উৎপাদন আরম্ভ হয়।
  • (৫) ফলে রোমে ভারতীয় রেশমের বাজারে মন্দা দেখা দেয়। তাছাড়া হুণ আক্রমণের ফলে ভারতে যে রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটে তার জন্যও ৩৬৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বহির্বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয়।

রোমে রপ্তানি দ্রব্য

ভারত থেকে রোমান সাম্রাজ্যে শুধুমাত্র রেশম রপ্তানি হত না। ভারতীয় জীবজন্তু যথা সিংহ, বাঘ, তোতা পাখি, ভালুক প্রভৃতিরও রোমে চাহিদা ছিল। চামড়া, পশুর লোম, হাতির দাঁতের দ্রব্য, মুক্তা, চন্দন কাঠ, নীল, লোহার জিনিষ, পাথর, সুগন্ধি দ্রব্য ভারত থেকে রপ্তানি হত। এছাড়া রান্নার মশলা, বিশেষত লঙ্কা, মরিচ পশ্চিম দেশে বিশেষভাবে রপ্তানি হত।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য

  • (১) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে গুপ্ত ভারতের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ কম ছিল না। রোমের সঙ্গে বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিলে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের দ্বারা এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হয়।
  • (২) বাংলার তাম্রলিপ্ত, ঘন্টশাল, কাদুরা ও করমণ্ডল উপকূলের কাবেরীপত্তনম্ বন্দর থেকে এই বাণিজ্য চলত। তাম্রলিপ্ত তখনকার যুগে এক সমৃদ্ধশালী বন্দর ছিল। দূরপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে তাম্রলিপ্ত থেকে বাণিজ্য চলত।
  • (৩) চীনা রাষ্ট্রদূত ফা-হিয়েন তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে সমুদ্রপথে স্বদেশ যাত্রা করেন। সম্ভবত ফা-হিয়েনের যাত্রাপথ ধরেই ভারত-চীন বাণিজ্য পথ প্রসারিত ছিল। তাছাড়া জাভা, মালয় প্রভৃতি দেশের সঙ্গেও ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্য চলত।
  • (৪) ভারতের চন্দন কাঠ মেকং নদীর ব-দ্বীপ অঞ্চল বা ফুনানে রপ্তানি হত। চীন থেকে রেশম আমদানী হত। ইথিওপিয়া থেকে আসত গজদত্ত। ভারতীয় বণিকরা চীনের ক্যান্টন বন্দরে বাস করত। তাছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মশলা, সুগন্ধি, রেশম এনে ভারতীয় বণিকরা তা রোমে রপ্তানি করত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়দের সম্পর্কে চীনা বিবরণ পাওয়া যায়।
  • (৫) তাম্রলিপ্ত ও দক্ষিণ ভারতের অমরাবতী থেকে ভারতীয় বাণিজ্য জাহাজ রীতিমত ব্ৰহ্ম, মালয় ও ফুনানে যাতায়াত করত। ভারতের পশ্চিম উপকূলের কল্যাণ প্রভৃতি বন্দর থেকে আরব ও ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বাণিজ্য জাহাজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেত। যদিও ধর্মশাস্ত্রে সে যাত্রা নিষিদ্ধ ছিল, বাস্তবে তা মানা হত না।

নিগম প্রথা

  • (১) গুপ্ত যুগে বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক আইন-কানুন চালু করা হয়। স্মৃতিশাস্ত্রগুলিতে দেখা যায় যে, বাণিজ্যের উন্নতির জন্য চেষ্টা করা রাজ কর্তব্য বলে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। গুপ্ত যুগে গিল্ড বা নিগম প্রথা ছিল। বণিকরা তাদের স্বার্থরক্ষার জন্যে নিগম গঠন করত। কারিগররাও নিগম গঠন করত।
  • (২) নিগম প্রথার দরুণ কোনো বহিরাগত ব্যক্তি নিগমের বিনা অনুমতিতে বাণিজ্য বা শিল্পের কাজ করতে পারত না। নিগমের নিয়ম অনুসারে জিনিষপত্রের দরদাম স্থির করতে হত। বৃহৎ ব্যবসায়ীরা নিগমগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে একচেটিয়া বাণিজ্য ও মুনাফা করার চেষ্টা করত। এর ফলে পুঁজিবাদের উদ্ভব হয়।
  • (৩) গুপ্তরা ধনী শ্রেষ্ঠীদের খাতির করে চলতেন। কারণ, তারাই অর্থ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করত, বাণিজ্যকে নিগমের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করত। এজন্য স্থানীয় শাসন পরিষদে নিগম প্রধান ও শ্রেষ্ঠীদের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করা হত। নিগমগুলি ছিল স্ব-শাসিত সংস্থা। এতে সরকার হস্তক্ষেপ করত না।
  • (৪) নিগমগুলি আধুনিক ব্যাঙ্কের মত মহাজনী কারবার করত। বৌদ্ধ সংঘগুলিও নিগমে টাকা খাটাত ও বাণিজ্যের মুনাফা ভোগ করত। লোকে বাড়তি টাকা নিগমে সুদের বিনিময়ে জমা রাখত। নিগম সেই টাকা চড়া সুদে ব্যবসায়ীদের ধার দিত। সাধারণত ২০% সুদে নিগম টাকা ধার দিত।
  • (৫) নিগমগুলি অনেক সময় আধুনিক ব্যাঙ্কের ভূমিকা পালন করত। বড় মন্দিরগুলি এবং গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিও সুদের বিনিময়ে অর্থ ঋণ দিত। যদিও ধর্মশাস্ত্রে সুদ গ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল, কার্যক্ষেত্রে তা মানা হত না। এছাড়া শ্রেষ্ঠী বা শেঠী শ্রেণী ছিল পেশাগত বণিক, পুঁজিবাদী ও মহাজন শ্রেণী। এই শ্রেষ্ঠী শ্রেণী ছিল নিগমগুলির প্রধান।

মুদ্রা

গুপ্তযুগের মুদ্রাগুলি পরীক্ষার ফলে দেখা যায়, প্রথম দিকে সেগুলি শক-কুষাণদের অনুকরণে তৈরি করা হত। রোমান মুদ্রার প্রভাবের কথা স্মিথ বলেছেন। গুপ্তযুগের শেষদিকে মুদ্রার মানের যথেষ্ট অবনতি হয়। এছাড়া গুপ্ত যুগে রৌপ্যমুদ্রার অত্যন্ত স্বল্প পরিমাণ লক্ষ্য করে কোশাম্ব গুপ্ত যুগে বাণিজ্যের প্রয়োজন কমে যায় বলে মনে করেন।

উপসংহার :- হূণ আক্রমণের পর প্রাচীন বাণিজ্য পথগুলির গৌরব অস্তমিত হয়। গুপ্ত যুগে গ্রাম ও জনপদগুলিই প্রাধান্য পাচ্ছিল। নগরগুলি ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হতে থাকে। সুতরাং ৩৬৪ খ্রিস্টাব্দের পর গুপ্ত যুগের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লোপ পেতে থাকে।

(FAQ) গুপ্ত যুগের বাণিজ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গুপ্ত যুগে কোন কোন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চলত?

রোম, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া।

২. গুপ্ত যুগের দুটি বন্দরের নাম লেখ।

ভৃগুকচ্ছ, উজ্জয়িনী।

৩. গুপ্ত যুগে বাংলার বাণিজ্য বন্দর কোনটি ছিল?

তাম্রলিপ্ত।

৪. কোন গুপ্ত সম্রাট শকদের পরাজিত করেন?

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত।

Leave a Reply

Translate »